প্রথম প্রহরে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>><<<<<<<<<<<<<<<<
এটি একটি সত্য ঘটনার অবলম্বনে
তৈরী। উল্লেখ্য যে এই ঘটনার
প্রত্যক্ষদর্শী আমার এক বড়ভাই
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>><<<<<<<<<<<<<<<<

১.
প্রেজেন্ট ইজ গুড বাট পাস্ট ইজ
গোল্ডেন। বছরের ছাব্বিশতম
সিঁড়িতে দাড়িয়ে আবার আমার এই
কথাটি মনে হল। এক লাফে পাঁচ
নাম্বার সিঁড়িতে যেতে ইচ্ছে
করছে। কিন্তু আগের সিঁড়িগুলো যে
ভেঙে গেছে।ইচ্ছেতে অনেক সময়
অনেক কিছু হয় না। কিন্তু
স্মৃতিচারণে তো বাধা নেই।
সারারাত জেগে কাজ করে আমি
ক্লান্ত। এখন হেমন্তের শেষরাত্রি।
বিশাল শহরের মাঝে একটা
দালানের ব্যালকানিতে
কফিকাপে বসে অপেক্ষা করছি
একটি নতুন অরুনের যা কি না
তমসাকে মিইয়ে দিবে। হালকা
বাতাসে ভেসে আসছে শিউলি
ফুলের মোহায়িত সুঘ্রাণ। আমি
স্বপ্নীল অাবেশের সঙ্গী, কিন্তু
তন্দ্রাচ্ছন্ন নই। কল্পনায় ভেসে
গেলাম। সেই পাঁচ বছরের গন্ডীতে।
সেই যে সাতরং এর দিনে………

২.
আমার একটা দাঁত পইরা গেছে। নাইম
রে দেহানি (দেখানো) লাগব।
দাতটা ইন্দুরের গাতাত (গর্ত) দেম।
আমি নাইমের বাসাত যাইতাসি।
-আন্টি নাইম আছে?
নাইমের মাঃ কিরে নাইম। দেখ
লিমন আইছে।
নাইম ঘর থেইক্যা বাইর হইসে।আইসা
কইতাসে (বলতেছে)
-আম্মা আমি লিমনের লগে (সাথে)
খেলতাম যাইতাসি।
এই কথা বলে নাইম ও আমি দৌড়
দিলাম।দুজনে দৌড়তে দৌড়তে
জামরুল গাছের নিচে এসে
দাড়ালাম।
-নাইম, আমার না দাঁত পইরা গেছে।
-হি হি হি।
দাঁতপড়া বিলাই
ঘাড় ধইরা কিলাই।
-তুই কি! তুই ত ছিলামাথা।
ছিলা ছিলা ১১
যাইত্যা ধরগা পাগারো (ছোট পুকুর)
একটা ডিম নষ্ট
ছিলা মাথার কষ্ট
– তুই হইসস শয়তান।
এই ছেরা বেরবেরা
কাডলের কুষ
তোর মা পাদ মারছে
আমার কি দুষ
-আরেকবার যাইস
আমরা বাড়িত আইস
মুরগির লেদা ভাইজ্যা দেমনে
কড়কড়াইয়া খাইস।
এখন নাইমের সাথে আমার কাইজ্যা
(ঝগড়া) লাগছে। আমি তারে একটা
ছেপ (থুতু) মাইরা দৌড় দিসি। নাইম
কানতাসে!

৩.
কটকটি। এই কটকটি।
একদিন দুপুরে এমন শব্দ শোনে দৌড়
দিসি। যত জায়গা থেকে কুড়িয়ে
পাওয়া টিনভাঙা, লোহা এসব
নিয়ে কটকটিওয়ালার কাছে
আসছি।
-আমারে এইগুলা দিয়া কটকটি দেইন।
পাশে নাইম কিছু কাঁচের বোতল
নিয়ে বলছে
-আমারে এইগুলা দিয়া কটকটি দেইন।
কটকটিওয়ালাঃ কাচের জিনিস
নেই না।
আমিঃ তুই যদি আমার লগে মিল দেস
তাইলে আমি তোরে কটকটি দেম।
-আইচ্ছা। আমরা অহন মিল হইছি।
কটকটিওয়ালার কাছ থেকে কটকটি
নিয়ে আমরা একে অপরের সাথে
মিল দিয়ে দুজনে মিলে কটকটি
খাচ্ছি।
তখন ছিল গরমকাল। কটকটি খেয়ে
শেষ।
আমিঃ এ নাইম্যা ফুন(শোন)।
ইমইন্যারা বাড়ির পিছের
জামগাছটাত মেলা (অনেক) জাম
হইসে।নিচে মেলাতা পরে। আয়
গিয়া টুক্কাইয়া (কুড়িয়ে) লইয়া আই।
-ইমনের আম্মা তো মুখ করে!
-টুক্কাইয়া দৌড় দেম।
-আইচ্ছা।

৪.
দুইজনে আস্তে আস্তে গেছি ইমনের
বাসার পিছে। অনেক জাম পইরা
রইছে। দুইজনে টুনা(জামা দিয়ে
বানানো সাময়িক থলেবিশেষ)
পাইত্যা জাম টুক্কাইতাসি। কি যে
বালা লাগতাছিন। জামে ভর্তি। এই
দিক দিয়া তুলি ওই দিক দিয়া তুলি।
টুক্কানি শেষ। অহন বাড়িত যাইয়াম।
কোনহান থাইক্যা ইমন আমরারে
দেইখ্যা ফালাইসে
– আম্মা, ও আম্মা, দেহ নাইম্যা আর
লিমইন্যা না বেকটি (সব কয়টি) জাম
টুক্কাইয়া ফালাইছে।
এই কথা শুনার পর আমরা দুইজনে কুইট্যা
(জোরে) দৌড় মারছি। বেডহা
(বোকা) নাইম টা দৌড় মারতেই
পইরা গেছে। জাম দিয়া তার
জামা মাইখ্যা গেছে। আমি তারে
তুইল্যা দিয়া আবার দৌড় দিসি।
দুইজনে দৌড়তে দৌড়তে জামরুল
গাছটার নিচে আইছি। নাইমের
হাডুর ছাল গেছেগা। আমি কিছু
দূর্বা আনছি। চাবাইয়া তার হাডু তে
দিসি। এতে বালা হয়। আমি জানি।
অহন রক্ত টা কম বাইরইতাসে। আমরা দুই
জনে মিইল্যা আমার টোনা
থেইক্যা জাম খাইতাসি।ঠোঁট জাম
কালার হইতাসে। হাসতাসি আর
জাম খাইতাসি। বাতাসটা বেশি
আইতাছিলো। আমরা একজন
আরেকজনের ঠোঁট দেখতেছিলাম।
কারটা বেশি লাল হয়?

৫.
আইজ ঈদের দিন।
আব্বা আমার লাইগা একটা নতুন
জামা আনছে।আমি জামা পিনছি
(পরেছি). জামাটা মেলা (অনেক)
সুন্দর।আম্মা।,আব্বা দুইজনরে সেলাম
করছি। আম্মা দিসে বিশ টেকা আর
আব্বা দিসে ৫০ টেকা। বড় ভাই শহর
তে আইসে। হে শহরের ইস্কুল পরে। বড়
ভাই দিসে ৩০ টেকা। আমার ১০০
টেকা হইসে।আমি দৌড় দিয়া
নাইমের বাসাত গেছি। হে ও নতুন
জামা পিনছে। আমরা দুইজনে
মিইল্যা এক্কেলগে নুডুস খাইছি।
সবাই নামাজে যাইতাসে। আমিও
গেছি। নামাজ শেষে সবাই
কুলাকুলি করতাসে। আমিও নাইমের
সসাথে কুলাকুলি করছি। বাসাত
আম্মা মেলা কিছু রানছে। আমি
খাইয়া গেছি গাছটার নিচে।
নাইমঃ লিমন ফুন, আমরা কুলাকুলি
করি। আয়।
-আগে তো একবার করছি!
-ঈদ তো সারাদিনই থাকে।
-আচ্ছা অায়, করি।
দুজন দুজনকে বাহুডোরে আবদ্ধ
করেছিলাম। একটা পবিত্র বন্ধুত্বের
সম্পর্কে।
হঠাৎ কার আওয়াজ শুনে বুকটা ধরফড়
করে উঠল!

৬.
কিরে ১ ঘন্টা ধইরা কোলাকুলি করন
লাগে? ভাইয়ের গলা।
আমরা দুইজনেই শরম পাইছি। চুপ কইরা
দাড়াইয়া আছি।
-হইসে আর শরম পাওয়ন লাগত না। এই
নে। দুইজনের লাইগ্যা চকলেট।
আমরা দুইজন চকলেট খাইলাম।অনেক
মজার চকলেট। ভাইয়া নাইমের
কানে কানে কি যেন বলল।
-কি রে নাইম। ভাইয়া তোরে কি
কইসে?
-না কইতাম না।
আমার প্রচন্ড রাগ হল।
-যা তোর লগে আড়ি
একশ জুতার বাড়ি।
আমি আইস্যা পড়ছিলাম সেইদিন।
@
সন্ধ্যা সময় ভাইয়া বাইর হইতাসে।
আমিও আস্তে আস্তে বাইর হইলাম।
ভাইয়া জামরুল গাছের নিচে
আইছে। নাইম ও আইছে। ভাইয়া
নাইমরে একটা চকলেট দিসে।
হায় আল্লাহ
ভাইয়া নাইমের প্যান্ট খুলসে,
তারপর তার টা খুলছে। তার সাথে
না কি জানি করতাসে।
নাইম চিৎকার মারছে জোরে।
অজ্ঞান হইয়া পইরা গেছে। ভাই
দৌড় দিয়া গেছে গা। আমি দেখি
একটা লোক তার চিক্কারে আইসে।
লোকঃ ওরে আল্লাহ! কোন শওরের
বাইচ্চা এই পোলার সর্ব্বোনাশ
করছে!
লোকজন জড় হল। নাইমকে
হাসপাতালে পাঠানো হল। জ্ঞান
ফেরার পর সব বলায় আমার
পরিবারকে বলল গ্রাম ছেড়ে চলে
যেতে। বাবা তার স্কুলমাস্টারের
চাকরি ছেড়ে দিল। নাইমের বাবা
মা আমার বাবা মার সাথে ভালো
সম্পর্ক ছিলো। তারা মামলা টামলা
কিছু করে নাই। আমরা তার পরদিন
গ্রাম ছেড়ে চলে যাই।
যাওয়ার দিন অধীর আগ্রহে ছিলাম।
যদি সে আসত। একটিবারের জন্য।
কিন্তু
এলো না।
সে তো হাসপাতালে ভর্তী।
এই ছোট্ট বুকটা আশা করছিলো। কিন্তু
বুকের তুলনায় আশাটা বেশ বড় হয়ে
গিয়েছিলো হয়তোবা। ট্রাক
ছেড়ে দিল। তাকিয়ে থাকলাম
সেই পথে যে পথে নাইম আর আমার
দুরন্ত প্রানচঞ্চল পা গুলো ছুটোছুটি
করত। কাশবাগান, আমগাঝ, পুকুর দেখে
নাইমোর কথা মাথায় আসছিলো।
কিন্তু
কিছু করার ছিল না।
এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর নিজের
ভিটায় গেলাম। সবকিছু পরিবর্তন
হয়ে গেছে। সেই কাশবন, পুকুর আর
বনফুলগুলো কোথায় যেন হারিয়ে
গেছে।ইতিউতি করছে আমার দু চোখ।
নাইম কে দেখব বলে। এক চা স্টলে
তাদের কথা জিগ্যেস করলাম।
শোনলাম তারা না কি কবে চলে
গেছে। কোথায়
তা কেউ জানে না।
জীবনের দ্বিপ্রহরের প্রথম সময়ে তার
সাথে দেখা হয় নি বলে আফসোস
নেই কিন্তু প্রভাতের প্রথম প্রহরে
তার সাথে শেষ দেখাটাও করতে
পারলাম না।
কে জানে? নাইম কেমন আছে?
নাইম কি আমার কথা ভাবে?
মনে করে আমাকে?
না কি প্রবীন বিসর্জন দিয়ে
নতুনত্বের আহ্বানে অবগাহিত সে?
থাক সে প্রশ্ন অন্তরালেই………..
*****(সমাপ্ত)*****

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.