বনলক্ষ্মী

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা
উৎসর্গঃ ‘রাহুল দেব’

১.
-যত্তোসব গাঁজা!
বলে অামি হেসেই উড়িয়ে দিলাম।
অরবিন্দ অামার দিকে তখন এমন দৃষ্টিতে তাকালো যেন তার অপূরনীয় ক্ষতি করে দিয়েছি। তার অগ্নিচোখ উপেক্ষা করার মতো নয় বলে কাঁচুমাচু হয়ে দিদিমা কে অাবার বললাম
-‘তারপর কি হলো?
দিদিমা পানের কৌটা থেকে পান বের করে অায়েশ সহকারে মুখে দিয়ে বললো

-তোরা হলি শহুরে ছেলেপেলে। তোদের কি অার ওসবে বিশ্বাস অাছে? তবে তোর দাদু বনলক্ষ্মী দেখেছিলেন!
অরবিন্দ দেখি নেড়েচেড়ে বসেছে। তার চোখ চকচক করছে। বাইরে তখন অবিরাম বর্ষার জলধারা। হ্যারিকেনের হলদেটে অালো পরিবেশের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। কেমন যেন মায়া ও রহস্য মেশানো। অামাদের ছায়াগুলো তিরতির করে নেচে যাচ্ছে, যেন তারাও রহস্যবৃত্তে বন্দী। অরবিন্দ না পেরে শেষে দিদিমা কে ত্যাগদা দিলো
-“তারপর কি হলো?”
দিদিমা বলতে লাগলো

“কি সুন্দর তার রূপ! বনলক্ষ্মী রাত্রে মন্দির হতে বের হয়। তারপর সারা বনে বনে হেটে বেড়ায়। নূপুরের ঝুম ঝুম ধ্বনি তে অাশপাশ অামোদিত হয়। গাছরা মাথা নুইয়ে প্রণাম করে! বনের ভেতর এখনো মন্দিরটা অাছে। তবে তা পতিত হয়ে অাছে। কেউ যায় না সে মন্দিরে। তবে শোনা যায় প্রতি রাত্রে দেবী বনে বনে হাটে। বনরক্ষক বলতে পারিস তাকে। অার ভুলেও দেবীকে তাচ্ছিল্য করতে নেই। অার বিরক্ত ও করতে নেই। কারন দেবী নীরবে থাকতে পছন্দ করে। তবে তাচ্ছিল্য তে মহাবিপদ অানে।

অামার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। অার পারছি না এসব। প্রাচীন উপকথা বই অার বুড়োবুড়ির কন্ঠেই মানায়। অামি এসব বনদূর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী কে নিয়ে সময় অপচয় করতে চাচ্ছি না। অাড্ডা ভেঙে চলে এলাম রুমে।

তখন বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। মনে পরছে সেসব কথা। তার ইচ্ছে ছিলো অজপাড়া গায়ে ঘুরবে। শেষমেশ মামাবাড়ি বেড়াতে এলাম প্রিয় মানুষ “অরবিন্দ” কে নিয়ে। অার এখনে এসে সে রূপকথার ডালা নিয়ে বসেছে। কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে অামি ঘুমানের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সে কখন অাসে জানি নাহ। বাতাস শনশন করে বইছে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে।

অামি ঘুমিয়ে গেছিলাম, হঠাৎ করে জেগে উঠলাম। বেশ চমকে গেছি! একটা ঠান্ডা শীতল হাত অামার বুকের উপর! জমে যাচ্ছি। রক্তে ভয়ের স্রোত খেলে গেলো। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে! বাইরে তখনো একঘেয়ে ভাবে বৃষ্টি পরছে। অামি অস্ফুট স্বরে বললাম

-“কে?”

হাতের মালিক তখন বেড়ালের মতো গুঁটি মেরে অামার বুকটাকে বালিশ বানিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
অরবিন্দ!
অামার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। অকারনে কি ভয়টাই না পেয়েছিলাম! এমন বৃষ্টিরাত্র কি অার নিরামিষ কাটিয়ে দেয়া যায়! দুষ্টামি শুরু করলাম। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম ফোঁটায় যেন একাকার হয়ে যায় দুটো দেহ….। সঙ্গম পরবর্তী সময় বৃষ্টি থেমে গেছে। চারদিকে শুধু ঝিঁ ঝিঁ পোকার অার্তনাদ। জেগে অাছি অামি। অামার বুকের উপর ঘুমিয়ে অাছে অরবিন্দ। সময় গড়াচ্ছে…।

২.
বৃষ্টির একঘেয়ে শব্দ শোনে ঘুম ভাঙলো। মেজাজ তখনি গরম হয়ে গেলো। বেড়ানোর প্ল্যান মাটি। সে বিছানায় নেই। অামি সারা গায়ে অলসতা জড়িয়ে শোয়ে অাছি। কিছুক্ষন পর সে চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। উদোম গায়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে তাকে বললাম

-“বৃষ্টি তো দিনের বারোটা বাজালো। তা কি করবা অাজ? “
সে অানমনে বললো
-‘দ্যাখি, রঙ ক্যানভাস সবই তো অাছে, ছবি অাঁকাতে পারি কি না।’
তার ছবি অাঁকার সময় অামি কোন ডিস্টার্ব করি না। সবসময় কি যে হিজিবিজি অাঁকে, অামি বুঝি না! এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে সে বলে

-”তোমার গড়, ট্যালির হিসেব যেমন অামি বুঝবো না, সেরকম অামারো অাঁকাবুকি তোমার কাছে অস্পষ্টই থাকবে। “
সে তার কাজ করুক! অামি ব্যাগড়া দেই না, কোন ছবি চোখের সামনে পরলে দাঁত বের করে বলে দেই, “চমৎকার এঁকেছো”!

দাদুর কথা মনে পরছে। দাদু গত হয়েছেন বছর ছয়েক অাগে। তখন দিদিমা কে বলে কয়েও মামা কিংবা মাসীদের বাসায় নেয়া যায়নি। অাদ্যিকালের বুড়ি না কি ভিটে কামড়ে পরে থাকবে। তারপর তার জন্য পাচক ও কেয়ারটেকার রেখে দিয়েছে মামা। সব মিলিয়ে বুড়ির দিন বেশ ভালোই যায়।

চিন্তারা সব প্রজাপতির মতো উড়ে গেলো তার কথায়। কি যেন বলছে সে তা শোনতে পাই নি। অামি বললাম
-“কি বললে?”
সে উশখুশ করতে করতে বললো
-“অাচ্ছা বনলক্ষ্মী সম্পর্কে তুমি কি জানো?”
অামি তার দিকে তাকালাম। তারপর বলতে শুরু করলাম

-“বনলক্ষ্মী এ অঞ্চলে বলা হয়। অঞ্চলভিত্তিক তার নাম অালাদা। সুন্দরবনের কাঠুরেরা মূলত এর পূজা করে থাকে। তার নাম অাসলে “বনদেবী”। মুসলিমরা একে “বনবিবি” ও বলে থাকে। গ্রীক উপকথায় নার্নিসাসের প্রেমে পরেছিলো “বনপরী” ইকো। অনেক জায়গায় একে বনপরী ও বলে। বনলক্ষ্মীর পাশে থাকে দাড়িওয়ালা এক চাচার মূর্তি। যতদূর জানি, তার বাহন সম্ভবত “রয়েল বেঙ্গল “। বনের বিভিন্ন অশুভ শক্তি থেকে বনদেবী রক্ষা করে থাকে। যারা বন ধ্বংস করে থাকে তাদের জন্য বনদেবী রুদ্র মূর্তি ধারন করে। তা হঠাৎ বনদেবী নিয়ে পরলে কেন?
সে কিছু বলে নি। চুপচাপ ছবি অাঁকায় মন দিলো। অামিও তাকে অার ঘাটাই নি।

বৃষ্টির বেগ কমে অাসছে। অামি তখন পাড়ার ছেলেদের সাথে কাদায় ফুটবল খেলতে নেমেছি। ময়লা পানি ও কাদায় পুরো সয়লাব। খেলা শেষে সব পুকুরে স্নান করছি। হঠাৎ ই কে যেন অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপারে টান মারলো। কানে অাসে সে কথাটা

-“অাজ থেকে তিনদিন তো বনলক্ষ্মী বেরুরে রে। রাতে অার বাইরে বেরুব না।”
কৌতুহলী হয়ে জিগ্যেস করলাম
-“বনলক্ষ্মী বেরুবে মানে?”
সে তখন অভ্যস্থ কন্ঠে বলতে লাগলো
-“চতুর্দশী, পূর্ণিমা ও ষোড়শী তে বনলক্ষ্মী বনে বনে ঘুরে। অাজ তো ভূত চতুর্দশী, অাজকে তিনি বেরুবের ই।”
অামি শার্লক হোমসের মতো ভাব নিয়ে তাকে বললাম

-‘তুমি কি করে জানো?
সে অামার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালো, যেন তা না জানা অপরাধ! তারপর তরল কন্ঠে বললো
-এ তো সবাই জানে।
তারপর সব অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে অালাপে মত্ত হলো। অামার মাথায় তখন বনলক্ষ্মী ঘুরছে। সত্যিই কি বের হন তিনি? যদি হন, তবে…..

৩.
ঘরে এসে দেখি সে একমনে ছবি অাঁকছে। দিদিমা মনে হয় ঘুম দিলো। তার ঘরে উঁকি দিতেই দেখি বুড়ি বসে অাছে। অামায় দেখে বলে অায়, অায়।
অামি ঘরে গেলাম। দিদিমা বলতে লাগলো
-“অাজ ভুলেও সন্ধ্যার পর বাইরে বেরুবি নাহ্, অাজ বনলক্ষ্মী বের হবে।”
অামিও মুচকি হেসে এ কথা ও কথা বলে চলে এলাম। মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরছে। অাজ বেরুতেই হবে।
রাত্রের খাবার পর সে অাবার তার ছবি নিয়ে বসেছে। অামি তাকে বললাম
-“সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। অামি কিনতে যাবো। “
সে হ্যাঁ, না কিছুই বলেনি। চলে গেলাম।

মন্দিরের লোকেশন জানতাম। পূবের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে অব্যবহৃত রাস্তা ধরে হাটতে হয় গোটা দশ মিনিট। তারপর বিশাল ছত্রাল হিজল গাছের নিচে মন্দিরটা। মন্দিরের অদূরেই একটা শ্যাওলাপরা পুকুর। এগুলো মাথায় ম্যাপ করে রাখা।

ছোটবেলা থেকেই অামি ছিলাম দুর্দান্ত সাহসী। একবার পানিতে একটা সাপের লেজ ধরে পানির মধ্য অাছড়িয়ে না কি মেরে ফেলেছিলাম। যদিও ধূরা সাপ ছিলো । কিন্তু এ জঙ্গলটা এমনই নীরব যে অসম সাহসী লোকেরও অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিবে। অামার অস্বস্তি বাড়ছে, কোন ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে না। অাকাশে চতুর্দশীর চাঁদ। ফালি ফালি জোৎস্না এ জায়গায় ও জায়গায় পড়ার পর জায়গাটাকে বেশ অাদিভৌতিক লাগছে। হাটতে হাটতে চলে এলাম। সামনে বনলক্ষ্মী মন্দির। মন্দিরের সামনে দাড়ালাম।

একা।
নীরব।
শীতল বাতাসের স্রোত।
চারদিকে নীরবতা।
ফোনের টর্চ দিয়ে ভেতরে দেখলাম।
শূন্য মন্দির।
কোন বিগ্রহ নেই।
কিছু মাটির সড়া টানানো! কিন্তু সড়ার মাঝখানটা খালি! সচরাচর মাটির সড়ার মাঝখানে মূর্তির ছবি অাঁকা থাকে। কিন্তু দেয়াল ভর্তি সড়ার কোন জায়গায় মূর্তির ছবি অাঁকা নেই।
অস্বস্তি বাড়ছে।
অাস্তে অাস্তে রূপ নিতে থাকলো ভয় এ।
বিশাল বড় বনের পেটে অামি একা দাড়ানো! অামার সামনে পরিত্যাক্ত এক মন্দির!! !
কথাগুলো মাথার মধ্য নিমিষে ঢেউ খেলে গেলো।
অাশেপাশে দোলনচাঁপার ঘ্রাণ।
ঘ্রাণ তীব্র হচ্ছে!
কারো নূপুরের ধ্বনি!
অামার ভয় রূপ নিলো অাতঙ্কে।
দৌড় দিলাম। দৌড়ছি!
প্রাণপনে।

অামার এ জঙ্গল থেকে বেরুতে হবে! প্রাণ নিয়ে! সময় কাটছে অার দৌড়াচ্ছি।
অনন্তকাল দৌড়ানোর পর বনশেষে যেন কেটে গেলো অাদিভৌতিকতার মায়া। অামি থামি নি। দৌড়ে চলে এলাম বাসায়। বাসায় ঢুকে হাঁপাচ্ছি। সে অামার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকানো! তারপর প্রশ্ন করলো
-কি হয়েছে?
-“কুকুরে তাড়া করেছিলো!”
সে শঙ্কিত হয়ে বললো
-কামড় অাঁচড় লাগে নি তো?
-নাহ।
অনুযোগ সহকারে বললো
-‘কি কি যে করো তুমি! যাক অামি ছবি এঁকে শেষ করলাম! দেখবে না?’
অামি অাগ্রহ নিয়ে তার ক্যানভাসের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখার পর অস্ফুট স্বর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
.
দেখি যে “একটা ছেলে একটা মন্দিরের সামনে দাড়িয়ে অাছে, অার মন্দিরের ভেতর অনেক মাটির সড়া! কিন্তু কোনটাতেই দেবী নেই! “
তার দিকে তাকাতেই দেখি, “পেছনে একটা ছায়া ধূয়ায় মিশে গেছে। বাতাসে দোলনচাঁপার ঘ্রাণ…….!”

৪.
অরবিন্দ বুঝতে পেরেছে যে অামার কিছু হয়েছে। অার এটাও বুঝতে পেরেছে যে অামি তা বলবো না। তাই অার চাপাচাপি করে নি।

সকালে ঘুম থেকে অাজ অামিই অাগে উঠলাম। সচরাচর কখনোই দেরী না করে উঠা হয় না। উঠে দেখি তার নিষ্পাপ মুখ। অামার বুকের লোমের মাঝে নাক ডুবিয়ে গুঁটিশুঁটি মেরে শুয়ে অাছে। মনটা বেশ চনমনে হয়ে গেলো। রাত্রের কথাগুলো মাথায় অাসতেই মনে হচ্ছে সব যেন ছেলেমানুষি। কিসে ভয় পেয়ে চলে এসেছি! অাতঙ্ক ও অস্বস্তিতে! এগুলো কখনো মানুষের ক্ষতি করে না। এ অসম সাহসী দিনের বেলার অামার কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে। সময় সাহসকে কত পরিবর্তন না এনে দেয়।
যা হোক, অাজ পূর্ণিমা। অাজ অার মিস করা যাবে না। ভয় পেয়ে দৌড়ানোও চলবে না। যেন নিজেকে নিজে বুঝাচ্ছি। হঠাৎ অরবিন্দ ঘুমমেশা কন্ঠে জিগ্যেস করলো
-“কিসব বকছো?”

অামি সে প্রসঙ্গে না বলে তার কপালে চুমু দিয়ে বললাম
-উঠবে না?
সে কিছু না বলে তার নাকটা অারেকটু গুঁজে দিলো অামার বুকের মাঝে….।
.
ঘুম থেকে উঠা ও প্রত্যাহিক কাজ সারতে সারতে দেখি যে বেলা বেশ হয়ে এসেছে। দিন কাটছে কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে করতে। অবশেষে এলো অাকাঙ্খিত রাত।
ডিনারের সময় হলো।
দিদিমা খাওয়াদাওয়া রুমে করতো। অামাদের খাবার পাচক রুমে দিয়ে যেতো। তারপর খাওয়া শেষে সে সবকিছু নিয়ে যেতো। খাবারের পর অরবিন্দ কে বললাম
-“একটু হেটে অাসবো।”
-“চলো!”

এই পরলাম বিপদে। তাকে তো নেয়া যাবে না! গ্রামে সে অনভ্যস্ত। তারপর উপকথা তাকে গোগ্রাসে গিলেছে। কিছুতে ভয় পেলে তো সমস্যা। কাটিয়ে কি করে যাওয়া যায় সে চিন্তা পুরোদমে ঘুরছে। হঠাৎ বললাম
-” পুরনো এক বন্ধুর সাথে কিছু সময় কথা বলবো তো, তুমি থাকলে হয়তো সে স্বাভাবিক হতে পারবে না।”
-“অাচ্ছা ঠিকাছে। “
চিন্তা করছি, এত সহজে মানার বান্দা তো না। তাহলে কি…?

চলছি। অাজ বাইরে অথৈ পূর্ণিমা। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে মৃত পূর্ণিমা। চাঁদটাকে মড়ার খুলির মতো ফ্যাকাশে লাগছে। জোৎস্না যেন শাদা হাড়ের গুঁড়ো। অাজকের পরিবেশ টা কেমন যেন মায়াবী। মাথায় ঝিম ধরে যায়।
বনে ঢুকে গেলাম। কিছু পেঁচা কর্কশ কন্ঠে ছোঁচার উপর ঝাপিয়ে পড়ছে। শব্দটা বুকে লাগলো। অন্যকোন দিকে কর্ণপাত করলাম না। গন্তব্যস্থান মন্দির। কিছুক্ষন হাটতেই দূর হতে অাবছা হিজল গাছটা দেখা যাচ্ছে। ঝট করে কে যেন হিজল গাছের পাশে লুকিয়ে পড়লো!
অামি ভাবলাম, এ কি অামার চোখের ভুল?
সাহস হারালাম না। মনকে প্রবোধ দিলাম, মনের ভুলে বলে। হাটার গতি স্লথ হলো। এখন অামি হিজলের নিচে দাড়ানো।

কেউ নেই।
অাবহাওয়া গুমোট।
অস্বস্তিকর।
পাশেই কোথায় যেন শোনতে পেলাম নূপুরের ঝুম ঝুম ধ্বনি।
চিন্তুা করছি, সাথে ভয়ও পাচ্ছি। যাবো কি? না কি যাবো না….!

শেষ পর্যন্ত কৌতুহল বিজয়ী হলো। পা চালালাম। শব্দটা অাসছে পুকুর পাড় হতে। পাড়ে দাড়ালাম।
অাবারো যেন চোখ ধোঁকা দিলো! কে যেন ঝট করে দৌড়ে চলে গেলো পুকুরের উপর দিয়ে। অনেকটা বাতাসের বেগে!

এবার বেশ ভয় পাচ্ছি! সাথে এসে জুটছে অাতঙ্ক। অামার অস্তিত্ব কি কেন অপদেবীকে রাগিয়ে তুলেছে! ভয় জমছে বরফের মতো। উল্টো হাটা দিলাম। দ্রুত। অাজ অার দৌড়ালাম নাহ। হিজল গাছের কাছে অাসতেই যা দেখলাম তা অামার ২২ বছরের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা!

“”দেখি যে সবুজ শাদা শাড়ি পড়া, হালকা অলংকারে অাবৃত এক অপরূপা বসে অাছে হিজলের ডালে! কোন স্বর্গের দেবী! সাথে বসা একটা বাঘ!””

অামার বোধশক্তি লোপ পাচ্ছে। অাতঙ্কে অামি যেন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। অমিও অবিচ্ছেদ্য ভয় অামায় জাপ্টে ধরেছে। অস্ফুট স্বরে বললাম
-“কে অাপনি!”
তখনি সে দেবীমূর্তি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। চারদিক হতে শোনতে পেলাম কাঁটা দিয়ে উঠা এক শব্দ!
হাসির!

কি মর্মস্পর্শী সে শব্দ। বনের নীরবতা ভেঙে খানখান হয়ে গেলো। অামার মনে হচ্ছিলো অামি এখন জ্ঞান হারাবো। শেষ শক্তিটুকু সম্বল করে দৌড় দিলাম। পেছন থেকে হাসির শব্দ অাসছে। হঠাৎ ধাক্কা খেযে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

৫.
চোখ খুলে দেখি যে অামি বনে অাছি। কেউ কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে। মৃদু শব্দ করতেই লোকটা অামাকে কোল থেকে নামালো। মুখ ফুটে বের হলো একটা শব্দ
-“অরবিন্দ”!
অরবিন্দ অামার দিকে শঙ্কা নিয়ে তাকিয়ে অাছে। তারপর বললো

-“ঝামেলা কিছু একটা করবে তা অাগেই বুঝতে পারছিলাম। গতকাল দৌড়ে অাসার ঘটনাটার সঠিক কারন বলো নি। কারন কুকুর তাড়ানো তুমি ভালোকরে পারো। অার কুকুরের কাছে তাড়া খেয়ে অাসার কথা বিশ্বাসযোগ্য না। বাকি রইলো একটাই! বনলক্ষ্মী মন্দির! পাচকের কাছে শোনে অামি বনে ঢুকছি। ঢোকার সাথে সাথে কারো দৌড়ানোর শব্দ, অার তারপর অদূরেই গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে পরে যাও। অামি এসে তোমায় অজ্ঞান অবস্থায় পাই। জ্ঞান ফিরতে দু মিনিট ও লাগে নি।”

এক নিঃশ্বাসে সে এসব কথা বলে গেলো। অামি ধাতস্ত হয়ে দূর্বল গলায় বললাম
-“একটা কথা বলবো?”

-“বলতে হবে না! হাসিটা অামি বনে ঢুকতেই শোনেছিলাম। বেশ ভয় পেয়েছি। চলো বন থেকে বেরিয়ে যাই! “
তার কাঁধে ভর দিয়ে চলতে লাগলাম। হঠাৎ বেশ বাতাস। বনে যেন তান্ডব নেমেছে। মুহুর্তে অাকাশ কালো করে ফেলেছে। ভয়াবহ বন থেকে বেরিয়ে এলাম দ্রুত।
বাসায় পৌছেই প্রথমেই ডাকলাম দিদিমাকে। সাড়া নেই। বুড়ির ঘরে গিয়ে দেখি ফাঁকা। অরবিন্দও চিন্তা করছে, কোথায় যেতে পারে?
পাচক কে ডাকলাম। সে সামনে অাসতেই তার দিকে কর্কশ কন্ঠে প্রশ্ন ছোঁড়লাম
-“দিদিমা কোথায়?”
পাচক অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর যা শোনালো তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য

-“দিদিমা তো দুদিন হলো ছেলের বাড়ি গেছে! অাপনি জানেন না! জমির কাগজে কি ঝামেলা হয়েছে তা দেখতে গেলো! তিনি না অাপনাদের ফোন করে জানিয়ে যাবে! অামার কাছে রান্নার সব দ্বায়িত্ব বুঝিয়ে গেলো, অার কাল তিনি চলে অাসছেন! “

অামার মুখ মরা মাছের মতো হাঁ হয়ে গেছে! অরবিন্দের দিকে তাকাতে দেখলাম, তার মুখ রক্তশূন্য! অামি একটা কথাই বললাম

-“কাল খুব ভোরে অামি চলে যাবো”

কেউ কোন কথা বলেনি!

দিদিমা খুব ভোরেই চলে এলো। এসে একথা ও কথার পর অাফসোস করছেন। বলছেন যে
-“অামার দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে এ বুড়ো বয়সে। তাই ব্যস্ততায় অার মনে ছিলো না রে কথাটা জানানোর। পাঁচু তো জানিয়ে দেয়ার কথা। ”
একথা ওকথা বলার পর তিনি বলছেন যে অারো দুটো দিন থেকে যেতে, কিন্তু অামি অামার সিদ্ধান্তে অনড়। বিকেল বিকেলই রওনা দিলাম।
রিক্সায় উঠেই একটা কথা মনে হলো। অরবিন্দ কে বললাম

-“অাচ্ছা তুমি সে ছবিটা কেন এঁকেছিলে?”
তখন অরবিন্দ বললো
-“রাত্রে অামি স্বপ্ন দেখেছিলাম যে একটা ছেলে মন্দিরে দাড়ানো। মন্দিরের সড়ায় কোন ছবি নেই। তাই কল্পনাটা ফ্রেমে বেঁধে রাখলাম। “

চুপচাপ চলছি রিক্সায়। অাকাশে মেঘ। রাস্তার বাঁকে বনটা চোখে পড়লো। অাস্তে অাস্তে চোখের অাড়ালে চলে যেতে থাকলো। অাড়ালে চলে গেলো বনলক্ষ্মী মন্দির অার………!” 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.