একটি বসন্তের খোঁজে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
অসহায় লাগছে খুব। জানি না কোথায় যাবো। হাটতে হাটতে এসে পড়লাম রেলস্টেশনে। দেখি যে একটা ট্রেন দাড়িয়ে অাছে। কোন একটা কামারার দিকে পা বাড়িয়ে দিলাম। উঠে দেখি বেশ কিছু লোক বিক্ষিপ্তভাবে বসে অাছে প্রায়শূণ্য সে কামারায়। জানালার ধারে বসে পড়লাম, অার সাথে সাথেই ট্রেন সবাইকে বিদায়ধ্বনি জানিয়ে ছুটতে শুরু করলো। শূণ্য পকেট ও বুকভরা নীরব অার্তচিৎকার পুঁজি করে রওনা দিলাম। জানালার কাছে মাঘের গুমোট বাতাস ভাঙে। মনে পরছে সে মুহুর্তটা…….

“তার দিকে তাকিয়ে অাছি, সে নিশ্চুপ। কাছে এগিয়ে গেলাম। তাও সে কিছু বলে না। অাস্তে করে উরুতে হাত দিলাম, সে তখনো চুপ। অামার হাত ঘুরে তার পশ্চাতে চলে যায় তখনি সে বলে
-তুমি না অামার সাথে কথা বলবে না?
-অামি কই কথা বললাম!
-এইমাত্র!
সে এ কথা বলে হেসে দিলো।

জীম। অামার চাচাতো ভাই। কখন থেকে যে তার সাথে অামার এ সম্পর্ক তা মনে করতে পারি না। শুধু একটা বিশেষ দিনের কথা মনে পরে। সে ছুটিতে অামি চাচার বাসায় গিয়েছিলাম। রাত্রে থাকার ব্যবস্থা হলো তার ঘরে। শুয়ে উসখুশ করছি, কেন যেন তন্দ্রাদেবী অামার প্রতি অপ্রসন্ন। হঠাৎ সে অামাকে জড়িয়ে ধরলো। তার ছোঁয়া তে মন বড়ো অবাধ্য হয়ে গেলো। সমসত্বার ছকে বাঁধা পরা সে অাকাঙ্খার রূপ নিলো প্রবলভাবে। এক অভিশপ্ত অসুখ অামায় চরম সুখ দিলো। রাতটি ছিলো অামার জীবনের স্মরনীয় রাতের মধ্য একটি রাত।
তারপর থেকে তার সাথে অামি শুধু যৌনতার বৃত্তে বন্দী।
যেমন অাজ! অামাদের বাসায় সে বেড়াতে এসেছে, অার অামি দিন-রাতের পরোয়া না করে শুরু করলাম। উন্মত্বতা, মদিরতা, পূর্বরাগ ও শৃঙ্গারে অামার কামারাও তখন যৌননেশায় বুদ। অঘোষিতভাবে হঠাৎ করে খুলে গেলো দরজা। অামরা তখন উলঙ্গ! দেখি যে অামার ধর্মপ্রাণ বাবা দাড়িয়ে অাছে! অামি কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। বাবা অামায় যা না তা বললো। পুরো ঘটনা শোনে মা নিশ্চুপ! শুধু অাঁচল মুখে দিয়ে মায়ের চোখে বেদনা ঝরে। শাপশাপান্ত করতে করতে বাবা বলে

-তুই অামার ছেলে না, বেড়িয়ে যা বাড়ি থেকে, তোকে অামি ত্যাজ্যপুত্র করলাম।
অামি বেদনামাখা চাহনি নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়েছিলাম। বাবার চোখে জল জমেছে। কখনো অার মুখোমুখি দাড়াতে পারবো না। এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়লাম। কেউ অামায় পেছন থেকে ডাক দেয় নি, এমনকি মা ও না..!

২.
বাস্তবে ফিরে এলাম। টিটি ট্রেনের টিকেট চেক করছে। অামার কাছে এসে বললো
-ভাই টিকেট দেখি!
অামি তার দিকে জলভেজা অসহায়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। সে অার কিছু বলে নি। নাম না জানা একটা স্টেশনে নেমে পড়লাম। অাদিগন্ত বিস্তীর্ণ ধুলো উড়া মাঠে ছেয়ে অাছে চারদিক। তারপর শুরু হলো হাটা। সে গ্রামীন জনপদে হাটতে হাটতে কেটে গেলো দুটো দিন। অামি তখন ভয়াবহরকম ক্ষুধার্ত, পরিশ্রান্ত ও মর্মযাতনায় পীড়িত। জীবনের যতসব অবসাদ যেন জেঁকে ধরেছে। হঠাৎ করেই যেন বিশাল খালি মাঠের পরে জেগে উঠে এক ইমারত। অনেকটা মাজারের মতোই। গলা সিরিশ কাগজের মতো খসখসে। পিপাসা নিবারণের জন্য অামি তখন সে পথের দিশারী। কাছে যেতেই দেখি মাজারের একপাশে একটা লোক গান গাইছে! অামি তার দিকে তাকিয়েছিলাম বেশ কিছুক্ষন। গান শেষ হতেই ক্ষীণ কন্ঠে বললাম

-এক গ্লাস পানি হবে?
লোকটা অামার দিকে তাকালো। অামার শ্রী-হীন মলিন মুখ যেন তার ভেতরে জাগিয়ে তুললো গ্রগাঢ় স্নেহবোধ। সে পঁয়ত্রিশোর্ধ লোকটা তখন বললো
-দাড়াও বাবা , অানছি।
কিছুক্ষন পর হাতে একটা থাল ও একগ্লাস পানির দেখা মিললো। অামি তার হাত থেকে নিয়ে সেগুলো গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। খাওয়া শেষে তার দিকে কৃতজ্ঞতার চাহনি দিলাম। সে বললো
-বাসা কোথায় বাবা তোমার?
অামি তখন নির্বাক। তিনি অাবারো বললেন
-বাসা থেকে পালিয়ে এসেছো?
এবারও অামি চুপ। তিনি অার কিছু না বলে বললেন
-বসো, গান শোন, অার অাজকের রাতটা অামার কুটিরে কাটিয়ে যাও।
অামি পাশে বসে গান শোনতে লাগলাম। পাশেই কৃষ্ণচূড়া ফুলের গাছ। বসন্তের শেষ বিকেলের মৃদুমন্দ হাওয়ায় বাতাসে ভাসতে ভাসতে ঝরে কিছু কাৃষ্ণচূড়া। সোনালী নরম রোদ বসন্তের নীল বিকেলে হেসে উঠে। সে কন্ঠের অপূর্ব মায়াজালে চারদিক মোহাচ্ছন্ন। কি অপরূপ সূফীসংগীত। পরকালের কথা মনে করিয়ে দেয় গভীরভাবে। তন্ময় হয়ে শোনছি তার গান। কেটে যায় বসন্তবেলা…..

৩.
দিন গড়িয়ে রাত এলো। অামি তখন তার কক্ষে। বেশ গোছানো ছোট্ট একটা কক্ষ। খাওয়াদাওয়া সেরে তার বিছানায় ভাগ বসিয়েছি। সে অাবোলতাবোল অনেক কথা বলে যাচ্ছে। মানুষটা মোটামোটি নিঃসঙ্গ। তাই কারো সহচর্য পেয়ে মনের অব্যক্ত বেশ কথা গোছিয়ে পরিবেশন করছে অনর্গল। অামি ভাবছি পরিবার, ভবিষ্যত ও অনান্য কথা। হঠাৎ সে বললো
-তুমি কি অামার কথা শোনছো…?
অামি যেন ঘোর ভেঙে তার দিকে তাকালাম। কিছু বলছি না। কিছুক্ষন নীরব সময় পাড়ি দেবার পর হঠাৎ বলে উঠলাম
-অাপনি অামায় গান শেখাবেন?
উনি তরল কন্ঠে বললো
-শিখাবোনে। অামার সাথে থাকো, দেখো এ জীবন ভালো লাগে কি না।
অামি তখন তার দিকে তাকালাম। অাবছা অন্ধকারে চোখে পড়ছে একহারা দীর্ঘাঙ্গী লোকটার মায়াময় অবয়ব। কেন যেন কাছে টানে খুব। সে লোমশ পুরুষ যেন নিখুত কামদেবের প্রতিচ্ছবি। জানালার ফাঁক গলে তখন বসন্তের লিলুয়া হাওয়া অাসন পেতে বসেছে। সে তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। অামি নির্ঘুম রাত পাড়ি দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি একগুচ্ছ চিন্তাভাবনা নিয়ে। হঠাৎ ঘুমের ঘোরে সে অামাকে জড়িয়ে ধরলো। তার জড়িয়ে ধরাতে কেমন যেন নেশা কাজ করে। অামি অালতো করে তাকে জড়িয়ে ধরতেই সে অামাকে শক্ত করে তার বুকে জড়িয়ে নিলো। কোন কিছু বুঝে উঠার অাগেই সে অামার ঠোঁটে বসিয়েছে ঠোঁট। অামি বিষ্ময়ে হতভম্ব। অাস্তে অাস্তে দেহ নরম হতে শুরু করলো। তার মাঝে হারিয়ে ফেলছি নিজেকে। সে বসন্তরাতে অামি ভুলে গেলাম অামার অতীত, দুর্দশা ও জীবনের নাটিকার প্রথম অঙ্ক।অামিও তখন সমানভাবে সাড়া দিয়ে যাচ্ছি। দুটো দেহ মিশে যাচ্ছে, চলছি গভীরে… অারো গভীরে।
যখন জ্ঞান ফিরলো তখন অামার চোখে ভাঙে ঘুম। তার বুকের উপর মাথা রাখা, গুঁটিশুঁটি হয়ে শোয়া।

অাবার ঘুমোলাম। যখন ঘুম ভাঙে তখন দেখি সে পাশে নেই। অনেকদিন পর এতটা সকালে উঠলাম। কেন যেন অনুতপ্তবোধ হচ্ছে প্রবল। চিন্তা করছি চলে যাবো। চুপিচুপি রুম থেকে বেরুতেই তার চোখে পড়লাম। চমকে উঠলাম। সে বলে
-চলে যাচ্ছো?
-অামার অাসলে নিজের কাছে খারাপ লাগছে।
-কালকের ঘটনার জন্য?
অামি চুপ ছিলাম। সে সেই নীরবতার সূত্র ধরে বললো
-এটাই হবার ছিলো। মন খারাপ করো না।
-এটা হবার ছিলো মানে?
-সব কথা অামি অাজকে বলবো না। একদিন জেনে যাবে!
অামি অাসলে কিছু ধরতে পারছিলাম না। কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। কি একটা অদৃশ্য টান অামি অনুভব করছি, কয়েকটা ঘন্টা থাকার সুবাদে। অামি বাক্যবিনিময় না করে স্নান সেরে ঘরে অাসতে দেখি নাস্তা তৈরী। অামি নাস্তা সেরে তার একটা সাদা পাঞ্জাবী পড়ে নিলাম। সে অামার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে বললো
-তোমায় খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।
অামি তার কথাটা এড়িয়ে গিয়ে বললাম
-চলুন।
তার পিছন পিছন চলতে লাগলাম। সে মাজারের কিছুটা দূরে একটা শান বাঁধানো নির্জন পুকুরপাড়ে থামলো। ঘাটে বসে বললো
-এখানে কেউ অাসে না। এ মাজারের গায়েনরা শুধু এখানে চর্চা করে গান।
পুকুরটা ভালো করে দেখলাম। চারদিকে কৃষ্ণচূড়া গাছে ছেয়ে অাছে। গাছে গাছে লাল রঙের অাগুন। বাতাসে ভাসে বনফুলের তীব্র সুঘ্রাণ। উদাসী দুপুরের উদাসীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে অাকাশের গুঁড়ো গুঁড়ো নীল। সে তখন গান ধরলো। চারদিকে অপরূপ নৈঃশব্দ।

সুরের মুর্ছনায় নিমগ্ন পৃথিবী। অামি তন্ময় হয়ে শোনছি গান। অামার গলাও খারাপ ছিলো না। তার দেয়া শিক্ষায় অামি এগিয়ে চলছি। সুরের স্নিগ্ধ মোহে অামি ভুলে গেলাম অামার অতীত, অামার পড়াশোনা, বাসা থেকে বিচ্ছেদ। নিজেকে ভাসিয়ে দিলাম অজানার ঠিকানায়।
কেটে যায় বসন্ত। রয়ে যায় সুরের মায়া।

৪.
অামি তখন তার কাছ থেকে শিক্ষা নিচ্ছি পুরোদমে। মাজারে তার সাথে সাথে এখন অামিও গান গাই। সুরে বন্দনা করি উপরওয়ালার। অার তার সাথে অামার সম্পর্ক?
মোটামোটি জটিল। মাঝে মাঝে অামরা বন্ধু, কখনোবা অামরা গুরু শিষ্য, অাবার প্রতিটা রাত্রে অামরা দেহপ্রেমে মজি। পাপবোধ বিদীর্ণ হতে কতবার তার বুকে মাথা রেখে বলি, এ ত পাপ! সে তখন কিছু বলে না। যেন এ প্রশ্নের উত্তর সে জানে, কিন্তু দিবে কোন এক বসন্তবেলায়। এভাবে বহুমাত্রিক চারিত্রিক ছাঁচে অামরা চলছি।

মাঝে মাঝে বাবা মায়ের কথা খুব মনে হয়। তখন কাঁদি, কিন্তু তারা কখনো অামার খবর নেয় নি। হয়তোবা অামার কোন অস্তিত্ব নেই তাদের জীবনে। এভাবে কেটে গেলো জীবন থেকে ১০ টি বছর।

প্রৌড়ের দ্বারে পৌছিয়েছে সে। অামি এখন প্রতিদিন মাজারে বসে গান গাই। সুরে ইশ্বরসাধনা করি। তিনি কখনো টুকটাক ভুল ধরিয়ে দেন। এমনি একদিন সকালে গাচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে চোখ পড়তে দেখি মা দাড়িয়ে অাছে! চোখ কচলে দেখলাম, না কল্পনা নয়। মা অামার দিকে এসে হাত ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মা কেঁদে কেঁদে বলছে
-তোকে কত খুঁজেছি, তুই একদম লাপাত্তা। কত জায়গায় খোঁজ নিয়েছি, কোথাও নেই। অামাদের কথা কি তোর মনে পরে না?
ভেজা চোখ ও জড়ানো কন্ঠ চিড়ে বেরুলো
-মা, অামি যে তোমাদের সন্তান নই! অামি ত্যাজ্যপুত্র!
-মন ভাঙার জন্য একটা কথাই যথেষ্ঠ। কিন্তু মনের টান যে হাজারো কথায় ও কাটে না রে বাবা। তোর বাবা অাজও তোর অপেক্ষায় অাছে রে। বুড়ো মানুষটা তোর দিকে পথ চেয়ে থাকে, ভাবে তুই হয়তো সেদিনেই ফিরে অাসবি। তুই যেরকম ই হোস না কেন, অামাদের তো ছেলে। ছিলি তো অনেকদিন বাইরে। এবার চলে অায় ঘরে…।

বড় একটা শ্বাস নিয়ে স্বার্থপরের মতো বললাম
-না মা। তা হয় না। অামি যাবো না, অামি এখানে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি। অার জোড় করো না কখনো, যদি জোড় করো তবে অারো দূরে চলে যাবো; মনে রেখো মা, তোমার ছেলে ভালো অাছে। অার অামি যাবো না, বাবার যদি দেখতে ইচ্ছে হয়, তাহলে যেন চলে অাসে। অার ঘনঘন এসো না মা। কারন তাতে মায়ায় জড়িয়ে যাবো, এখানে এ গান ও সবকিছু নিয়ে ভালো অাছি।
মা অার কিছু বলে নি। কিছুক্ষন থেকে চলে গেলো। অামি সেদিন সে পুকুরে বসে রইলাম অ-নে-ক-ক্ষ-ণ।

৫.
সে ঘটনার পর কেটে গেলো অারো কয়েকটি বছর। তবু কোন এক সঙ্গম পরবর্তী নিবিড় রাতে জীবনের কথা মনে পরে। পুরনো বন্ধুবান্ধব, সেই চেনা জায়গা, স্কুলঘর, কলেজ এসব বড্ডো স্মৃতিকাতর করে দেয়। এমনি এক রাত্রে হঠাৎ সে বলে
-অাজকে তোমাকে অনেককিছু বলার অাছে।
কেন যেন অাজকে তার মনটা অনেক বিষন্ন। যেন অতল শূণ্যের মাঝে লীন হচ্ছে। অামি কন্ঠ স্বাভাবিক করে বললাম
-কি বলবে?
-জানতে চাইতে না, কি একটা কথা তোমার কাছ থেকে এতদিন লুকিয়েছিলাম। অাজ বলবো তা।
অামি পুরো সচকিত হয়ে গেছি! সে বললো
-চলো অামার সাথে!
অামি তার পেছন পেছন চলতে লাগলাম। অাকাশ জুড়ে নক্ষত্রের মেলা। হাজারো নক্ষত্র অনুভব করায় অাকাশের বিশালতার অস্তিত্ব। পুকুরের পাশে বিশাল কাঁটাঝোপ। সে জঙ্গলের বুকে হেটে চলছি। অনেকক্ষন হাটার পর একটা ফাঁকামতো জায়গা দেখলাম। একটা কবরস্থান! অবাক হলাম, এতদিন এখানে ছিলাম, কিন্তু এর সম্পর্কে জানিও না। তিনি সে কবরস্থানের সামনে দাড়িয়ে বলতে লাগলো
-এখানে এগারোটা কবর অাছে। ইনারা সব এ মাজারের গায়েন। অনেককাল অাগে, এ মাজারের পীর, প্রথম গায়েনকে সমকামরত অবস্থায় দেখে ফেলে, তারপর তিনি তাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হন, কিন্তু সে তার কাছে প্রাণভিক্ষা চায়। অনেক অাকুতির পর পীরসাহেবের মন নরম হয়।তখন পীরসাহেব বলেন, “তোকে মাফ করে দিয়েছি, তবে শোনে রাখ তোর মতো অারো ১২ জন এ চক্রে বন্দী হবে, তোরা থাকবি গুনাগার। পৃথিবীতে থাকাকালীন তোরা পরিবার হারাবি। এ মাজারের গায়েনরূপে তোদের জায়গা হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ কষ্ট “নিঃসঙ্গতায়” কাটাতে হবে তোদের জীবনের বড়ো একটা সময়। কবর হবে সবার এক জায়গায়। অাখিরাতে তোদের জন্য কি অাছে জানা নেই। অার কাল রাত্রে অামার গুরু অামার স্বপ্নে এসে বলেছে, অাজকে তোকে সব বলতে!
এই বলে সে বড়ো শ্বাস নিলো। অামি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম! এ কি রূপকথা! না কি অন্যকিছু। অামি ভাষাহীন। কোন কথা মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। অজানা ইতিহাসের সাথে গেঁথে অাছি অামি। কবরের ১০ জন যেন সে ঘটনার সাক্ষী। চুপচাপ চলে এলাম সেখান থেকে। তার মানে অামি বারো নাম্বার! রাতটা কেটে গেলো বিনিদ্র।
ভোরের দিকে তাকে ডাক দিলাম। দেখি সে নিথর। কোন সাড়াশব্দ নাই। সে চলে গেছেন ইহলোক ছেড়ে।

৬.
তাকে কবরে নামিয়ে দিয়ে এলাম। সমস্ত কাজ সেরে ঘরে বসে রইলাম। কেমন যেন শীতল মৃত্যুনীরবতা। যে মানুষটা কালকেও ছিলো, অাজ সে অস্পর্শীয়। বুকের ভেতর গুমোট কষ্ট। গুমরে মরছি দিনরাত। তার কথা মনে করে দিন যায়, রাত যায়, একসময় কষ্ট কমে, বেদনা কমে, স্মৃতি ঝাপসা হয়….। ইদানীং একাকীত্ব জেঁকে ধরে, সহ্য করতে পারি না। মনে হয় অাত্মহত্যার পথ বেছে নেই। মাজারে ঘুরি, চুপচাপ কবরে বসে থাকি। টুকটাক সূফীসংগীতে বসি। অন্য জীবনের কথা মনে পরে, যে জীবন কেউ দেখে নি, তবু ভয় পায়। পরজীবন ও অনান্য বিষয়াবলীতে মগ্ন হই। অপেক্ষায় থাকি একটি বসন্তের। যেরকম বসন্তে অামি এসেছিলাম। কিন্তু বসন্তগুলো কেটে যায়, কেউ অাসে না। সেই তেরো সংখ্যার মানব বড়ো অধরা! অামি যেন বেঁচে থেকেও মরে গেছি। মাজারের হাজারো লোকের ভিড়ে অামি ভয়াবহ রকম নিঃসঙ্গ।

কেটে গেলো অাটটি বছর।
অামি তখন প্রৌঢ়ের কোঠায় পা বাড়িয়েছি। বয়স চল্লিশের উপর। দাড়িতে পাক ধরেছে, চোখের দৃষ্টিতে নির্জীবতা চলে এসেছে। তবু অপেক্ষা করি…।

অাজকে বসন্তের প্রথম দিন। অামি সকালে স্নান সেরে সাদা পাঞ্জাবী গায়ে জড়ালাম। অাজ মা বাবার কথা মনে পড়ছে বেশ। সেই যে মা গেলো, অার কখনো অাসেনি। ভেবেছিলাম বাবা দেখা করতে অাসবে, কিন্তু বাবা অাসেনি। অামিও অার যাইনি। জানি না বেঁচে অাছে কি না। এ জীবনে তাদের অার দেখতে পারলাম না। কবরস্থানে গিয়ে দাড়ালাম। তার কবর জিয়ারত করলাম। তারপর মাজারে গিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে গাইতে শুরু করলাম সূফীসংগীত। চারদিকে অপরূপ নৈঃশব্দ। গান শেষে একজন বলে উঠলো, একটু পানি দিবেন?
অামি মুখ তুলে তার দিকে তাকাতেই দেখলাম ২১ বছরের এক ছেলে মলিন শ্রী-হীন হয়ে দাড়ানো। বড়ো মায়া হলো। তাকে পানি ও সাথে কিছু খাবার দিলাম। সে গোগ্রাসে গিলতে লাগলো। অামি জিগ্যেস করলাম
-কই থাকো তুমি বাবা।
সে চুপ।
-বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছো?
সে তখনো চুপ।
অাচ্ছা বসে গান শোন তবে।

চারদিকে বসন্ত প্রকৃতি তখন হেসেখেলে উঠছে খলখল করে। নরম হলুদ রোদে বাসন্তী বাতাস ভাসে অাপন খেয়ালে। গাছ হতে ঝরে পড়ছে কৃষ্ণচূড়া ফুল। দিনের শেষ অালো তখন অামার মুখে অাছড়ে পড়ছে। অামি তখন গাইছি সে সূফীসংগীত

“অাল্লাহ্ কে বান্দে হাস্দে
যো ভি হো কাল ফের অায়েগা…..।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.