বাদল দিনে দেখেছিলাম তারে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১।

কাঁধে ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে ট্রেন থেকে তাড়াতাড়ি নামলাম। নামার সাথে সাথেই ট্রেন ছেড়ে দিল। মনে হল ট্রেন যেন আমার জন্যই থেমেছিল। স্টেশনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাকই হলাম।কারন স্টেশনটা একবুক শূন্যতা নিয়ে দাড়িয়ে আছে।বামে তাকাতেই চোখে পড়ল বৃষ্টি ও ঝড়ে ক্ষয়ে যাওয়া সিমেন্টের একটি নেমপ্লেট।সেখানে বড় বড় হরফে লেখা “অতিথিপুর”। আশেপাশে কাউকে চোখে পড়ছে না।আকাশের দিকে তাকালাম। কালো হয়ে আছে।মেঘে মেঘে। যেকোন সময় নামতে পারে প্রকৃতিরআর্শীবাদ। দাড়িয়ে না থেকে স্টেশনের বাইরে এলাম।এসে দেখি একজন ঘোড়া নিয়ে দাড়িয়ে আছে।কিন্তু চারপাশে কোন যানবাহন চোখে পড়লো না।আমার ইতিউতি সন্ধানী চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যাটা যেন মনের কথা বুঝতে পারলো। আমাকে বললো,
-কোথায় যাবেন ভাই ?
-হরিপুর বাজারে যাবেন?
-চলেন।
-ঘোড়াতে করে?
-হা , কেন কখনো ঘোড়ায় চড়েন নি?
-না এটাই প্রথম।
-ঠিক আছে। উঠে আমাকে শক্ত করে ধরুন। নয়তো পড়ে যেতে পারেন।
এই বলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

একটু গভীরভাবেই তার দিকে তাকালাম। চেহারায় এক ধরনের মফস্বলীয় সরলতা রয়েছে।তামাটে হয়ে যাওয়া চামড়ার সাথে লালকালো চেক শার্টটা চমৎকার ভাবে মানিয়ে গেছে।ঠোঁটের উপর গোঁফজোড়া ঠোঁটের কোনা ধরে ধরে ঝুলে পড়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে মুক্তোর মতো দাঁত দিয়ে হাসলো। তারপর তার গমগমে উক্তি,
-ভাই উঠে পড়েন।
আমি তার থেকে চোখগুলো জোড় করে সরালাম।তারপর ঘোড়ায় উঠলাম । ঘোড়া চলতেই অদ্ভুত এক দুলুনি অনুভব করলাম।পড়ে যাওয়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি জড়িয়ে ধরলাম।কেমন যেন সংকোচ বোধ হচ্ছিল । কিন্তু লোকটির নিঃস্পৃহতায় আমি স্বাভাবিক হলাম।

২।

ঘোড়া চলছে তার নির্দিষ্ট ছন্দে। কানের কাছ দিয়ে শো শো করে শিস কেটে যাচ্ছে বাতাস । বাতাসে আর্দ্রভাব বেশী।তার মানে যেকোন সময় বৃষ্টি নামবে। মাঝে মাঝেই আমার নাকটা পৌছে যাচ্ছিল ঘোড়সওয়ারের ঘাড়ে।আর তখনি আমি টান দিয়ে ভিতরে নিচ্ছি এক ধরনের ‘পুরুষমাদকতাময়’ গন্ধ।নিজের কাছে নিজেকে ছোট ছোট লাগছে। এ অবস্থা কাটানোর জন্য প্রথম প্রশ্নবান ছুঁড়লাম সেই ঘোড়সওয়ার কে লক্ষ্য করে,
-আপনার নাম কি ভাই?
-অঞ্জন। আপনার?
-সৌমিক ।
-আচ্ছা আপনি কার বাড়ি যাবেন?
-হরিপুর সরকার বাড়ি ।
লোকটি কন্ঠে নিখাদ বিষ্ময় নিয়ে জিগ্যেস করলো,
-আপনি রাজীব দার কিছু হন?
-আমি তার ছেলে।
কেন যেন লোকটা আর কথা বলে নি।চুপচাপ চলছি। ঘোড়ার খুঁড়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আর তা যেন আঘাত করছে নীরবতার মর্মে। হঠাৎ করেই নেমে এলো বৃষ্টি। এতে অবাকই হলাম।লোকটা প্রবল বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।রাস্তার মোড়ে আগাছার মতো গজিয়ে উঠা একটা চায়ের দোকানে এসে ঘোড়া থামল। দোকানটা বন্ধ। এমন ভরা বাদলের দিনে কেই বা পাতি দোকান খুলতে যায়। বৃষ্টিতে আমরা ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছি।লোকটা অবলীলায় তার শার্ট খুলে ফেলল।আর আমি অপরাধীর মতো চোরা চোখে তাকে গিলে যাচ্ছি।শার্ট নিংরানোর সাথে সাথে তার হাতের পেশীগুলো ফুলে উঠলো।বুক বেয়ে বেয়ে নাভীমূলে পড়েছে কাঁচবিন্দুর মতো জল।
আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-গেঞ্জি খুলে চিপে নিন। তাহলে ঠান্ডা লাগবে না।
আমিও বেদবাক্যের মতো তার কথা মাথায় নিলাম।টি শার্ট টা খুললাম। লোকটা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।কেমন যেন লজ্জা লাগছে।অবশ্য ফার্মের মুরগীর মতো সারাদিন বাসায় থেকে থেকে ধবধবে সাদা হয়ে গেছি। স্থনবৃন্ত পর্যন্ত গোলাপী। আমি তাড়াতাড়ি টি শার্ট টা পড়লাম। একটা বেঞ্চ ছাউনির মাঝে পড়ে আছে।আমি সেখানে গিয়ে বসলাম।লোকটা তখনো খালি গায়ে।তার শার্টটা একটা খুঁটির সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে আমার পাশে এসে বসলো।

৩।

বৃষ্টির বেগ তখন তুঙ্গে।মনে হচ্ছে বৃষ্টিতে ভেসে যাবে চারদিক।অঞ্জনের শরীর থেকে বৃষ্টিভেজা ঘামের গন্ধে আমার বুকে যেন ড্রাম বাজছে।চোখে জেগে উঠেছে নেশা।প্রবল পৌরুষময় গন্ধে দাড়িয়ে যাচ্ছে আমার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ।আমার আঙ্গুলের সাথে তার আঙ্গুলের একটু ছোঁয়া লাগল।শরীরটা আমার কেঁপে উঠলো। তার দিকে তাকালাম।শূন্যদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।কাছেই কোথাও একটা বাজ পড়লো। ভয়ে কেঁপে গিয়ে তার দিকে একটু ঘেঁষলাম ।বাতাসের সাথে আসা হালকা বৃষ্টি আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে। এবার সে আমার দিকে তাকালো।তার দুচোখের বাঁধনে বাধা পড়েছে আমার এ দু চোখ।খুব কাছাকাছি চলে এসেছি দুজনে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস আমাত জাগিয়ে দিচ্ছে কামনা।দুজনের ঠোটগুলো খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। অঞ্জন আস্তে করে এগিয়ে দিল তার ঠোঁট । কাছে কোথাও বাজ পড়লো। আমি চমকে গেলাম আবারো। হঠাৎ করে বিবেকবোধ জাগ্রত হলো। নিজেকে নীচমনা লাগছিল। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। সেভাবেই দাড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষন। হঠাৎ দেখলাম বৃষ্টি কমে গেছে।চুপচাপ ঘোড়ার পাশে এসে দাড়ালাম।লোকটা শার্ট পড়ে নিঃশব্দে ঘোড়ার পিঠে চড়লো। আমিও উঠে তার কোমর ধরলাম। মনে হচ্ছে কেমন যেন একটা নিঃশব্দ বিচ্ছেদ হলো।চুপচাপ চলছি।বাতাসে ভেজামাটির সোঁদা গন্ধ।
ঘোড়া চলছে দ্রুত।
দেখতে দেখতে চলে এলাম হরিপুর বাজারে। গ্রাম্য বাজারের সমস্ত দোকানপাটগুলোও যেন মিলেমিশে আছে। ঘোড়া থেকে নামতেই দেখলাম কে যেন আমার দিকে দৌড়ে আসছে। হতে পারে বাড়ির কেয়ারটেকার। তারই থাকার কথা ছিল। অঞ্জনের ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। চুপচাপ চলে যাচ্ছে।আমাকে সে দিয়ে গেছে বৃষ্টিভেজা কিছু অনুভূতি।একবার যদি পিছন ফিরে তাকাতো তাহলে দেখতে পেত তার গমনপথে আমি তাকিয়ে আছি। কিন্তু সে ফিরে নি।আমিও রওনা দিলাম আমার গন্তব্যে।

৪।

বাড়ির উঠোনে দাড়িয়ে আছি।বিশাল কাঠের দোতলা বাড়ি। কিন্তু কোথায় কেউ নেই। জীবিকা নয়তো ষোলআনা নাগরিক সুবিধা ভোগের জন্য সবাই পাড়ি দিয়েছে শহরে।প্রথম প্রথম সবাই ছুটি কাটাতে বেড়াতে আসতো, কিন্তু এখন আর কেউ আসে না।আর আমি এলাম এই প্রথম। অদ্ভূত এক আবেগ অনুভব করছি।একটা কথা আমার বুকের ভিতর থেকে আসছে ‘আহ্ আমার পৈত্রিক ভিটা’।
দোতলার একটা কামরায় ব্যাগ রাখলাম।বাড়িতে একজন কাজের মাসিও আছে।তাকে বলে দিলাম রাতে খিচুরি, মাংস খাবো। আবারো শুরু হল বৃষ্টি। বাতাসে ভেসে আসছে কদম ও দোলনচাঁপার গন্ধ। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। টপাটপ করে আম পড়ছে। কিন্তু হায়! কোন মানুষ নেই আম কুড়ানোর।পুরো মৃত একটা বাড়ি।কোথায় বাড়িতে অনেক মানুষ থাকবে ,সরগম থাকবে বাচ্চাদের কান্নাকাটিতে। তারা আম কুড়োবে , কাঁদায় খেলবে। বড়দের কন্ঠে থাকবে প্রশ্রয়ের ধমক।কিন্তু না, কোথায় যেন তাল কেটে গেছে।হারিয়ে গেছে সব।এসব ভাবতে ভাবতে কেন যেন বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।দু চোখ দিয়ে গলগল করে জল পড়ছে। মুছলাম না সেই বেদনার জল। নেমে পড়লাম উঠোনে।
কাঁদছি।
বৃষ্টিতে ভিজছি।
আমি একা।
আর কেউ নেই।
শুধু আছে টিনের চালের উপর আছড়ে পড়া বৃষ্টির শব্দ।কি সুন্দর সুর!
রাত্রে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম ।কামিনী ফুলের ঘ্রান পাচ্ছি। বর্ষার আয়োজন যেন পুরো দমে চলছে প্রকৃতিতে। এর মাঝেই দরকারি কাজটা সেরে ফেলেছি। বাড়ি বেচার কথাবার্তা। বাড়িটা বেচে দিব।মনে হচ্ছে বাড়ি না ,বেচে দিচ্ছি বাপ দাদার শৈশব ও স্মৃতিগুচ্ছ।এগুলো রাখতেও চাই না। কারন মানুষগুলোই আর নেই। এগুলো হারিয়ে যাক আমার অন্তরালে।

৫।

পরদিন সকালে রওনা দিলাম।বাসায় চলে যাবো।বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে শেষবারের মতো বাড়িটার দিকে তাকালাম। করুণভাবে চাইতেই বাড়িটা যেন বলতে চাইছে,”আমাকে অপরের হাতে তুলে দিও না।”
আমি শোনতে পাই নি বাড়ির কান্না।হয়তোবা শোনতে চাই নি।একটা রিক্সা দিয়ে স্টেশনে আসলাম।কিছুক্ষনের মধ্য ট্রেন এলো। সিটে বসে পড়লাম। বসার সাথে সাথেই স্যান্ডির ফোন,
-কিরে হিরু, কোন খবর নেই।কারো প্রেমে ডুবেছিস না কি?
-হ্যাঁ।
-তাই?কোথায় দেখা হায়েছিলো?
আমি চুপ থেকে বললাম,

-“বাদল দিনে দেখেছিলাম তারে”।

তারপর ফোনটা কেটে দিলাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। বৃষ্টি নামছে ঝরঝর করে। এখন অঞ্জনের কথা মনে পড়ছে খুউব। মনের ভেতর একজন অপরিচিত মানুষের আনাগোনা চলছে। নীরব মনে জানালা দিয়ে তাকালাম। চারপাশ বৃষ্টিতে আচ্ছন্ন। জানালা বেয়ে আসা বৃষ্টির ছোট ছোট ফোঁটায় ভিজে যাচ্ছি। ট্রেন চলছে দ্রুতগতিতে । ভবিষ্যতের দিকে………

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.