আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১।

হাসপাতাল থেকে বের হলাম । বসন্তের এক রোদ্দুর ঝলমলে দিন । ঝিরিঝিরি হাওয়া মনকে ক্রমশ আন্দোলিত করছে । রাস্তা পার হতে যাবো এমন সময় কে যেন আমার হাত ধরেছে । তাকিয়ে দেখি ৭-৮ বছরের ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিলো । কাঁধে স্কুল ব্যাগ । একেবারে ছোট্ট একটা পরী । আমায় বলা তার প্রথম কথা
-” ভাইয়া আমায় রাস্তাটা পার করিয়ে দিবেন?”
আমি মুচকি হেসে বললাম
-“আসো “।

রাস্তা পার করতেই সে ধন্যবাদ দিয়ে হাটতে যাবে এমন সময় মা বলে চিৎকার দিলো। আমি কৌতুহল চোখে তাকাতেই দেখি সে বসে আছে রাস্তায় । আমি শঙ্কিত ভাবে তার দিকে এগিয়ে গেলাম । দেখি যে পড়ে গিয়ে হাঁটু ছিলে গেছে। রক্ত পড়ছে । আমি ধরে তাকে দাড় করালাম । সে দাড়াতে পারছে নাহ। মনে হয় গোড়ালি মচকে গেছে। আমি কোলে নিয়ে বললাম
-” চলো ডাক্তার এর কাছে যাই”
ছোট্ট মেয়েটা কোনো কথা বলল না । সে অদ্ভুত রকম শান্ত!

ইমারজেন্সি তে নিয়ে ট্রিটমেন্ট করালাম। মেয়েটা একটুও ভয় পায়নি । কিন্তু সে আর দাড়াতে পারছে নাহ । আমি তাকে জিগ্যেস করলাম
-” তোমার বাসা কোথায় ? “
-“পুরান বাজার”
-“বাসায় কে কে আছে তোমার?”
-“বাবা মা আর পুনু দা ‘
– ” তুমি কারো ফোন নাম্বার জানো?”
সে অসম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো। আমি বললাম
-” চলো , আমি তোমায় বাসায় দিয়ে আসি ।”
সে বলছে
-“মা কে বলো না , মা বকা দিবে।”
আমি হেসে বললাম
-“আচ্ছা বলব না । তা তোমার নাম কি ?”

সে বলল , “চিত্রা”।
-বাহ খুব সুন্দর নাম । তা তোমার বাবা মা কি করেন?
-” বাবা মা দুজনেই কলেজে পড়ায়। “
-“তোমার ভাই কি করে?”
-“সারাদিন আমার সাথে ঝগড়া করে”

আমি শুনে বেশ মজা পেলাম । মেয়েটা খুব গোছিয়ে কথা বলতে পারে। এতোটুকু মেয়ে একটা। আমার একটা বোন থাকলে ভালোই হতো ।

তার নির্দেশনায় আমি তার বাসায় পৌছুলাম। দোতালা একটা বাসা । কলিংবেল চাপতেই একটা ছেলে বের হলো। তার দিকে তাকাতেই যে কথাটা মাথায় আসলো তা হলো

-” সে মা কালীর থেকেও কালো হবে হয়তোবা! “

ছেলেটার চোখে মৌলিক উদ্বেগ ! জিগ্যেস করল
-” কি হয়েছে চিতু তোর?”
আমি বললাম
-“সেরকম কিছু নাহ। পড়ে গিয়ে পা মচকে গেছে । আমি ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে এলাম “
-আপনাকে ধন্যবাদ।
হেসে বললাম ” ঠিক আছে “

২।

সে আমায় কফির আমন্ত্রন জানালো। আমি অমত করলাম । তার অবস্থা হলো , ” কে শুনে কার কথা। ” আন্তরিক বন্ধুর মতো প্রায় টেনে হিঁচড়ে আমায় ঘরে নিয়ে এলো, উদ্দেশ্য , ” এক কাপ কফি”।
চিত্রাকে শুইয়ে দিয়ে আমরা দুজন বসে কফি খাচ্ছি । সে প্রথমে প্রশ্ন করলো

-আপনার নামটা জানা হলো নাহ………
-আমি উদয়, আপনি?
-প্রণব । কি করছেন?
– “MMC থেকে ইন্টার্ন। আপনি?
-আমি BAU থেকে অনার্স শেষ করলাম ।
হঠাত করে তার ফোন বেজে উঠলো। সে রিসিভ করে হু হা করলো। তারপর আমি ও তাড়াতাড়ি কফি শেষ করে উঠলাম। সে চিত্রাকে কোলে নিয়ে বললো
-“আমি বাইরে যাবো চিতু। “
আমি একটু অবাক হয়ে বললাম
_ওকে একা রেখে যাবেন? ভয় পাবে নাহ?
-নাহ, মাসির বাসায় রেখে যাবো । কাছেই । আর একজনের অবস্থা খুব আশঙ্কাজনক, তার ইচ্ছার কথা বলছে নাহ , আমার যেতে হবে।

আমার মাথায় পুরোটা গোলিয়ে গেলো। আমি বললাম
-” মানে?”
-” এখন তো একটু ব্যস্ত , আপনার ফোন নাম্বার টা দিয়ে যান, এ কৌতুহল এর অবসান ঘটিয়ে দেবো।
আমি ফোন নাম্বার দিয়ে বাসায় চলে এলাম । মাথার মধ্য শেষের কথাগুলো শুধু ঘুরছে ! অপেক্ষায় আছি, তার ফোনের।

৩।

দিন গেলো তাহার পথ চাহিয়া । আমার অবস্থা বর্তমানে এমন। কেন জানিনা তার কথা ভুলতে পারছি নাহ । কালো এক ছেলে , পেশল দেহ , গালে বুনো দাঁড়ির ঝাঁক । চোখ কাকচক্ষুর মতো স্বচ্ছ । সবচেয়ে সুন্দর তার হাসি । তার হাসিতে বুকে একঝাক পিন ফুটে যায় । আহামরি সুন্দর নাহ , কিন্তু ভীষন পুরুষালী । একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে । খুব ইচ্ছে করছিলো যদি একটু জড়ানো যেতো প্রনয়ের বাঁধনে! তার নাম্বার নাই , যোগাযোগ যে করবো সেরকম ও কোন পথ নাই । রাগ লাগছিলো প্রচুর । এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ফোন এলো । আমি সিউর যে তার ফোন , কিন্তু দেখি যে মা ফোন দিলো । কথা বললাম । সে ফোন দেয়নি । আমি আশাহত!

কেটে গেলো ১টা সপ্তাহ। সে ফোন দেয়নি । তাতে কি , এক অনধিকার আশায় আমি আশা করি । একদিন হয়তো ফোন দিবে, হয়তো দিবে নাহ । কিন্তু মানুষরা পজেটিভ দিক ভাবতে পছন্দ করে । একদিন , ক্লাস শেষ হওয়ার পর পা বাড়ালাম ক্যান্টিনের দিকে । একটা চেয়ারের দখলদার হতেই দেখি যে আমার বিপরীত একটা চেয়ারে সে বসে আরাম করে সিঙ্গারা খাচ্ছে । আমার খুব রাগ লাগলো, কোন কারন ছাড়াই । আমি উঠে চলে আসার সাথে সাথেই পেছন থেকে নাম ধরে ডাকলো আমায়
-” উদয়”
আমার কেন জানিনা খুব ভালো লাগছে, অথচ আমি তো এরকম আবেগী নাহ! আমি নিজেকে সামাল দিতে দিতে পেছনে ফিরতেই দেখি সে আমার পাশে দাঁড়ানো । আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা আদেশের সুরে বলল
-চলো হাটি।

পরন্ত বসন্ত বিকেলে রোদের গন্ধ গায়ে মেখে আমরা হাঁটছি । বাতাসে নাম না জানা ফুলের মৃদু সুভাষ । হলুদ আলোয় তাকে কেনো জানিনা খুব মায়াবী লাগছে । যেন অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। নীরবতা দীর্ঘশ্বাস ফেললো তার কথায়

-আমি একটা সংস্থা তে কাজ করি , নাম ” শেষের হাসি ” । নামটা অদ্ভুত , তাই না ? আমাদের প্রধান কাজ হলো মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ ইচ্ছা পুরন করা। আপনি হয়তো জানবেন না যে কত ছোট বাচ্চা সেখানে আছে , যারা জানে নাহ যে কিছুক্ষণ পর তারা মারা যাবে । তাদের মুখে শেষ হাসিটা যে কতটুকু প্রশান্তিকর ও হৃদয়বিদারক তা আপনাকে বুঝাতে পারব নাহ । ১ বছর হল ময়মনসিংহে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে কাজ শুরু করেছিলাম , এখন আমাদের অনেক ভলান্টিয়ার। আর্ত মানবতার সেবায় নিজেকে মেশাতে পেরে ভালো লাগে।

আমি চুপ করে শুনছিলাম । জানতাম ই না যে এ শহরে এমন কিছু আছে । আমি তাকে বললাম
-” আপনাদের কাজের ধারা টা কি আমি দেখতে পারব?”
সে বলল , ‘ সময় করে চলে আসবেন ‘

আমি আমার পথে চলে আসলাম। মনে কাজ করছে যতসব অবিমিশ্র চিন্তা!

৪।

তারপর আরো কয়েকটা দিন কেটে গেলো , তার সাথে আর যোগাযোগ নেই । সে যেন আমার জীবনে অতিথির মতো । মাঝে মাঝেই আসে। ক্ষণিক মন ভালো করে চলে যায় আরো অনেক অগণন অপেক্ষার প্রহর উপহার দিয়ে । তবু বাস্তবিক হবার চেষ্টা করি । ব্যক্তিজীবনের যতসব মামুলি সমস্যায় আমি নিজেকে ডুবিয়ে ফেলি। তারে যেন আর বিশ্রিভাবে মিস না করি , সে কারণে । একদিন কোন এক সন্ধ্যা, অবিস্মরণীয় হয়ে আসে আমার জীবনে । সেদিন আমি পার্কে বসে বাদামের সদ্গতি করছি , এমন সময় ফোন এলো
-“তুমি কি পার্কে বসা?”
কণ্ঠ শুনে ধরতে কষ্ট হলো নাহ , “প্রণব” । বুক ধক করে উঠলো । আমি কোনমতে বললাম , ‘হা ‘ ।
-” তাহলে নৌকাগুলো যেখানে বাধা থাকে সেখানে আসো” ।

আমি আসতেই দেখি সে এক নৌকাতে তখন বেশ আয়েশ সহকারেই বসেছে। ইশারায় উঠতে বলল । আমি উঠেই দেখি যে আমরা ছাড়াও আরো দুজন বসে আছে। একজন বৃদ্ধমতো আর একজনের হাতে একটা বাশি । আমি চুপ করে বসে রইলাম । নৌকা ছেড়ে দিলো । চারদিকে কুলকুল পানির শব্দ । চলতে চলতে আমরা তখন জনপদ ছাড়িয়ে বহুদূর । সূর্যের শেষ আলো তখন পানিতে অবগাহন করছে । গলিত সোনা ভাসছে এক গোধূলি বেলার হলুদ আলোয় । হালকা বাতাসের সাথে তখন বাঁশীর সুর ভেসে আসে। এক অচেনা সুরের মায়ায় তন্ময় হয়ে যাই। প্রণব তখন সেই বৃদ্ধকে হাত ধরে নৌকার পালের দিকে নিয়ে যায় । তার ভরাট কণ্ঠে তখন আমন্ত্রিত হয় জীবনানন্দ দাস………

“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ির এই তীরে
এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় শঙ্খচিল শালিকের বেশে………… “

সে পরিবেশকে তখন আমার আর চেনা পৃথিবীর কোন অংশ বলে মনে হয় না। আমি এই অপূর্ব সুন্দর অনুভুতি চাপিয়ে রাখতে পারি নাহ । আমার চোখ দিয়ে জল গরাচ্ছে । চেয়ে দেখি বৃদ্ধও পাঞ্জাবীর হাতা দিয়ে চোখ মুছছে । এ কান্নায় কোন লজ্জা নেই । আছে এক অপার প্রাপ্তির সুখ ।

৫।

সেদিনের পর থেকেই আমি তার প্রতি দুর্বল হয়ে পরি । ভীষণভাবে । কিন্তু আমাদের ফোনালাপ হয় না তেমন , দেখাও কম । টুকটাক ম্যাসেজ হয় । কিন্তু এসব টুকটাক কথা আরো উচাটন করে দেয় মনকে । অনেকটা আগুনে তুষ ছিটানোর মতো । বলতে ইচ্ছা করে কিছু , কিন্তু সে যদি আমার মতো না হয় ? থাক , এরকম করেই চলুক ।

মাঝে মাঝে আর পারি না , তখন চিৎকার করতে ইচ্ছা করে । খুব ইচ্ছা করে দিনশেষে কারো নীরে ফিরি। কিন্তু এসব শুধু স্বপ্নই রয়ে যায় । আচ্ছা , আমি তো জানি নাহ তার গার্লফ্রেন্ড আছে কি নাহ । তাকে জিগ্যেস করলেই তো বুঝে যাবো সে কি আমারি মতো না কি । ফোন দিলাম তাকে ।
ফোন ধরেই বলল

-” বিশেষ কিছু বলবে?”
-আমি বিশেষ কিছু বলব না কি তা তুমি কি করে বুঝলে?
-কিছু বলতে চাও বলেই তো ভোর ৪ টায় ফোন দিয়েছো।
আমি দাঁত দিয়ে জিভ কেটে আমতা আমতা করে বললাম
-আসলে এম্নিই , ঘুম আসছ নাহ তাই আর কি…………
-ঠিক আছে , তুমি ঘুমাও। কাল ১০ টায় অফিসে এসে পড়ো । কিছু গুরুত্বপূর্ন কথা বলবো । আর আমি ঠিকানা টেক্সট করে দিচ্ছি ।
এই বলে সে ফোন রেখে দিলো ।

সারারাত আমার ঘুম হলো নাহ। ভাবনার সাতকাহন নিয়ে বসলাম । কি বলে সে। এই প্রথম সে আমায় ডাকল । আমি জানি সে স্পেশাল কিছুই বলবে ।

পরদিন সকালে স্নান করলাম । বেশ সুন্দর করে গোছিয়ে নিলাম নিজেকে । ছাইবর্ণের একটা শার্টে আমাকে খুব একটা খারাপ লাগছে নাহ । তারপর সময় থাকতে থাকতেই বের হলাম। বাতাসে তখন বসন্তের ঘ্রাণ!

৬।

তার দেয়া ঠিকানায় পৌছুলাম। ঠিকানা টা একটা গেটের গায়ে ঝুলছে । দারোয়ানকে বলে গেট দিয়ে ঢুকতেই ভেতরের পরিবেশ দেখে আমি অবাক । চেনা কোন পরিবেশ নাহ।

চারদিকে অনেক মানুষ। বিভিন্ন বয়সের। মেলার মতো ছড়ানো ছিটানো । এখানে যেন দুঃখবোধ বলে কিছু নেই । আনন্দ চরাচরে ভাসছে সব । সবাই সবার মত হই-হুল্লোড় করছে । মন ভালো হয়ে যাওয়ার মতো একটা পরিবেশ। আমি তাকে দেখলাম , ” একটা ৬-৭ বছরের বাচ্চার সাথে খেলা করছে । ” আমি তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম । সেও প্রতিউত্তরে হাসলো । আমার হাত ধরে বলল, ” আসো” । সেই ছিলো প্রথম স্পর্শ !

এই জায়গাটা ব্রহ্মপুত্রের তীরে । একটা গাছের নিচে বেঞ্চ পাতানো । দুজনে সেখানে বসলাম । কিছুক্ষণ অনুভব করলাম সেই নদীর এক নিজস্ব ঘ্রাণ! হঠাত সে বলল

-এখানে কেমন দেখলে আমায় ?
-তুমি কতো সুখী ! সবার মাঝে মধ্যমণি হয়ে আছো । তারাও কতো সুখি , জীবনের অন্তিমে তোমার মত একজন ক্ষনিক সঙ্গী পাচ্ছে ।
সে হেসে বলল
-“জানো প্রত্যেক মানুষের একটা নিজস্ব দুঃখ থাকে । আমারো আছে । আজ তা বলার জন্য ডেকেছি তোমায় । “
আমি আর তাকে থামালাম নাহ , সে নিজের মতো করে বলতে লাগলো

-” তখন ক্লাস ৭ এ পড়তাম । প্রথম কৈশোর । আমাদের ক্লাসের একটা মেয়েকে ভালো লাগতো , একদিন সাহস করে বলে দিলাম । সে কান্না করে স্যার কে বলল , আর সেদিন স্যার কি মার দিলো আজো ভুলিনি । এই বলে সে মুচকি হাসলো । তারপর ও ভুলতে পারিনাহ । এমন করেই চলছে । একদিন টিফিন পিরিয়ডে সে ক্লাসে বসে কান্না করছে । আমি তার কাছে গেলাম , জিগ্যেস করলাম কি হয়েছে ? সে কিছু বলে নাহ । আমি তাকে বললাম আসো বসে থেকো নাহ , বের হই । সে কিছুতেই যাবে নাহ। তার হাত ধরে টান দিতেই দেখলাম তার পাজামা রক্তে মিশে আছে । আমি মাসিক এর ব্যাপার জানতাম । তাকে কিছুই বললাম নাহ । শার্ট টা খুলে বললাম ” বেঁধে নাও কোমরে , আর আমরা দুজনেই চলে আসলাম । সেদিন থেকেই বন্ধুত্ব হয়ে গেলো । চলতে চলতে এবার অনুভব করলাম এই সম্পর্ককে আর বন্ধুত্বের নামে চালানো যাচ্ছে নাহ । তাই একদিন আবার প্রোপোজ করলাম , না করলো নাহ । প্রেম চলতে থাকলো । ৯ বছর প্রেম চলার পর জানলাম সে আরো একটা প্রেম করে । হাতে নাতে প্রমান পেলাম । সেসময় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম । বদলে গেলাম । আমি আর নিজেকেও চিনতে পারি নাহ । অনেক মেয়ের সাথে কথা বলতে থাকলাম , প্রেম চালাতে লাগলাম , তারপর সেক্স ও করতে লাগলাম । হঠাথ একদিন এক বন্ধুর জন্য রক্ত দিতে গেলাম । রক্ত পরীক্ষার পর ডাক্তার আমায় বলল আমি HIV positive . পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো। মৃত্যুকে এতো কাছে কখনো আসতে দেখিনি । আমি তখন ভেঙ্গে পরলাম । সময় কম , কিন্তু জীবনে আশা ছিলো কিছু মানুষের আশা পুরন করবো । আমি আবার চিন্তা করতে শুরু করলাম । নতুন উদ্যমে ।

তারপর এই সংগঠন করলাম ।” এই বলে সে দম নিলো ।
তারপর আবার বলল , ” এটাই আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিলো , আর আমি সফল । আমার অবস্থা ভালো নাহ , হয়তো কয়েকদিন পর মারা যাবো । তবু আমার এ জীবনের প্রতি কোন আফসোস বা অপূর্ণতা থাকবে নাহ । আমি পূর্ণ ।

তার চোখ জলে চকচক করছে । সে জলে কোন কষ্ট দেখি নি । কেমন যেন আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ , আরে প্রাপ্তির এক নির্লিপ্ততা ।

আমার চোখ দিয়ে তখনো জল গড়াচ্ছে । বোবা হয়ে গেছি । কিছু কষ্ট যেন জেঁকে ধরছে । তাকে আমি আর কিছু বললাম নাহ । বললাম নাহ যে সে মারা আরো একটা মানুষের খুব কষ্ট হবে । আরো একটা মানুষ তাকে খুব করে চাইছিলো । আরো একটা মানুষ তাকে অনেক অনেক অনেকটা ভালোবাসে!!!
সে হঠাথ বলল
-তুমি কি যেন বলবে বলেছিলে ?
আমি কিছু না বলে খুব কষ্টে একটা মুচকি হাসি দিয়ে উঠে হাটা দিবো অমনি সে আমার হাত ধরে টান দিলো । আর আমায় তার কাছে নিয়ে এসে সরাসরি বলল
-ভালোবাসো আমায় ?
আমি সহ্য করতে না পেরে ডুকরে কেঁদে তাকে জড়িয়ে ধরি । আর বলি , ” নাহ আমি তোমায় ভালোবাসি নাহ …”

৭।

দুজনে চলে এলাম । তাদের স্টাফসহ আমাকে নিয়ে সে একটা জায়গায় আসলো । চারদিকে নাম না জানা বিভিন্ন ফুলের ঘ্রাণে ম ম করছে। সকালের বাসন্তিক রোদ সবার উপর হেসেখেলে পড়ছে । সবাই গোল হয়ে একে অন্যের হাত ধরে আছে। তাদের গানে আমি একটা অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললাম । তারা মিলিত স্বরে গাইছে

-“আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে ,
দুঃখ বিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে…………”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.