অনুগল্পঃ অপয়া

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
মা, ও মা ….. খাবার দাও।
-অামি অসুস্থ, দেখছিস ত। কামালের মা ছুটি নিয়েছে। তুই বরঞ্চ হোটেল থেকে খেয়ে অাস বাবা।
মুখটা হাড়ির মতো করে অর্ণব বলল
“অাচ্ছা”।
অর্ণব পাল। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। তারা থাকে ময়মনসিংহ থেকে
অারো ভিতরে গৌরীপুর নামক উপজেলায়। তার মা “শেফালী পাল” তিনদিন যাবত অসুস্থ। অার কালামের
মা তাদের কাজের বুয়া। সে অাজকে নেই। অর্ণব বের হয়ে গেল বাসা থেকে। অাজ শুক্রবার। ডান্স ক্লাবে যাবে।
সেখানে গেলেই মনটা ভালো,হয়ে যায়। সারাটা বিকেল সে ডান্স করে সন্ধ্যায় যখন সে বাড়িতে এসে ঢুকবে
তখন সে উচ্চস্বরে হাসির শব্দ শুনতে পেল। তাড়াতাড়ি বাসায় ঢুকেই পড়ল বিশাল এক মহিলার সামনে। কপালে
বিশাল একটা লাল টিপ। হাতে অনেকগুলো সুতো বাঁধা। কেমন যেন রহস্যময়।

অর্ণবঃঅাপনি কে? অার অাপনি অামাদের বাসায় কেন?
পিছন থেকে অর্ণবের মা “এ অামাদের নতুন কাজের মাসি। নাম অনিমা। ভালো হয়েছে । তাই না রে?
অর্ণবের কেন জানি ভালো লাগে নি….। সে চুপ করে রওনা দিল তার ঘরে।

২.
রাত্রের খাওয়াদাওয়া সম্পন্ন করে বিছানায় বসে ফেসবুক চালাচ্ছে সে। রাত তখন ১২ টা ছুঁই ছুঁই করছে। টিকটিকি
ক্ষনে ক্ষনে ডেকে যাচ্ছে “টিক টিক টিক”। অার তার সাথে পাল্লা দিয়ে ঘড়িটাও সেরকম শব্দ করে উঠছে।
নীরবতা টা কানে বাজছে খুব। হঠাৎ করে ঝনঝনিয়ে উঠল কিছু। অর্ণবের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। অাস্তে অাস্তে উঠল বিছানা ছেড়ে। বারান্দায় কি যেন শব্দ হচ্ছে। কেমন যেন ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে দোলা রকিং চেয়ারের শব্দ।
বারান্দায় সাহস করে যখন পা দিল তখনন সব চুপ। অাবার নিস্থব্ধ। দুরু দুরু করছে বুক। কানের কাছ দিয়ে একটা গরম বাতাস হালকা করে শীষ কেটে গেলো।
সারা শরীরের লোমগুলো কেঁপে উঠল। কেমন যেন একটা অপার্থিব নীরবতা। অর্ণবের কেমন যেন করতে লাগল। সাহসের উপর অার ভর দিল না। রুমে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ল। টিকটিকিটা তখনো ডাকছে
“টিক টিক টিক”।

৩.
রাত্রে ভালো ঘুম হলো না অর্ণবের। পরের দিনটা অর্ণবের কাটল অানমোনায়। বায়োলোজি ক্লাসে না ঢুকে ভুলে ঢুকল আই সি টি ক্লাসে। তার মাথা কাজ করছে না। অাবার একটা ভয়ংকর রাত হয়তো অপেক্ষা করছে তার জন্য।। বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। তখন প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে। পায়ের নিচে শুকনো পাতারা ভাঙছে মচমচ করে। বাসার গেইট খুলে ভিতরে পা দিল।

থমথমে নীরবতা। বাসার সিড়িগুলো দিয়ে উঠল দোতালায়। তার জুতোর শব্দটা তার হৃদয়ে যেন বাড়ি
মারছিলো। ব্যাগটা তার রুমে রাখল। অাশ্চর্য!
বাসার অন্য রুমে কোন লাইট জ্বালানো নেই!
তার রুমেরটা ছাড়া। ত্রস্ত ভঙ্গীতে ডাক দিল
– মা! ও মা!
কোন শব্দ নেই। সে ভাবল, ” হয়তো কোথাও গেছে।”
মনে মনে চিন্তা করল, “ফ্রেশ হওয়া দরকার”।
ওয়াসরুমে ঢুকল। পানির কলটা ছাড়ল। কানের পাশ দিয়ে শশ… শশ… শশ… করে একটা বাতাস গেল।
চকিতে পিছনে তাকালো।
কিন্তু কোথাও কেউ নেই।
মুখে এক অাঁজলা পানি নিয়ে কুলি করতে লাগল। হঠাৎ করে তার বুকটা ধক্ করে উঠল।

৪.
মুখে কেমন যেন গোল কিছু একটা। তাড়াতাড়ি বেসিনে ফেলল মুখের পানিটা। বেসিনের দিকে তাকিয়ে একটা
অস্ফুট অার্তনাদ করে উঠল। মনে হল যেন শিরদাড়ার মাঝ বরাবর একটা ঠান্ডা কিছু বয়ে গেলো। সে দেখল, ” একটা মানুষের চোখ তার গার্গলের জলের সাথে বের হয়েছে। ” চিৎকার করে উঠল। দৌড় দিল সে। তার মায়ের রুমের দিকে।
রুমে নক করছে সে।
কিন্তু দরজা ভিতর থেকে বন্ধ!!
দরজায় জোরে ধাক্কা দিল।
খুলে গেলো দরজা।
রুমে ডিমলাইট জ্বালানো। তার মা শুয়ে অাছে বিছানায়। শুয়ে থাকার ভঙ্গীটা কেন যেন ভালো লাগল না
তার কাছে। কাছে গিয়ে ডাকল
-মা, ও মা….
তার মাকে ধাক্কা দিল।
দিয়ে যা দেখল, তা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, অচিন্তনীয়।
দেখল যে তার মায়ের দুটো চোখই নেই। তার জায়গায় অাছে রক্তাক্ত শূন্যতা। বাথরুমের চোখটার কথা মনে করে তার গা গুলিয়ে উঠল। রুমটা ভরে গেলো হিম শীতল এক অপার্থিব বাতাস ও উৎকট রোমাঞ্চকর
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠা এক অপার্থিব
সুরে।
তার পাশে কে যেন!
ভীষন নিকষ কালো একটা অাঁধারের ভয় কাজ করছে তার মনে। ধুকপুক করছে বুক। তবুও পাশ ফিরে তাকালো।
যা দেখলো তা কখনো ভুলবার নয়।
দেখে যে সেই কাজের মহিলা! তবে তার কোন চোখ নেই। চোখের জায়গায় ভয়াবহ ভূতূরে শূন্যতা।তার মুখে একটা
টাটকা চোখ!।কচকচ করে খাচ্ছে সেই অপয়া। অর্ণবের
চোখের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে –
তোর চোখদুটো দে, অামার অনেক ক্ষুধা!

নীরব ভৌতিক হিমশীতল পরিবেশের নীরবতা ভাংল অর্ণবের মৃত্যু চিৎকারে।
তারপর…. অাবার নীরব হয়ে গেলো
সব…

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.