একটি পুতুলের অসমাপ্ত উপখ্যান

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
অনেকদিন বাক্সবন্দী ছিলাম। কোন এক চিলেকোঠার এককোনে পড়ে ছিলাম অযত্নে। বাক্সটা হঠাৎ করে নড়তে শুরু করলো। একসময় নাড়াচাড়া বন্ধ হলো। বাক্সের ডালা খুলতে লাগলো। ভেতর থেকে চোখ পড়লো মালিকের মুখের দিকে। অামাকে পরিষ্কার করলো খুব সুন্দরভাবে। আজকে বসন্তের ৩০ তারিখ। কাল পহেলা বৈশাখ। গ্রামের হাটে বৈশাখী মেলা হবে। সকল বাঙালী মেতে উঠবে প্রানের উল্লাসে। রাস্তায় রাস্তায় ফুটে উঠবে অালপনা ও বসবে পান্থা ইলিশের মচ্ছব। অামাকেও কালকে মঞ্চে নিবে। অনেকদিন পর অাবারো সরব হবো। সেই পুরনো নাটক, পুরনো গান….অাহ কি অনুভূতি। একসময় অামি কত জনপ্রিয় ছিলাম। মঞ্চে নামলে সবাই কত হাততালি দিতো। এখন অার সেদিন নেই। টিভি, ডিস সবকিছু কেড়ে নিয়েছে প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতি। কেউ অার পুতুলনাচ দেখেনা। হা, অামি পুতুলনাচের একটি কাঠের পুতুল। নিষ্প্রান এক কাঠের পুতুল……

২.
-তাপস, এই তাপস কোথায় তুমি…?
-তুমি এখানে আমি সেখানে সে কি জানোনা…..
মুচকি হেসে বললো
-প্লীজ, অন্তত ফাজলামি বন্ধ করো অার তাড়াতাড়ি রেডি হও।
-অামি অলওয়েজ রেডি বেইবি।
-তাহলে ব্যাগ টা নিয়ে বের হও।
-না
-না মানে….?
-অাগে গালে একটা গিফট দেও।
মুচকি হেসে রন তাপসের গালে একটা থাপ্পড় দিলো। তাপসের মুখটা দেখার মতো হয়েছে। বাংলার পাঁচ বা সাত কিছু একটার মতো দেখাচ্ছে। এমন অবস্থা দেখে হাসির বেগ চাপাতে পারলো না রন। হেসে তাপসের গালে এঁকে দিলো ঠোঁটের চিহ্ন…

তাপসের মুখ ১০০ টাকার এনার্জি বাল্বের মতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নামলো দুজনে…..
তাপস ও রন একই ভার্সিটির স্টুডেন্ট। তারা অাগে জানতো না যে তারা একই ভার্সিটিতে পড়ে। ফেসবুকে পরে যোগাযোগ হয়েছে তাদের। তারপর থেকে ভালোলাগা… পথচলা…
এবার পহেলা বৈশাখ রনের বাড়িতে কাটাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল তাপস। তাই কাছের মানুষের নাড়ীর টানের ঠিকানার নীড়ে চললো। কেটে যাচ্ছে বসন্তের শেষপ্রহর……

৩.
অাইলো অাইলো অাইলোরে
রঙগে ভরা বৈশাখ অামার অাইলোরে….
এমন শব্দে হঠাৎ সচকিত হলো রন।অাস্তে অাস্তে মনে পড়লো সব। সে তার বাড়িতে আছে। কাল অনেক রাত্রে পৌঁছেছে দুজনেই। খেয়েদেয়ে শুতে গেলো । তারপর শুরু হলো তাপসের জ্বালাতন। সময়ে অসময়ে সেই বিরক্ত করে। তারপর অার কি রাত্রে অাবার পরিষ্কার হলো তার জন্য। ব্যাটা এখন বুক চেতিয়ে ঘুমোচ্ছে।অবচেতন মনেই বুকের লোমগুলোর উপর অাঙুল বুলিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো। তখনো শেষ হয়নি পাশের বাড়ির বাচ্চাদের বেসুরো চিৎকার। তাদের কন্ঠে এমন অাকুতি যে বৈশাখ না থাকলেও আজই এসে পড়তো বৈশাখ। সত্যিই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে শৈশবে। সেই বাধাহীন জীবন, শুক্রবার, মামার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া…….

স্নান সেরে রুমে ঢুকতেই দেখে মহারাজের ঘুম ভেঙেছে। দাঁত বের করে বললো
-কেমন হলো ঘুম…?
-ঘুমোতে অার দিলে কই….. যাও স্নান সেরে এসো।
স্নান সেরে পান্তা ইলিশ খেয়ে দুজনেই বেরুল গ্রামের মেলায়। দূর থেকে যে কেউ দেখে বলবে
লাল পাঞ্জাবী পড়া দুজন সুখী চেহারার দেবদূত রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে।
ঘুরতে ঘুরতে একটা জায়গায় চোখ অাটকে গেলো দুজনেরই। ছোট্ট একটা মঞ্চ। পুতুলনাচের মঞ্চ। দুজনেই দাড়িয়ে আছে একরাশ আগ্রহ নিয়ে……

৪.
অামি শুধুই একটা কাঠের পুতুল, এমন মনে করে সবাই। কিন্তু অামারো অাছে হাসি, কান্না, অভিমান….। আমার খুব ভালো লাগতো… যখন অামার মালিক অামাকে হাতে নিয়ে কথা বলতো। কত কথা হতো অামাদের। লোকটা কত দুখী। অাচ্ছা পৃথিবীর সব মানুষগুলোর কি অনেক দুঃখ থাকে….? মালিক অামার সাথে কথা বলতো দেখে মানুষ হাসাহাসি করতো। পাগল বলতো।এখন অার কথা বলে না। হয়তো চায় না, কেউ তাকে পাগল বলুক, অামিও চাই না। কারন অামি অামার মালিক কে ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি…. যে ভালোবাসায় কোন পুঁতিগন্ধ নেই, পবিত্র এক মোহহীন, কামহীন ভালোবাসা….।

পায়ের শব্দ শোনে চিন্তা থেকে বাহির হলাম। মালিক অাসছে নিশ্চই। অাবারো হয়তো বা সেই পুরনো গানে সরব হব এক নতুন অামি। কিন্তু মানুষ কি এ নাচ দেখবে….?
যদিও অনেক বয়স হয়েছে, তবুও প্রানের তারুন্যে ভুলব অামি সবকিছু। মালিক এলো। অামাকে হাতে নিয়ে বলছে
-তুই অামাকে একদিন অনেক উপরে তুলেছিলি। অনেকদিন পর অাবার তোকে নিয়ে খেলা দেখাবো।
-মালিক অামি তো অাপনারই জন্য।
কিন্তু মালিক অামার কথা শোনে নি। কখনো শোনও না।

অামাকে নিয়ে এলো পুতুলনাচের মঞ্চে। কিন্তু একি! মালিকের হাত কাঁপছে কেন…। আমার হাতের সুতোয় টান দিয়েছে…. সাথে সাথে পায়ের সুতোয় টান লেগেছে। ঝামেলা লেগে গেছে সুতোয়! তাড়াতাড়ি উপরে টান দিতেই কোনার এক কাঠে অামার দেহটা ধাক্কা খেলো মারাত্বকভাবে। আমার একটা হাত ভেঙে গেলো…..। মালিক দিশেহারা, দর্শকরা হতভম্ব, আমি বরাবরের মতোই বাকরুদ্ধ। একটা ঘুনপোকা আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছিলো…. কষ্ট হতো কিন্তু বলতে পারতাম না। তার ফলে সারাটা দেহ নষ্ট হয়ে গেছে। দর্শকরা কেউ কেউ বিদ্রুপ করছে। আস্তে আস্তে সবাই চলে গেলো। শূন্য হয়ে গেলো পুতুলনাচের মঞ্চ। মালিকের চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল বের হলো। ব্যাথাতুর কন্ঠে বললো
-তুই অাজকে আমায় ডুবালি…..

৫.
আমি মেলার বাইরে ময়লার স্তুপে পড়ে আছি।কত চিৎকার করলাম, কত অার্তনাদ করলাম…. কিন্তু মালিক অামার কথা শোনে নি। আমার কাজ শেষ হয়ে গেছে। আর তাই সে অামাকে ফেলে দিয়েছে। আমাকে তার কাছে রেখে দিতে পারতো… কিন্তু দেয়নি। মানুষগগুলো এমন ই হয়।

হাটতে হাটতে দুটো ছেলে অামার দিকে অাসলো।একজন বলল
-তাপস, একে রেখে দেই?
-পাগল না কি! ভাঙা পুতুল রাখতে যাবে… নতু্ন একটা কিনে দেব। এসো ত…..
চলে গেলো তারা। আমাকে রেখেই বা কি করবে। একটা ভাঙা পুতুল আমি….
দূর থেকে ভেসে আসছে গান

-“বৎসরের আবর্জনা
দূর হয়ে যাক যাক যাক……
এসো এসো
এসো হে বৈশাখ……”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.