আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা


১।
অসহ্য!
মানুষ থ্রি’জি ছাড়া কি ভাবে চলে? আমার’তো এক মিনিট থাকলেই দম বন্ধ হয়ে আসে।
-ওখানে গিয়ে দেখ, ঠিকমত কারেন্ট পাস কি না? তোর থ্রিজি পেতে কড়ই গাছের মগ ঢালে গিয়ে বসতে হবে।
-কি!!
গাড়ীতে বসে কথা হচ্ছিল আমরা মা ছেলেতে। জীবনে এই প্রথম ঠাকুরদাদার বাড়ি যাচ্ছি। এককথায় আমার পৈত্রিক গ্রামের বাড়ী। জীবনের এত গুলো বসন্ত পার করেছি কোলাহলে পরিপূর্ণ ঢাকা শহরে বন্ধী থেকে, এই প্রথম শহর ছাড়লাম গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটবো বলে। অনেকে লং জার্নিতে গেলে ব্যাগের ফাঁকে কিছু বিখ্যাত লেখকের বই কাপড়ের ফাঁকে ঢুকিয়ে নেয়, যাতে পাশের সিটের যাত্রীরা তাকে বিশিষ্ট জ্ঞানধর ভাবে। আমার বেলায় সেইটা সম্পূর্ণ উল্টো, আমি শুধু জার্নিতে নয় পাঠ্য বইয়ের ব্যাগের ফাঁকেও একটা কবিতার বই ঢুকিয়ে রাখি। এইযে এখন আমার কোলে আসন পেতে বসে আছেন পূর্ণেন্দু পত্রী। চিঠি-১১ থেকে পড়ছিলাম আর গ্রাম সম্পর্কে মায়ের জ্ঞান ধার নিচ্ছিলাম।

দারুচিনি দ্বীপের কানাবাবারা যেমন প্ল্যান করে সেন্ট মার্টিন যাচ্ছিল, আমার প্ল্যানটাও তেমন ছিল, কিন্তু কোন না কোন কারণে গোছানো ব্যাগ থেকে জামা কাপড় খুলে ফের আলনায় সাজিয়ে রাখতে হয়েছিল। এইবারও যাওয়া হত না যদি ইন্টার পরীক্ষা শেষের ছুটির অজুহাত না দেখাতাম বাবাকে। সাথে বাড়তি অজুহাত দাড় করালাম মনসা পূজার। শ্রাবণ মেঘের দিনে একটানা অঝোরে ঝরছে আজ ক্রন্দনরত আকাশের বারিধারা। গাড়ীর গ্লাসে বৃষ্টির পানিতে জমানো শিশির একটা সময় পরিষ্কার হতে লাগলো আর আমরাও পৌঁছলাম আমার নাড়ির ঠিকানায়। বৃষ্টি তখনো পুরোপুরি ভাবে মুষলধার ছেড়ে যায়নি। অবিরত গুড়িগুড়ি পানি ঝরিয়ে কাঁদছিল আকাশ। এদিকে গাড়ী থেকে পা নামাতেই বিরক্ত এসে ভর করল আমার মুখে। কাঁদাতে পা পড়তেই শরীরটা গ্যাঁজ গ্যাঁজ করে উঠল। এই প্রথম পায়ের সাথে কাঁদা মাখালাম, হোক না অনিচ্ছায় আর এডিডাসের দামী কনভার্সের উপর দিয়ে। স্পর্শ আর দেখা’তো হল নাকি?
নড়বড়ে পায়ে দুই কদম পা ফেলেই,
ধপাস! পড়ে গেছি। কে যেন বলছেঃ উডুরা ছেরা!
আমি মায়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লাম উডুরা কি?
-বোকা!

আমার কান লজ্জায় লাল হয়ে গেল। এসেই বোকার সিল কপালে লেপটে নিলাম! আমার এই বেহাল দশা দেখে ঠাকুরদা এগিয়ে এল। বুড়োর জমিদারী না থাকলেও এখনো জাঁদরেলি ঘোপ নাকের নিচটা ঢেকে রেখেছে। শুনেছি বুড়ো কোন এক কালে এই এলাকার জমিদার না থাকলেও ঐ গোছেরই ছিলেন। ঠাকুরদার সাহায্যে বসার ঘরে এসে বসলাম। বুড়ো নীরবতা ভাঙলেন আমাকে পূঁজি করে,
-দাদুভাই গ্রামে পা ফেলেই বোয়াল মাছ ধরতে লেগে পড়লে যে!!
বুড়ো আমার মজা কুড়চ্ছে, আবার নিক্ষিপ্ত দৃষ্টি ফেলে হাসিও প্রত্যাশা করছে! আমি শীতের ঠোঁট ফাটা হাসি টানলাম নিতান্তই ভদ্রতার খাতিরে। প্রত্যাশিত হাসি না পেয়ে গলা নামিয়ে বুড়ো আবার মুখে কথা টানে,
-আচ্ছা ঠিক আছে। গ্রামে এই প্রথম বলে কথা। যাও পরিষ্কার হয়ে আস। কামাল তোমাকে কলতলা দেখিয়ে দিবে।
-কামালটা কে ঠাকুরদা?
-তোমার দেখাশোনার গাইড বলতে পার।
-আমি কি বাচ্চা যে কিছুক্ষণ পর পর কেউ পেম্পাশ পরিবর্তন করে দিবে?
-তা নয় দাদুভাই, তুমি এইখানে নতুন। এখানে অনেক বন জঙ্গল । দিক হারিয়ে কোথায় চলে যাও কে জানে? কামাল রইল, সে তোমাকে ঘুরিয়ে দেখাবে সব।

বৃষ্টির ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় আমার মেজাজ বুড়ো বাড়িয়ে দিল। মায়ের চোখ টিপনিতে বুঝেছি বুড়োর সাথে তর্ক করতে নিষেধ করছেন মা। আমি কথা না বাড়িয়ে পা বাড়ালাম। দুপুরে পঞ্চ-ব্যঞ্জন দিয়ে খাবার সেরে খুব ক্লান্ত লাগছিল। কোনরকম বিছানায় গা হেলিয়ে চোখ রাখলাম মোবাইলের স্কিনে। ফেসবুকে টেক্সট করতে গেলে বোধহয় দুইদিন অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে, এমন দুর্বল গ্রামের নেট। ধ্যাত এরকম জানলে এই বৃষ্টি বাদল ঢেঙিয়ে কে আসত এই অজপাড়া গাঁয়ে?
-আইতাম হুজুর?
হঠাৎ কারো গলার আওয়াজ শুনে রীতিমত চমকে গেলাম। বালিশ থেকে মাথা হটিয়ে দরজায় তাকিয়ে দেখি, কালো দীর্ঘকায় এক কিশোর চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। অযত্নে বেড়ে উঠা শরীরের উপর স্পষ্টই ছাপ দেখা যায় এক খেটে খাওয়া দিন মজুরের।
-তুমি কে?
-আমি কামাল, হুজুর।
-ঠিক আছে হুজুর ডাকতে হবে না। আমি শ্রাবণ।
-বড় সাব আমারে কইছে।
-ঠিক আছে। এখন বল তোমাদের এদিকে কোন বাজার আছে?
-হ হুজুর। কেল্লেগা?
-শোন আমি বাজারে যাব। মোবাইলে টাকা ফ্লেক্সি করতে। তুমিও আমার সাথে যাবে।
-জে হুজুর।
-হুজুর না!
-জে আইচ্ছা।
কামাল আর আমি বাজারে যাচ্ছি। কামাল বাইসাইকেলর প্যাডেলে পা মারছে দক্ষ চালকের মত। আমি তার পিছনে ক্যারিয়ারে বসে চার দিকে তাকিয়ে দেখছি। কি অপূর্ব এই সবুজ প্রকৃতি। বর্ষার পানি যেন সব গুলো গাছকে স্নান করিয়ে সবুজ আবরণের প্রলেপ লেপে দিয়েছে। ঈশ, এত দিন কেন যে গ্রামে আসলাম না। জসীম উদ্দিনের “নকশী কাঁথার মাঠ” পড়েছি বদ্ধ ঘরে এসি ছেড়ে। আজ বুঝলাম কবিরা কেন প্রকৃতি প্রেমী ছিলেন?

বাজারের উঠতেই দেখলাম বিশাল এক যায়গা পেটে ধরে জমে উঠেছে মেলা। বইতে এত বার পড়েছি নাগর দোলার কথা কোন দিন দেখিনি। আজ স্বচক্ষে দেখে চড়তে ইচ্ছা করছে খুব। আমি নাগর দোলা দেখে বাচ্চাদের মত দৌড় লাগালাম। কামাল আমার পিছন থেকে “খারইন হুজুর” বলে চিৎকার করছে। আমি দাঁড়ালাম। দেখি কালাম দৌড়ে আমার কাছে আসল, বড়-বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, কই যাইতাছেন হজুর?
-চল, নাগরদোলায় চড়ি।
-এইডাত তো পুলাপাইন উডে। আপনে এইডাত উইঠ্যা কিতা করবাইন?
-কথা বলো না। আমার সাথে তুমিও চলো।
-মাইনসে হাসবো!
-হাসুক। তুমি আস।
মুখের মধ্যে লজ্জা আর বিরক্তি ধরে কামালের শ্যামলা মুখ আরও কালো করে নাগরদোলায় উঠে বসে। আমি তার হাত চেপে ধরে জোরে চেঁচাতে লাগলাম। আমরা যখন উপরে উঠি শক্ত করে কামালের হাতটা চেপে ধরি, কামালের খেটে খাওয়া শক্ত হাত ধরে আমি চোখ বন্ধ করে রাখি। চোখ খুলে দেখি বড়রা বাচ্চাদের যে ভাবে আদরীয় দৃষ্টিতে দেখে সেই চোখে কামাল আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

২।
পরদিন সকাল থেকে যেন আকাশ ভেঙে পানি পড়ছে। বৃষ্টি খানিকটা দম নিতেই
কামালকে নিয়ে বাহিরে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। আঙিনায় পা রাখতেই পা পিছলে গত কালের আধপড়াটা আজ পূরণ করে দিলাম। মানে ধপাস করে পড়েই গেলাম কাঁদাতে। আমার পড়ে যাওয়া দেখে কামাল সশব্দে হেসে উঠল। আমি রাগ করে তার দিকে এক খাবলা কাদা ছুড়ে দিলাম। কাঁদা খেয়ে তার হাসি যেন আরও উপচে পড়ছে। মুখ থেকে কাঁদা সরাতে সরাতে বলে,
-ভাইজান অহন পুলাপাইনের মতই আছুইন।
কি বুঝে যেন তার দিকে চরম নির্ভরতায় হাত বাড়িয়ে দিলাম। সে যখন তুলতে যাবে আমি তাকে টান দিয়ে ফেলে তার নগ্ন উন্মুক্ত বিশাল বুকে কাঁদা দিয়ে ডলতে লাগলাম। সে হেসেই চলেছে। তার হাসি দেখে আমিও চটে গেলাম, ধারে কাছে যতটা কাঁদা ছিল সবটা তাকে উৎসর্গ করে আমিও বাচ্চাদের মত হাসতে লাগলাম। হঠাৎ করেই তার অনাবিল হাসি আর কাদামাখা খোঁচা দাড়িযুক্ত মুখশ্রীর অবয়বটা দেখতে অসম্ভব ভালো লাগছিলো। কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম মনে নেই। হঠাৎ করেই উঠে পড়লাম সেই ঘোর থেকে।
-কামাল। এদিকে কোন পুকুর আছে?
-এইদিকে পুস্কুনি ভরা।
-চলো, তাহলে তোমার “পুস্কুনি ” থেকে একটা ডুব দিয়ে আসি।

অনেকটা সময় পুকুরে কাটালাম। পুকুরে নামলাম ভয়ে ভয়ে, আমি শহুরে ছেলে, সাতার জানি না। কামালের সাহায্য নিয়ে পানিতে একদিন-ওদিক ছুটোছুটি করে স্নান সারলাম। দুজনেরই উলঙ্গ বাহু, কামালের বুকে হালকা পশম পানির চাপে শুয়ে আছে। দেখতে কি অপূর্ব লাগছিল। এইভাবে আরও কিচ্ছুক্ষণ কাটালাম সাঁতার শেখার নাম করে। কিন্তু অনিচ্ছার সত্ত্বেও পুকুর থেকে উঠতে বাধ্য করল মুখপোড়া বৃষ্টি। আবার!! জ্বর আসার দোহাই দিয়ে কামাল হাল চড়ানোর গরু তাড়ানোর মত করে পুকুর থেকে তুলে নিল আমায়। ভেজা কাপড় বদলাতে বদলাতে কামালকে বললাম,
-তোমাকে কাঁদা মাখা অবস্থায় ভূতের মত দেখাচ্ছিল।
কালাম ঠোঁটের কোনে হাসি টেনে আমার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে উদাসীনতা সুস্পষ্ট। কামাল আমার দিকে তাকাচ্ছে বারবার। কামালের এমন চাউনি দেখে আমার হাসি পেয়ে গেল। বোধহয় সে ভাবছে, আমি এতটা ফর্সা আর সে কালো কেন? মনে মনে হয়তো আফসোসও করছে, ধ্যাত! আবুলের মা কিংবা জরিনা কালিও ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে ফর্সা হয়ে গেল। আমি একবার মেখেই দেখতাম কি হয়?

৩.
কাল মনসা পূজো। সবাই অসম্ভব ব্যস্ত। সকাল থেকে আবার থেমে-থেমে বৃষ্টি ঝরছে। ঠাকুরের ঘরের দরজা মাড়াতেই মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেলাম,
-শ্রাবণ একটু শুনে যা তো।
-হ্যাঁ মা বল।
-আমায় একটা কাজ করে দে না বাপ।
-বল কি করতে হবে?
-কাল পূজা অর্চনাতে কয়েক পদের ফুল লাগবে। সকালে সব ফুল যোগাড় করা সম্ভব নয়, তুই যদি পারিস কামালের সাথে গিয়ে আশপাশটা খুঁজে কিছু পাস কিনা দেখত।
-কোন দিকে যাব?
-যা তো। ওদিকে একটা বিল আছে। নৌকায় যাবি! আগে দেখেছি সেখানে শাপলা ফুটে থাকত।
আমি কথা না বাড়িয়ে গেলাম শাপলা ফুল আনতে।
কামালের সাথে একটা স্যাঁতস্যাঁতে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটছি। এইখানে বাতাসের এত ত্যাজ, যেন সুযোগ পেলে কয়েক গজ উড়িয়ে নিয়ে যাবে। অনেকটা হেটে যাওয়ার পর একটা ছোট্ট নৌকা দেখলাম। বর্ষায় এই অঞ্চলের সবার নিজেদের নৌকা থাকে। আমরা দুজন নৌকায় গিয়ে বসলাম। সে বৈঠা ঠেলছিল আর আমি তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছি। বাতাসটা প্রবল। সেই শান্ত বিকেলে যেন অশান্তটা বা মত্ততার প্রতিচ্ছবি এই আজকের পবন। নৌকা চলছে তার আপন গতিতে। তার গলার গামছা আর লুঙ্গিটা উড়ছে সেই সমীরণে। আমি বেসুরা কণ্ঠে রবি ঠাকুরকে আমন্ত্রণ জানালাম,

“পাগলা হাওয়ায় বাদল দিনে
পাগল আমার মন জেগে উঠে”

সে নেমে গেল। ডুব দিয়ে গুঁড়ি থেকে অনেক শাপলা তুলে আনল। আমার দূরের একটা শাপলার দিকে চোখ নিবিষ্ট হল। নীল শাপলা। কেন যেন সেটাকে মায়া হরিনীর মত লাগছিলো। হঠাত কামালের পিছন থেকে ডেকে উঠল,
-এই নিন বাইজান। নীল পদ্ম।
তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে সাথে অবাক হচ্ছিলাম, নীল পদ্ম আমার ভীষণ ভালো লাগে। সে কি ভাবে বুঝল? হেসে ফুলটা নিলাম। সে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল নৌকায়। দুহাত দুদিকে জলে ডুবিয়ে সটান হয়ে শুয়ে আছে। আমি বললাম,
-আমিও শোব।
-ভাইজান আমি উইঠ্যা পড়তাছি।
-না তুমি শুয়ে থাক।
আমি কথা না বলে শুয়ে ছিলাম চিত হয়ে শুয়ে ছিলাম তার পাশে। বাতাস জলের ছলছল শব্দ যেন আমাদের দৃশ্যের মনো-মুগ্ধতা বাড়িয়েছে। সে সংকোচ করছিল। অসতর্কতা বসে তার একটা হাত আমার বুকের উপর পড়ল। তার স্পর্শে কেন যেন শিহরিত হলাম আমি। সে হাত সরিয়ে নিচ্ছিল আমি বাম হাত দিয়ে তার হাত চেপে রাখলাম। বুঝতে পারছিলাম না আমি কি করছিলাম। তার শরীরের বুনো গন্ধ আমার নাকে এসে ভিড়ছে। আমি যেন নেশা-গস্ত। ক্ষণিকের পরিচিত যুবকের প্রতি আমার ভালোলাগাকে কোন নাম দেয়া যায় কিনা ভাবছিলাম। কিন্তু উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সাথে টের পেলাম আমার আর তার নিঃশ্বাস সমান ভাবেই ঘন হয়ে আসছে। এইটা কি কোন মোহ নাকি অন্যকিছু?

আমরা ফিরে আসতে লাগলাম। না কামালকে আমার ভালো লাগার কথা জানানো হয়নি। আবারও সেই জঙ্গল পাড়ি দিচ্ছিলাম, পাশ থেকে একটা শক্ত হাত আমার হাত চেপে ধরল। আমাকে নিশ্চয়তার আশ্বাস প্রদান করল সেই হাত। রুক্ষ হলেও স্পর্শ দুইজনই অনুভব করছিলাম সেই ক্লিয়ার। আমার মনের কথা চেপে রেখেছিলাম সাথে কামালেরটাও জানা হল না। পথ চলতে চলতে ভাবছিলাম সেই মাহেন্দ্রক্ষণটার কথা। মেঘাচ্ছন্ন বিশাল খোলা আকাশের বুকে দুই জন পুরুষ পাশাপাশি শুয়ে আকাশ দেখা।
সন্ধ্যা নামতেই মেঘ কেটে গিয়ে আকাশটা ভরে উঠল থালার মত চাঁদ বুকে নিয়ে। কামাল হ্যারিকেনের জার পরিষ্কার করছিল। আমি তাকে বললাম,
-কামাল বাহিরে যাবে? অবশ্য আজ সারাদিন বাহিরেই ছিলাম। পূজার জন্য খেটেছও অনেক। না যেতে চাইলেও সমস্যা নাই।

-কি যে কইন। আপনের সাথে গুরতে বালা লাগে। আপনার লগে আমি জাহান্নামেও যাইতে রাজি।
আমি চিন্তা করলামঃ কথাটা কি সে এমনি বলল না কি…….. পুকুর পাড়ে গেলাম। জল জোছনায় মন জোনাকীরা যেন তারুণ্যের আভার বহনকারী। তার সাথে ঝিরিঝিরি বাতাস। পুকুর পাড়ে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থাকলাম নিঃশব্দে। সেটাই যেন সেই সময়ের উপযোগী আচরণ। হঠাৎ বলে,
-বাইজান কাউরে বালা বাসুইন?
-হ্যারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজছি। পাই নি।
কি বুঝে যেন সে আমার হাতটা আবার চেপে ধরল। এইটা কি ভয় না পাওয়ার নিশ্চয়তা নাকি অন্যকিছুর নির্ভরতার হাত, আমি বুঝতে পারছিলাম না। কেন যেন মনে হল তার স্পর্শের ভাষা আমার পরিচিত। আমি কিছু বললাম না।ইচ্ছে করছিল তাকে কিছু বলি, কিংবা আমার একটা হাত তার হাতে গুঁজি। কিন্তু পারি নি। মানুষ চাইলেই সব কিছু করতে পারে না। সবার নিজস্ব একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। হয়তো মানসিক ভাবে আমারও ছিল। ভাবলাম সব কিছুরেই একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। সময় আসুক ততদিনে হয়তো এই স্পর্শ, এই ভালোলাগা নিজস্ব একটা নাম খুঁজে নিবে। আর তাছাড়া গ্রামে তো আছি বেশ কয়েকদিন।

৪.
আজ মনসা পূজা। একটা ছোট্ট ছেলে আমার কাছে এসে বললঃ
-কইন “কসে কসে”
-কসে কসে বললে কি হবে?
-আপনে কইন না “কসে কসে”.
-কসে কসে।
-তোর নানী ডাইল দিয়া ফচে ( শৌচ করা)
আমি হাসতে হাসতে মাটিতে লুটোপুটি। চিন্তা করছি আমার নানী দেখা যাচ্ছে খুব সম্ভ্রান্ত মহিলা। টয়লেটে পানির বদলি ডাল নেয়। নানী মনে হয় ডাল রেঁধে কড়াই থেকে বদনায় ঢেলে দেয়। আর তারপর টয়লেটে ছুটে। আচ্ছা যদি ঘরে ডাল না থাকে তাহলে নানী কি বদনা নিয়ে হোটেলের দিকে দৌড় দিবে? বলবে কি গিয়ে আমায় এক বদনা ডাল দিন।
কোথায় থেকে মা ঝড়ের মত এসে বলে,
-তাড়াতাড়ি রেডি হ। তোর বাবা অ্যাকসিডেন্ট করেছে।
ধক করে উঠল বুকটা। কি হয়েছে বাবার!

আমি তাড়াতাড়ি ব্যাগ গোছাতে লাগলাম। এইবার পূর্ণেন্দু পত্রীকে হাতে নয় কাপড়ের ভাঁজে গুঁজে দিলাম। কাপড় ভাঁজ করছিলাম আর বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলাম। কামাল বোধহয় বাড়ী নেই। সকালে যে না বলে কোথায় গেছে, বেলা অব্ধি বাড়িমুখো হয়নি। বাবার চিন্তায় মাথা ধরে আছে সাথে কামালকে না বলে যেতে হবে ভেবে আরও খারাপ লাগছে। মনটা মাত্রাতিরিক্ত খারাপ হয়ে গেল। পূজা শেষ না করেই সবাইকে প্রণাম করে মাইক্রোবাসে উঠলাম। সবাই আছে কিন্তু যার অপেক্ষায় আছে আমার দুচোখ তার দেখা নাই। গাড়ি ছেড়ে দিল। বৃষ্টি নামছে। পিছন দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ দেখি খালিগায়ে একজন কালো কিশোর দৌড়ে আসছে, তার হাতে অনেক গুলো নীল পদ্ম। আমাদের মাইক্রবাস তখন অনেকটা দূরে চলে গেছে। আমি পিছনের গ্লাসে দেখছি, সেই কিশোর সেখানেই সে দাড়িয়ে পড়ল……… তাকে দেখলাম যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায়। শ্রাবনের জল আমাদের গাড়ির জানালা বেয়ে পড়ছে…। আমার চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু কার জন্য এই অশ্রু? বাবার জন্য নাকি দুইদিনের নামহীন ভালো লাগার সম্পর্কটার?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.