টপ-বটম ভেদাভেদ

ম্যাথিউ লাস (Matthew Lush) ও নিক ল’স (Nick Laws) জুটির নাম শুনেছেন কখনো? না শুনবারই কথা। তবে ইউটিউবের সমকামী জগতের ভ্লগ (Vlog : Video Blog) যদি অনুসরণ করা হয় তবে অত্যন্ত আদুরে এই জুটির মজার মজার কিছু ভিডিও হয়তো দেখেছেন। ম্যাথিউর চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হোল তার রঙিন কেশরাজি। কখনো গোলাপি, কখনো নীল, কখনো রঙধনু রাঙা। তবে তার হাস্যরসাত্মক চটপটে ব্যক্তিত্ব আপনাকে আকর্ষিত করতে পারে আরেকটু বেশী। অন্যদিকে নিক তুলনামূলক লাজুক, একটু ভাবগম্ভীর বলা চলে। ব্যক্তিত্ব যার যাই হোক না কেন প্রেমিক যুগল হিসেবে দুজনে অনন্য। আর যেখানে প্রেম আছে সেখানে কাম থাকতেও পারে। কামের কথা এলে নিশ্চয়ই আসবে চিরাচরিত ‘কে টপ আর কে বটম’ প্রসঙ্গ। এই জুটির যেকোনো একটি ভ্লগ দেখলে আপনি হয়তো চোখ বন্ধ করে বলে দেবেন ম্যথিউই এই সম্পর্কে ‘নারী’ ভূমিকাটি পালন করে। এভাবে বলছি কারণ খানিক মেয়েলি হাত নাড়াচাড়া দেখেই  আমরা গতানুগতিক ‘টপ নাকি বটম’ বিচার করতে বসে যাই। বোতাম চাপা সেলফোনের কাল ফুরিয়ে স্পর্শকাতর সেলফোনের যুগ চলে এলেও আমরা অনেক আদিম তত্ত্ব এখনো জাদুঘরে পাঠাতে পারিনি।

আমি কোন আধুনিক তত্ত্বও দিতে চাইছি না। আদিম তত্ত্বটির ভুল অংশটুকু দেখাতে চাইছি কেবল। একজন সমপ্রেমী হিসেবে এই চিরাচরিত ‘T/B’ প্রশ্নটি শুনতে শুনতে আমি কিঞ্চিৎ বিরক্তই। যেকোনো একটা বেছে না নিলে অনেকের কাছে ‘সমপ্রেমী’ সত্ত্বাটাই যেন বৃথা! ‘টপ’ কিংবা ‘বটম’ তকমাবিহীন মানুষ সমপ্রেমী জগতে যেন হালবিহীন নৌকা। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পূরণের সনাক্তকরণ চিহ্ন উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়েছিল, তেমনি ‘টপ/বটম’ হয়ে উঠেছে সমপ্রেমীদের অতি আবশ্যক সনাক্তকরণ চিহ্ন। কিন্তু একটা বেছে না নিলে খুবই পাপ হবে কি? পারস্পারিক যোগাযোগে এই প্রশ্নটির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? প্রয়োজনীয়তার কথা উঠলেই আমার মস্তিষ্ক ছোটখাটো একটা বক্তৃতা উৎপাদন করে নেয়। শুধুমাত্র যৌনসম্পর্কের জন্য পারস্পারিক যোগাযোগ হলে প্রশ্নটির গুরুত্ব অক্সিজেনের মতই অনস্বীকার্য কিন্তু প্রেম বা কামকে ঘিরেই কি জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত ব্যয় হয়? পরিচিত বন্ধুটিকে নিয়ে কি আমরা রেস্তোরায় খাওয়া বা সিনেমা দেখার মত কাজ গুলো করছি না? হোক সে সমপ্রেমী কি বিষমপ্রেমী। অন্যদিকে প্রেম ও কাম উভয়ই অনেক বিচিত্র, এককালের বাংলার ষড়ঋতুর মতই। কখনো বৃষ্টিজলের মত বহমান, কখন শীতের মত শুষ্ক।

আমাদের মধ্যে কেউ সমলিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট, কেউ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি, কেউ বা আবার উভয় লিঙ্গের প্রতি। আবার কেউ কোন লিঙ্গের প্রতিই কামাসক্ত নন। কামহীন? একটু ভ্রুকুটি করছেন কি? করুন, তবে তাদের ‘খোজা’ বা অক্ষম ভেবে বোকা বনবেন না। এমনতর ব্যক্তি কামে উদাসীন হতে পারেন কিন্তু প্রেমে সমপ্রেমী, বিষমপ্রেমী কি উভপ্রেমী যেকোনোটিই হতে পারেন। তাই আপনার গতানুগতিক প্রশ্নে কিংবা ভ্রূকুটি তাদের জন্য একটু বিব্রতকর বটেই। কামের দৌড়ে আপনি এগিয়ে থাকলেও প্রেমের খেলার অনেক বৈচিত্র্যময় দিক তারা আপনাকে শেখাতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। শুধু প্রেম নয়, কামের ধারাও কি কম রঙিন? ফেসবুকের চ্যাট বলুন আর রমনার বেঞ্চালাপই বলুন, আপনার দৌড় হয়তো ‘দাতা/গ্রহীতা’ ভাবনায় আটকে আছে কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষেরই ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা থাকে। চাহিদার ফেরে কেউ চুম্বনেই তৃপ্ত, কেউ বা আরো অন্তরঙ্গ রঙ্গলীলায়।  কারো মাঝে হয়তো ‘দাতা/গ্রহীতা’ চাহিদাটুকু একেবারেই অনুপস্থিত। প্রশ্ন করতে পারেন, সকলের মুখেই একই প্রশ্ন কেন তবে? উত্তরটা কঠিন নয়। সমপ্রেমী কিংবা উভপ্রেমী হিসেবে অনেকেই নিজেদের একটু ভিন্ন চোখে দেখেন। ব্যতিক্রমের মাঝে ব্যতিক্রম হয়ে বঞ্চিত হবার ঝুকি কয়জন নিতে চাইবে বলুন?

আপনি টপ কিংবা বটম নন? তবে আপনার জন্য একেবারে প্রস্তুত মধ্য পন্থা। বলতে পারেন আপনি বহুমুখী গুনের অধিকারী বা ভারসেটাইল। মা খালাদের ভাষায় সব তরকারীর লবণ। অনেকে আবার ভারসেটাইলের সাথে ‘টপ’ বা ‘বটম’ যুক্ত করে কোনটা একটু বেশী পছন্দ করেন তা বুঝিয়ে দিতে চান। তাহলেও সমস্যা নেই, অন্ততপক্ষে একটা তকমা তো আপনি বেছে নিয়েছেন। সমস্যা তখনি যখন আপনি তকমাবিহীন ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে চাইবেন। আমার এক বন্ধু বলেছিল, ‘ভারসেটাইল বলতে কিছু নেই। সবটাই সুযোগসন্ধানী টপ আর দ্বিধান্বিত বটমের ছলচাতুরী।’ আমিও হেসে বলেছিলাম, ‘সমকামী বিষমকামীও কিছু নেই। সুযোগ বুঝে সঠিক স্থানে হাত বুলিয়ে দিলে সকলেই সমকামী হয়ে যায়।’

অনেক হয়েছে নিজেদের কিছু গতবাধা ট্যাগে বেধে ফেলা। নিজের প্রাথমিক উপস্থাপনটা হোক একজন ব্যক্তি হিসেবে, একজন টপ বটম বা ভারসেটাইল হিসেবে নয়। প্রসঙ্গ গুলো আসুক সময় বুঝে, প্রয়োজন বুঝে। পুরুষালী ভাব মানেই টপ আর মেয়েলি ভাব মানেই বটম এসব তথাকথিত ধারণা ছুড়ে ফেলবারও উপযুক্ত সময় এটা। পৃথিবীতে বিশেষ করে সমপ্রেমী সমাজে আপনার পদচারণা যদি শুধু যৌন সম্পর্কের খাতিরে হয়ে থাকে তবে আপনার আদিম তত্ত্ব খণ্ডানো আমার কম্ম নয়। কিন্তু কেউ এসব তকমা গ্রহণে নারাজ হলে তার যৌনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবার আগে দ্বিতীয়বার ভাবুন। ম্যাথিউ লাস (Matthew Lush) ও নিক ল’স (Nick Laws) জুটির মাঝে প্রেম কাম দুইই উপস্থিত এবং টপ/বটমের তকমা তাদেরও আছে। তাদের পরিচয়ের ভ্লগটি দেখার সুযোগ যদি হয় তবে উপলদ্ধি করতে পারবেন একটা সম্পর্কের(বন্ধুত্ব হোক কি প্রেমের) ভিত্তি এই চিরাচরিত প্রশ্নের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। তাদের মতো আপনার সম্পর্কগুলোও গড়ে উঠুক একটি বিশেষ লেবেল আঁটার ঐতিহ্যকে পিছে ফেলে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.