আমি যারে ভালোবাসি তারে করি দান

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
বাগানটার দিকে তাকালাম। চোখদুটো জুড়িয়ে গেলো আমার কষ্টের উপহার দেখে। ফুলে ফুলে ভরে আছে আমার বিশাল বাগানটা। বাগানটা যদি নেশা হতো তাহলে জীবনটা দামী অর্কিডে সাজানো বাগানের মতো সুন্দর হতো। কিন্তু নিয়তির কষাঘাতে আমাকে বেছে নিতে হয়েছে পবিত্র জিনিস দিয়ে জীবিকা অর্জনের পথ। বাবার আবাদী জমির পরিমানটা ছিল বিশাল। বাবা চলে যাওয়ার পর কষ্টেসৃষ্টে দাড় করিয়েছি এই ফুলের চাষ। ২ বছরের মাথায় আমার ফুলের সাপ্লাই যেতে থাকে সারা দেশে। আজ আমি মোটামোটি দাড়াতে পেরেছি।
এক নিঃশ্বাসে মনে পড়ে গেলো আমার সেসব কথাগুলো। হাটতে থাকলাম বিশাল গাঁদাফুলের বাগানের মাঝ দিয়ে। শীতের সকালের শিশিরভেজা সেই গাঁদাফুলগুলো যে কি সুন্দর লাগছিলো। বুকে গেঁথে যাচ্ছিলো সেইসব সৌন্দর্য্য। আমার অতি আকাঙ্খিত টিউলিপ ফুলের বাগানের মাঝে দাড়ালাম। চারা বড় হচ্ছে। ফুল ফোটবে বসন্তে। এমন সময় ফোন থেকে টুংটাং মিস্টি শব্দ আসছে। ফোন রিসিভ করতেই মার গলা,
-অঙ্কুরকে স্কুলে দিয়ে আসতে হবে। তোর কি খেয়াল নেই? তাড়াতাড়ি বাসায় আয়।
একবুক ভেজা মাটির গন্ধ নিয়ে চললাম বাসার দিকে।

২.
স্কুলে পৌছে দিয়ে আবার বাসায় এসে লাঞ্চটা সারলাম। চিন্তা করছি কি করে ফুলের বাগানগুলোকে আরো ভালোভাবে সংরক্ষন করা যায়। হঠাৎ করে আমার মনে হল,”আমি এই দুটো বছরে কি কোথাও ঘুরতে গেছি? কোন বন্ধুর সাথে আড্ডা দিয়েছি? “
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এটাই! আমি দু বছর ব্যাস্ততার জন্য কিচ্ছু করিনি। সময় পাইনি! মনে মনে চিন্তা করছি আমিও তো সব বন্ধুদের মতো আড্ডা দিতে চাইতাম! কিন্তু আমার সে সময়গুলো হারিয়ে গেছে।
মায়ের ডাকে সমস্ত ভাবনারা উড়ে চলে গেলো। মা বলছে অঙ্কুরকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে। সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম স্কুলের দিকে।
স্কুলের ওয়েটিং রুমে বসে আছি। এমন সময় তৃতীয় শ্রেনীর কর্মকর্তা গোছের একজন লোক ওয়েটিং রুমে এসে বললঃ অঙ্কুরের অভিভাবক কে আছেন?
-জ্বী বলুন।
-আপনি আমার সাথে আসেন।
আমি কোন বাক্য খরচ না করে বাধ্য ছেলের মতো সেই লোকের পিছু পিছু চলতে লাগলাম। দোতলার বারান্দার শেষমাথায় এসে লোকটি একজনকে বলল,
-স্যার, ইনি অঙ্কুরের গার্জিয়ান।
আমি তার দিকে তাকিয়ে একটা সৌজন্যমূলক হাসি দিলাম। করমর্দন ও পরিচয়পর্ব শেষ হলে জানতে পারলাম, তিনি এই স্কুলের ইংরেজীর শিক্ষক। তিনি বলতে লাগলেন,
-অঙ্কুরের ব্রেইন খুব শার্প। ক্লাসে কাল অঙ্কুর আমায় জিগ্যেস করেছিলো, “স্যার, বড় হাতের ABCD ছোট হাতের ABCD থেকে কয় বছরের ছোট?
আমি তারর প্রশ্নের জবাবে হতভম্ব হয়েছিলাম। অঙ্কুরের চিন্তাধারা গভীর । তার মেধাটাকে তুমি সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালনা করো।
আমি আচ্ছা বলে তাকে চায়ের নিমন্ত্রন জানালাম। কিন্তু সে আরেকদিন বলে নিমন্ত্রনটাকে এড়িয়ে গেলো। অঙ্কুরকে নিয়ে বাসার পথে রওনা হলাম। সারাটা পথ অঙ্কুরের সে ইংরেজীর শিক্ষক হাসান স্যারকে নিয়ে ভাবলাম। হয়তো নিরানন্দ মানুষের জীবনে ছোট ছোট ঘটনাই হয়ে উঠে অনেক স্মরনীয়।

৩.
আমার একটা পৃথিবী আছে। তবে সে পৃথিবীটা সবার থেকে একটু ভিন্নভাবে সাজানো। আমার ভালোলাগার রাজত্বে রাজ করে এক অচেনা পুরুষ। হ্যাঁ, আ মি সমপ্রেমী…। আর সমাজ সে কারনে নাক সিঁটকোবে। কিন্তু আমি ‘সমপ্রেম’ টা কে গৌরব বলে গায়ে জড়িয়েছি। তাই এ বিষয়ে আমার কোন অপরাধবোধ নেই।
স্কুলের ক্যান্টিনে বসে বসে এসব জিনিষ নিয়ে ভাবছি। অঙ্কুরের স্কুলে একটা নাটক মঞ্চস্থ হবে। আর সে কারনে ছুটির পর রিহার্সাল চলছে। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সেকেন্ডের কাঁটার অক্লান্ত দৌড় দেখছি। এমন সময় কাশির শব্দ শোনে ঘড়ি থেকে মুখ তুলে সামনে তাকালাম। দেখি, হাসান স্যার দাড়িয়ে আছে। আমি বললাম,
-স্যার আপনি এই সময় এখানে? বসুন!
হাসান স্যার মুচকি হাসলো। কালো কালো চোখের সাথে কালো দাঁড়ি দিয়ে আবৃত মুখের মাঝে যখন একচিলতে হাসি ফোটলো, তখন মনে হলো “মেঘের মাঝ থেকে রৌদ্র,কিরন ছড়াচ্ছে”।
হাসিটা আমার বুকের কাছাকাছি গিয়ে কোথাও একটা ধাক্কা খেলো। সত্যিই, কি সুন্দর মানুষের হাসি! হাসান স্যার বললেন,
-চা চলবে….?
-চায়ে আমার আপত্তি নেই।
-তোমার পরিবারে কে কে আছে?
-মা বাবা আর ছোটভাই।
-বাবা……?
-বাবা প্রবাসী ছিলেন। আমেরিকা থাকতেন।দু বছরে একবার আসতেন। কিন্তু গত তিনটা বছর বাববার কোন খোঁজ পাই নি। কোন মেইল না…. কোন চিঠি না…।
জানি না বাবা বেঁচে আছেন কি না?
-সরি।
-না, না সমস্যা নেই।
-কোন পর্যন্ত পড়ালেখা করেছো।
-ইন্টার কোনরকম পাস কররেছিলাম। তারপর আর ইচ্ছে করে নি। অমনযোগীতাও একটা কারন। বাবার আবাদী জমিতে শখে ফুলের চাষ করতাম। সময়ের প্রয়োজনে ফুলকে হাতিয়ার করে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়লাম। দু বছরে আমি একটা জায়গায় দাড়াতে পেরেছি।
আমি তো একাই বকবক করে যাচ্ছি। আপনার সম্পর্কে কিছু বলেন।
-সেরকম করে বলার কিছুই নেই। মা বাবা ছোট থাকতেই মারা যায়। চাচার বাসায় মাননুষ হয়েছি। আদর ও করেনি অবহেলাও করেনি। তারপর সিঁড়ি দিয়ে বেয়ে বেয়ে এই স্কুলের শিক্ষক হওয়া।
আমরা দুজনেই নিশ্চুপ। মনে হচ্ছে অনেক কথাই বলার আ ছে। কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না। কেমন যেন গনার কাছে কিছু আটকে যাওয়া অনুভূতি অনুভব করছি। হঠাৎ হাসান স্যারের গমগমে কন্ঠস্বরে নীরবতা খানখান হয়ে গেলো। স্যার বললেন
-এই যে আমার নাম্বারটা। অঙ্কুরের কোন বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে আমাকে জানিয়ো। আমি তবে আসি।
এই বলে হাসান স্যার উঠে পড়লো। আমি হাসান স্যারের গমনপথে তাকিয়ে থাকলাম। ভাবছি, “ইস.. যদি একবার পিছনে ফিরে দেখতো। দেখতে দেখতে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো, কিন্তু পিছে তাকালো না। হয়তো পিছুটান নেই। অনেকটা ঘড়ির মতো। চুপচাপ ক্যান্টিনে বসে আ ছি। ঘড়ি চলছে অক্লান্তভাবে। টিক্ টিক্ টিক্…….।

৪.
রাত্র,পর্যন্ত যে কতবার স্যারের নাম্বারটা দেখলাম। শেষ পর্যন্ত সাহসের উপর ভর দিয়ে ছোট্ট একটা ম্যাসেজ পাঠালাম
-শুভরাত্রি।
সাথে সাথে রিপ্লে এলো
-কে বলছেন?
ভণিতা না করে অামার সরাসরি জবাব
-অামি অঙ্কুরের ভাই।
ওপাশ হতে রিপ্লে এলো
-এতো তাড়াতাড়ি রাত্রটাকে বিদায় দিয়ে দিচ্ছ?
-আড্ডা দেয়ার মতো তো মানুষ নেই।
-আমাকে মানুষ মনে হয়,না?
-হা হা হা…. আমি তা বলিনি। বলেছি যে মনের মানুষের কথা। তার সাথে থাকার আনন্দটাই বিশাল।
-আচ্ছা, দূরত্বটাতে আপনি থেকে তুমিতে নিয়ে আসা যায় না? অামাকে বন্ধুর মতো মনে করতে পারো।
-সময় তো লাগবেই। তবু চেষ্টা করি। কি করছেন এখন… মানে কি করছো এখন?
-চাদর মুড়ি দিয়ে জোছনা দেখছি। মখমলের মতো মোলায়েম কুয়াশার চাদর ভেদ করে আসছে হালকা জোছনা। ভয়ংকর রকম সুন্দর।
আমি লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে তার সাথে চ্যাট করছি। মনে হচ্ছে, দুজনে একসাথে একটা চাদর ভাগ করে তার কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ তার কথা শোনছি। হঠাৎ করে তার সাথে আর কথা বলতে পারলাম না। কারন ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ঘন্টার কাঁটা চারটে তে আছে। চুপচাপ শুয়ে পড়লাম।
*
ভোর হল। ভোর ত নয়, যেন তারই অপেক্ষায় কাটিয়ে দেয়া কিছু মুর্হুর্তের ইতিকথা। রাত্রে তাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্নটা এরকম

“একটা ফুলের বাগান। দুজন দাড়িয়ে আছি বাগানের মধ্য। একজন অপরকে অপলক দৃষ্টিতে দেখছি। আমাদের ঘিরে অনেক প্রজাপতি উড়ছে। হালকা ঝিরিঝিরি বাতাসে তার কিছু চুল দোলে উঠলো । সে আমার গালে হাত রাখছে….”
স্বপ্নটা ভেঙে গেলো। মনে মনে ভাবলাম “আর একটুক্ষন বেশি সময় স্বপ্নটা দেখলে কি এমন ক্ষতি হতো?”
রেডি হয়ে অঙ্কুরকে নিয়ে স্কুলে গেলাম। তাকে ক্লাসে দিয়ে চলে আসতে যাবো, এমন সময় পিছন থেকে ডাক এলো,
-প্রদীপ।
ঘুরে দেখি হাসান স্যার। বললাম,
-জ্বী। ভালো আছেন?
-হা। ব্যাস্ত কি বেশী?
-না না। ফ্রি আছি।
-তাহলে চলো। সমনে থেকে হেঁটে আসি।
-চলেন। মানে…..
হাসান স্যার শব্দ করে হেসে উঠলেন।

৫.
বিশাল স্কুল ক্যাম্পাসের এক কোনায় একটা আম গাছ। তার নিচে একটা বেঞ্চ। বসে আছি দুজনে।
একটু কাছাকাছি।
হাত ছুঁই ছুঁই করছে।
মাঝে মাঝে তার হাতের সাথে আমার হাতটা একটু লেগে যাচ্ছে। অল্প একটু স্পর্শেই আমার শরীর শিহরিত হচ্ছে। তার একটু স্পর্শে আমার যে কতটুকু ভালো লেগেছে, তা সে নিজেও জানে না।
-প্রদীপ, মন কি খারাপ?
-না না।
-আচ্ছা তুমি কোন কোন ফুলের গাছ লাগিয়েছো?
-গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, দোলনচাঁপা, কাঁঠালচাঁপা আর….
-আর?
-আর একটা সিক্রেট। তবে আপনাকে বলা যেতে পারে।
-আবার দূরত্বটাকে বাড়িয়ে দিলে…।
-সরি, তুমি। আর আরেকটা হল টিউলিপ।
-কি? টিউলিপ? কি বলো! যতদূর জানি, “টিউলিপ হলো শীতপ্রধান দেশের ফুল। নেদারল্যান্ড টিউলিপ চাষে বিখ্যাত। কিন্তু তুমি কি করলে করলে!
-আসলে’জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ এ পড়ুয়া এক বড় ভাই বাংলাদেশে নতুন এক জাত আবিষ্কার করেছে। প্রথম পর্যায়ে সীড কালচারে সফল হয়েছে। তারপর সে হাতে একটা প্রজেক্ট নেয়ায় আমাকে তার আবিষ্কারের সাফল্য,যাচাইয়ের সুযোগ দিয়েছে। আর আমিও পেলাম কিছুটা জমি জুড়ে টিউলিপ চাষের সুযোগ।
-তাহলে তো দেখতেই হয়।
-হ্যাঁ, অবশ্যই। কেন নয়। তবে বসন্তের প্রথমদিকে যাবেন। সেসময় টিউলিপ ফোটে।
সে আমার দিকে তাকালো। তার তাকানোতে আমার ভিতরটা যেন পুড়ে গেলো। আবার সে দিল তার ভুবনভূলানো হাসি।
হ্যাঁ, মনে মনে বলতে দ্বিধা নেই। আমি আবার নতুন করে তার প্রেমে পড়লাম।

৬.
দিন কাটছে। সেই সাথে শীতের রাতগুলো জানান দিচ্ছে একাকী মানুষের একাকীত্ব। আমি কোলবালিশ আকড়ে ধরে মাঝে মাঝে মুখ ডুবিয়ে দেই। ভাবি, স্যারের বুকে মুখ লুকাচ্ছি। আর স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরে তার উষ্ণতা আমায় বিলিয়ে দিচ্ছে অকাতরে। আমি বিড়ালের মতো গুঁটি মেরে স্যারের একবুক লোমের মাঝে মাদকতাপূর্ণ সেই “পুরুষ পুরুষ” ঘ্রানের উৎস খোঁজছি। কিন্তু হঠাৎ করে সব মিলিয়ে যায়। ভাবি, “ইস… এগুলো,যদি কল্পনা না হতো”।
স্যারের প্রতি আমার ভালোলাগাটা দিন কি দিন বেড়ে যাচ্ছে। থামার কোন নামগন্ধও নেই। প্রায়শই আমরা দুজন বিকেলে বের হই। পার্কে হাটাহাটি করি। বেঞ্চে দুজন পাশাপাশি বসে হাতের আলতো স্পর্শ চোখ মুদে উপভোগ করি। কখনো বা অবচেতন ভঙ্গিতে তার হাতটা একটু ছুঁয়ে দেই।
কিন্তু এভাবে আর কতদিন! এবার হাপিয়ে উঠেছি। মাথার ভেতর সুমতি চিন্তারা বলছেঃ

-যাকে ভালোবাসিসস, তাকে মনের মথাটা বলে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।

কিন্তু সেসময় কুমতি চিন্তা বলে উঠেঃ
-সাবধান বলবি না! সে যদি সমপ্রেমী না হয়!

সুমতিঃ তাতে কি! এভাবে কষ্ট পুষে রাখার থেকে বলে দেয়া ভালো!

কুমতিঃ একদম না। এসবের কোন মূল্য নেই।

সুমতিঃ ভালোবাসা কখনো মূল্যহীন হয় না।

কুমতিঃ সমাজ নিগৃহীত এইসব সস্তা আবেগের জায়গা কোথায়!

মাথায় সুমতি ও কুমতি চিন্তারা এখন চুলোচুলি করছে যুক্তিকে অস্ত্র বানিয়ে। শেষ পর্যন্ত সুমতির জয় হলো। আমি তাকে বলে দেবো আমার ভালোলাগার কথা।
শীত প্রায় শেষ। পরশু থেকে বসন্ত। বসন্তের ১ তারিখে তাকে আমাদেরর বাসায় নিমন্ত্রন জানালাম। দু তিনটা দিন কাটলো আমার অস্থিরভাবে।

৭.
আজ বসন্তের এক তারিখ।
ঘুম থেকে উঠলাম। জানালা দিয়ে টিউলিপের বাগানটার দিকে তাকালাম। আমার চোখ বিষ্ফোরিত। লাল ও হলুদ রঙের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে যেন মাটিতে। চোখ সরানো যাচ্ছে না। ভয়াবহ রকমের সুন্দর। কলিং বেলে চাপ পড়লো। অবাক ই হলাম।এতো সকালে সে এসে পড়বে! কি বলে! আমি তাড়াতাড়ি কাপড় চেঞ্জ করে দিলাম দৌড়। হাসিমুখে দরজা খুলে থ বনে গেলাম।
এ কে!
কাকে দেখছি!
আমার চোখে জল চলে এলো। আনন্দে! বাবা…. বলে দৌড়ে এসে বাবার কোলে ঝাঁপ দিলাম। বাবা এসেছে। আমাদের একবারও জানায় নি পর্যন্ত। প্রাপ্তির সসুখে চোখে আনন্দের জল। উছ্বাস ও আবেগমিশ্রিত কন্ঠে বললাম
-কোথায় ছিলে বাবা এতোদিন! ৩ বছরে একটা মেইলও পাঠাও নি! এটা পর্যন্ত জানি না যে বেঁচে আছো কি না!
-সে অনেক কথা রে। ঝামেলা ছিল বলে যোগাযোগ করতে পারি নি। জলপথে পালিয়ে এসেছি খুব কষ্ট করে। মিথ্যা মামলায় ফাসানো হয়েছিলো আমায়। আর তারপরই আমি পলাতক।
আমাদের কথাবার্তা শোনে মা বেরিয়ে এলো। এসেই একটা বড়সড় ধাক্কা খেলো। তাড়াতাড়ি ঘোমটা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বাবাকে প্রণাম করলো। আমি সেখান থেকে চলে এলাম। এখন তাদের কিছুটা সময় দরকার। আমার মনে হতে লাগলো.., “আমি মনে হয় প্রাপ্তির শেষ সীমায় আছি।”
নাস্তা ও স্নান সেরে নীল পাঞ্জাবি ও সাদা প্যান্ট পড়লাম। আয়নার সামনে দাড়িয়ে একটা হাসি দিলাম। না আমার হাসিটা খারাপ না। সুন্দর না হোক! নির্মল। প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে ভাসছি তবু যেন মনটা উচাটন উচাটন করছে। বাবা আসার আনন্দে ছটফটানি কিছুটা কমেছে। চিন্তা করছি, “আজকে বাবা এসেছে। তাকে কি আসতে বারণ করে দিব? “
না থাক, সে তো নিমন্ত্রিত অতিথি। তাকে খবরটা শেষে দিলেই হবে।
তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।সময়টা গড়িয়ে যাচ্ছে। বাতাসে ভেসে আসছে ফুলের সুঘ্রান। সে এখনো আসছে না। সে কি আসবে না? আ মার বুকটা কেন যেন অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলো….

৮.
আমার সমস্ত দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে সে আসলো। সাদা শার্টে তাকে অনিন্দ্যসুন্দর লাগছিলো। আবার দেখলাম, ‘তার সাদা দাঁতের ভোবভূলানো হাসি’। কলিজাটা মোচড়ে উঠলো ভীষনভাবে। তার কাছাকাছি এসে কান কানে বললামঃ
-তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। চোখ বন্ধ কর।
তার কানে আমার ঠোঁটটা অল্প একটু স্পর্শ করেছিলো। তার শরীরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো।
তার হাতটা আলতো করে ধরলাম। শরীরটা ঝিমঝিম করছে। তাকে নিয়ে হাটছি বাগান ধরে। অবশেষে আসলো কাঙ্খিত টিউলিপ ফুলের বাগানটা। বাগানে অজস্র ফুল ফোটেছে। তাকে বললামঃ
-চোখ খোল।
চোখ খুলে সে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলো। চারদিকে যেন হলুদ ও লাল রঙের আগুন ধরে গেছে। বাসন্তী বাতাসে টিউলিপের বাগানে একটা ঢেউ খেয়ে গেলো। দৃশ্যটা অসহ্য রকমের সুন্দর। সে বিরবির করে বলছে
-আমি কি বেহেশতে আছি!!
-না এই দুনিয়াতেই আছো।
তার হাত ধরে উঁচু একটা জায়গায় বসলাম। আমি বললামঃ
-আমার জন্য না একটা সারপ্রাইজ আছে! তুমি দিবে বলেছিলে!
-ও হ্যাঁ, এই নাও।
হাত পেতে একটা কার্ড নিলাম। বিয়ের নিমন্ত্রন পত্র। তার দিকে তাকালাম। সে লাজুক মুখে হাসছে। আমার মনটা কেমন যেন করে উঠলো। একটা কষ্ট যেন আমার হৃদয়ে জেঁকে বসেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গলার কাছে আবেগগুলো দলাপাকিয়ে গেছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি উঠে দাড়ালাম চোখের পানি আড়াল করার জন্য। টপাটপ গাল বেয়ে পড়ছে চোখের পানি। তাকে ভাঙা গলায় বললামঃ
-তুমি ৫ মিনিট বসো, আমি এক্ষুনি ঘর থেকে আসছি। চোখটা মুছে বুক চিড়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়া কষ্টগুলোকে সামাল দিচ্ছি। পিছন থেকে হাসান বললোঃ
-প্লীজ একটু ইনভাইটেশন কার্ডটা খুলে দেখো।
কথাটা যেন শোনেও শুনলাম না। তবুও তার সঙ্গীনির নামটা দেখার সাহস করলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে ইনভাইটেশন কার্ডটা খুললাম। সেখানে লাল কালি দিয়ে লিখাঃ

…………. “I LOVE YOU”………….

নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। দৌড় দিয়ে হাসানকে জড়িয়ে ধরলাম। তার বিশাল বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। সে আমাকে শক্ত করে তার বুকে জড়িয়ে ধরে বলছেঃ
-পাগল.., কাঁদছো কেন! আমি তো আছি।
কিন্তু এখন কাঁদতেও ভালো লাগছে। বুক থেকে সমস্ত কষ্ট ধুয়ে মুছে চলে যাচ্ছে। কোকিল ডাকা বসন্তে তার বুকে মাথা রেখে তাকে জ়ড়িয়ে ধরে রাখলাম
অ-নে-ক-ক্ষ-ন।
দুজনে বসে রইলাম টিউলিপ ফুলের বাগানে। ঝলমলে হাসিখুশি সূর্যের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। বসন্ত বাতাসে ভেসে আসছে ফুলের ঘ্রান ও কোকিলের ডাক। তার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো তার জন্য একটা ফুলের তোড়া বানিয়েছিলাম। টিউলিপ ও বাসন্তীরঙা গোলাপ দিয়ে।তোড়াটা পাশে ছিল। তাকে দিলাম। সে বললোঃ
-ফুল দিলে তো কিছু বলতে হয়। বলবে না?
আমি একটা সুখশ্বাস ফেলে তাকে বললামঃ

“বসন্তে ফুটিলো ফুল, ভরিলো বাগান
আমি যারে ভালোবাসি তারে করি দান।”

************(সমাপ্ত)*******************

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.