অ-পুরুষ ও অন্তরালের আমি

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
শীতের কুয়াশা অাপন মমতায় অাবৃত করে নিয়েছে অাজ মফঃস্বলের ছোট্ট শহরটাকে। কিন্তু কর্মব্যস্ততা অার মানুষকে সে সকাল অনুভব করার সুযোগ দিলো কই। সবাই তখন দৌড়চ্ছে কর্মস্থলে। টিফিনের টাকা বাঁচানোর মতো কিছু মানুষ দু চার সেকেন্ড করে সময় বাঁচিয়ে ভিড় জমিয়েছে ; রাস্তার পাশে অাগাছার মতো গজিয়ে উঠা দোকানগুলো তে। সেরকম মানুষের তালিকায় নাম উঠে অামারো।

অামি জয়। এবছর শিক্ষার নবমতম সিঁড়িতে পা দিলাম। অাজ স্কুলের প্রথম দিন। বাবার সরকারী চাকরির ঘন ঘন বদলির কারনে কোন জায়গায় বেশি দিন থিতু হওয়া যায় না। তবে এবার না কি এখানে বাবার চাকরির শিকড় গজাবে। হঠাৎ ঠান্ডা হাওয়া শরীরটাকে কাঁপিয়ে দিলো। ঠান্ডা বেশি হওয়ার সুবাদে ঠোঁটের উপর ধরে রাখা খেজুরের রসের বিন্দুটাকে বরফবিন্দুর মতো লাগছে। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছতেই অনুভব করলাম, অামার গোঁফের রেখা ঘন হয়েছে। দেহের ভাঁজে ভাঁজে নানা জায়গা জানান দিচ্ছে, অামি এখন ছোট নই। কৈশোরের সুবাদে প্রতিটা দিন নিজেকে চিনতে কষ্ট হয়। কেমন যেন পরিবর্তন লক্ষ্য করি। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে স্কুলে পৌছে গেলাম। প্রথম দিনটা খারাপ কাটে নি। তবে এর মধ্য সব বন্ধুরা বুঝে গেলো অামার দূর্বল দিকটা। অামি মেয়েলি ধরনের। কোনরকম সমস্যা ছাড়া একটা সপ্তাহ পাড়ি দিলাম। তবে সে সপ্তাহেই অামার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারনা পাওয়ার জন্য যথেষ্ঠ।

একদিন ক্লাশে যেতেই অরুন ডাকলো
-এই জয়, শোনে যা তো।
ওপাশ হতে মাসুদ বললো
-ওর নাম জয় কবে থেকে.? ও ত জয়া, জয়া অাহসান। অামাদের বয়েজ স্কুলের সেক্সী অাইটেম।
মনটা বিষিয়ে উঠলো, চুপ করে ক্লাশের এককোনে গিয়ে বসলাম। ওপাশ হতে রাজু বললো
-এই, জয়া ত ন্যাপকিন ও হয়, তুই ইউজ করিস তো…?
মাসুদঃ করবে না কেন, এখনি ত বয়স!
রাগে ক্ষোভে অামার প্রায় কান্না চলে অাসে। অামি বেঞ্চে রাখা ব্যাগের উপর মাথা দিয়ে কাঁদতে থাকি। অামি চাই না অামার কান্না দেখে কেউ অামায় হাফ লেডিস বলুক। তারা তখনো অামায় নিয়ে মজা করছে….
দিন কে দিন তাদের মজার মাত্রা ভয়াবহ রকম বাড়তে থাকে। অামি কিছু বলতে পারি না। চুপ করে থাকি। একদিন ক্লাশ শেষে অরুন বললো
-এসব অত্যাচার সহ্য কেন করিস! উচিত জবাব দিতে পারিস না! নিজেকে দূর্বল ভাববি না কখনো।
তার কথাতে অামার মনে সাহসের সঞ্চার হলো। ভাবলাম পরদিন অামি উচিত জবাব দিবো..।

পরদিন স্কুলে যেতেই শুভ্র,বললো
-জয়া ভাবী শোনে যান তো…?
অামি গটগট করে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর ঠাশ করে তার গালে চড় বসিয়ে দিলাম। ঘটনার অাকষ্মিকতায় সবাই থ বনে গেলো! হঠাত শুভ্র কুত্তার বাচ্চা গালি দিয়ে অামার উপর এলোপাথারি কিল ঘুষি ছুঁড়তে লাগলো। যখন সবাই ফেরালো তখন দেখি অামার নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে, ঠোঁট কেটে গেছে। ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট নেবার পর সালিশ বসলো। ঘটনা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা দিলো অরুন। সকলের সম্মিলিত মতামতের উপর ভিত্তি করে শুভ্রকে টিসি দিয়ে বের করে দিলো।

২.
মনে দুঃখ ও বেদনা নিয়ে সেদিনের মতো চলে এলাম। ভালো লাগে না অামার এসব। অামার জন্য কারো ক্ষতি হলে অামার খুব দুঃখ হয়, তবু অামার কারনে অনেকের ই ক্ষতি হয়। বাসায় গিয়ে উদাস মনে অামার রুমে বসে অাছি। ত্রিশঙ্কু বাবু মানে অামাদের হেডমাস্টার বাবার বন্ধুমানুষ। তিনি বাবাকে সব বলবেন। হঠাৎ অামার দরজায় টোকা পড়লো, অার গমগমে কিন্তু কোমল স্নেহময় পুরুষালী কন্ঠে বলে উঠলো

-অাসবো, জয়?
চেহারা হতে মলিন ছাপ মুছে ফেলে বললাম
-অাসো বাবা..
বাবা বিছানায় বসে কিছুক্ষন সময় নিলেন। অামি বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম
-অাজ স্কুলের ঘটনা নিয়ে কিছু বলবে কি?
-নাহ্, কিন্তু শোনলাম তুমি না কি বন্ধুদের সাথে মিশতে পারছো না..?
-সেরকম কিছু না বাবা। অার একটা কথা বলবো?
-বলো
-অামি মাসির বাড়ি যেতে চাই, সেখানে থেকে পড়বো। রেজিস্ট্রেশন এখনো শুরু হয় নি, তাই যাওয়ার সুযোগ অাছে।
-সেখানে মানিয়ে নিতে পারবে কি?
বরাবরের মতো বললাম
-হা, পারবো।

বাবা তারপর অামায় একটা র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো গিফট দিলো। চুপচাপ চলে গেলো। র‍্যাপিং পেপার খোলে দেখলাম ডেল কার্নেগীর বই,
“হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপলস”
জলে টলমল করে উঠলো চোখদুটো। বুঝলাম, বাবা অামার জন্য বই অানে নি, এনেছে এক প্যাকেট মোড়ানো ভালোবাসা। সেদিন অামার চোখের জলে ছিলো একরাশ কৃতজ্ঞতা।

৩.
অবশেষে তল্পিতল্পা নিয়ে চলে এলাম মাসির বাসায়। মাসির তিন মেয়ে, কোন ছেলে নেই। অামাকে সবসময় ছেলের দৃষ্টিতে দেখতো, অার তার কাছে অাসার পর তার ছেলের উপযোগীতা কিছুটা পূরন ও হলো। ভর্তি হয়ে গেলাম সেখানকার মিশনারী স্কুলে। কথায় অাছে যে, ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। অামিই বা তার ব্যাতিক্রম হবো কেন। অামার মুখচোরা স্বভাব অামায় গৃহবন্দী করে রাখলো। যাতায়াতের মাত্রা শুধু স্কুল অার প্রাইভেট। সারাদিন পড়ি। ভয়াবহ রকম ভাল্লাগেনা রোগে অাক্রান্ত। হা, তবে এর মাঝে একটা জিনিস ভালো লাগতো। সে ভালোলাগার নাম ছিলো রাশেদ। দেখা হতো প্রাইভেটে। শ্যামলকালো পেটানো শরীরের অধিকারী সে ছেলে কেন যে অামায় এতটা অাকর্ষন করতো, তা জানতাম না!

কোন এক গ্রীষ্মের ছুটির মধ্যদুপুরে প্রাইভেট শেষে হঠাৎ সে অামার কাছে এসে অনেকটা ‘জোড়’ দিয়েই বললো
-এখন কি জরুরী কোন কাজ অাছে…?
-না, সারাদিন বাসায় বসে অলসতার সাথেই সময় কাটাই।
-তাহলে চলো, স্কুলমাঠে যাই।
-কেন?
-অারে ভলিবল প্রেকটিস হচ্ছে। দু গেইম খেলে অাসি।
অামি অাতঙ্কিত চোখে তার দিককে তাকিয়ে বললাম
-অামি ভলিবল খেলতে পারি না!
সে অট্টহাসি দিয়ে বললো
-পারো না তাতে কি, শিখে নেবে!
এবার অার না করি নি। অামার সংকোচ হচ্ছিলো। ডাক্তাররা একে স্যোশালফোবিয়া বলে। চিন্তা করছি, মাঠে নামলে ত মানুষ হাসাহাসি করবে। কিন্তু মানুষের সাথে মেশার ত একটা রাস্তা পেলাম। অাগ্রহে গেলাম মাঠে।
কিছুক্ষন খেললাম। ছেলেগুলো যথেষ্ঠ অান্তরিক। অল্পেতেই অাপন করে নিলো অামায়। কিছুক্ষন খেলেই বললাম
-“অামার স্কীন কালো হয়ে যাবে “

বলেই বুঝলাম ভুল হয়ে গেছে। রাশেদ অামার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর হেসে বললো,
-ছেলেদের এত স্কীন নিয়ে চিন্তা করতে অাছে?
অামিও সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে মৌন হয়ে খেলতে লাগলাম। খেলার নামে পুরো দুঘন্টা বাঁদরলাফ দেবার পর নিজেকে অাবিষ্কার করলাম ঘামে ভেজা চুপচুপে লালমানব হিসেবে। ফর্সা হওয়ার সুবাদে অল্প পরিশ্রমে লাল হয়ে যাই। সবাই তখন অান্ডারওয়্যার পড়ে স্কুলসংলগ্ন জনশূন্য পুকুড়পাড়ে ঝাঁপ দিচ্ছে। হঠাৎ রাশেদ বললো
-হা করে দাড়িয়ে অাছো কেন! পুকুরে নামো।
-কিন্তু সবাই অান্ডারওয়ার পড়ে নামছে!
-তাতে কি! তুমি মেয়ে না কি!
এই বলে জামাকাপড় খুলে অান্ডারওয়্যার পড়ে দাড়ালো।

রাশেদের ভীষণ সুন্দর পেশিবহুল শরীরী সৌন্দর্য অামায় উন্মাদ করে দিলো। কোনো এক অমোঘ আকর্ষণ যেন টেনে নিয়ে গেল তার কাছে। প্রথমটায় অামি বুঝেই উঠতে পারিনি যে অামার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দীঘল চেহারার মানুষটিই রাশেদ। সে অামার দিকে তাকিয়ে বললো
-কি দেখো!

অামি রীতিমতো লজ্জ্বা পেলাম। কিছু বললাম নাহ্। তারপর হঠাৎ সে অামায় পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো তার ঘামের বুনো মাদকতায়। পুরুষ দেহের কি অসাধারন মদিরতা। তার বুক অামার পিঠে লেপ্টে অাছে। তার হাতদুটো স্বর্ণলতার মতো বেষ্টন করে অাছে অামায়। হঠাৎ করে অামায় তুলে লাফ দিলো পুকুরে। পড়ার সাথে সাথেই অামার কন্ঠ থেকে অার্তরব বেরিয়ে এলো! চোখে খেলছে নগ্ন অাতঙ্ক, কারন অামি সাঁতার জানি না! রাশেদকে অাষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলাম। সবারর হা হা হাসিতে যেন বাতাসে সোরগোল উঠলো। এমনকি সে হাসিতে নাম ছিলো রাশেদের ও। রাশেদ জোড় গলায় বললো
-চোখ খোল হাঁদারাম। তুমি হাঁটুপানিতে অাছো!
তার এ কথাতে যেন চেতনার দ্বারে ঘন্টি বাজলো। তাই তো! রাশেদ পুরনো সুর ধরে অাবার বললো
-তুমি মনে হয় সাঁতার জানো না!
একরাশ অপারগতা মনে চাপিয়ে ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাসের সুরে বললাম
-নাহ!

অার কোন কথা হয় নি। স্নানপর্ব সেরে বাড়ির দিকে পথ মাপছে অামার পা দুটো। বাসায় পৌছে মাসির মুখোমুখি! অামার অবস্থা দেখে মাসির হা হয়ে যাওয়া মুখ দিয়ে ঘড়ঘড়ে স্বরে যেসব শব্দ বের হলো তার মানে অনেকটা এরকম হয়
-কোথায় গিয়েছিলি তুই?
-প্রাইভেট শেষে ভলিবল খেলে স্নান সেরে অাসলাম।
তারপর রুমের দিকে রওনা দিলাম। পেছনে তাকালে নিশ্চিত দেখতে পেতাম যে মাসির চোখদুটো ব্রহ্মতালু তে পৌছে গেছে।

৪.
রাশেদের সাথে অামি ভালো মানিয়ে নিয়েছি। অামি অামায় বেদনাভরা অতীতের সাতকাহন গাইলাম তার কাছে। সে সবকিছু মনযোগী ছাত্রের মতো শোনলো। তারপর বললো
-বুঝলাম। এবার নিজের মধ্য পরিবর্তন অানো।
-কিন্তু অামি ত পারি না!
-অামি তোমায় সাহায্য করবো। তোমার সমস্যা হলো তুমি খুব ভয় পাও। কারোরটা খেয়ে থাকো তুমি? জীবনযুদ্ধে অামাদের ভয় পাওয়া চলবে না।
তার কথায় জ্বলে উঠলো অামার অনুপ্রেরণার প্রদীপ। নতুন অাঙ্গীকে অাবিষ্কার করলাম নিজেকে।
রাশেদ পড়াশোনায় অবশ্য যথেষ্ঠ বাজে। সে কারনে অামি তার পড়াশোনায় সাহায্য করতে লাগলাম। এদিকে রাশেদের সহায়তায় অামি কয়েকদিনে হয়ে উঠলাম তুখোড় ভলিবল খেলোয়ার। সাঁতারেও অামি অাজকাল তাকে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছি সমানতালে। একদিন হঠাৎ করে সাইকেল ধরিয়ে দিয়ে বললো

-চালা তো?
-কিন্তু অামি ত পারি না!
-দ্যাখ, পারি না শব্দটা কাজকে অর্ধেক অসম্ভব করে দেয়, অামি ত অাছিই।
সাইকেল শিখতে গিয়ে অামার পা অর্ধেক ছিলে যায়। তবে দুদিন পর তার সহায়তায় মাঠজুড়ে সাইকেলের টায়ারের দাগ বসাতে সক্ষম হলাম।

কৃতজ্ঞতার মাত্রা বারংবার যেন উর্দ্ধগতির মতো বাড়ছে। ভালো লেগে যাচ্ছে রাশেদকে, এক নিষিদ্ধ অলিখিত চুক্তিতে। কিন্তু যাপিতজীবনের সমান্তরালে চলা রাশেদকে কখনো হয়তোবা বলতে পারবো না, একদিন তোমাকে অামার ভালো লাগতো। যতটা ভালো লাগলে একটা মানুষের সাথে সারাজীবন কাটানো যায়, ততটা!
ঋতু তখন তার শারদ রূপে অার্বিভাব হয়েছে। সে শারদ বিকেলের কথা ভুলবো না! সেদিন চোখেমুখে বিষন্নতার প্রত্যয়নপত্র নিয়ে রাশেদ অামায় বলেছিলো,
-চল্ অামার সাথে।

অতি পরিচিত বন্ধুসুলভ কর্তৃত্বময় কন্ঠস্বর। যেখানে নিঁখাদ ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে শব্দের অনুরণনে। অামিও অার না করি নি। চলতে লাগলাম। বাংলার শ্যামলিমায় ঘেরা পথ-প্রান্তরের বুকে হেটে। পথের দুপাশে সারি করে দাড়িয়ে অাছে দু বছর বয়সী শিশু গাছ, যেন ফোকলা দাঁতে এখুনি পাতা দুলিয়ে জিগ্যেস করবে,”কই যাও তোমরা?” বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পাড়ি দিয়ে অামরা তখন গারো পাহাড়ের পাদদেশে। বেশ নির্জন একটা জায়গায় এসে থামলো সে। অামি তার দিকে তাকাতেই সে একটা ঝোঁপঝাড়যুক্ত লতাগুল্ম সরিয় দিলো! চোখ পড়লো পাহাড়ী সুড়ঙ্গে। কোন কথা না বলে তার পেছন পেছন অাসতে লাগলাম। কিছুদূর যেতেই সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্যের সমাপ্তি ঘটলো। যা চোখে পড়লো তাতে অামি বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।

মাখনের মতো নরম সবুজ ঘাসের উপত্যকা, যে ঘাসে হাজারো প্রজাপতি লুকোচুরি খেলে। একধারে কিছু কাশফুল শুভ্রতা ছড়িয়েছে নিজস্ব ভালোলাগায়। সামনে মৌলিক লেকের নীল পানি! অনেকটা শারদ অাকাশের মতো! শেষ বিকেলের সূর্য্যরশ্মি পানিতে অাছড়ে পড়ে বিচ্ছ্যুরণ ঘটাচ্ছে স্ফটিক নীল অালোর। এ যেন অানন্দধারায় ভাসছে চরাচর…।

সে অামার কানেকানে বললো
-যখন দৌড় দিতে বলবো তখন দৌড় দিবি হাতে ধরে।
শক্ত করে তার হাতটা ধরলাম। সে বলে উঠলো, “দৌড়া”।
ছুটছি দুজন, যেন ছোটা নয় দিগন্তে উড়ছে গাংচিল। চারদিকে ঘাসের ডগায় বসে থাকা প্রজাপতির সংখ্যা একধাক্কায় হাজার হয়ে গেছে। চারদিকে হাজারো প্রজাপতি, বাতাসে মৌ মৌ গন্ধ, অন্তহীনের দিকে ছুটছি! এ যেন অপার সৌন্দর্য্য। এ যেন খন্ডস্বর্গ! হাজারো রঙের প্রজাপতিরা তখনো উড়ছে অামাদের অাশেপাশে! যেন শেষ শারদের রৌদ্র বলে গেলো অামায়
-ভালোবাসি!

১৫ টি বসন্তের মধ্য অামার পাওয়া উৎকৃষ্ট উপহার। এ অনাবিল স্মৃতি থেকে যাবে অাত্মজীবনীর সোনালী পাতায়। ফেরার সময় একবার জিগ্যেস করেছিলাম
-কখন অাসিস এখানে?
সে মুচকি হেসেছিলে। সে হাসি বড়ো রহস্যময়। যেন এ প্রশ্নের উত্তর জানলেও সে দিবে না।

৫.
দিন কেটে যাচ্ছে। অামার এবার হাত পোক্তক্ত হচ্ছে ক্রিকেট, ফুটবলে। বেশ ক্রীড়ক হয়ে উঠছি দিনে দিনে। অামার চেহারায় ফর্সা ভাবটা কেটে গিয়ে এসেছে রোদে পোড়া বাদামী একটা পুরুষালী ধাঁচ, দেহের কোমলতা কেটে গিয়েছে বাড়তি চর্বির মতো। শক্তসামর্থ সাবালকের রূপ এখন পরিস্ফুটিত হয়। গোঁফ, দাড়ি এখন বেশ ঘন হয়ে প্রকট পৌরুষ প্রদর্শন করে। রাশেদের সাথে এখন নিয়মিত জীমে যাওয়া হচ্ছে। অায়নায় নিজেকে দেখে চমকে যাই। বাসা ছেড়ে এখানে এসেছি প্রায় দেড় বছর হতে চললো। কত্তোটা পরিবর্তন!

টেস্ট পরীক্ষার প্রায় মাসখানেক অাছে। হঠাৎ একদিন রাশেদ বললো
-প্রেম করিস না তুই?
-নাহ্!
-ছেলে হয়ে প্রেম করিস না! কি করে হবে?
-ছেলে হতে গেলেই কি প্রেম করতে হয় না কি রে?
-নাহ, তবে এমন ছেলে ত নাই ই ; যে প্রেম করতে চায় না!
-অামার প্রেমের চিন্তা করকে ভালো লাগে নাহ্।
সে অালাপটার ইতি সেখানেই টেনেছিলাম। কিন্তু কয়েকদিন পর অাবার বেশ ভাবালো সেসব ব্যাপারগুলো। অার তার কারন হলো জীববিজ্ঞান বইয়ের ভাঁজে চিঠি!
বেশ অাবেগ মেশানো একটা চিঠি! এটাকে নিয়ে কি করবো বুঝে উঠতে বেগ পেতে হয়েছিলো। কারন বেনামী চিঠি! রাশেদকে দেখালাম। রাশেদ বললো
-কে হতে পারে, তা তো জানি না! তোর কাউকে সন্দেহ হয়?
-হা, অনন্যা। সে অামায় অাকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে যে সে অামাকে চায়। হয়তো সেই বলতে পারছে না, তাই হয়তো চিঠির পথ টা বেছে নিয়েছে।
-তা, তুই কি করবি?
মনে মনে চিন্তা করলাম, অামার তো ছেলেদের ভালো লাগে! এটা কি অামার সমস্যা? হয়তো প্রেম করলেই কেটে যাবে! অার এটাই সুবর্ণ সুযোগ।
তাকে কিছু না বলে সে রহস্যময় হাসিটা তাকে ফেরত দিলাম। সে বরাবরের মতো নিঃস্পৃহ।

সাহস করে অনন্যাকে বলে দিলাম, “ভালোবাসি”। অার অনন্যা ও অামায় ফিরিয়ে দেয় নি। পড়াশোনা, প্রেম ও রাশেদের সাথে অাড্ডা সবমিলিয়ে কেটে গেলো বাকি মাস দুটো। তখন অাস্তে অাস্তে এস এস সি পরীক্ষা সন্নিকটে এসে দাঁড়ালো। সে শীতের একদিন। ভালো লাগছিলো নাহ্, সন্ধ্যায় যোগাযোগ করে অামি ও রাশেদ বসে অাছি কিছুদূর, একটা কালভার্টের উপর। নীরব পৌষ সন্ধ্যা যেন চারদিক কে মায়াতুলির সাদা রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। কুয়াশা পড়েছিলো বেশ। হঠাৎ রাশেদ বললো
-কেন এমন হয় বলতো, যাদের সঙ্গ পেয়ে অামরা অষ্টপ্রহর মেতে থাকি, তাদের অভাবে নিঃসঙ্গ মন নিয়ে পাড়ি দিতে হয় অনেকটা সময়?
রাশেদের দিকে তাকালাম। এ রাশেদ অামার চেনা কোন রাশেদ নয়! এ রাশেদ বেশ বদলে গেছে! কিছুক্ষন নীরবে থেকে অামি জবাব দিলাম
-দোস্ত, অামি তোর সাথে অাছি সারাটা সময়।
-জানিস জয়, মাঝে মাঝে কাউকে পেতে ইচ্ছে করে।
কে জানে, ছেলেটা কত কষ্ট বয়ে বেড়ায়। অামি সেসময় কিছু বলি না। কিছু বলার প্রয়োজন হয় না শুধু তাকে বন্ধুবলয়ে বদ্ধ করি। যেন এটাই তার দরকার।

দেখতে দেখতে এস এস সি পরীক্ষা টা চলে অাসলো। তখন সব ব্যাস্ত। পরীক্ষা নিয়ে ব্যাস্ত থাকার কারনে রাশেদ, অনন্যা কারো সাথে সময় দেয়া হয় নি। তারও ব্যাস্ত ছিলো। প্রেকটিক্যাল শেষ করার পর সব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলো। সেসময় বাসা হতে ফোন এলো। বাবার। প্রাথমিক লৌকিকতা সারার পর বাবা বললো
-অনেকগুলো দিন বাসায় অাসো না। অার পরীক্ষা ত শেষ! অার অাত্মীয়ের বাসায় থাকাটা দৃষ্টিকটু দেখায়। চলে অাসো, অার তোমার মা ও তোমায় দেখার জন্য অাগ্রহ নিয়ে অাছে। কালকেই সব প্যাক করে চলে অাসো।
-অাচ্ছা বাবা।

কেন জানিনা মনটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মনটা খারাপ করে গেলাম স্কুল ক্যাম্পাসে। রাশেদকে বলে দিয়েছি সেখানে অাসার জন্য।
রাশেদ ও অামি দুজন বসে অাছি পুকুরপাড়ে। কাল চলে যাবো। স্মৃতি বড্ডো খারাপ জিনিস। অার হয়তোবা তার সাথে এভাবে বসে অাড্ডা দেয়া হবে না। সেদিন কিছুই বলতে পারি নি। চুপচাপ সময় কেটে গিয়েছিলো। চলে এলাম ঘরে। কেটে গেলো একটি রাত, যে রাতের কোলে অামি কিছুটা বিষাদ ধার নিয়েছিলাম।
খুব সকালের বাস ধরে চলে গিয়েছিলাম। কারোর সাথে দেখা হয় নি। শুধু অনন্যা ও রাশেদের ফোন নাম্বার টা অামার কাছে অাছে। চলে গেলাম তাদের থেকে দূরে……

৬.
বাসায় পৌছুতেই সবাই অান্তরিক উষ্ণতায় গ্রহন করলো অামায়। মা অামায় জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। বাবাও অামায় পিতৃস্নেহে শক্ত অালিঙ্গনে জড়ালো। তারপর পছন্দের খাবারের ফর্দ ও ভালোবাসার অত্যাচারে যখন নাভীশ্বাস নিচ্ছি, তখন তারা অামায় ছাড়লো। অনেকদিন পর অরুণের সাথে ঘুরতে বের হলাম। অরুন বললো
-জানিস, তুই যাওয়ার পর শুভ্র তোকে পাগলের মতো খোঁজেছে। তোকে পেলে খবর করে দেবে।
-সে জয় হারিয়ে গেছে।
-হা, তা তোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

খেলার মাঠের দিকে এগুলাম। হঠাৎ দেখি লাল চোখ নিয়ে একজন অামার দিকে এগিয়ে অাসছে। শুভ্র! দু বছরেও তার রাগ এতটুকু কমেনি! কাছাকাছি অাসতেই কুত্তার বাচ্চা বলে অামার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো। হাতে হাত, দুজনে শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। পুরনো ক্রোধ ও অপমান অামারো জেগে উঠেছে। হঠাৎ সে অবস্থাতেই বলে উঠলো
-হাফ লেডিস, তোর জন্য অামারে টিসি দিয়েছিলো!
একটা কথাই মাথা গরম করার জন্য যথেষ্ঠ। হাত মুড়িয়ে পেছনে নিয়ে এসেছি। তারপর কায়দা করে কাধে তুলে ফেলেছি। বুকে তখন প্রতিহিংসার অাগুন। চোখ জ্বলছে জ্বলন্ত কয়লার মতো। উপর থেকে ধরে অাছাড় মারলাম। সে তার একটা হাত ধরে চিৎকার দিলো। তার হাতটা ভেঙে গেছে। সেখানে পুরনো অারো সহপাঠী রা ছিলো। অামার কান দিয়ে তখন লাভার অাগুন বেরুচ্ছে। তাদের দিকে তাকিয়ে গমগমে কন্ঠে বললাম
-অার একবার যে হাফ লেডিস বলবে, তার অবস্থা এর থেকেও ভয়াবহ হবে । অামি খুনেরও পরোয়া করি না।
তারপর চলে যেতে লাগলাম।

এখানে সময় কাটে খুব ধীরে। অামি চলে অাসার পরে একদিন ও রাশেদের সাথে কথা হয় নি। সে ফোন ধরে নি। মিস করতাম তাকে। অনন্যার সাথে কথা হয় প্রতিদিন। এস এস সি রেজাল্ট দিয়েছে। অামি, অনন্যা ও রাশেদ তিনজনেই জিপিএ ৫ পেয়েছি। ইন্টারে ভর্তি হলাম এখানকার স্থানীয় কলেজে। অনন্যার কাছে শোনলাম রাশেদ না কি সেখানকার একটা কলেজে ভর্তি হয়েছে। চলে গেলো অারো একটি বছর।

অাজ বছরের শেষ দিন। ৩১ শে ডিসেম্বর। দুপুরে বাসায় বসে ছিলাম। পুরনো বাক্স খুলতেই চোখে পড়লো অনন্যার দেয়া বেনামী চিঠিগুলো। চিন্তা করতেই ভালোলাগা কাজ করতে লাগলো। একগুচ্ছ ভালোলাগা ছোঁকে ধরেছে। হঠাৎ করে মনে হলো, “অামি ত কখনোই চিঠিগুলোর ব্যাপারে অনন্যাকে কিছু বলি নি! ” তাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত ছিলো। ফোন দিলাম অনন্যাকে। ফোন দিয়ে বললাম

-ধন্যবাদ অনন্যা।
-কারনটা জানতে পারি কি?
-বেনামী চিঠিগুলোর জন্য। যেগুলো অামি তুলে রেখেছি সযতনে।
-বেনামী চিঠি? কিসের? কে দিয়েছে!
তার কন্ঠে নিঁখাদ বিষ্ময়!
অামি অারো অবাক হয়ে বললাম
-তুমি দাওনি!
-না তো। কিসের চিঠি! অামি ত সবসময় ফোনেই কথা বলতাম!

মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো! চুপচাপ ভাবতে লাগলাম। মাথাটা কাজ করছে না। হঠাৎ একটা চিন্তা অাসতেই বুকটা ধক্ করে উঠলো। তাড়াতাড়ি স্টোররুমে গিয়ে বের করলাম জীববিজ্ঞান প্রেকটিক্যাল খাতাটা। চিঠিটা মেলে ধরলাম! লেখায় পুরো মিল! অার এ জীববিজ্ঞান খাতাটা করে দিয়েছিলো রাশেদ। অামি কাঁপছি। কন্ঠটা পুরো বসে গেছে! এ কি করলাম অামি। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে রওনা দিলাম। গন্তব্যস্থান মাসির বাড়ি!
যখন পৌছুলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা। অামি বাসায় ব্যাগটা রেখে দৌড় দিলাম কালভার্টের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখি একটা ছেলে বিষন্ন মনে বসে অাছে। অামি পেছন থেকে ডাক দিলাম
-রাশেদ!

সে অামার দিকে ঘুরলো অাস্তে করে। কি মলিন চেহারা হয়েছে। রুক্ষতা ও অযত্নের ছাপ প্রকট। কালভার্ট থেকে নেমে সে মুচকি হেসে বললো
-কেমন অাছো?
সে তুই তুমির দন্দ্বে ভোগছে। তার সেই পুরুষালী চিত্রকে উপেক্ষা করেই বললাম
-অাগে বলো তুমি কেমন অাছো!
ছোট্ট করে বললো, “ভালো”।
-সত্যিই কি ভালো অাছো?
সে অামার দিকে তাকালো। রোঁদনভরা সে চাহনীর অন্তরালে ছিলো অনেক অধরা ইচ্ছে।
অামি সরাসরি বললাম
-অামায় খুব ভালোবাসো তুমি, তাই না?
-না, খুব না। একজন সাধারন বন্ধুর মতো।
অামি পকেট থেকে চিঠিটা বের করে দিয়ে বললাম
-তাহলে এটা কি ছিলো!
সে চুপ করে অাছে। অনেকটা অপরাধীর মতো। তারপর হঠাৎ বললো
-হা বাসতাম। কিন্তু তাতে কি!
অামি ধরা গলায় বললাম
-তাহলে বলো নি কেন!
-কি বলবো, তোমায় ভালোবাসি? সমাজের ঠুলিযুক্ত চোখে তুমি তখন অ-পুরুষ। সে সিল কপাল থেকে মোছার জন্য, পুরুষ হয়ে উঠার জন্য তোমার চেষ্টা দেখে অামি নিজেই সরে গেছি। সমাজের চোখে এ অ-পুরুষের অাবেগগুলোকে অন্তরালে গলা টিপে মেরে ফেলেছি। খুব ভুল কিছু করেছি কি! সেই প্রাইভেট থেকেই তোমার সাথে অাছি। কতভাবে বুঝিয়েছি! কিন্তু ভয় ও ছিলো। যদি বন্ধুত্বটাও শেষ হয়ে যায়! অামার এ অাবেগগুলোর কোন স্থান নেই এ সভ্য জগতে। অার তুমি ত অনন্যাকে নিয়ে ভালোই অাছো। ভালো থাকো।

এই বলে সে চোখ মুছতে মুছতে চলে যাচ্ছে। অামি তাকিয়ে অাছি তার গমনপথে। হঠাৎ তার দিকে দৌড়ে গিয়ে তার হাতটা ধরলাম। বললাম
-জানো তুমি, যেদিন অামায় পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে পুকুরে লাফ দিয়েছিলে, সেদিন শুধু কল্পনায় এককভাবে অাধিপত্য বিস্তার করেছিলে তুমি, সে কালভার্ট, তোমার সে হাত ধরে বিকেল দেখা কিছুই ভুলতে পারি না। অামি প্রেমে পড়েছিলাম তোমার চিঠির। অাফসোস অামার সৎসাহস ছিলো নাহ্। সে কারনে তোমায় হারিয়েছি। অামি অারেকবার তোমায় হারাতে চাই না।
দুজন দুজনের হাত ধরে অাাছি। চোখাচোখি। দুজনেই ভাসছি চোখের জলে। হঠাৎ সে অামায় হ্যাঁচকা টানে বুকের জড়িয়ে নিলো। দুজনেই চুপ করে অাছি। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছি। যেন চলে না যায়। চোখ দিয়ে গলগল করে জল পড়ছে। কেউ কিছু বলতে পারছি না। অনুভব করছি দুজনের হৃদস্পন্দনগুলো। তার বুকে মাথা গুঁজে দিলাম। সে কপালে চুমু দিলো। দূর হতে গননা শুরু হলো। ১০ সেকেন্ড পর বাজির শব্দ ছড়িয়ে গেলো বহুদূর। রাশেদ বললো
-নতুন বছরে শুরু হলো অামাদের পথচলা। হেপি নিউ ইয়ার।
অাসি মুচকি হেসে বললাম
-অাই লাভ ইউ ২।
দুজনে একসাথে হেসে উঠলাম। দুজন তখন কালভার্টে বসে অাছি। অামি তার কাঁধে মাথা রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে অাছি। কি সুন্দর নিবিড় তিমির রাত্রি……..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.