প্রেতসাধনা

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.

হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ মাই ডিয়ার রয়। হ্যাপি
বার্থডে টু ইউ।

মোমবাতিতে ফু দেবার পর সবাই একসঙ্গে এ গানটি
গেয়ে উঠল। আজ রয় হার্ভের ১৮ বছর
পূর্ন । তারা বর্তমানে
নেত্রকোনা জেলার
দূর্গাপুর উপজেলায় অবস্থানরত। ঢাকার
কোলাহল, ঝঞ্ঝা এসব থেকে
ওষ্ঠাগত
প্রানের মাঝে হালকা
নবীনত্ব ও স্বস্তির
নিঃশ্বাস ফেলার জন্য,রয়ের বাবা মা আর
রয় সহ ছোট্ট পরিবারটি
এসে পড়ে ছোট্ট
উপজেলায়।রয়ের যদিও
পুরাতন বন্ধুবান্ধব দের
ছেড়ে আসতে একটুও মন চাইছিল না তবু
আসতে হয়েছে। আর তার মন
ভালো
করার জন্যই ছেলের
জন্মদিন উপলক্ষে
পার্টিটা দিয়েছেন তার বাবা। রয়ের দিকে
তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন
তিনি। কারন, রয়কে খুশি
খুশি দেখাচ্ছে। রয় এবার
এত গিফট পেয়েছে যে তার
খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে। যদিও বিশাল
বাড়ির গা ছমছমে ভাবটা
তার খুশিতে
কাটতে পারছে না। তবুও
তাতে তার বিন্দুমাত্র
দ্বিধা নেই। গিফটগুলো তার রুমে নিয়ে
এলো। ওয়াও সবাই কত
সুন্দর সুন্দর
গিফট দিয়েছে। রয়ের
মনটাই ভাল হয়ে গেল।
-আরে এটা কি? জোরেশোরে বলল রয়। যেন নিজেকেই
নিজে
প্রশ্ন করল। এটা একটা
ছবি মনে হয়। সে রেপিং
পেপারটা খুলে
ফেলল। ছবিটার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকল।
নিশ্চুপ নিঃস্তব্ধ
বিভীষিকাময় করাল এক
রজনীতে এক প্রেতসাধক
পিছন ফিরে
প্রেতসাধনা করছে। তার হাতে আগুন জ্বলছে।
ছবিটার দিকে
তাকিয়েই ধক করে উঠল
বুকটা। তার বিছানার
পায়ের দিকের দেয়ালে
সে ছবিটা টানিয়ে রাখল। তারপর সে দোতালা থেকে
নিচে নেমে
গেল। সে দেখেনি, ছবির
ভিতর প্রেতসাধকের
হাতের মাঝে থাকা
আগুনটা যে জ্বলছে। আগুনটা থেকে শিখা উঠছে।

২.

পরদিন সকাল।
নাস্তার টেবিলে রয় আর
তার বাবা বসে একসঙ্গে
নাস্তা করতে বসেছে। -রয়, কালকে
কেমন কাটল?
-বাবা ভালোই। জানো
কালকে একটা অদ্ভুত গিফ
পেলাম। -তাই
না কি! তা কি গিফট? – একটা ফটো। ছবিটার
ভিতরে প্রেতসাধক
প্রেতসাধনা করছে। –
বেশ ত।
-বাবা প্রেতসাধনা নিয়ে
কিছু জানো? -সেগুলো প্রকৃতির কালো
দিক। আর তা নিয়ে মাথা
না ঘামানোই
ভালো।
তবে বাবার এই কথা তার
মন গলাতে পারল না। সে চিন্তা করছে,
এই ছবিটা তাকে টানে
কেন? তা দেখতে হবে!
রাত্রে রয় ঘুমোতে যাবে।
ঘরটা অসম্ভব ঠান্ডা।
একটা থমথমে আবহাওয়া বিরাজমান।
গভীর কূয়োর ভিতরে যেমন
থমথমে ভাব
থাকে সেরকম একটা ভাব
আছে ঘরে। কাঠখর
পোড়ানোর শব্দ পেল রয়। আরে এই মুর্হুতে কে কি
পোড়াতে আসবে? শব্দের
সাথে একটা
গন্ধও ভেসে বেড়াচ্ছে।
কেমন যেন ধূপের গন্ধ।
রয়ের শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠল। ক্যাঁচ করে
জানালাটা খুলে গেল।
বাইরে একদম বাতাস
নেই তাহলে এরকম করে
জানালাটা খুলবে কেন?
সাতপাঁচ চিন্তা করতে পারল না রয়। বা
চিন্তা করার মত মন
মানসিকতা তার নেই।
কোনরকম যেন বিছানায়
উঠেই ঘুমিয়ে গেল।
হঠাৎ করেই যেন ঘুম ভেঙে গেল রয়ের। কেন ভাঙল সে
তা বলতে
পারবে না। গ্রান্ডফাদার
ক্লকে ঢং ঢং করে দুটো
ঘন্ট পড়ল।
মানে এখন রাত্র দুটো বাজে। ঠিক রাতত
দুটো।কানে আসছে বিড়বিড়
করে কিছু পড়ার শব্দ।
কেঁপে কেঁপে
উঠল সে সেদিন একটা
পেঁচার কর্কশ কন্ঠে ডাক শুনে। তার ঘরে কে
যেন কাঁদছে। রক্ত হিম
হয়ে আসল সেই নীরবস
রাত্রের কান্নার শব্দ
শুনে। আস্তে আস্তে মিইয়ে
যেতে লাগল সব কিছু। রুমে এখন
মর্গের মত শীতলতা
বিরাজমান।

৩.

রাত্রের বিষয়টা রয়কে
অসম্ভব ভাবিয়ে তুলেছে। না। এভাবে যদি
প্রতিরাত হতে থাকে
তাহলে সে তো ঘুমোতেই
পারবে না। কিন্তু
কিছু একটা তাকে করতেই
হবে। আজ রাত্রে সে অপেক্ষা করবে কিছু
হয় কি না!। আরে ছবিটা
সম্পর্কে সে খোঁজখবর ও
নিতে পারে! সে
গিয়ে বাবাকে বলল
– আচ্ছা বাবা, এই যে বড় ছবিটা। সেটা কে
দিয়েছিলো?
-সেটা মিস ক্যানিংহোম
দিয়েছে। কেন?
-না, এমনি।
কলেজ যাওয়ার সময় সে ক্যানিংহোম এর বাসায়
গেল। গিয়ে দেখে
তিনি উল বুনছেন। -আরে
রয়! এসো বসো।
-আন্টি আপনি একটা বড়সড়
ছবি দিয়েছিলেন সেটা অনেক সুন্দর।
সেটা কোথা থেকে
এনেছিলেন? আমি ভাবছি
ওরকম একটা জিনিস আমি
আমার বন্ধুকে
গিফট করব।
-সেটা তো মোহনলালের
এন্টিক শপ থেকে এনেছি।
-আন্টি ধন্যবাদ। আবার
দেখা হবে। -ঠিক আছে।
কলেজের কোন স্যারের
ক্লাসে একদম মন বসছে না। কলেজ শেষ
হওয়ার পর সে তাড়াতাড়ি
চলল সেই দোকানটার
দিকে।
দোকানটা শহরের
একপ্রান্তে। দোকানের ভিতরে একটা গুমোট
পরিবেশ।
দোকানিঃ কি চাই?
-মানে বলছিলাম যে,
কিছুদিন আগে একটা ছবি
এখান থেকে কিনে নেয়া হয়েছে।
প্রেতসাধকের। বলতে
পারবেন এটা কোথা থেকে
আনা
হয়েছিলো বা এটার
সম্পর্কে কি জানেন? -দ্যাখো ওরকম ছবি তো
অনেক আসে। -মানে
প্রেতসাধকের হাতে
আগুন জ্বলছিল। কোন
পেইন্টিং না একটা
ফটোগ্রাফ! -ও, সেটা আহসান হাবিব
নামে একজন ফটোগ্রাপার
আমার কাছে
বিক্রি করেছিলো।
-তার ঠিকানাটা কি
পাওয়া যাবে? -এই নাও।
সে দেখল যে এখান থেকে
আরো ১২৪ মাইল দূরের
শহরে তার বাসা।
সে চিন্তা করল যে করেই
হোক, ছবির রহস্যটা তাকে বের করতেই
হবে। সারাদিনের
পরিশ্রমে তার শরীরটা
একেবারে ভেঙে আসছে।
শাওয়ার ছেড়ে স্নান করে
সে ঘুমোতে গেল। ধুপ করে কি যেন একটা
শব্দ হল। সচকিত হয়ে গেল
সে মুর্হুতে।
আর সহ্য,করতে পারছে না।
তার কেমন যেন ভয় ভয়
লাগছে! কান্নাটা ভেসে আসছে
তার খাটের নিচ হতে।
চিন্তাই করতে পারছে
না যে তার ঠিক নিচে
কোন অশরীরি বিরাজমান।
তার শরীরের ঘামগুলো যেন টুপ টুপ করে
পড়ছে। টিক টিক করে ঘড়ি
চলছে এক
অদ্ভুতুরে নীরবতার মাঝে।
খাটের নিচ থেকে কোন
বস্তু যেন খাটের এককোন থেকে অন্যকোনে
ছেঁচড়ে চলছে। জানলাগুলো
খুলছে আর
বন্ধ হচ্ছে। ভাসছে
কান্না, ধূপ আর সেই
বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ার শব্দ। আর সহ্য করতে
পারছে না। শীতল কিছু
একটা স্পর্শ পেল
তার পায়ে।

৪.

সে ভয়ে ভয়ে মাথা তুলল। তারপর সে যা দেখল তা
অভূতপূর্ব,
বিশ্রী ভয়ংকর একটা
জিনিস। একটা মরা পচা
গলা দগদগে ঘা যুক্ত
বিশ্রী হাত খাটের নিচ হতে বেরিয়ে তার পা
চেপে ধরেছে। আতঙ্ক
যেন শরীর মন চুঁইয়ে
পড়ছে। ঘ্যঁচ করে যেন
বুকের মধ্য,কিছু ঢুকে
গেল। শ্বাস নিতে পারছে না। তার ভয়াবহ চিৎকারে
সারা বাড়ির
নীরবতা খানখান হয়ে
গেল।
****

যখন তার জ্ঞান ফিরল তখন
সে দেখল যে মার কোলে শুয়ে আছে।
সকাল আটটা বাজে।
রাত্রের কথা মনে পড়তেই
তার শরীরটা আবার
কেমন যেন করে উঠল।
শরীরটা হালকা দূর্বল লাগছে। তবে তার সে
ফটোগ্রাপার এর কাছে
যেতেই হবে।

সে রওনা দিল।
ফটোগ্রাপারের বাসায়
বাবা মার শত বাধা নিষেধ
সত্বেও। তাকে বাড়িতেই
পাওয়া গেল।
সে তার কাছে এসে সব
খুলে বলল। তখন
ফটোগ্রাপার আহসান তাকে একটা ঘটনা

শোনাল

আমি ২৫ বছর বয়সে
ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ
করি।সেখানকার
সুন্দর ও নতুন স্পটগুলোর সুন্দর ছবি তুলে দিতে হতো
আমায় যাতে
টুরিস্ট আকর্ষিত হয়!
একসময় সুন্দরবনের কিছু
ছবি তোলার জন্য আমি গেলাম। আমার সাথে আরো একজন ছিল।
আমাদের
সেবারের কাজটা ছিল
রাত্রের ভিউ নেয়া।
বেরিয়ে পড়লাম। ঘুরতে
ঘুরতে কখন যে গভীর জঙ্গলে পৌছে গেলাম তা
নিজেও জানি না।
হঠাৎ করে কানে আসে
বিড়বিড় করে কিছু পড়ার
শব্দ। আমি শব্দটা
অনুসরন করে গেলাম। যা দেখলাম তাতে রীতিমতো
অবাক হয়ে
গেলাম। শুধু অবাক না ভয় ও
পেয়েছি। দেখি যে একটি
উলঙ্গ মেয়ে
সারা সরীরে রক্ত মেখে হেক্স সার্কেলের
মিডিলে বসে একমনে
মন্ত্র পড়ছে। তার পাশে
লাল মোমের আলোতে চকচক
করছে
বিশাল এক রামদা। আর তারপর দেখলাম যে তার
সামনে একটা

ছোট্ট শিশু শোয়ানো আছে।
আমি লুকিয়ে পিক নিতে
থাকলাম।
তারপর সে বাচ্চাটাকে একটা পোঁতা কাঠগড়ার
দিকে নিয়ে যেতে
থাকল। আমি পরিস্থিতির
ভয়াবহতা বুঝলাম। আমি
টিমকে ফোন
করছিলাম। কিন্তু দেখি যে সেই পিশাচিনী রামদা
টা হাতে নিয়ে
সোজা নামিয়ে দিল
বাচ্চাটার ঘাড়ে। চাপা
গোঙ্গানি আমার গলা
থেকে বেরুল। সেই পিশাচী টা শুনে ফেলল। ততক্ষণে
আমাদের টিম
এসে পড়ল। সেই মেয়েকে
বেধেঁ পুলিশে দেয়া হল।
মেয়েটা আমায়
অভিশাপ দিয়েছিল যে তোর ছবির মধ্য আমি
মানুষের সর্বনাশ করব।
হেসে উড়িয়ে
দিয়েছিলাম। ছবিটা
বানালাম। এক সপ্তাহের
মধ্য,আমার স্ত্রী ও সন্তান মারা গেল।দেউলিয়া হয়ে
গেলাম আমি।
একজন এন্টিক শপের
মালিক ছবিটা আমার কাছ
থেকে কিনে নিল।
এই হয়েছিলো আমার জীবনে।
প্রতি অমবষ্যায় পিশাচী
একটা বলি নেয় তার
অমরত্বের জন্য।
আজ কিন্তু অমবষ্যা!

৫.
ফটোগ্রাপার এর বাসা
থেকে বেরুতেই গা টা
কেমন যেন গুলিয়ে
উঠল। বমি পেতে লাগল।
বাসা পর্যন্ত গেল অতি
কষ্ট করে। সারাটাদিন সে
বিছানায় শুয়ে থাকল।
সারাটা দিন গুমোট।
বাড়িটি যেন
মৃত্যুপুরী হয়ে গেছে। আজ
কারো না কারো জান চলে যাবে।
মৃত্যুপ্রহর গুনছে সেই
গ্রান্ডফাদার ক্লকটা।
টিকটিক করে জানান
দিচ্ছে প্রতিটি মূল্যবান
সেকেন্ড। রয়ের বাবা মা বাসায়,নেই। তাদের
দুজনেরই গুরুত্বপূর্ণ
কাজের জন্য,সন্ধ্যার আগে
ফিরবেন না।
আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। শো শো করে বাতাস বইছে। যে কোন সময়
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়বে।
বাড়িটি যেন মর্গ হয়ে
গেছে। প্রতিটা
বিজলীকে যেন মনে হচ্ছে
প্রেতের আর্তনাদ। হু হু বাতাসটা যেন
প্রেতের পাঁজরভাঙা
দীর্ঘশ্বাস। বাবা ফোন
দিয়ে বলে দিল যে
আসতে দেরী হবে। সন্ধ্যা
নামল সেই বাসায়। ইঁদুরও যেন কিঁচকিঁচ
করছে না আজকে। ঝড় শুরু
হল। তার রুমের ভেতর

বাড়ছে নীরবতা।
হঠাৎ করে তীব্র গন্ধ
পেতে লাগল ধূপের। বাড়ছে। আস্তে আস্তে
বাড়তে লাগল বাচ্চার
আর্তনাদ ও
কান্নামিশ্রিত শব্দ।
ছবিটা আজ
যেন খুব আকর্ষন করছে তাকে। সে ঘোরের
মধ্য,আছে। ছবির মাঝে
প্রেতসাধকটার হাতের
আগুনটা বাড়ছে। আস্তে
আস্তে সে এগুল
সেই ছবিটার দিকে। একটা হাত ঢুকাল। হাতটা ছবি
ভেদ করে চলে
গেল! খুলে গেছে দুই দুই
জগতের দরজা। আস্তে আস্তে
মাথাটা
ঢুকিয়ে দিল সে। চলে গেল অন্য ভুবনে। সেদিকে তার
বাবা মা চলে
এলো। তাকে ডাকছে তারা।
কিন্তু পাচ্ছে না। তার
রুমের দিকে
এগুলো তারা। অপরদিকে রয় সে জগৎ এ
গিয়ে দেখে একটা
ডাকিনী, বিভৎস
প্রেতিনী রূপী মূর্তিমান
রাহু ডেকে চলেছে
শয়তানকে। রয় আস্তে করে তার গলাটা বাড়িয়ে
দিল সেই কাঠগড়ায়।
শয়তান টা রাম দা
নিয়ে এগুচ্ছে।
ওদিকে রয়ের রুমে তার মা
বাবা ঢুকল। ঢুকেই চোখ পড়ল সেই
ছবিটাতে। কেমন যেন
অদ্ভুতুড়ে ছবিটা। রয়ের

মাঃ ছবিটা আমি নষ্ট
করে দিব!

রয়ের বাবাঃ দাও। সে দিকে রয়ের মাথার
উপর রামদা নিয়ে
দাড়িয়ে আছে পিশাচীনি।
সেই প্রেতসাধক। আস্তে
আস্তে নামিয়ে আনছে
রামদা। ওদিকে রয়ের মা হাত
থেকে ফেলে দিল ছবিটা।
ছবিটা মেঝেতে পরে
ভেঙে
গেল। রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে
সেই প্রেতসাধকের ছবিটা থেকে………..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.