বিবেক

রাহুল রায়

(কোলকাতা পিজি হাসপাতাল , সময় রাত্রি 1.30 মিনিট )

1.

আমার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা গড়াচ্ছে, কিছুতেই থামাতে পারছিনা আমি। ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটের সাদা বিছানার চাঁদর চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে। আমার খুব ইচ্ছে করছে এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যাবার। আমি সহ্য করতে পারছি না কিছুতেই। একেবারেই সহ্য করতে পারছিনা এই পরিস্থিতি।

বিবেক তাই আমার হাত ধরে আছে। বিবেক , বিবেক দাশগুপ্ত । বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের 17 নং গলির আশালতা ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা । বয়স 27 , বাংলা বিষয়ে যাদবপুর থেকে গবেষনা করেছে । বর্তমানে তার একটিই পরিচয় সে বেকার । বাবা মার কাছে বেকার , সমাজের কাছে বেকার , ভালোবাসার কাছে বেকার ।

2.

– “আমাকে ছেড়ে যেওনা তুমি, প্লিজ। আমার ভয় করে।” ভালোবাসার কাছে বাবা মার কাছে বিবেকের শেষ চাওয়া ছিলো এটাই ….

বহুবার চাকুরীর পরীক্ষা দেওয়া সত্বেও সে চাকুরী পায় নি । তার পাপ সে জেনারেল শ্রেনীর ছাত্র । তার অন্যায় সে ঘুষ দিতে পারে নি । নিজের বাবা- মা ,ভালোবাসা কাউকেই বোঝাতে পারে নি বেকারত্বের জ্বালা কতোখানি ।

আমার খুব ইচ্ছে করছে ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদি । ছেলে মানুষের কান্নাটা ফুরিয়ে যায় সেই ছোটবেলাতেই। এর পর ছেলেরা আর কাঁদে না, কাঁদতে পারেনা, অথবা কাঁদতে হয় না। পুরুষ মানুষ হবে পাথরের মত। শত আঘাতেও থাকবে স্থির। আমিও তো এমনই ছিলাম। আবেগ জিনিসটাকে প্রশ্রয় দেইনি কখনও। কিন্তু আজ আমার ভেতরের পাথর চাঁপা আবেগ গলে গিয়ে অগ্নিগিরির লাভার স্রোতের মত আমার চোখের কোণ পুড়িয়ে দিয়ে নেমে আসছে বিছানায়।

– দেখো, তুমি এমন করে ভেঙ্গে পড়লে চলবে? বিবেকদের দেখবে কে বলো? আমাদের সমাজে একটাই বিবেক নয় , আরো শতো শতো বিবেক রয়েছে ।

গলা ধরে আসে বিবেকের।

আমি আর পারি না, ঝটকা দিয়ে বিবেকের হাত ছাড়িয়ে নেই। দরজা পর্যন্ত গিয়ে থমকে দাঁড়াই। ছুটে এসে বিবেকের হাত ধরি। ও কিভাবে যেন বুঝে যায় –

– বাবাকে এনো না কাছে। বাবা আমাকে এভাবে দেখুক আমি চাই না।

গলার স্বর নিস্তেজ হয়ে আসছে বিবেকের। প্রতি মুহূর্তে ও একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে।

3.

বেকারত্ব কী ? লেখাপড়া শেখার পরে চাকুরী না পেলে কেন এই সমাজ তথা বাবা -মা ,আত্মীয়- স্বজন একজন মানুষকে বেকার বলে ধরে নেয় ? আচ্ছা সত্যি কি এই জন্য এই মানুষগুলি দায়ী ? হৃদয় কোন কিছু মানে না বলে এরাও হয়তো কাউকে ভালোবাসে কিন্তু বেকার বলে একসময় ভালোবাসাও ছেড়ে চলে যায় । পিতা মাতাও সাথে থাকে না কারো কারো । আমি বলছি না আত্মহত্যা একজন বেকারের সঠিক সিদ্ধান্ত এটা কখনোই সাপোর্ট করা যায় না । কিন্তু আমরা কি একবারো ভেবে দেখি কতোটা মানসিক চাপে পড়ে একজন মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে ? কে বা কারা এদের এটা করতে বাধ্য করছে ?

আজ আমার চোখেও অশ্রু। বিবেক হারিয়ে যাচ্ছে আমার সবার থেকে ,সমাজ থেকে ,পরিবার থেকে । আমি কোন ভাবেই ধরে রাখতে পারছি না ওকে এই জীবনে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করে ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছেন, বলে দিয়েছেন বিবেক আর কয়েক ঘণ্টা মাত্র থাকবে আমাদের সাথে। প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই করবার নেই এখন।

আমি বিবেকের হাতটা জড়িয়ে ধরে বিছানার পাশে বসে আছি … চারিদিক কেমন শূন্য লাগছে আমার …

আমার বন্ধুটা একটু একটু করে দূরে চলে যাচ্ছে আমাদের সবার কাছ থেকে … দূরে চলে যাচ্ছে … অনেক দুরে । যেখানে নেই বেকারত্বের জ্বালা নেই জাতিগতো বিভেদ নেই রাজনৈতিক হানাহানি ।

এই বিবেকদের আত্মহত্যার পেছনে কারা দায়ী –

সমাজ ? পরিবার ? ভালোবাসা ? নাকি সরকার পোষিত সেই সব নরপিশাচ যারা টাকার বিনিময়ে চাকুরী বিক্রি করে ? নাকি ভারতের সংবিধান যেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে জেনারেল হয়ে জন্মানো পাপ ?

কারো কাছে কি এর সঠিক উওর আছে ???

রবি ঠাকুর বলেছিলেন —

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে “

কিন্তু বাস্তব বড়ো কঠিন এখানে একলা চলা যায় না । এখানে একলা মানুষ বাঁচে না …..

বিঃদ্রঃ আত্মহত্যা মহাপাপ । এই গল্পে কখনোই একে সাপোর্ট করা হয়নি । আমি শুধুমাত্র দেখাতে চেয়েছি আত্মহত্যার পেছনের কারন অনেক থাকতে পারে । তবুও আমাদের সবার জীবনে বেঁচে থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই উচিত ।

“সমপ্রেমের গল্প” ফেসবুক পেইজ হতে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.