কেয়া পাতার নৌকা

লেখকঃ মেঘ রাজ সাইমুন
উৎসর্গ- প্রিয় শুভ্র-কে।


ভূমিকাঃ

আজ রবিবার।

ছুটির দিন।

ঘুম থেকে শীঘ্রই উঠে গেল অর্ক।

সরি ডাঃ অর্ক রায় চৌধুরী।সদ্য পাসকৃত ডাক্তার
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বেলা ৯টা।
কাল বাংলাদেশ থেকে আসা অভিদা,বৌদি আর তাদের পাঁচ বছরের মেয়ে তিশি কে নিয়ে অর্নদাকে দেখতে যাবে সে।চট করে ফ্রেশ হয়ে নিল অর্ক।কাপড় বদলিয়ে অর্নের ঘরে গেল সে।অনেকদিন হল অর্নের ঘরে কেউ আসে না।তাই মাকড়শারা আপন মনে জাল বুনেছে তাদের শিকার ধরতে।ছোটবেলায় অর্নের দেওয়া একটা মাউথএয়ারগান খুঁজতে এসেছে এ ঘরে।অনেক খুঁজেও সেটা পেল না অর্ক।ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ঘরে একটা কোণে ছোট্ট একটা টেরাং এর দিকে নজর আটকে গেল তার।
মনে পড়ল এটা অর্নদার প্রিয় সেই টেরাং।হয়তো বাবা যত্ন করে তুলে রেখেছে।টেরাংটাকে নামিয়ে নিল সে।মায়াভরা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল সেটির দিকে।খুলে দেখল অর্নের দেওয়া মাউথএয়ারগানটা।সাথে কিছু কাপড়চোপড় অর্নের।কাপড় উল্টাতেই একটা নীল ডায়রী তার চোখে পড়ল।ডায়রীটাকে তুলতেই কিছু একটা নিচে পড়ল।অর্ক তাকিয়ে দেখল কোন একটা পাতার নৌকা।এই ডায়রীতে হয়ত কোন প্রিয় পৃষ্ঠায় চাপা পড়ে ছিল আপন খেয়ালে।
শুকনো পাতার নৌকাটিতে কিছু রক্ত শুকিয়ে আছে।পাতার নৌকাটাকে নাকের কাছে নিলো সে।কেয়ার সুগন্ধ বের হল।অর্ক বুঝল এটি হয়তো কেয়াগাছের পাতা দিয়ে তৈরী হস্তনিপুণ নৌকা।অর্নদার কোন প্রিয় স্মৃতির ছোঁয়া আছে এই পাতার নৌকায়।আধ খোলা জালানা দিয়ে সকালের হাওয়া এসে নীল ডায়রীর কিছু রক্তমাখা শুভ্র পৃষ্ঠায় অর্কের জানা-অজানা স্মৃতির দেখা পেল সে।
——————————————————

এক।

ভোরবেলা টিনের চালের রিমঝিম বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে ঘুম ভাঙ্গল আমার।ঘুম ঘুম চোখে উঠে গিয়ে জালানাটা খুলে দিলাম।কিছু পূবালি হাওয়া আমার চোখকে ছুঁয়ে দিল।কাক ডাকা ভোরে বৃষ্টিকে খুব সুন্দর লাগে আমার।আমি হাত বাড়িয়ে জালানা দিয়ে বৃষ্টির শীতল জলের ছোঁয়া নিলাম।জালানার কাছ ঘেষে শিউলিফুল গাছ থেকে একটা হলদে কুটুমপাখি শ্রাবণঝরা নীলাকাশে উড়ে গেল।আমার সারা দেহ শিহরিত হল।আকাশের দিকে চোখ পড়তেই চোখটা ঝাপসা হয়ে এল আমার।মাঝরাতে মাকে স্বপ্নে দেখলাম।মা ভালো নেই আমাকে ছেড়ে।ঠাকুমা বলত,মানুষ মারা গেলে নীল আকাশের তারা হয়ে যায়।ভগবান তো আকাশে থাকে।তাহলে কি আমার মা তার কাছে?আমি আজও গভীর রাতে তারার মাঝে আমার মাকে খুঁজে ফিরি।হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে আমার বুকটা কেঁপে গেল।আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রুপসা সেতুর নিচে আমার প্রিয় কেয়াগাছটার দিকে তাকালাম।
ওটার আশেপাশে কোথাও পড়েছে বোধ হয়।কেয়াগাছটা অক্ষত আছে দেখে চোখেমুখে একটা দুষ্টু হাসির রেখা টেনে নিলাম।লোকে বলে,কোন এককালে উগরোপন্থীর মতো সুন্দরবন ছেড়ে পশুর নদী দিয়ে আপন খেয়ালে ভাসতে ভাসতে এখানেই ঠাঁই নিয়েছিল ও।কেয়াগাছটা আজ অনেক বড়।নিজের অস্তিত্ব বিরাজ করেছে আজ।সে আমার বড়ই আপন।চিলেকোটা হতে মায়ের চিৎকার ভেসে এল।
-কই নবাবপুত উঠল নাকি?
কপাট খুলে বাইরে এলাম আমি।উত্তর ঘরে বসে পড়ছিল অর্ক।বাবা পাশে বসে হয়তো হিসাব কষছে।চিলে কোটার দিকে তাকিয়ে আমি বললাম,
-কি হয়েছে বলেন?
-বলি সতীনের পো।এত ঘুমালে হবে কি করে গো!আমার যে একটু লাগে তোমায় বাপু।
আমি দাওয়ায় দাড়িয়ে মুখে জল নিতে নিতে বললাম,”কি করতে হবে বলেন।”
-তোমার অভি দাদার দোকান থেকে এক প্যাকেট মরিচগুড়া নিয়ে এসো।যাও!
বই থেকে মুখ তুলে অর্ক বলল,
-মা বাইরে তো বৃষ্টি পড়ছে।অর্ন দা যাবে কিভাবে?
-তুমি চুপ করো।খুব বৃষ্টি হচ্ছে না।ও যেতে পারবে।এইটুকু তো পথ বাপু।
আমি একটা শুকনো হাসি দিলাম।যে হাসি পৃথিবীতে সৎমায়ের দ্বারা অত্যাচারিত প্রতিটি সন্তানের মুখে শোভা পায়।
-আমি যাচ্ছি অর্ক।সমস্যা হবে না ভাই।ঠিক চলে যাবো।
-কিন্তু দাদা।
-তুই চুপ কর না ভাই।
রন্ধনশালা থেকে পার্বতী দেবীর অগ্নি চোখ নিক্ষেপ হল অর্কের দিকে।অর্ক মাথা নিচু করে পড়তে লাগল।বাবা কিছু বললেন না,এমনকি চোখ তুলে একবারটি দেখলেনও না।কাগজে-কলমে হিসাব কষতে কষতে তিনি সংসার আর জীবনের হিসাব কষা ভুলে গেছেন।
টিপটিপ বৃষ্টির মাঝেই অভি দার দোকানের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম আমি।
আমি অর্নব।আর এই হল আমার জীবন।দশ বছর বয়সে মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আরেকটা বিয়ে করে।সে ঘরে অর্ক এল।অর্ক আমার সহোদর না হলেও ওকে আমি খুব ভালোবাসি।অর্কও আমি বলিতে অজ্ঞান।এসএসসি পাশ করে,সৎমায়ের সুমতিতে আর পড়া হল না।খুব ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবো।আজ সব কিছুই আমার কাছে স্বপ্নের মতো।
শ্রাবণের ঝরাজল আমার চোখের জলকে লুকিয়ে রাখছে।আমি পথ চলছি একা বৃষ্টির মাঝে।অভিদার দোকানে যেতে নদীর কুলে কেয়াগাছটা দেখা যায়।এই সময়ে কেয়া গাছে ফুল ফোটে।পৃথিরাজের সকল গন্ধে চারদিকে মধুময় করে তোলে কেয়াফুল।সাদাফুলের চারপাশে বেগুনি পাপড়ি ঘেরা কেয়াফুল।আর পাতাগুলো তীক্ষ্ণ কাঁটা নিয়ে সগর্বে গর্বিত।বৃষ্টির জলের ফোঁটার সাথে যেন আপন মনে যুদ্ধ করছে।কেয়া পাতার সাথে আমার জীবনের খুব মিল।যেন একধারায় আমরা দুটি অসহায়।
অভিদার দোকানের কাছে যেতেই অভিদা বলল,
-কিরে অর্নব।বৃষ্টিতে ভিজে এলি কেন?
-বাড়িতে মরিচগুড়া লাগবে তাই।
-ছোট কাকিটা যেন কি?
-ওসব থাক অভিদা।তুমি দাও তো আমি যায়।
-একটু বস তো।এই নে গামছা একটু মাথাটা মুছে নেতো।
এই হল অভিদা।আমার বড় জেঠুর একমাত্র ছেলে।বিবিএ পাশ করে,জীবিকার তাগিদে দোকান খুলেছে রুপসার পাড়ে।আমাকে খুব ভালোবাসে।সংসারে একমাত্র মনের কথাগুলো বলার মানুষ আমার।
-কিরে অর্নব?সকালে কিছু খেয়েছিস?
-না অভিদা।আমি উঠে চোখমুখে জল দিয়েই এলাম।অবশ্যই বৃষ্টির জল আমার সারা দেহ অবগাহন করেছে।
-এতো কষ্টে থাকিস|অথচ দুষ্টু কথা ছাড় দিস না।
-তুমি যে কি বল না দা?
-এই নে তো মরিচগুড়া।আর এই ছাতাটা নিয়ে যা।
-লাগবে না দা|তুমি রেখে দাও।আমি ঠিক চলে যাবো।আর একবার না হয় বৃষ্টিতে এই কষ্টের শরীরটাকে ভিজালাম।
আমি দোকান থেকে বের হয়ে আসলাম।অভিদা হয়তো আমার যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে।আসলে মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুব সেনসিটিভ।তাকে কেউ ভালোবাসা বা করুণার চোখে দেখলে সে টের পাই।আবার চললাম আমি চিরচেনা শ্রাবণেরধারায়।

দুই।

পড়ার ঘরে বসে আনিকা আর অভ্রকে পড়াচ্ছিলাম আমি।অভ্র চেয়ারম্যান কাকার ছোট ছেলে।আর আনিকা তাদের একমাত্র মেয়ে।এদের পড়িয়ে যা পাই তা দিয়ে আমার ভবঘুরে জীবন চলে যায়।বাবার কাছে আমি কোন আবদার করি না।কথা বলি না বলার মত।আর মায়ের সাথে খুব দরকার না হলে কথা বলি না।
বাবা যেদিন মাকে বিয়ে করে এনে বলেছিল,এই নে তোর মা।দশ বছর বয়সী হলেও আমি সেদিন নতুন মায়ের চোখে আমার প্রতি ঘৃণা দেখেছিলাম।সেই থেকে আমি কোনদিন মাকে ‘মা’ বলে ডাকি নি।তাতে মা বোধ হয় খুব বেশিই সুখী।তিনি ধারনা করি ভেবেছেন,সতীনের ছেলের মুখে মা ডাক না শোনায় ভালো।হঠাৎ অভ্রের ডাকে আমার চিন্তায় আঁচ কাটল।
অভ্রের দিকে তাকিয়ে বললাম,”হা,অভ্র বলো।”
-দাদা এই অংকটা দেখেন তো।
-হা দাও।
অভ্রকে অংকটা বুঝাতে লাগলাম।
দরজার কাছে হঠাৎ একটা শব্দ হল।আমি তাকিয়ে দেখলাম একটা পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সী ছেলে দাড়িয়ে আছে।ছেলেটি দেখতে খুব সুন্দর।সব থেকে আকর্ষনীয় লাল ঠোঁটের নিচে কালো তিলটা।যেন মরুভূমির তপ্ত বালুতে এক টুকরো কালো মেঘ।মুখে খোচা খোচা দাড়িতে সুর্যদেবের মত লাগছে।আমাকে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে ছেলেটি ঈশারায় কাছে ডাকল।অভ্র আর আনিকাকে পড়তে বলে,আমি উঠে গেলাম দরজার কাছে।
ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,”তুমি অর্নব?”
-হ্যা।আপনি আশিক দাদা না?
-হ্যা।তুমি বুঝলে কিভাবে?
-জাদুতে।
-বাহ|তুমি তো খুব সুন্দর করে কথা বলো।
-তাই নাকি?আসলে অভ্র আর আনিকার কাছে আপনার এতো গল্প শুনেছি যে,আপনাকে মনে মনে কল্পনায় এঁকে ফেলেছি।
-ওহ হো কি ব্যাপার বলোতো?
আমি লজ্জা পেয়ে বললাম,”কখন আসছেন?”
-এই তো সকালে।
-কত দিন থাকবেন?
-সবে ফাইনাল এক্সাম শেষ করে এলাম।কিছুদিন থাকবো।এবার তোমাকে অনেক জ্বালাবো।আনিকা তো ফোনে তোমার অনেক প্রসংশা করে।বলে,অর্নদা এরকম ওরকম।আমাদের বকে না,পিঠায় না।
-তাই বুঝি?
-ওকে যাও তুমি পড়াও।
-ওকে দাদা।
এই হলো অভ্রের বড় ভাই আশিক।ঢাবি তে পদার্থে অনার্স পড়ছে।অভ্র আর আনিকা পড়ানোর সুবাধে আশিক দাদার সাথে আমার বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে উঠতে লাগল।সারাদিন আশিক দাদার সাথে ঘুরে বেড়ানো,মাছ ধরা,আমার প্রিয় সেই কেয়াতলায় বসে জীবনের সাত রংয়ের গল্প শুনা আমার অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেল।
দিনে দিনে আশিক দাদার প্রতি আমার দুর্বলতা বাড়তে লাগল।ওনার প্রতিটি কথা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম।ওনি যেন জীবন রাঙিয়ে তুলে তার সাধ নিতেন অবাধে।আমি জানি,জীবন জটিলও নয় ওতো সহজ নয়,আমরাই জীবনকে জীবনের প্রয়োজনে জটিল করে তুলি।মা মারা যাওয়ার পর আমি খুব কম হাসতাম,কিন্তু আশিক দাদা আসার পর আমি হাসতে শিখেছি,জীবনকে উপভোগ করতে শিখেছি।মাঝে মাঝে ওনার সাথে ঘুরতে গিয়ে রাত করে বাড়ি ফেরাতে রাতের খাবার পেতাম না।তবুও আমার কোন কষ্ট লাগত না।আশিক দাদার মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলে আমি সব কষ্ট ভুলে যেতাম।এভাবেই চলছিল আমার জীবন।

তিন।

নিথর জলের বুকে রুপসা সেতুর রাতের চিত্রের দিকে তাকিয়ে আছি আমি আর আশিক দা।রাতের রুপসাকে পৃথিবীর যে কোন শিল্পীর চিত্রের সাথে তুলনা করা যাবে।কিছুদিন আগে এটির কাজ শেষ হল।খুলনার রুপসা নদীর উপর অবস্থিত খান জাহান আলী সেতু।লোকে একে রুপসা সেতু বলে।দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুতে দাড়িয়ে গোধুলির সুর্যাস্তের রুপ পৃথিবীর যেকোন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে ছাড়িয়ে যাবে।এই সেতুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কুদির বটতলা,ভূতের আড্ডা,বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রশিক্ষন কেন্দ্র ইত্যাদি।লাল নীল আলোর জলচিত্রে কিছু পড়ার শব্দ হল।
দুজনেই সেদিকে তাকালাম,রুপসার ঢেউ ছড়িয়ে গেলে জীবন নদীর তীরে।আমাকে চুপ থাকতে দেখে আশিক দা মুখ খুলল,
-কি ব্যাপার অর্নব?ঐখানে কি দেখো?
-ঐ কেয়াগাছ দেখেছেন?ল্যামপোস্টের আলোয় গাছটাকে কি অপূর্ব লাগছে।
-কেয়াগাছে তুমি এমন কি খুঁজে পাই অর্নব?
-হুম।ওর জীবনের সাথে কি একটা মিল খুঁজে পাই আমি।ওর পাতাগুলো কি তীক্ষ্ম কাঁটা নিয়ে জীবন কাটায়।
-তুমি বুকের মাঝে খুব কষ্ট চেপে রাখো,তাই না?
-যার জীবনের কোন কুল নেই।তার কষ্ট আচড়ে পড়ার মত ঢেউ কোথায়?
-এতো কষ্ট বুকে না রেখে কাউকে ভাগিদার করতে তো পারো।
-জানেন তো দাদা,খুব ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবো।মানুষের জীবনকে আলোয় ভরিয়ে তুলব।ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে পাড়ি দিব জীবন নামের কঠিন সাগরকে।জীবনের পনেরটা বর্ষাকে অতিক্রম করার আগেই শ্রাবণের মুষুলধারা ধুয়ে দিল আমার স্বপ্নকে।আজ আমি জীবনপুরের পথিক।বাস্তবের তাগিদে আমার কষ্টের পথ চলা।
-উফ!অর্নব কাঁদছো কেন?
আশিক দা আর কোন কথা বলল না।ওনি শুধু দেখছিল আমার কালো চোখের জল।কারন ওনি জানতেন,মানুষের বুকের চেপে রাখা কষ্টকে কমাতে কাঁন্নাই একমাত্র পন্থা।কিছুক্ষণ থেকে আমরা উঠে গেলাম আপন নীড়ের সন্ধানে।পেছনে পড়ে রইল রুপসার রঙিন জীবন স্রোত।

চার।

বাড়িতে গিয়ে দেখলাম অভিদা বসে আছে।চোখে ঘুম ঘুম ভাব।
-কি ব্যাপার অভিদা।তুমি এখানে যে?
-আমাদের বাড়িতে অতিথি এসেছে,তাই আজ তোর কাছে ঘুমাবো।
-অর্ক কোথায়?
-ওতো কাকিদের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়েছে।
-ও গেল|ওতো আমাকে ছাড়া ঘুমায় না।
-যেতে চাই নি।আমি ভয় দেখিয়ে পাঠালাম।
-ওহ।তো তুমি জেগে আছো যে?
-তুই ফিরছিস না,তাই।কোথাও ছিলি?
-এইতো কাছে।
-কেন যে এমন করিস।কাকি রাগারাগি করছিল।ভাত খেয়ে নে।
-না,ক্ষুধা নেই।
-মিথ্যা বলছিস কেন?জানি তো,কাকি একটু কেমন কেমন।তাই বলে তুই নিজেকে কষ্ট দিবি?
-সত্যি অভিদা!আমার ক্ষুধা নেই।
অভিদা আমাকে জড়িয়ে ধরল।আমার কালো চোখের কিছু অবাধ্য জল অভিদার অনাবৃত শরীরে পড়ল।
-আমি খাইয়ে দেবো|তুই খাবি চল।
-কি যে বল তুমি অভিদা।বললাম তো ক্ষুধা নেই। তাছাড়া আমি তো ছোট নেই।
অভি দা আমার কান ধরে বলল,
-ওরে আমার পাকারে।খুব বড় হয়ে গেছিস দেখছি।নে তো হা কর দেখি।
আমি আর কথা না বলে অভিদার হাতে খেয়ে নিলাম।বিছানায় শুয়ে অভিদা আমাকে জড়িয়ে ধরল।
-আমাকে ভালোবাসবি তুই?
-মানে?
-তুই বুদ্ধু নাকি?বুঝছিস না।
-কি বলো তুমি দাদা এসব?
-তুই বল না?ভালোবাসবি আমায়?
-ছিঃ দাদা।কি সব বলো তুমি।তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?
-সত্যি অর্নব।আমি তোকে খুব ভালোবাসি।
-দাদা আর একটা কথাও বলবে না তুমি।তুমি জেঠুর একমাত্র ছেলে।কত ভালোবাসা দিয়ে তোমাকে মানুষ করেছে।আর তুমি?আমি কিন্তু জেঠুকে…..
-প্লিজ অর্নব|
-প্লিজ দা।তুমি একটা বিয়ে করো।
-ওহ তার মানে তুই আমাকে….
আমি নিঃশ্বাস রেখে বললাম,”ফিরিয়ে দিচ্ছি।এতে দু’জনের মঙ্গল!”
অভি দা আর কোন কথা বলল না।অভিদার দু’ফোঁটা চোখের জল আমার বুকের উপর পড়ল।আমি বুঝলাম অভি দা কাঁদছে।আমি নিজেকে তার বাহু থেকে ছাড়িয়ে নিলাম।
-ওকে তুই যা চাস।তবে মনে রাখিস।আমি তোকে ভালোবাসি,চিরকাল বেসে যাবো।জীবনে কোনদিন যদি কষ্টের ক্রন্দনে মুখ লুকানোর বুক খুঁজে না পাস।তবে আমার বুকে আসিস।সেদিনও এ বুক তোর রইবে।

পাঁচ।

কেয়াগাছের তলায় দাড়িয়ে রুপসার সহস্রকালের স্রোত দেখছি আমি।আর আশিক দার কথা ভাবছি।আমি কি আশিক দাকে ভালোবেসে ফেলেছি।সেদিন রাতে এজন্যই অভিদাকে ওভাবে বলেছিলাম মনে হয়।কিন্তু আশিক দাকে কিভাবে বলব এ কথা।সে যদি আমার মতো না হয়।তাহলে অযথা ভালো বন্ধুত্বটাই নষ্ট হবে।বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম আশিক দা অর্কের সাথে কথা বলছে।অর্ক আমার দিকে কি যেন ঈশারা করল।কিছুক্ষন পর আশিক দা আমার কাছে এলো।এসেই আমার পাশে দাড়িয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।রুপসার বাতাসে ওনার চুল উড়ছিল।অপূর্ব সুন্দর লাগছিল আশিকদা কে।
-কি ভাবছো?অর্নব।
-কই কিছু না’তো।
-কিছু তো একটা ভাবছো।তুমি আজকাল আমার কাছেও কথা লুকাতে শিখে গেছো!
-কি যে বলেন আপনি!
-আমার কথা ভাবছিলে তাই তো?
হঠাৎ আমি ঘামতে শুরু করলাম।আশিকদা কি কিছু বুঝতে পারল।
-না এমনি।এই তো,নদীর স্রোত দেখছিলাম।
-তাই বুঝি।আচ্ছা এই কেয়া গাছটা তোমার কাছে এত প্রিয় কেন?
-আমার অস্তিত্ব আমি ওর মাঝে খুঁজে পায়।
-তুমি না বলো কেয়া পাতার কাঁটার কথা।আজ দেখো আমি কি করি।
হঠাৎ আশিকদা একটা কেয়া পাতা ছিড়ে কাঁটাসহ কি যেন করতে লাগল।আমি দেখলাম আশিকদার হাত থেকে রক্ত বের হচ্ছে।
-কি করছেন এটা।আপনার লাগছে তো।ছাড়ুন তো।আমি আশিকদার একটা রক্ত ঝরা আঙ্গুল আমার মুখে নিয়ে চুষতে লাগলাম।
-কি করছো অর্নব?
-চুপ করুন তো!মুখের লালায় এন্টিসেভটিভ থাকে,রক্তঝরা বন্ধ হবে।
আমি দেখলাম আশিকদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।হঠাৎ রক্তাক্ত কেয়া পাতা দিয়ে তৈরি একটা নৌকা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আশিকদা আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ল।
-এই নাও তোমার জীবন জটিলতার নৌকায়।আজ এটার বিনিময়ে তুমি আমায় ভালোবাসা দিবে।ভালোবাসবে এই পাগল ছেলেটাকে?
আমার দু’চোখ দিয়ে আনন্দ অশ্রু বেয়ে পড়ল।নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
-এই ছেলে কাঁদছো কেন?
আমি আশিকদাকে জড়িয়ে ধরলাম।
আশিকদার হাতের কেয়া পাতার নৌকাটা আমার বুকের বাম পাশে লেপটে গেল যেখানে হৃদয় থাকে।আশিকদার লাল ঠোঁটের স্পর্শ পেলাম আমি।আমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল।এভাবে কতক্ষণ মনে নেই।আশিকদার মুখের লালা আমার কাছে সেদিন মধুর মত লেগেছিল।আমার জীবনে প্রথম কোন পুরুষের এত কাছে আসা।
বাড়িতে ঢুকতেই অর্ক এসে বলল,অভিদা বিয়ে করে এনেছে।ওর টানাটানিতে নতুন বৌকে দেখতে গেলাম।খুব সুন্দরী ছিল বৌদি।অভিদার সাথে বেশ মানিয়েছিল।চিলে কোটায় একটা চেয়ারে অভিদা বসে ছিল।হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে গেল।আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।বুকে চিনচিন ব্যথা অনুভব হল আমার।জানি না কেন মনে হল আজ থেকে সেই অভিদাকে আমি হারিয়ে পেললাম।অজান্তেই দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল চোখের কোণ থেকে।দুরে বসে অভিদা দেখতে পেয়েছিল কি আমার চোখের জল?

ছয়।

চেয়ারম্যান বাড়ির সদর দরজায় ঢুকতেই আমাকে কে যেন টেনে নিয়ে গেল।কৌতুহলী চোখে চেয়ে দেখলাম আশিকদা হাসছে।আমি এখন আশিকদার ঘরে।হঠাৎ আশিকদা দরজা বন্ধ করে দিল।
-কি করছেন আপনি?কাকিমা দেখলে কি বলবে তাছাড়া অভ্র আনিকা।
-ছাড়ো তো।কেউ দেখবে না।তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো।তাছাড়া আমি আমার মনের মানুষকে একটু আদর ও করতে পারব না?
-কি ঝামেলা!
-আমার খুব মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে।
-এখন মিষ্টি পাব কৈ?
আশিকদা আমার ঠোঁটের দিকে ঈশারা করল।
-চলবে না।
-কি নিষ্ঠুর!নিজের লোকের সাথে কেউ এমন করে।
-খুব না?
আশিকদা আমার কাছে এগোতে লাগল।আর আমি পিছতে লাগলাম।পিছতে পিছতে আশিকদার বেডের উপর পড়ে গেলাম।আশিকদা আমার গায়ে উপর পড়ল।আমার ঠোঁট আশিকদার অত্যাচার সইতে প্রস্তুত হল।ভালোবাসার অত্যাচার।কারোর লাল ঠোঁটের ছোয়া পেলাম।দুজনেরই শরীর জেগে উঠল।এভাবে আমাদের প্রথম ভালোবেসে এতো কাছে আসা।আর এমন করে একে অপরকে ভালোবেসে আমাদের মাঝে অনেকবার যৌন খেলা হয়ে গেল দুজনের অজান্তে।
আজ অনেকদিন হল আশিকদা ঢাকা গেছে।আমার খুব খারাপ লাগে আজকাল।
আশিকদাকে খুব দেখতে মন চাই।কিন্তু আজ এতো দিন হলো আশিকদা আমার কোন খোঁজ নিল না।যে আশিকদা আমাকে না দেখে একটা মিনিটও থাকতে পারতো না!সে কিভাবে আমাকে ভুলে আছে।তাহলে আশিকদার কিছু হল না তো?হঠাৎ আমার শরীর কেঁপে উঠল অজানা ভয়ে।অর্ক কখন যে আমার পিছনে এসে দাড়িয়েছে আমি টের পাই নি।আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল ওর কচি হাতের ছোঁয়ায়।
-কি হয়ছে দা।তুই আজকাল তেমন কথা বলিস না।আমাকে বকাঝকাও করিস না।
আমি ফিরে তাকিয়ে বললাম,
-ও তুই।কিছু হয় নি ভাই।
-আমাকে বল না দাদা।আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম।
অর্ক আমাকে জড়িয়ে রেখে বলল,”জানিস দাদা আজ আনিকা বলল ওর বড়দা নাকি শহুরে মেম বিয়ে করে এনেছে।”
আমার হৃদয় আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা শুরু হল।বুক ফেটে আর্তনাদ এলো।কি করল এটা আশিকদা?আমি আজ ভালোবেসে হেরে গেলাম।আমার চোখ দিয়ে হৃদয়ের শুভ্র রক্ত ক্ষরন হতে লাগল।পিছে অর্ক দেখে ফেলার ভয়ে,ওকে বললাম,
-অর্ক তুই যা তো ভাই।আমার একটা কাজ আছে।
অর্ক চলে গেল।আমি বিছানায় পড়ে গেলাম।জ্ঞান ফিরে দেখলাম,অভিদা আমার কাছে বসা।অভিদার চোখে জল।আমার আর আশিকের ব্যাপারটা অভিদা জেনেছিল সেদিন অভিদা আমায় কিছু বলেনি।
আজ আমি আশিকদার বাড়িতে গিয়েছিলাম,আমার ভালোবাসার দক্ষিণা চাইতে।আশিকদা আমায় অনেক অপমান করল।আমার মতো শরীর নাকি তার যৌনতার পুজারী।
আমার মতো বেজাতি হিন্দুর ছেলে নাকি তার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না।মা মারা গেলেও আমার ছোট্ট হৃদয়ে এতো আঘাত পাই নি।আজ যা পেলাম দিন দিন আমার মানসিক অবস্থা খারাপ হতে লাগল।আশিকদা আর আমার খোঁজ নিল না।বাবা আমাকে নিয়ে অনেক জায়গায় গেলেন।কোন কাজ হলো না।আমার অবস্থার অবনতি হতে লাগল।শেষে বাবা চিকিৎসার জন্য আমাকেসহ স্বপরিবারে এই ভারতে এলেন।এখানে এসে আশিকদার কথা খুব বেশি মনে পড়তে লাগল।আশিক দার সেই কেয়া পাতার নৌকাটা নিয়ে এসেছি এদেশে।আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসার স্মৃতি।আজ খুব মাথা ব্যথা করছে জানি না কি হয়।
আশিকদাকে খুব দেখছে ইচ্ছে করছে।কিন্তু আজ আমি তার থেকে অনেক দুরে।তাকে মুক্তি দিয়ে এসেছি।কিন্তু ভালোবাসা তো হৃদয়ের সীমারেখা মানে না।মা আজকে আমাকে বাবা বলে ডেকেছে।শত কষ্টের মাঝেও আমি আজ খুব খুশি।

অর্কের চোখ থেকে অনর্গল জল পড়ছে অর্নের নীল ডায়রীর উপর।আজ সে তার দাদার পাগল হবার কারন খুঁজে পেল।
নিচ থেকে অভিদা,বৌদি অর্ককে ডাকছে।হয়তো তারা প্রস্তুত হয়েছে অর্নকে দেখতে যাবার জন্য।

গোবিন্দপুর পাগলা গারোদ।

অর্নের সেলের সামনে দাড়িয়ে আছে অর্ক,অভি,গোপি আর তিশি।অর্ন আপন মনে একটা কাগজ দিয়ে নৌকা তৈরি করছে।
অর্কের মনে পড়ল কেয়া পাতার নৌকার কথা।সে ওটি সাথে করে এনেছে।একবার বের করে দেখল নৌকাকে।শুকনো তীক্ষ্ম কাঁটার আঘাত পেল অর্ক।সে দেখল অভিদা কাঁদছে।এই অভিই একদিন ভালোবেসে ছিল অর্নকে।অভির সামনেই আজ তার ভালোবাসা,পাগল হয়ে সাত বছর পড়ে আছে এই পাগলা গারোদে।তার চোখের জল বাধ মানবে কিভাবে?
অর্ক বুঝল,ভালোবাসার গভীরতা আজ তার অর্নদাকে দেখে।হোক সে একটা ছেলে প্রতি ভালোবাসা।কারন ভালোবাসা তো ভালোবাসাই।অজান্তেই চোখের জল গড়িয়ে পড়ল তার।

অর্নব একবার ফিরে তাকাল ওদের দিকে।তারপর আবার গেল আপন খেয়ালের পৃথিবীতে।

——————————————————
লেখাঃ মঙ্গলবার,১৮ই আশ্বিন,১৪২২।
(ভারত বঙ্গাব্দ)।
——————————————————
প্রকাশে-
প্রথম প্রকাশঃ অন্য ভুবন।
সময়ঃ বৃহস্পতিবার,৮ই অক্টোবর,২০১৫ ইং।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.