ভালোবাসার রুপকথা

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

(চৈনিক উপকথার ছায়া অবলম্বনে অনুগল্প টি রচিত। চৈনিক উপকথায় বেশ কিছু মানবীয় গুন বা দোষকে আবেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আর লেখক সেই বিষয়টাকেও অপরিবর্তিত রেখেছেন)

আচ্ছা সবাই তো জানে ছেলে মেয়ের ভালোবাসার সম্পর্ক। ইদানিং না কি মানুষ সমলিঙ্গের প্রতিও আকৃষ্ট। কিন্তু “ভালোবাসা” বলে যে আবেগ টা আছে, তার ঘটনা জানেন কি কেউ? তার কি হয়েছিলো?
আচ্ছা, শুনুন তাহলে সে গল্প…

ইশ্বর মানুষ তৈরীর আগে আবেগগুলো নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। তারপর একেকটা আবেগকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে দিলেন। সেই আবেগগুলো হলোঃ “ভালোবাসা, পাগলামি, ভয়, নিচতা, ঘৃনা, রাগ, সংকীর্ণতা, দুঃখ, সুখ, মিথ্যাসহ আরো অনেকে। তারা প্রতিদিন হেসেখেলে সময় পার করতো। এর মাঝে “পাগলামি” ছিল ভীষন একগুঁয়ে স্বভাবের। সে যা বলতো তাই সবাইকে মানতে হতো। নয়তো কারো ক্ষতি করে বসতো, কাউকে করতো আহত। সবাই পাগলামিকে যতটা ভয় করতো “ভয়কেও” ততটা ভয় করতো না। ওদিকে ভালোবাসা ছিলো স্বপ্নালু। তার কাছে সমস্ত আবেগ ছুটে আসতো। তাকে একটু ছুঁয়ে দেখার জন্য। তার মাঝে যে আছে অপার শান্তি। অপার সুখ। একদিন সবাই মিলে ঠিক করলো যে তারা লুকোচুরি খেলবে। যেই কথা সেই কাজ। সবাই অতি উৎসাহে খেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো। তারা এর আগে লুকোচুরি খেলেনি।

ভালোবাসা তাদেরকে বললো – শোন তোমাদের, একজন ১-১০০ পর্যন্ত গুনবে। তার মধ্য আমরা লুকিয়ে পড়বো। যাকে প্রথমে বের করবে সে পরেরবার গুনবে। ঠিক আছে?
সবাই কায়মনোবাক্যে মেনে নিলো ভালোবাসার কথা। তারা সবাই মিলে ঠিক করলো যে প্রথমে গুনবে “মিথ্যা”। কিন্তু এতে বেঁকে বসলো পাগলামি।
পাগলামি বলছে – না, প্রথমে আমি গুনবো।
ভালোবাসাঃ সমসময় জেদ করা ভালো নয়, পাগলামি।
-আমি জেদ করবোই। জেদ আমার বন্ধু। আমি জেদ করতেই পারি।
– কিন্তু এই সাধারন জিনিস নিয়ে জেদ করা ঠিক নয়। কিন্তু কিছুতেই কথা শুনছেনা পাগলামি। শেষে হাল ছেড়ে দিলো সে। বললো
-ঠিক আছে, তুমিই গোন।
পাগলামির পাশে ” আনন্দ” দাড়ালো। পাগলামি আনন্দে হেসে দিলো।

সে গুনতে শুরু করলো ১, ২,৩,৪…. এর মাঝে মিথ্যা সবাইকে গলা উঁচিয়ে বললো -আমি খড়ের গাঁদায় লুকবো। কিন্তু সে লুকালো গাছের পিছে। কোমলতা লুকালো মেঘের কোলে, ভয় লুকালো অন্ধকারে, বেদনা লুকালো কাঁটাঝোপে, আনন্দ সূর্যের আলোয় মিলিয়ে গেলো আর ভালোবাসা লুকালো সাদা রঙের গোলাপ ফুলের ঝাঁড়ে। সবার লুকানো শেষ হলো আর পাগলামির গোনাও শেষ হলো।

পাগলামি বললো -এবার আসছি আমি। পাগলামি সবকিছু খুঁজেছে। প্রথমেই চোখে পড়লো অন্ধকার। অন্ধকারের মাঝে ভয়কে লুকিয়ে থাকতে দেখলো। সে আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সাথে সাথে আনন্দকেও দেখে ফেললো। একে একে সবাইকে খুঁজে বের করলো সে, কিন্তু ভালোবাসাকে খুঁজে পেলো না।
তার মাথা আবার গরম হয়ে যাচ্ছে! কেন পাবে না সে। কোথায় আছে! কোথায় সে! সে আস্তে আস্তে সবজায়গা খুঁজে দেখলো ভালো,করে। কিন্তু ভালোবাসা নেই!

“খুঁজলে ভালোবাসা ধরা দেয় না। সে কি নিষ্ঠুর!”

সে আর সহ্য,করতে পারছে না। পাগলামি ক্রমশ মাথাচড়া দিয়ে উঠছে। হঠাৎ করে গোলাপের ঝোঁপটা কেমন যেন নড়ে উঠলো! পাগলামির তখন আর স্বভাবিক চিন্তা করার মতো মানসিকতা ছিলো না। সে গোলাপঝাঁড়ের দিকে এগুলো।অনেক কাঁটা! সে একটা তীক্ষ্ণ কঞ্চি দিয়ে গোলাপের ঝোঁপে খোঁচাতে লাগলো । কিন্তু কিছুই নেই। হঠাৎ করে শোনা গেলো গগগগনবিদারী আর্তচিৎকার। সবাই ভয় পেয়ে গেলো! গোলাপের ঝোঁপ থেকে উঠে দাড়ালো ভালোবাসা। সবাই তাককে দেখে আঁতকে উঠলো। তার চোখ দুটো কঞ্চির খোঁচায় গলে গেছে।চোখ দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে । রক্ত সাদা গোলাপকে লাল করে দিয়েছে। ভালোবাসার এই দুঃসময়ে আনন্দ চলে গেলো। কিন্তু দুঃখ তার কাঁধে হাত দিয়ে বললো

-“আমি তোমার দুঃসময়ের বন্ধু”

ওদিকে পাগলামি ভড়কে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কেন সে এমন করলো! তার ভালো,বন্ধুর এতো বড় সর্বনাশ! সে ভালোবাসার পায়ে ধরে বললো -আমি অপরাধ করেছি। আমাকে কি সাজা দেবে বলো।”
এই কথা বলে পাগলামি চিৎকার করে কাঁদছে। বুকটা ফেটে যাচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্টে। তার মুখটা নীল হয়ে গেলো। ভালোবাসাও খুব কষ্ট পাচ্ছে। পাগলামি তাকে এতো ভালোবাসে! সে পাগলামিকে বুকে টেনে নিলো। আর বললো -কান্না করো না। আমার কষ্ট হয়। তবে তুমি যেহেতু অপরাধী, তোমাকে সাজা পেতে হবে। পাগলামী ভীত চোখে ভালোবাসার দিকে তাকিয়ে আছে। পাগলামি ভালোবাসার বুক থেকে মুখ তুলে বললো
-কি সাজা দিতে চাও?
-তুমি আমার পথ চলার সঙ্গী হও।

একথা শোনার পর পাগলামি ভালোবাসাকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল আর তারপর থেকেই ভালোবাসা অন্ধ ও পাগলামি তার পথের সাথী।

……………
(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.