বনে পাহাড়ে

লেখকঃ শুনি

ফাল্গুনের বাতাসে আসলেই ক্যামন জানি আবেশ থাকে। নইলে আমার মত প্রেমহীন , প্রেমবিমুখ মানুষও আজ অন্যরকম অনুভূতি অনুভব করছে। নীলিমার সাথে আমার সম্পর্ক ভেঙেছে আজ চার বছর হল। শুনেছি সে এখন জাপানে আছে পি এই চ ডি করছে, স্বামীসহ আছে সেখানে। নীলিমা , বুয়েটের মেধাবী মেয়ে ছিল। আমার প্রেমিকা ছিল। এখন কিছুই নেই! নীলিমা নেই , প্রেম নেই! মাঝে মাঝে আমিও থাকি না হারিয়ে যাই! হারিয়ে যেতেই এই পাহাড়ি বনে ফরেস্ট রেঞ্জের চাকুরি নিয়ে এসেছি। দুনিয়ার সাথে যার কোন সংযোগ নেই। পাহাড়ি বুনো গন্ধে আদিম পরিবেশে আমি এখানেই নতুন এক দুনিয়া গড়ে নিয়েছি। নীলিমা চলে যাবার পরই আমি ফরেস্ট এর চাকুরীটা নেই, প্রথমে ছিলাম সুন্দর বন , করমজল। বদলি হয়ে একবছর হল রাঙামাটি হিল ফরেস্ট এ এসেছি। কাপ্তাই লেক ঘেঁষে এক পাহাড়ি ঢালে আমার বাংলো। এখানে মানুষ বলতে আমি , আমার দুজন গার্ড আর আমার বেয়ারা এরা সবাই বাঙালি। অনতি দূরে কয়েক ঘর আদিবাসী আছে বটে তবে কি এক অদৃশ্য কারনে তারা বাংলোর পথ তেমন মাড়ায় না! আমিই যাই মাঝে মাঝে , আমাকে দেখলে ওদের মধ্যে অনেকেই ভয়ে লুকিয়ে পড়ে। এতদিন সুন্দর বনের নোনা পানির মধ্যে ছিলাম। সে এক শ্বাপদসংকুল পরিবেশ। করমজলের কুমির প্রজনন কেন্দ্রের পাশেই আমার বাংলো ছিল। মাঝে মাঝে রাতে বাঘ চলে আসতো বাংলোর উঠানে। অনেক বার দেখেছি অন্ধকারে জ্বল জ্বল করছে পান্না সবুজ বাঘের চোখ! আমি আগে শুনেছিলাম বাঘের চোখ নাকি লালচে রঙের হয়, করমজলে নিজের চোখে দেখে আমার সে ভুল ভাঙে। করমজলের বুনো পরিবেশ , বাঘ হরিনের নিরন্তর টহল আশে পাশের জেলে পল্লী সব কিছু মিলিয়ে নীলিমাকে ভুলে ছিলাম , ভুলে ছিলাম আমার হারানো প্রেম ভুলে ছিলাম অনাগত কোন প্রেমের কথা! কিন্তু আজ এই ফাগুন দিনে এই পাহাড়ি পরিবেশ আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে আমিও কোন এক কালে প্রেমিক ছিলাম , আমার একটা প্রেম কাহিনী ছিল কিংবা আবার ইচ্ছা করলেই আমি আবার একটা প্রেম কাহিনী গড়তে পারি! মাঝে মাঝে মনে হয় , আমি সমতলের ছেলে এতদিন সমতলে ছিলাম তাই হয়তো সমতলের মাটি মানুষের প্রেমে আমার অতীত ভুলে ছিলাম , কিন্তু এই পাহাড়ে এসে নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে , যে দিকে তাকাচ্ছি সে দিকেই অসাড় অচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় গুলি। ক্যামন জানি একটা নিস্তব্ধ পরিবেশ আমাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সে গ্রাস এর প্রকোপে পড়েই হয়তো আমি অতীত কে জাগিয়ে তুলে একটু স্বস্তি পাচ্ছি! সুন্দর বনে যখন ছিলাম তখন রাতের বেলায় বোটে করে নদীতে নেমে যেতাম। কাদা মাটির আঁশটে গন্ধ কেওড়া ফুলের মাতাল করা সুভাষ আর নদীর বুক জুড়ে জেলে নৌকার সলতে বাতি সে এক অনন্য পরিবেশ ছিল। মাঝে মাঝে রাতের বেলা জেলে পাড়াতে চলে যেতাম সেখানে বসতো গাজী কালু চম্পাবতির পালা! শীতকালে করমজলের অনতিদুরে নদীর চড়ে মেলা বসতো। খুলনা যশোর সাতক্ষীরা থেকে পসারিরা আসতো। এইসব মানুষ জনই আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল আমার অতীত থেকে আমার নীলিমার নীল থেকে! কিন্তু এই পাহাড়ি বনে আমি পাহারাদার হয়ে আসার পর কেবলই মনে হচ্ছে আমি আর এদের কি পাহারা দেব? এই পাহাড় গুলিই চারিদিক থেকে আমাকে ঘিরে রেখেছে সুদক্ষ প্রহরীর মত! পাহাড় যে আমার ভাল লাগে না , ব্যাপার খানা তেমন নয়, নীলিমারও প্রিয় ছিল পাহাড়ি জনপদ! আমাকে সে প্রায়ই বলতো আমরা পাহাড়ে এক টুকরা জমি কিনে টং ঘর করবো, রাতের টং ঘরের বারান্দায় বসে পৃথিবীটাকে দেখবো! শুনেছি নীলিমা জাপানের এক পাহাড়ি শহরেই বাস করছে, শহরটার নাম ভুলে গিয়েছি! কি জানি হয়তো সে এখন পাহাড়ের ঢালে বানানো জাপানি কাগজের ঘরে তার স্বামির কোলে মাথা রেখে নাক বোঁচা জাপানি পাহাড় দেখছে! পাহাড়ের আবার নাক থাকে নাকি? আমি বলি থাকে , পাহাড়ের নাক কান চোখ সব আছে। আমার আশে পাশের পাহাড় গুলির নাক গুলি বেশ তীক্ষ্ণ। তীক্ষ্ণ নাক দিয়ে অবিরাম নিঃশ্বাস ছেড়ে আমাকে ফাগুন সমীরে পাগল করে দিচ্ছে। আমার বাংলোর সামনেই ঘাট, এখানে একখানা বোট থাকে সব সময় এতে করেই রাঙামাটি শহরে যাই, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস গুলি কিনে নিয়ে আসি! বাংলোর বারান্দায় বসলে চোখে পড়ে চাপালিশের বাগান। মাঝে মাঝে বাগান থেকে দুই একটা বনমোরগ বের হয়ে আসে। একবার একটাকে ফাঁদ পেতে ধরেছিল আমার বেয়ারা হাফিজ, চিটাগং এ ছেলে রান্নার হাত বেশ পাকা। সে বারই প্রথম বনমোরগ খেয়েছিলাম। পরে মনে হল আমি এসেছি এদের রক্ষা করতে এদের ভক্ষক হওয়া আমার সাজে না! সেই থেকে বাংলো তে বনমোরগ ধরা নিষিদ্ধ করে দিয়েছি! স্যার কি করছেন? হাফিজের কথা শুনে আমি ডায়েরি লেখা রেখে ওর দিকে ফিরে তাকালাম , বললাম এই তো লিখছিলাম! স্যার সন্ধ্যা হয়ে এল। চা দেই! আমি বললাম , না আজ খাবো না! স্যার রাতে কি রান্না হবে? তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই কর! স্যার বাঁশ দিয়ে একটা তরকারী করি! হুম কর! হাফিজ ঘরে চলে গেল, কিছুক্ষণ পর এসে একটা বাতি দিয়ে গেল! আমি লেখা ছেড়ে বাইরের দিকে তাকালাম পাহাড় গুলি আঁধারে ঢেকে গেছে। মাঝখান থেকে দেখা যাচ্ছে আকাশের দিগন্ত জুড়ে লালিমা! মাঝে মাঝে পাহাড়ি পাখি গুলির নীড়ে ফেরার তাড়া শোনা যাচ্ছে। সামনে কাপ্তাই লেকের উদার জলরাশি। সবকিছু মিলিয়ে একাকীত্ব আরও প্রবল ভাবে চেপে ধরছিল! ক্ষণিক পর চারদিক থেকে ঝি ঝি পোকার অফুরান গুঞ্জন ভেসে আসতে লাগলো। জোনাকিতে ছেয়ে গেছে আমার বাংলোর ছাতিম গাছটা, সাথে ছাতিম ফুলের মাতাল করা গন্ধ। আদিবাসি পাড়া থেকে শোনা যাচ্ছে ওদের বাদ্য যন্ত্রের তান! আকাশে তাকিয়ে দেখলাম মস্ত এক চাঁদ! ও, আজ পূর্ণিমা! মনে হচ্ছিল এক জীবনের আর কতটা পূর্ণিমা এভাবে নিঃসঙ্গ ভাবে কাটাবো! আর কত সময় এভাবে অতীত বয়ে বেড়াবো! একটা বাতাস এসে শরীরটাকে শীতল করে দিয়ে গেল! বাতাসে মেশানো ছিল মাতাল করা বুনো গন্ধ! মনস্থির করে এখানা কাগজ নিয়ে মায়ের কাছে চিঠি লিখতে বসে গেলাম! প্রিয় মা, তোমার কথাই থাকলো , আমি হেরে গেলাম। একা থাকা যায় কিন্তু সহ্য করা যায় না! ইতি তোমার প্রাঞ্জল! মনে আমার গুন গুন করে উঠলো মান্না দের গান , চাইনা বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর/ শুধু একদিন ভালোবাসা মৃত্যু যে তারপর ,তাও যদি পাই , আমি তাই চাই!!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.