মনপোড়া শ্রাবণে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
আজ ২২ শে শ্রাবন।
কবিগুরুর ৭৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী।আমি দাড়িয়ে আছি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে, যেখানে কবিগুরু তার জীবনের বড় একটা অংশ কাটিয়ে দিয়েছেন।দোতালার বারান্দায় দাড়িয়ে আকাশের দিকে নিক্ষেপ করেছি শূন্য দৃষ্টি।শ্রাবনের কালো মেঘে ছেঁয়ে আছে আকাশটা।সেই সাথে আছে ভেজা বাতাসের প্রবল ঝাঁপটা।হয়তো এমন এক দিনে আকাশের দিকে তাকিয়ে কবিগুরু রচনা করেছিলেন সেই গান
“শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা…”
তার প্রতিটা সৃষ্টিকর্ম ও গড়া অনুভূতিকে উপলব্ধি করছি নিজের মতো।এমন সময় আমার চিন্তার বেড়াজাল ছিন্ন হল পেছনে থাকা লোকটির কথায়
-সৌমিত্র বাবু ,কর্তাবাবু আপনাকে নাট্যশালায় যেতে বলেছেন।
-নাট্যশালায় কেন?
-যেখানে সমস্ত অতিথীদের আপ্যায়নের ব্যাবস্থা করেছে। সে কারনে।
চাকরের কথার ধাঁচ শোনে আমার খুব হাসি পেল। একেবারে শান্তিনিকেতনী ঢং এ কথাবার্তা।যদি দুদিন ময়মনসিংহ রাখতে পারতাম তাহলে তৃতীয়দিনই প্রত্যেকটা কথার পিছনে গালি দিয়ে বাক্যটাকে পোক্ত করতো।
আবার আগের আবেশে ফিরে গেলাম।

মনে হচ্ছে আজকে এই বাড়িটার সর্বত্র বিষাদ ছড়িয়ে আছে।এখনো হয়তো বাড়ির কোন এক কোনে পড়ে থাকবে রবিঠাঁকুরের পদধূলি।একদিন সেই সিংহপুরুষের পদধ্বনিতে বাড়ি ছিল স্বকীয় আবেশে।আজ তিনি নেই। বাড়ি কি তার অভাব অনুভব করে? এর উত্তর আমার জানা নেই।সবচিন্তা ঝেড়ে ফেলে সেই চাকরকে অনুসরন করতে লাগলাম।
নাট্যশালায় পৌছুবার পথেই দেখলাম যে কিছু লালনভক্ত গলাছেড়ে গান গাইছে।আর বাকিসবাই গাঁজায় দম দিচ্ছে।একজন আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-রবীন্দ্রনাথ যে লালনের গানের খাতা চুরি করেছিল তা জানেন কি?
এদের সাথে তর্ক করা আর উলুবনে হীরা ছড়ানো এক কথা।আমি কথার জবাব না দিয়ে নাট্যশালায় প্রবেশ করলাম।

২.
সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখি সব নিমন্ত্রিত অতিথীরা আসন গ্রহন করেছেন।আমিও তাদের সাথে যোগ দিলাম। সার দেশ হতে রবীন্দ্র সাহিত্যানুরাগী ও রবীন্দ্রাদর্শ মেনে চলা লোকদের নিমন্ত্রন করেছে। আমি অল্প পরিচিত ও পরিচিতদের অকাতরে রবিঠাঁকুরের বই উপহার দিতাম। আর সেই কারনে এই অধমের স্থান হয়েছে এতগুলো উত্তমের মাঝে। কবিগুরুর এক বংশধর তার সমন্ধে জানা অজানা তথ্য দিতে থাকলেন।আর আমরাও তা গোগ্রাসে গিললাম।
লেকচার শোনতে শোনতে মাথাব্যাথার উপক্রম হচ্ছে।বেশী কোনকিছুই ভালো লাগে না।অবশেষে তার বক্তব্যের ইতি টানল সে আর আমাদের প্রাতরাশের আয়োজন করলো।কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা ঘটে। আমার পাশে বসা বাচাল লোকটির একচেটিয়া কথাবার্তায় আমার মাথা খারাপ হওয়ার যোগার।কারন আমি মিতভাষী।আর খাবারের সময় নীরবতা আমাকে যোগায় প্রশান্তি। কোনরকম খাওয়া শেষ করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আবার চোখ গেল আকাশের দিকে।ছাইকালো মেঘে আকাশ হয়েছে গম্ভীর। যেকোন সময় শুরু হবে মেঘ ঝরা বর্ষা।প্রবল বাতাসে চোখ খোলে রাখাই দায়। ভানুসিংহ তো এমন সময় কলম চালিয়ে লিখতেও পারে সেই লাইনগুলো
“নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে
তিল ঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”
আমি আর ঘরের বাহিরে যাই নি।সিঁড়িগুলোকে মাড়িয়ে চলে এলাম দোতালায়।প্রহরী পার হয়ে একটা কক্ষে প্রবেশ করলাম।রবিঠাকুরের চেয়ার ও টেবিল রাখা। কাছে গেলাম। কেমন এক প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ।অনেকটা পুরনো বইয়ের মতো। ধরিয়ে দেয় মাতাল নেশা।কেমন যেন একটা অনুভূতি হতে লাগলো। বর্ননা করার মতো নয়। আলতো করে টেবিলটা ছুঁলাম। এই টেবিলে বসে কবি “সোনার তরী,চিত্রা ও ক্ষনিকা লিখেছিলেন। আজ কবি নেই। কিন্তু কবির সৃষ্টিকর্মগুলো আছে।স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

৩.

রুম থেকে বের হলাম। কেন যেন মনে হচ্ছে কবির সৃষ্ট সমস্ত চরিত্রগুলো এখনো সজাগ হয়ে বিচরন করছে আশেপাশেই। হয়তো হৈমন্তিকে দেখব জানালা ধরে মল্লিকাদের বাগান দেখছে, বিনোদিনী চুল বাঁধতে বাঁধতে পানের খিলি মুখে দিচ্ছে কিংবা বিপ্লবী এলাকে (চার অধ্যায়) দেখব সেই উক্তিতে
“তুমি যদি বল এখনি করিব বিষয় বাসনা বিসর্জন…”
কল্পনায় গা ভাসানো বন্ধ করলাম।এখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ‘জাদুঘর’ লেখা সংরক্ষিত কামরায় ঢুকলাম।রবিঠাঁকুরের ব্যাবহার্য সমস্ত জিনিসপত্রই দেখতে পাচ্ছি।আমি যদি আজ মার যাই তাহলে হয়তো কেউ মনে রাখবে না। কিন্তু রবিঠাঁকুরকে মনে রাখবে যুগ যুগ। চিন্তা করেই লজ্জ্বা পেলাম।কি নিয়ে চিন্তা করছি আমি!মহাপুরুষদের সাথে আমার নূন্যতম তুলনাটুকুও চলে না।হঠাৎই এক লোকের চোখের সাথে আমার চোখ চার হয়ে যায়।কেন যেন মনে হতে লাগল আমি তারে দেখেছি। কিন্তু কোথায়? তা আপাতত আমার স্মৃতির আয়ত্তের বাইরে।একহারা স্বাস্হ্যবান দীর্ঘাঙ্গি সেই লোক।কাজলকালো আয়ত চোখ ও তামাটে রঙের গাত্রবর্ন।যুগ্ম ভ্রু ও চাপদাড়িতে তার কাছে অসাধারনরাও হার মানে।আমার দিকে তাকিয়ে বকশাদা দাঁতে হাসি উপহার দিল।বুকটায় ঘ্যাঁচ করে কিছু যেন বিঁধল। কি সুন্দর হাসি। চোখে মুখে বিরাজ করছে মফস্বলীয় সরলতা।এরকম অসহ্যরকম সুন্দর পুরুষের দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকা যায় না। আমিও বেশীক্ষন তাকাই নি। একজন গাইড নিঃস্পৃহ কর্তব্যের মতো রবিঠাঁকুরের জীবনী বলে যাচ্ছে।আমি সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। রবিঠাঁকুর ও তার ছড়িয়ে দেয়া মায়া নিয়ে পড়ে থাকলো একদল লোক।

৪.

বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। শ্রাবন বর্ষনে প্রকৃতি গ্রহন করবে নতুন সবুজ রূপ। আকাশ থেকে স্বচ্ছ তরল কাঁচবিন্দুর মতো ঝরছে বৃষ্টি। আজ বৃষ্টিতে ভিজব।মনে অব্যাক্ত ব্যাথা ও কন্ঠে রবিঠাঁকুরকে আহ্বান জানালামঃ
“…বলাকার পথখানি নিতে চিনে
আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে।”
কাঁধে কারো স্পর্শ অনুভব করে গানটা অসমাপ্ত অবস্থায় রেখে দিলাম।ফিরে দেখি সেই লোক! আমার উদ্দ্যেশে তার বলা প্রথম কথা
-আমায় ভুলে গেলে?’সোনার তরী’
সোনার তরী আমার ফেসবুক ফেইক আইডি।দ্বৈত জীবনের জন্ম সনদ। আমার মগজাস্ত্রে একটু চাপ দিতেই তার নামটা পরিষ্কার আমার চোখে ভাসল।অবাক হয়ে বললাম
-‘নিমন্ত্রন পত্র!’
মুচকি একটা হাসি দিয়েই চুপ হয়ে গেল।এই নীরবতার মর্মে যে সম্মতি ছিল তা আর বুঝতে অসুবিধা হয়নি আমার। চ্যাটে বেশ কিছুদিন কথাবার্তা ও ছবি আদানপ্রদান ও হয়েছিল। তারপর গতানুগতিক সর্ম্পকগুলোর মতো ভাটা পড়েছিলো এই সম্পর্কতেও। আমি বললাম
-‘এভাবে দেখা হবে তা কখনো ভাবি নি।’
-তবে আমি ভেবেছিলাম।জানতাম দেখা হবে।
তারপর আর কোন কথা বলতে পারছিলাম না।

যদিও অনেক কথাই ছিল, অন্তরালে চাপা।
কিছুটা নীরব সময় অনুভব করে নীরবতার মর্মে আঘাত করল সে।আর বলল
-“সামনেই একটা পুকুর। চলো পাড়ে গিয়ে বসি।”
তার পাশে চলতে লাগলাম। নিরন্তর এক গতিতে। ভালো হতো যদি তার সাথে হাটতে পারতাম পুরো একটা ছায়াপথ। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই এসে পড়লাম। হঠাৎ করেই ফোনটা কেঁপে জানান দিল তার অস্তিত্ব। পকেটে হাত দিয়ে শঙ্কা অনুভব করলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। পকেট থেকে বের করল তার ফোন। দেখলাম তার ফোনটা প্লাস্টিকের প্যাক দিয়ে মোড়ানো। জিগ্গাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই সে বলল
-বর্ষায় কখন ভিজতে ইচ্ছে করে জানি না। তাই ফোন সুরক্ষা করার জন্য সবসবময় একটা পলিব্যাগ পকেটে থাকে।
ব্যাখাটা ব্যাতিক্রম। তবে সহজ ও সাবলীল।আমিও আমার ফোনটা তার প্যাকে রাখলাম।
দুজনেই বসে বসে বৃষ্টিতে ভিজছি।দুজনের চোখ পুকুরের অর্ধেক ফোটা একটা শাপলার দিকে। হঠাৎ আমার হাতের উপর আরেকটা হাতের আলতো স্পর্শ পেলাম।মুচকি হেসে তার দিকে সরে তার কাঁধে সংকোচের সহিত মাথা রাখলাম।মনে হল অনেক কিছুই হয়তো পেয়েছি তবুও কিসের যেন ব্যাথা বুকে বাজে।সেই ব্যাথায় পুড়ছে মন। কেটে যাচ্ছে কিছু সময় এই “মনপোড়া শ্রাবন দিনে।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.