জোছনা ভাসে ঐ আকাশে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১।
আকষ্মাৎ তাকে দেখে আমিতো যারপর নাই অবাক হলাম। চক্ষে আমার তৃষ্ণা। তাকে এত্তোদিন না দেখার। আমার চোখে ভালোলাগার সাথে উঁকি দিচ্ছে তারল্যের আবেগ। আর তার চোখে মিয়ম্রান অভিমান ও তীব্র খুশির ঝিলিক। ঠোঁটদুটো ফুলিয়ে বনলতা সেনের মত করে বললঃ এতোদিন কোথায় ছিলেন?

নিজেকে জীবনানন্দ ভেবে আনন্দের বহিপ্রকাশে আমার দন্তপাটি বের করে বললমঃ তোর খবর কি! কবে এলি!
-সে তো দশদিন হবে। ১৫ দিনের ছুটি নিয়েছি। তুই কোথায় ছিলি? আর ফোন ধরছিলি না কেন?
-আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম। পাহাড়ে। আর ফোন ত চোরে নিয়ে গেছে। নাম্বার চেঞ্জ।
-সে যাই বল। এবার আমাকে যেতে হবে রে অভি। রাত্রে তোর বাসায় আসব।
-আচ্ছা।
তাড়াতাড়ি পিছিয়ে গেলাম।
স্মৃতির পাতার আরো ছয়টি মাস আগে। পাভেল আর আমি। ইন্টার পরীক্ষার জন্য দুজনেই দৌড়ছি প্রাইভেট স্যারের কাছে। কিন্তু পাভেলকে আগের মতো চিন্তিত মনে হচ্ছিলো না।
-কি রে, এত্তো প্রফুল্ল কোন কারনে?
-তোকে একটা কথা বলিনি। আমার চাকরি হয়ে গেছে।
-কি!
-হা নৌবাহিনীতে সৈনিক পদে । গত তিনদিন সেই দৌড়ঝাঁপেই ছিলাম। এপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়েই তবে এলাম।
-শালা হারামী। মিস্টি কই! আর খবর জানালি মাত্র!
-তোকেই বন্ধুদের মধ্য প্রথমে খবরটা দিলাম।

কেন যেন সেই মুর্হুর্তে মনটা ভরে গিয়েছিলো। এক মোহহীন আনন্দে। তারপর হুটহাট করে চলে গেলো সেই বালুকসুলভ ছেলেটা। ছয়টা মাস চোখের পলকে চলে গেলো। অথচ আর্শ্চর্য! আমার এত্তো ভালো বন্ধুর শূন্যতা আমি সামান্যতম অনুভব পর্যন্ত করিনি! সেই অনুভবের ইতিকথায় কি ছিল তা আজও আমার অজানা। পুরুনো স্মৃতিরস আস্বাদন করতে করতে হাটছি আমি নির্দিষ্ট গন্তব্যে। আজ মোর মনে বুকচেরা স্নিগ্ধ আনন্দের প্রসবন বহমান যা কি না একটা নদীতে গিয়ে মিশেছে। পাভেলের সেই কল্পনার নদী “প্রভাতরী” তে।

সমস্ত দিনে বিছানার মত বিশাল আকাশে সূর্য গড়াগড়ি দিয়ে, বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে গিয়ে টুক করে চলে গেলো পৃথিবীর অপর পারের মানুষগুলোর কাছে। এদিকে চাঁদ সূর্যের পদদলিত পদাঙ্ক অনুসরন না করে তার শ্বেত শুভ্র কোমল মোহনীয় আলো দিয়ে স্নান করিয়ে দিচ্ছে পুরো অন্ধকারকে। অন্ধকারের পঙ্কিলতা কিছুটা দূর হয়ে সে তার জোনাকী কন্যাকে অনুমতি দেয়ার সাথে সাথেই প্রকৃতির সেই কন্যা মেলে ধরল তারুণ্যের আভা। সেই সবুজ রঙের ছোট্ট বাতিগুলো।শারদ রাত্রিতে আমি আর পাভেল হেটে যাচ্ছি গ্রাম্য এক নিভৃত নির্জন পথে। পথের দুপাশে শাদা কাশফুলের উপর ঠিকরে পড়া জোছনার সৌন্দর্য্যে হয়তোবা প্রকৃতি আজ নিজেও মুগ্ধ। তার সৌন্দর্যের বাহার দেখে। হালকা ঝিরিঝিরি সমীরন, তীব্র শিউলি ফুলের সুভাস ও মন জোনাকীগগুলো সৃষ্টি করছে মনলোভা পরিবেশ। এ পরিবেশ যেন এক স্বর্গীয় রহস্যে ভরপুর।

২।
চাঁদের আলোয় দুজন যুবক হেটে চলেছে গন্তব্যহীন এক পথে যেখানে শাদা কাশফুলের সারি তাদের সঙ্গে নিরন্তর অবিরাম ধীরলয়ে চলছে। জোছনা দিয়ে মাখানো সেই কাশফুলগুলো আজ কামিনী হয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করছে। একটা জায়গায় কেন জানি থামলাম। চারদিক ভেসে যাওয়া জোছনায় আমি তার দিকে তাকিয়ে মোহনীয় এক স্নিগ্ধ কোমল হাসি দিলাম।
-তোর হাসি দেখে তো আমি তোর প্রেমে পড়ে যাবো।
-আমার প্রেমে পড়লে আমার বৌদির কি হবে সুন্দরী!
-বৌদী ছাড়াও চলবে। তুই তো আছিস।

এই কথা বলে দুজনেই কেন যেন হাসতে লাগলাম। যদিও হাসার মত কোন কার্যকারন ঘটে নি। তবুও হাসি যেহেতু সংক্রমক তাই হাসতে হয়েছে। পাভেল ঠোঁটে সিগেরেট ধরাল। ধরাতে ধরাতে বললঃ নেভির চাকরি করে মজা পাই না রে।
কথাগুলো কেমন যেন গুরুগার্ম্ভীর্য্যপূর্ন আর প্রবল ব্যাক্তিত্বের বহিপ্রকাশ। আমি চিন্তা করতে লাগলাম তার মধ্যে কি কোন পরিবর্তন এসেছে? হা এসেছে। তার মধ্য একটা অবুঝ বালকসুলভ ভাব ছিল। মুখে ছিল সারল্য। আজ তার জায়গায় স্থায়ীভাবে বসেছে লৌহকাঠিন্য আর প্রগাঢ় ব্যাক্তিত্ব। সত্যিই মানুষের রুপান্তর কত্তো দ্রুত! জোছনাবিধৌত সেই কাশফুল গুলোর সামনে সিগেরেট মুখে দেয়া সেই যুবককে যে কতটা সুন্দর দেখাচ্ছিলো তা যদি সে জানতে পারতো তাহলে বীরদর্পের সেই দৃপ্ত অহমিকাও তার সামনে মাথা নত করত।

পাভেল বলে যাচ্ছে তার ৬ টা মাসের কাহিনী। কখনো সুখ। কখনো কষ্ট। গতানুগতিকতার সূত্রে বাধা সে সব ঘটনা। আমার আজ সারারাত্র শুনতে ইচ্ছে করছে তার কথামালা। হঠাৎ করে সে বলে উঠলঃ কাল সকালে আমরা দুজন দৌড়তে যাব।
-আমার মাথে নষ্ট হয় নি। তুই ডিফেন্সে থাকিস বলে আমিও যে যাব তা ভাবা তো ঠিক না।
-ডিফেন্সে যাস কি না যাস সেটা না, জীমে গিয়ে যে বডি বানিয়েছিস তা ডিফেন্সিভ বডির থেকেও বেশি।কি রে যাবি না।
-হুঁ।
-শুনে তো মনে হচ্ছে তুই অনুরোধে ঢেঁকি না, রাইসমিল গিলে ফেলেছিস।

আমি কিছু বললাম না। তার দিকে তাককিয়ে মিস্টি করে হাসলাম। সে আমার দিকে কিছুক্ষন হা করে তাকিয়ে থেকে তার আধখাওয়া সিগেরেট টা ফেলে দিল। হঠাৎ করে আমাকে পিছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। আকাশের চাঁদটা আরো বড় হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে এই দুই বন্ধুর কার্যকলাপ ভালোভাবে দেখার জন্য তাদের উপর গাঢ় করে জোছনা ফেলল। দেখল যে কিছু জোনাকী তাদের চারপাশে তারুণ্যের বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মাতাল সমীরনে কাশফুল আজ টলমল করে তার মাথা নাড়াচ্ছে। সেই সমীরনে যুবকদুটোর কাপড় উড়ছে। এই দৃশ্য দেখার পর চাঁদ মেঘের বুকে মুখ লুকাল।

৩।
ঘোর কেটে যেতেই আমি তাকে বললামঃ ছাড় না, একেবারে চিলেচ্যাপ্টা বানিয়ে ফেলবি দেখছি।
-সরি।
সারাটা রাস্তা নীরবে শারদ রাত্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে এলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় এসে দাড়াতেই দেখি পাভেল দাড়িয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল – তোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।
আমি গুরুত্ব না দিয়ে খেলাচ্ছলে বললাম -সুন্দর মানুষকে সুন্দর দেখাবে এটা কোন নতুন কথা না।
-তো সুন্দরী, এবার দৌড় শুরু করি।
-আচ্ছা।

৪।
সকাল ৫.৩০ এ দৌড়তে বেরুলাম। দৌড়চ্ছি রেললাইন ধরে। দৌড় থেকে প্রকৃতির প্রভাতের রূপজ রস আরোহন করার দিকেই বেশি মনোনিবেশ করেছি। এটা আশ্বিন মাস। একেবারে শারদ প্রাতের সৌন্দর্য অবলোকনের উৎকৃষ্ট সময়। কত্তোক্ষন দৌড়তে পারব জানি না। সকালে ৩কিমি দৌড় প্রতিদিন দৌড় দেই। তবে পাভেল নাকি একটানা ১৭ কিমি পর্যন্ত দৌড়তে পারে। আকাশের থমথমে ভাবটা হঠাৎ করে বেড়ে গেলো। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। দাড়িয়ে প্রকৃতির ডাকে সারা দিচ্ছি। হঠাৎ করে চাপা আর্তনাদে দেখি পাভেল রেললাইনের পাশে পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি দৌড়ে তার কাছে যেতেই বলল
-রেললাইন ধরে দৌড়াচ্ছিলাম। হালকা বৃষ্টিতে ভেজা পিচ্ছিল স্লীপারে পা পড়তেই পিছলে গেলো। সারা শরীরে কোনররকম ক্ষতি হয় নি। তবে তার পা দেখি ভয়াবহ রকম মচকে গেছে। পা ফেলতেই ব্যাথায় আউ করে চেঁচিয়ে উঠল। জায়গাটা নীলচে হয়ে আছে। মরার উপর ক্ষরার ঘায়ের মত নেমে এলো বৃষ্টি। আশেপাশে কোন বড় গাছ নেই। সব কাশবন। তাকে কোলে করে নিয়ে হাটতে লাগলাম। জীমে প্রতিদিন ওয়েট লিফটিং করার সুবিধা আজ বুঝতে পারছি।

ভারী বর্ষন শুরু হল। রেললাইনের দু ধারে কাশবন। রেললাইন ধরে পাভেলকে বাচ্চাদের মত কোলে নিয়ে হাটছি। দু দিনের শেভ না করা খোঁচা খোঁচা দাড়ি ও গাল বেয়ে বৃষ্টির জল থুঁতনি দিয়ে টুপটুপ করে পড়ছে পাভেলের গায়ে। পাভেল হতবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আবার তার দৃষ্টিতে দেখতে পেলাম বালকসুলভ ভালোবাসা। আমি আমার সেই স্নিগ্ধ হাসিটা তার দিকে তাকিয়ে দিলাম। পাভেল আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কোনধরনের যন্ত্রনা বোধ হচ্ছে না। প্রবল বর্ষনের মাঝে দুজন যুবক নবযৌবনের জলধারায় স্নান করতে করতেএগিয়ে যাচ্ছে তাদের গন্তব্যে।

৫।

স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই একটা রিক্সা পেয়ে তাড়াতাড়ি তাদের বাসায় গেলাম। তার বাবাই ডাক্তার। সব দেখে বলল
-দুদিন পুরো বেড রেস্ট। কোথাও যেতে পারবি না। তার পায়ে ব্যান্ডেজ করে বরফ জড়িয়ে রাখল। আমি বাসার দিকে রওনা হলাম। দুদিন তার সাথে আমার দেখা হত তাদের বাসায় গিয়ে। আমি তাকে সঙ্গ দিতাম। কত্তো কথা হত। দুদিন পর দেখি সে দাড়াতে পারছে। বেশ লাগছে তার সুস্থতা দেখে। তবে খারাপ লাগছে। কারন কাল চলে যাবে। এই চিন্তা করে। আজকে দিনটা প্রচন্ড রৌদ্রজ্জ্বল। বাইরে তাকে নিয়ে বেরিয়েছি। বাসা থেকে হোন্ডাটা লুকিয়ে বের করতে হয়েছে। কারন বাবা যদি জানতে পারে তাহলে নতুন রেডিও চ্যানেল চালু হয়ে যাবে।আজ অনেক জায়গায় ঘুরব। পাভেলকে পিছনে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম গ্রামের দিক দিয়ে। রৌদ্রস্নাত বাতাস ও আকাশ থেকে চুঁইয়ে পড়া নীলিমা যেন সৌন্দর্যবর্ধন করছে প্রকৃতির। আকাশ নবনীল নাকি ঘননীল তা বোধগম্য হচ্ছে না। একটা পুকুর পড়ে দুজন বসলাম। পুকুর পাড়টা ঘিরে আছে খেজুর গাছে। জলটা স্বচ্ছ কাঁচের মত। বাতাসে ঢেউ উঠা জল দেখতে দেখতে যে কখন হারিয়ে গেলাম তা নিজেই জানি না। পাভেল হঠাৎ করে কি বলল তা শুনতেই পাই নি। আমি বললাম
-কি বললি?
-চল গোসল করি।
-কিভাবে!
-আন্ডারপ্যান্ট পড়ে নামলেই হল।

রৌদ্রছায়ার তপ্ত মৃত্তিকাও যেন আজ তার ঘ্রান ছড়িয়ে দিচ্ছে। গরমের প্রবল তেজ এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছি। শার্ট প্যান্ট খুলে পানিতে নেমে পড়লাম। এত্তো ভাল সাঁতার পারি না। পাভেল আমার থেকেও কম পারত। তবে বর্তমানে তার কর্মদক্ষতা দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। পাল্লা দেয়া নিছক ছেলেমানুষি বলে গভীর পানিতে ফ্রি স্টাইলে সাঁতরানো আরম্ভ করলাম। প্রচন্ড গরমে দীঘির স্বচ্ছ শাদা পানিতে সাঁতরানোর মজাই অন্যরকম। তার উপর যদি শারদ আকাশে সাদাকালো মেঘের সাথে বাতাস বহে তাহলে স্বর্গ বলা যেতেই পারে। হঠাৎ করেই আমার চোখে আনন্দ সরে গিয়ে স্থান নিল প্রবল ভয়। পা নাড়াতে পারছি না। পা অবশ হয়ে আসছে। ডুবে যাচ্ছি। আতঙ্কে প্রায় অবশ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। পানি খেয়ে ফেলেছি কতটুকু। ডুবছি ভাসছি। মনে হচ্ছিলো মারা যাবো। হঠাৎ দেখি পাভেলকে এগিয়ে আসতে। শ্বাস নিতে না পারায় মনে হচ্ছিলো ফুসফুস ফেটে যাবে। জানি উদ্ধার কার্যের সময় চুপ থাকতে হয় কিন্তু ভয়ে পাভেলকে জড়িয়ে ধরলাম। পাভেলও আমার সাথে ডুবে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। হঠাৎ করে শিথীল হলাম। পাভেল আমাকে সাঁতরে নিয়ে চলল পাড়ের দিকে। পাভেল কমপানিতে এসে দাঁড়াতেই তাকে জড়িয়ে ধরলাম।কাশছি অনর্গল।কাশির সাথে পানি বেরিয়ে এলো। খোলা হাওয়ায় উন্মুক্ত শরীরে তাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় পাড়ে উঠলাম। হা করে শ্বাস নিচ্ছি। কিছুটা সময় নিয়ে সুস্থ হলাম।

৬।

-হঠাৎ করে সাঁতার বন্ধ করে দিলি কেন!
-পায়ের রগে টান দিয়েছিলো। নাড়াতে পারছিাম না। তাই। ধন্যবাদ রে। তুই না থাকলে মরেই যেতাম।
-যাই হোক, আমার নেভীর ট্রেনিং টা কাজে লাগল।

তারপর সে আমার পা মালিশ করতে লাগল। আমার নিজের কেমন জানি লাগছিলো। তবে সে স্বাচ্ছন্দ্যে করছে। আমার ভালোই লাগল। পায়ের ব্যাথা কমার পড় কাপড় পড়ে আমার দুজন আবার উঠলাম হোন্ডায়। হালকা ঝাঁকিতে সে আমার পিঠে মিশে যাচ্ছিলো। আমার শরীর শিহরিত হচ্ছিলো। কিন্তু নিজেকে বারবার প্রবোধ ও ধিক্কার দিলাম। মনে মনে নিজেকে বললামঃ
-সে তোর বাল্যকালের বেস্ট ফ্রেন্ড। এখনো। তাকে নিয়ে তুই এইসব ভাবতেই পারিস না। কিন্তু মন বড় হারামী।

সেসব কথার পাত্তা না দিয়েই তার হালকা স্পর্শে ভালোবাসার উৎস্য খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু সেখানে ছিল বন্ধুত্বের প্রবল টান। পাভেলকে তার বাসায় দিয়ে এসে বাসায় ঢুকলাম। কেটে যাচ্ছে প্রহর চিন্তায়। নীল কুয়াশা থেকে শঙ্খনীলের মধ্য যত্তোসব আবেগ বিদ্যমান তারা একে একে এসে জানান দিয়ে যাচ্ছে তাদের অভিপ্রায়। আমিও সেসব সময় নিয়ে আছি। হঠাৎ সকল চিন্তা চেতনার বিচ্ছেদ ঘটল মার গানে। সামনে রবীন্দ্রসংগীতের প্রতিযোগীতায় সকল মহিলাদের কম্পিটিশন। মা হারমোনি নিয়ে রেওয়াজ করছে। আমি ঘরে বসে রইলাম। দুপুর গড়িয়ে বিকাল আর বিকাল গড়িয়ে নগরীর বুকে নামল সন্ধ্যা। আজ চাঁদটা অনেক বড়। মনে হয় কাল পূর্ণিমা। হঠাৎ করে পাভেলের ফোন
-এই যে বডি বিল্ডার, চলেন তালুকদার সাহেবের ঘাটে গিয়ে বসি।
-তুই কই?
-বাসা থেকে মাথাটা বের না করলে দেখবি কিভাবে?

৭।

আমি দোতালা থেকে রাস্তার দিকে তাকালাম। দেখি শাদা একটা শার্ট পড়ে পাভেল দাড়িয়ে আছে। আমি একটা শাদা টি শার্ট পড়লাম। তার সাথে ডেনিম জিন্স। কিছুদূর যেতেই বাজারের ট্রান্সমিটার টা ঠাসস করে ফেটে গেলো। আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ে এসে পৌছুলাম। আজ রাত্রে কারেন্ট আসবে না। চারদিক শ্বেত জোছনায় ভরে গেছে। পুকুর পাড়ে একটা শিউলি ফুলের গাছ। কিছু শিউলী ফুল কুড়োলাম। পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে এসে বসলাম। পুকুরের পানিতে তীব্র জোছনা পড়ে ঝিকমিক করছে। আকাশ পরিষ্কার বলে জোছনার রংটা আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। পানিতে একটা একটা করে ফুল ফেলতে লাগলাম। সবগুলো ফুল ফেলে দেয়ারর পর দেখি পাভেল ঘাটের সিড়িতে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছে।জল জোছনার প্রতিফলিত আলোতে তাকে যা সুন্দর লাগছিল তাতে মনে হচ্ছিল যে গ্রীক দেবতাও ইর্ষান্বিত হবে। তার পাশে গাঁ ঘেষে পানিতে পা ডুবিয়ে বসলাম।হালকা বাতাসে শিউলী ফুলগুলো ভেসে ভেসে আমাদের দিকে আসছিলো। সেই জল জোছনাস্নাত শিউলী ফুলগুলো একটা একটা করে তুলে রাখছিলো। আমি তার প্রতি মনে মনে অসম্ভব দূর্বল হয়ে গেছি। ভালোবেসেফেলেছি তাকে। কিন্তু তা যে চাপিয়ে রাখতে হবে অন্তরালে। কোন কথা হচ্ছিলো না আমাদের। কিন্তু আমি ওকে উপলব্ধি করছিলাম মর্মে। আমি ঘাটে পাভেলের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। পাভেল আনমনে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছিলো। সে আবার ফুলগুলো কে জল জোছনায় ভাসিয়ে দিল। রাত্র বাড়ছে। তীব্র হচ্ছে কষ্টটা। একসময় থাকতে না পেরে শোয়া অবস্থাতেই পাভেলের কোমড় জড়িয়ে ধরলাম।

-হল কি তোর?
-না রে কিছু না।
-কাঁদছিস না কি তুই?
আমাকে সে তার দিকে ফেরাল। নারিকেল গাছের পাতা বেয়ে বেয়ে জোছনা আমার গালে পড়ছে। আর আমার গাল বেয়ে পড়ছে গলিত নোনা ব্যাথা। পাভেল কিছু বলল না। কারন জানে আমি যদি নিজ থেকে কিছু না বলি তাহলে সে জোর করে কিছু করতে পারবে না। তাকে হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা ছেলেদের মত হেঁচকি তুলে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলাম। পাভেল আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল। রাত বাড়ছে। বড় হচ্ছে চাঁদ। আমার চারপাশে জোনাকীকন্যা সবুজ বাতি জ্বালিয়ে নাচতে লাগল। জলসিক্ত সেই শিউলীফুলগুলো অনেক দূরে চলে গেছে। সকলের উপর গলে গলে পড়ছে শারদজোছনা।

৮।

আজ পাভেল চলে যাবে। সন্ধ্যার ট্রেনে। আমাকে বলেছিলো যে সারাদিন ব্যাস্ত থাকব। সন্ধ্যায় স্টেশনে এসে পড়িস। সারাদিন সে আত্নীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে বিদায় নিল। নেভীতে ফোন ব্যাবহার করতে দেয় না। সন্ধ্যা হচ্ছে। নগরীর বুকে নেমে এলো আরেকটি গোধূলী। আজ পূর্নিমা। কারেন্ট চলে গেছে। সারা শহরের মানুষ দেখছে আজকের পূর্নিমা। অনেক বেশি উজ্জ্বল। আমাকে ক্রমাগত ফোন করে যাচ্ছে পাভেল তার মার ফোন দিয়ে। আমি ফোন ধরছি না। ট্রেনের শব্দ শোনা গেল। ট্রেন আসছে। একটা ম্যাসেজ দেখলাম আমার ফোনেঃ
“তুই আমার খুব ভালো একটা বন্ধু। তোকে আমি সারাজীবন বন্ধুর মতই দেখব। তুই ভালো থাকিস। আর পারলে আসিস কর্মস্থলে। আমি আবার 6 মাস পরে আসব। ভালো থাকিস।”

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। টপাটপ পানি পড়ছে চোখ দিয়ে। ছাদের কোনে নিমপাতা বেয়ে বেয়ে জোছনা পড়ছে আমার শরীরে। হালকা বেদনাবিধূর বাতাস আমার বুকচেরা দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে গেছে। মা হারমোনি নিয়ে গান গাইছেঃ
“আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল
শোধাইলনা কেহ…..”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.