তনিমা

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা


১.
আকাশটা ঘন নীল।
মফস্বল শহরটার বুকে নেমে আসছে এক নির্জীব নীরবতা, কারন আজ শুক্রবার। ঘড়িতে সময় বলছে বারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। আর এই ভরদুপুরে ছাদে দাড়িয়ে থাকাটা একদম যুক্তিযুক্ত না। তবু তনিমা দাড়িয়ে আছে নির্বাক এই শহরের এককোনে, তাদের বাসার ছাদে। ছাদে ফুলের
বাগান করেছে তনিমা। নিচ থেকে অনিমা এমনভাবে
চিল্লাচ্ছে যেন বাড়িতে হুলস্থুল কান্ড বেধে গেছে। তনিমা ও অনিমা দু বোন। তাদের বাবা ধনাঢ্য মাছব্যবসায়ী। মা মারা গেছেন অনেক আগেই। অনিমা চার বছরের এক
ছেলে নিয়ে প্রায়শই বেড়াতে আসে, বাপের বাড়ি কাছে থাকার কারনে।
অনিমা আবার চেঁচাল। তবে এবারের চিৎকার উপেক্ষা করার মত না বলে বাগানবিলাসী তনিমা নেমে এলো নিচে।

তনিমা নিচে নেমে এসেই অনিমাকে বলল
-কি হল কি!ভর দুপুরে মরার মত চিল্লাচ্ছিস কেন?
-দ্যাখ, বাবু না দুধ খাচ্ছে না।
মেজেজটা সপ্তমে চড়ল তনিমার। তার উপরে যদি গননা করা গেতো তাহলে সেখানেও চড়ত। ঘন্টায় কয়বার খাওয়ানো যায়?
তনিমাঃ দ্যাখ, এতে আমি তোকে দুটো সলিউশন দিতে পারি। সলিউশন নং ১ঃ তুই বাবুকে উল্টা করে ধরে তার পিছনে ফানেল ঢুকিয়ে দুধ ঢাল। দেখবি যে বৃহদান্ত্র
ক্ষুদ্রান্ত্র সব বেয়ে দুধ পাকস্থলী তে
পৌছে যাবে। সলিউশন নং ২ঃ দুধটা সাইকেলের পাম্পারে ভরে বাবুর মুখে সাইকেলের নল ঢুকিয়ে পাম্প মার।দুধ পেটে চলে যাবে।
অনিমা শীতল গলায় বললো
-” তুই বাবুকে দেখতে পারিস না কেন?

তনিমাঃ কারন এতে মানুষ বলবে মার থেকে মাসির দরদ বেশি।
-“কি!

-” হা। আর বাবার সামনে তালেবান গিরি করবি না।

-আমি তালেবান!
-হা। তুই তালেবান। মাও তালেবান ছিলো। একজনের কথা আরেকজনের কাছে লাগাতো। এগুলো তালেবানি স্বভাব। চমৎকার হল। তালেবান মায়ের তালেবান কন্যা।
-তুই আমার সামনে থেকে দূর হ।
-ডেকেছিলি তুই। আমি ইচ্ছা করে আসিনি।
এই কথা বলে সেই জায়গা ত্যাগ করলো তনিমা।

২.
মনে মনে চিন্তা করছে তনিমা
-” আমার আর বোনটার সম্পর্ক কি আদায় কাঁচকলায় টাইপ? তবে যে যাই বলুক না কেন, বোনটার সাথে খুনসুটি করতে ভালো লাগে।

তনিমা এসব চিন্তা করতে করতে বাথরুমে ঢুকল। শাওয়ার ছেড়ে দিল। প্রতিটি ফোঁটা ক্লান্তি ধুয়ে মুঝে দিচ্ছে। অাস্তে অাস্তে যেন সজীবতা অাঁকড়ে ধরলো তাকে । স্নান সেরে রেডি
হতে লাগল তনিমা। প্রতি শুক্রবার বিকেলে সে কিছু কেনাকাটা করতে বের হয়। আজ সে সেঁজেগুজে
বের হল। বের হতে দেখে একটা ছেলে তার দিকে তাকিয়ে ৩২ পাটি দাঁত বের করে দিয়েছে। হলদেটে দাত উস্কোখুস্কো চুলে রীতিমতো মেজাজ গরম করা চেহারা। দ্বিতীয়বার অার তাকাতে রুচি হয় নি। অার ভালো ছেলে দেখলেও তাকাতো না। কারন তার ছেলেদেরকে একদম ই সহ্য হয় না।এ দোকান ও দোকান
ঘুরে হালকা কিছু কেনাকাটা করল সে। তারপর পার্কের উদ্দ্যেশে রওনা দিল সে। মামার দোকানে ফুচকা খাবে। ফুচকার দোকানি তাকে দেখেই হেসে বলল
-চটপটি খাবা না ফুচকা?
-ফুচকা দেন।
তনিমা সবসময় ফুচকা খায়। তবুও তাকে জিগ্যেস করা চাই। পিছন থেকে রিনরিনে একটা কন্ঠস্বরের অধিকারিনী বলে উঠল
-একটু সরবেন প্লীজ!

পিছনে তনিমা আস্তে আস্তে ঘুরল। ঘুরে যা দেখে তাতে তার মাথা ঘুরে যাবার দশা। অনেক সুন্দরী একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে তার পিছে। সত্যিই যেন বনলতা সেন। বিশেষ করে মুখশ্রীটা। এত্তো সুন্দর! ঠোঁটের কোনে ধরে রেখেছে একচিলতে মেঘমুক্ত হাসি। হঠাৎ মেয়েটি বলল
-হাই, আমি কান্তা।
-আমি তনিমা।কেমন আছো।
-ভালো। তুমি?
-খারাপ থাকলে অবশ্য শপিং এ
বেরুতাম না।
-অনেকের মন খারাপ থাকলে ঘুরে এসে মন ভালো করে। তুমি তো তাদের মধ্য পড়তেও পারতে।আচ্ছা বাদ দেই।
কোথায় থাক?
-মেঘপুর বটতলা।তুমি?
-আরে! আমি তো সেখানেই থাকি তারা জানতে পারল যে তারা মাত্র দু বাসা আগে পরে থাকে।
কান্তাঃ বাসায় কে কে আছে?
তনিমাঃ বাসায় বাবা আছে। প্রথমে বাবা একজনকে বিয়ে
করেছিলো। তার থেকে বোনের জন্ম।তিনি মারা গেলেন । তারপর বাবা তার শালীকে বিয়ে করেন। তার থেকে আমার জন্ম। কিন্তু আফসোস। বাবা আর বিয়ে করতে পারল না!
-কেন?
-কারন বাবার আর কোন শালী নেই!
-হি হি হি। তুমি কি সবসময় এভাবেই কথা বল!
-কেন? তা কি অস্বাভাবিকের মাঝে পড়ে?
-তা না। তবো কেমন যেন হাস্যরস আর অদ্ভুত টাইপ।
আকাশটা মেঘলা। যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। তারা এটা রিক্সা খুঁজতে লাগল।
রিক্সায় উঠে বসল। তারা রিক্সা দিয়ে বাসার দিকে রওনা হচ্ছে। কান্তার শরীর। সুমিষ্ট এক ঘ্রান আছে যা কি না মন মাতাল করে দেওয়া। তার শরীরটাও একদম স্লীম। মেয়েদের গায়ের মিস্টি গন্ধটা তার কাছে ভালোই লাগে। অন্তত আর যাই হোক, ছেলেদের মত তার গা থেকে ” পাঠার ” মত গন্ধ বের হয় না। ছেলেদের উৎকট ঘামে ভেজা গন্ধ তার কাছে বিশ্রী লাগে। বমি বমি আসে। তার থেকে মেয়েদের ঘামের গন্ধই ভালো। রাস্তায় জ্যাম লেগেছে। বৃষ্টি হচ্ছে। রিক্সাওয়ালা পলিথিন দিয়েছে তাদের। তনিমা দুজনকেই প্রায় পলিথিনে মোড়ে নিল। মফস্বল শহরের বুকে নেমে আসছে আরেকটি অলিখিত বৃৃস্টি।

৩.
দিনগুলো যেন কেমন করে গড়িয়ে যাচ্ছে। প্রথম দেখার পর ফোনে কথা বলা, তারপর দুজনে মিলে ঘুরতে
যাওয়া ও আরো অনেক কিছুই। বন্ধন টা শুধু শক্তই হচ্ছে। বান্ধবী ছেড়ে যে এই সম্পর্ক টা কত আগেই অন্যদিকে মোড় নিয়েছে তারা তা নিজেই জানে না। তনিমা প্রায়ই ভাবে “আমি কি সমকামী”। একটা লেসবিয়ান? একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের
প্রেমে পড়েছি? তবে যাই হোক না কেন, তাকে নিয়ে সুন্দর স্বপ্নশীলা দিনের অধিকারিণী আমি।
তনিমাদের বাসায় আজ কান্তার দাওয়াত।
অনেক আয়োজন আজ তনিমা করেছে। ওদিকে অনিমা ছুটছে বাবুকে খাওয়ানোর জন্য। কান্তা এলো। সে খেতে বসেছে। অবশ্য তার চাপাচাপিতে তনিমাকেও খেতে বসতে হল। হঠাৎ কান্তা
-ওফ। এত্তো কাঁটা। রূপচাঁদা আমি খেতেই পারি না।
-আমার বোনকে ত মাছ খেতে দেখনি! সে কাঁটাসুদ্ধ মাছ চিবিয়ে একসাথে গিলে ফেলে। তার কাটা খাওয়ার ধরন দেখলে শিউর বিড়াল ও হার্টফেল করবে।
কান্তা তো হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছো। কি সব কথা যে বলে না তনিমা। খাওয়া শেষ করে সে কান্তা
-চল তনিমা, তোমার রুমে যাই। গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।
-চলো।
বাইরে ঝড়ো হাওয়া। দমকা বাতাস পরপর ছুটে যাচ্ছে।ঘরের জানালার পর্দা পতপত করে উড়ছে। ঘরময় এক
মায়া বিরাজমান। কেমন যেন ঘোরের মধ্য আছে দুটো মেয়ে। অদৃশ্য সেই মায়ার জাল হতে ছিন্ন হওয়ার
নিস্ফল চেষ্টার পর আরো কাছাকাছি হলো তনিমা ও
কান্তা।
তনিমাঃ কিছু বলতে ইচ্ছে করছে।
-কি বলবা?
-বলব কি তা তুমি জানো।
-কিন্তু যা বলতে চাও তার তো কোন ভবিষ্যৎ নেই। এটা মোহ। আমরা দুজনেই মোহাচ্ছন্ন। আমি একটা মেয়ে। আর তুমিও। একটা মেয়ের অনেক রকমের বাধ্যবাধকতা থাকে সমাজে।আমরা এতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ না। আমরা যতই সম অধিকার বলে গলা ফাটাই না কেন সামাজীকতার লোক দেখানো চাপটা আমাদের ঘাড়ে বেশী। যেই কারনে আমরা মুক্তমনা না।একটা ছেলের পক্ষে ঘর ছেড়ে বাইরে থাকাটা খুব সহজ। তারা তাদের মনের মানুষকে নিয়ে পালাতে পারেরে। কিন্তু আমরা
পারি না। আমাদের লোকের ভয় আছে। অনেক লোক বিরক্ত করবে। কিন্তু দ্যাখো, দুটো ছেলে একসাথে থাকলে এরকম হওয়ার সম্ভবনাই নেই। আজ খুব ইচ্ছে করছে
ছেলে হতে। তুমিও ছেলে হলে কি যে ভালো হত। দুজনে মিলে পাললাতাম।আর যা হয়েছে কি না। আমাদের ভুলে থাকা উচিত।
তনিমাঃ পারবে?
-জানি খুব কষ্ট হবে তবুও করতে হবে। সমাজের সেই গৎবাধা শৃঙ্খল। পালন করতে হবে। আমার পরশু বিয়ে। জানি অবাধ্য হতে পারব না, কিন্তু তোমার মত বান্ধবী শুধু তুমিই থাকবে। তুমি কি কিছু বলবে?
ঘরময় পিনপতন নিরবতা। আকাশের বিষাদনীলিমা ঢেকে আছে কালো মেঘে।প্রতিটি বাতাসে জানান দিচ্ছে তাদের বেদনার রংগাঁথা।
তনিমাঃ সুখে থাকো এটাই চাই।
কান্তাঃ পারব কি না তা জানি না। তবে ভালো থাকার চেষ্টা করতে হবে।

তিনদিন পর।
কান্তাদের বাসার সামনে একটা ফুল দিয়ে সাজানো গাড়ি দেখা যাচ্ছে। সবাই চিৎকার করছো জামাই এসেছে বলে। তনিমা বারান্দায় দাড়িয়ে সব দেখছে। আকাশ জুড়ে কালো মেঘ।হঠাৎ বৃষ্টি নামল। সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে।
তনিমা নড়ছে না। বৃষ্টির জল তার চোখেমুখে পড়ছে। ভালো হল। তার চোখের জল কেউ দেতে পাবে না।

৪.
বিশ বছর পর।
মা ও তার ১৮ বছর বয়সী এক ছেলে দাড়িয়ে আছে একটা পার্কে। মা ফুচকা খাচ্ছে।
ছেলেঃ মা ওদিকে গেলাম। প্রয়োজন হলে ফোন করো।
হঠাৎ একটা রিনরিনে কন্ঠস্বর।
-একটু সরুন প্লীজ।
বিশ বছর পর আবার দেখা হল কান্তা ও তনিমার। কত কথা হল। তাদের দুজনেরই ছেলে আছে। তনিমার
ছেলের বয়স ১৮। নাম মিজান। আর কান্তার ছেলের বয়স ১৬। নাম তমাল। তনিমাঃ চল না। সেই গাছটার
কাছে নিরব জায়গাটাই যাই। আমরা কত সময় সেই জায়গায় কাটিয়েছি।
কান্তাঃ চল।
তারা সেই জায়গায় গিয়ে একটু নির্জনতার খোঁজ করতেই যে দিকে চোখ পড়লো তাতে তাদের চোখ কপালে উঠে গেলো!
দেখে যে দুটো ছেলে একে অপরকে কিস করছে। তাদের দেখে দ্রুত স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল। কিন্তু
যা দেখার তা তারা দেখে নিয়েছে। তারা বিষ্মিত হয়েছিলো এই কারনে যে
ছেলেদুটো তাদেরই ছেলে ছিলো!

*****(সমাপ্ত)*****

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.