সমকামী জনগোষ্ঠীর প্রতি বাংলাদেশি গণমাধ্যম ও সরকারের যৌথ নিপীড়ন

১৯ মে সকালে, ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার একটি কমিউনিটি সেন্টারে র‍্যাব অভিযান চালিয়ে ২৭জন তরুণকে আটক করা হয় বলে বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল সংবাদ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়, এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হওয়া গণজমায়েতের উপর র‍্যাব কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরেই নজর রাখছিলেন। র‍্যাব-১০ এর ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর হোসেন মোতাব্বর দাবী করেন আটককৃতরা “সমকামী”। তারা ওই কমিউনিটি সেন্টারে জমায়েত হয়েছিলেন “সমকামিতায়” লিপ্ত হবার জন্য। যদিও র‍্যাব তাদের দাবীর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ উত্থাপন করেনি এবং র‍্যাবের এই বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে সবগুলো গণমাধ্যম গ্রেফতারকৃত তরুণদের সমকামিতার সাথে সম্পৃক্ততা আছে বলে ঢালাওভাবে সংবাদ প্রচার করে। এমনকি অনেক টিভি চ্যানেল গ্রেফতারকৃত তরুণদের চেহারা খুব স্পষ্টভাবে ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচার করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এই ভিডিও ভাইরাল হয়।

পরবর্তীতে দেখা গেল যে গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে “সমকামিতা” এর কোনো অভিযোগ আনা হবে না। অবশেষে মাদকদ্রব্য রাখার অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু তারপরও গণমাধ্যমগুলো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তায়, তাদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে গ্রেফতারকৃত তরুণদের সমকামী বলে প্রচার করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গণমাধ্যম কি ভুলে গেছে ঔপনিবেশিক আইনকে উত্তরাধিকার স্বরূপ অক্ষুণ্ণভাবে ধরে রাখা এবং ভিন্ন যৌন ও লিঙ্গ পরিচয়ে প্রদানের প্রক্রিয়াকে বাধা প্রদান করার দায় তাদের উপরও বর্তায়?

গণমাধ্যমগুলো কিভাবে ভুলে যায় যে, তাদের এই অনৈতিক এবং অপেশাদারি আচরণ ফলে আটককৃত তরুণরা এবং তাদের পরিবার সামাজিক নির্যাতন এবং হয়রানির শিকার হতে পারে। গ্রেফতারকৃত তরুণদের প্রাণনাশের ঝুঁকিও আছে। মাত্র একবছর আগেই জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব রাব্বী তনয় নৃশংসভাবে খুন হয়েছিল ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দ্বারা, রাষ্ট্র তাদের আজ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি। সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন “ ধর্মের বিরুদ্ধে কোন কিছুই সহ্য করা হবে না” এবং এর মধ্যদিয়ে তিনি উগ্রবাদীদের আরও হত্যাকাণ্ডের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। এই অরক্ষতি প্রেক্ষাপটে, যদি উগ্রবাদীরা এই তরুণদের হত্যার উদ্যোগ নেয় তবে সেই হত্যার দায় গণমাধ্যমগুলো প্রতি সমানভাবে বর্তাবে।

একটি দেশে, যেমন বাংলাদেশে যেখানে অপ্রচলিত যৌনতা ও লিঙ্গের বিরুদ্ধে একপ্রকার তীব্র বিরূপ অনুভূতি আছে সেখানে গণমাধ্যম এই অপ্রচলিত যৌনতা ও লিঙ্গকে গ্রহণযোগ্য করতে তাদের প্রচারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তার জন্য গণমাধ্যম সংস্থা গুলোকে ক্লিকবিট এবং উস্কানিমূলক সাংবাদিকতা থেকে সরে আসতে হবে। কেরানীগঞ্জের ঘটনা, দেশের গণমাধ্যমগুলো কভারেজ দেয়ায় মধ্য দিয়ে আজ দেশীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের এলজিবিটি সম্প্রদায়কে দমনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এলজিবিটি সম্প্রদায় নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে সহিংসতার সম্মুখীন হচ্ছে।

আমরা বাংলাদেশের সকল গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, অনতিবিলম্বে এই সংবাদগুলো অপসারণ করুন। কারণ সংবাদগুলো  ভবিষ্যতে তরুণদের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বিপন্ন করবে। আরও সংবেদনশীল হয়ে পেশাদারিত্বের সাথে এলজিবিটি বিষয় সম্পর্কিত সংবাদ পরিবেশন করার জন্য আমরা অনুরোধ করছি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.