মন মহুয়া

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

শীতের সকালে বিড়ালকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দেয়ার পর বিড়াল যেভাবে আড়মোড়া ভাঙে, বসন্তের এক সকালে চোখ বন্ধ করে আমিও সেইভাবে আড়মোড়া ভাঙছি এবং স্বভাববশত চিৎকার,
-পারুলের মা, আমার বেড টি……..
বলেই থামলাম। পায়ের নিচে সাপ পড়লে মানুষ যেভাবে চমকে উঠে, আমি তার থেকে ভয়াবহ রকমের চমকে গেলাম। কোথায় আমি! এটা কি আমার ঘর!কোন এক প্রাচীন ধাঁচের বাড়ির পেটের মধ্য যেন বসে আছি। সারা ঘর বেলুনে সাজানো, আর তাতে লেখা “হ্যাপি বার্থডে বিজন”
এবার ব্যাপারটা স্পষ্ট হল। আমার ১৮তম জন্মদিন উপলক্ষে বাবার একটা সারপ্রাইজ। সাথে মনে পড়ল যে আমরা কালকে বাসা চেঞ্জ করলাম। এমন সময় পারুলের মা কে ঘরে ঢুকতে দেখলাম।
-ছুডু সাব। এই যে আফনের ভেট্টি।
-উঁহ, ভেট্টি না, বেড টি।
-হইলো..
-তা, বাবা কোথায়?
-বড় সাব বাগানে বইস্যা রইছে। আফনেরে কইছে ঘুম ভাঙলে যাইতে।
-হুমম।এখন তুমি যাও।
চা নিয়ে বাড়ির বারান্দায় আসলাম। আমার কাছে জন্মদিন তেমন বিশেষ কিছু না। অনন্য দিনের মতই স্বাভাবিক একটা দিন। সকালে প্রথম প্রহরে বাবার বার্থ উইশ তেমন একটা প্রভাবিত করল না। তবে বারান্দায় এসে বুঝলাম আমার জন্য আরও একটা চমক অপেক্ষা করছে।

বাড়ির পাশে ঘন সবুজ বন। গাছগুলোতে যেন কেউ বার্জারের সবুজ রঙ
ঢেলে দিয়েছে। নিচে দোলনায় বসে আছেন বাবা। আমি চা টা শেষ করে নিচে নামলাম।
বাবার পিছনে দাড়াতেই মুখ না ফিরিয়ে বললেন,
-হ্যাপি বার্থডে বাবা।
বাবা বুঝল কি ভাবে আমি তার পিছনে দাঁড়িয়ে! কিছুটা অবাক হয়ে বললাম,
-থ্যাংকস বাবা।
-বাড়ীটা পছন্দ হয়েছে?
-এখনো তো পুরোটায় পা মাড়ায়নি। তবে যেটুকু দেখেছি তাতে মনে হচ্ছে সারাজীবন এই বাড়িটাতে কাটিয়ে দেয়া যাবে।
-জন্মদিন উপলক্ষে বন্ধুদের
দাওয়াত দিবে না?
-আমার কোন বন্ধু নেই, বাবা।
কিছুটা সময় নীরবে কাটলো। তারপর বাবা বলল
-লিমন? সে কি তোমার বন্ধু নয়?
-সে বেড়াতে গেছে। আর বাবা ফ্যান আর ফ্রেন্ডদের মাঝে বিস্তর ফারাক।
-তা তোমার এমন কেন মনে হল?
-কারণ, সে আমার টাকার প্রতি লোভাতুর।
-তোমার কথাটা কেমন যেন অহংকার-মিশ্রিত বলে মনে হচ্ছে?
-মনে হলেও এটাই সত্যি। আর আমি সাধারণ মানুষ তাই অহংকার থাকা আশ্চর্যের কিছু না। বড় বড় দেশপ্রেমিকেরাও কিন্তু মারাত্মক রকমের অহংকারী ছিল।
-যেমন?
-তাদের অহংকার-বোধটা ছিল দেশের প্রতি।
-তোমার সমস্যাটা হচ্ছে তুমি সবকিছু একসাথে গুলিয়ে ফ্যান্টাসিতে বাস করছো। বাস্তবিকতা তোমার মাঝে কম।
-বাবা, তোমার মনে আছে? আমি একদিন তোমায় বলেছিলাম “হাট্টিমাটিম ” টা কি? তুমি কিছু না বলে আমাকে কাল্পনিক সেই প্রতিকৃতি পাখির মত একটা খেলনা হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলে। “এটা হাট্টিমাটিম”। তুমি সত্যটা বলনি। এমন ঘটনা কিন্তু অহরহ আছে। তো তুমিই বলো আমার কাল্পনিকতা টা কি অযৌক্তিক?
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলল,
-তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। আমি হেসে বললাম,
-বাবা, প্রতিবারের মতো আজো জামিল ভাই আসবে না। তার জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই।
এই বলে আমি উঠে চলে এলাম।
বাসা থেকে নিকটবর্তী শহরের দূরত্ব ৮ কি,মি। চারদিকে ঘন মহুয়া বন। বনের পাশ দিয়ে একটা খাল বয়ে গেছে। বাড়িটা বাংলো টাইপ বাগানবাড়ি। বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন বাকি জীবনটা নীরবে কাটিয়ে দিবেন। বাসার সামনে বিশাল উদ্যান। মাঝখানে একটা ফোয়ারা অবিরত পাথরের গায়ের উপর কেঁদে চলছে। বসার জন্য দুইটা বেঞ্চ পাতা। ঝর্নার পানি, বৃষ্টির পানি আর এই ফোয়ারার পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে আমার ভীষণ লাগে। বেঞ্চে বসে ছলছল ফোয়ারার কান্না দেখছিলাম, হঠাৎ চোখ পড়ল মুরগীর পরিবারের দিকে। ফোয়ারা দেখতে বোধহয় মুরগীদেরও ভালো লাগে। বাবা-মায়ের সাথে বারটা ছোট-ছোট বাচ্চা। মোরগটা পরিবার থেকে দূরে-দুরে হাঁটছে, স্বার্থপরের মত ঠোঁটে আঁচড় কেটে যা পাচ্ছে তাই পেটে চালান করে দিচ্ছে। আর মা বাচ্চা গুলোর আশেপাশে হেঁটে-হেঁটে খাওয়ার খোঁজে দিচ্ছিল। সব কিছু ভালোই চলছিল, কোত্থেকে একটা হতচ্ছাড়া চিল এসে হানা দিল মুরগী পরিবারে। মা মুরগীটা নিজের জান বিপন্ন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল চিলের উপর। চিল অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও বাচ্চার গায়ে নখ বসাতে পারল না। আর চিল দেখে ভীতু বাবা মোরগ পালিয়েছে। বাবা হিসাবে বাচ্চা আর পরিবারের প্রতি কোন দায়িত্বই পালন করল না। মায়েরা বোধহয় এমনই হয়। আমার মাও বোধহয় আমাকে ছেলেবেলায় এমন করে আগলে রাখতেন। যদিও মায়ের কথা তেমন একটা মনে নেই আমার।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মা হারাই। মাকে চিতায় তোলা হয় মারা যাবার পরের দিন। কারণ বাবা আমেরিকায় তার ইমপোর্ট এন্ড এক্সপোর্টের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং এ আটকে গিয়েছিলো। আশা করছি আর বলতে হবে না যে বাবা ছিলেন ধনকুবের। মা মারা যাবার পর তার দেয়া তার সাথের স্মৃতিগুচ্ছ আজ কুয়াশা হয়ে বিলীন হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। নিরন্তর ব্যস্ততা কিংবা একমাত্র ছেলে অসুখী হওয়ার সম্ভাবনায় বাবা আর বিয়ের পিঁড়িতে বসল না। মা মারা যাওয়ার পর বাবা ঘরের জন্য একজন ম্যানেজার রেখেছিলো। ১৫ বছর বয়সী নিতান্ত বালক সেই জামিল ভাই ছিল সে সময়কার ম্যানেজার। আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো বোর্ডিং স্কুলে। ছুটিতে বাসায় আসতাম আর সময় কাটাতাম জামিল ভাইয়ের সাথে। আমার গতানুগতিক জীবনে জামিল ভাই যেন সাতরঙ। মনের সাদা ক্যানভাসটা রাঙিয়ে দিত জামিল ভাই। তার প্রতি আমার মুগ্ধতাটা ছিল সীমাহীন। ছুটির দিনগুলো তার সাথে চমৎকার কেটে যেতো।
বাবা তার কাজের ব্যস্ততার জন্য আমার সাথে কোন কোন ছুটিতে দেখাও করতে পারত না। প্রথমে প্রথমে বাবার প্রতি আমার মনে জমত বর্ষার কালমেঘ। কিন্তু সে মেঘ বর্ষিত হয়ে আকাশ কখনো স্বচ্ছ হতো না। জামিল ভাই ছিল আমার সহচরী। মনে আছে এখনো স্পষ্টভাবে, একদিন জামিল ভাইকে বলেছিলাম
‘আমাকে এমন একটা ফুল দিবেন যা আমি আগে কখনো দেখিনি’
জামিল ভাই খোঁজে অবশেষে আমার জন্য একগুচ্ছ মহুয়া ফুল আনেন।
কি সুন্দর ঘ্রাণ। টকটকে লাল রঙের মহুয়া ফুল।

জামিল ভাইয়ের সম্পর্কে বেশি কিছু জানতাম না। তবে জানার জন্য কেন যেন আগ্রহ ও জাগেনি। শুধু এতটুকু জেনেছি যে সে আমার জীবনের নানারঙ। সেই থেকে জামিল ভাইয়ের প্রতি ভালোলাগাটা দ্বিগুণ হয়ে গেল। রাত-দিন অপেক্ষায় থাকতাম তার সাথে গল্প করার জন্য। তাকে একটিবার দেখার জন্য। বাবার কাজ কর্মের ভিড়ে তেমন একটা অবসর পেতেন না জামিল ভাই। তাতে কি? উনি বাড়ী ফিরতে যত রাত হোক না কেন আমি অপেক্ষায় থাকতাম একসাথে খাবো বলে। তার প্রতি আমার ভালোলাগা চরমে উঠে আসে যখন বুঝতে পারলাম আমার পৃথিবীর অনেকটা যায়গা জুড়ে শুধু তার বিচরণ। রাতে বাড়ী ফিরে জামা পরিবর্তন-রত অবস্থায় তাকে দেখার জন্য জানালায় ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। গোসল শেষে তয়েলাপরা অবস্থায় তাকে দেখবো বলে কতদিন অসুখের নাম করে স্কুল কামাই করেছি তার ইয়ত্তা নেই।
এক রাত্রে বাসায় ছিলাম আমি আর জামিল ভাই। বাবা গেছে মালয়েশিয়া। মনটা অস্থির-অস্থির লাগছিলো। দ্বিধা-দন্ধে জামিল ভাইয়ের রুমের দিকে গেলাম।
-কিছু লাগবে বিজন বাবু?
কেন এলাম তা বলতে পারব না। তবে মুখে বললাম,
-ঘুম আসছে না, চলেন গল্প করি।
-চলো।

সারা রাত দুজন একসাথে শুয়ে গল্প করলাম। চমৎকার একটা রাত্র কেটে গেলো। সকাল দশটায় জেগে দেখি জামিল ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছি বিবস্ত্র হয়ে!! তাড়াতাড়ি উঠে চলে এলাম। খারাপ ভালো দুইয়ে এসে ভর করল আমার মনে। কিন্তু তার পরদিন থেকে জামিল ভাইকে বাসায় খুঁজে পেলাম না। সেই যে বাড়ী ছাড়ল আজ অব্ধি এই মুখো হয়নি। আমি বুঝতে পারছিলাম না কি দোষ করলাম আমি? সেই রাতে আমাদের মাঝে যদি কিছু হয়ে থাকে তা’তো উনার ইচ্ছাতেই হয়েছে। কেন উনি বাড়ী ছাড়লেন? কেন আমার ভিতরের আবেগ আর ভালোবাসার বীজ বুনে দিয়ে পালালেন তার উত্তর অনেক দিন খোঁজে পাইনি।
কল্পনার রেশ কেটে গেলো পারুলের মার ডাকে।
-ছুডু সাব। আফনের ভেকফাস্ট।
আমার মনে হল যে উনি কখনো “ব” বলা শিখবেন না। ফোয়ারার দিকে তাকিয়ে দেখি মুরগী পরিবারের কোন সদস্য সেখানে নেই। আমিও উঠে পড়লাম।
গোসল, খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দো’তলার বারান্দায় বসলাম সাদা একটা পাঞ্জাবী পড়ে। চমৎকার আরামদায়ক উষ্ণতায় সূর্য ছড়াচ্ছে আপন আভা। ঘর, মন সমস্তকিছু আলোকিত করছে বাসন্তীরঙা রৌদ্র। বসন্তের ভর দুপুরে কে আগে মানুষের মনকে উদাস করতে পারে। কিছু প্রজাপতি ও বাতাস যেন থমকে গেলো সুরেলা এক শব্দে। বাঁশির শব্দ। কে যেন মহুয়া বনের ভিতরে বাঁশি বাজাচ্ছে। অবাক ব্যাপার এই যে বাঁশীতে রবীন্দ্র সংগীত তুলছে। ব্যাপারটা যে কতটুকু মর্মস্পর্শী তা প্রমাণ দিল চোখের জল। বাঁশীতে বাজছে
-আহা আজি এ বসন্তে এতো ফুল ফোটে…….
আর যাই হোক কি না হোক সুরটা ছিল অসাধারণ। তরঙ্গ আকারে ঢেউ দিয়ে যাচ্ছে মনে। মহুয়া ফুলের মধু দিয়ে না কি এক ধরনের মাদক দ্রব্য বানানো যায়। আর সেই ফুলের ঘ্রাণটাও নেশা ধরিয়ে দেবার মতো। তার উপর যদি মনোলোভা সুরে বাঁশি বাজে তাহলে আকর্ষণ টা বহুগুণে বেড়ে যাওটা স্বাভাবিক। তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতে লাগলাম। সেই বংশীবাদকের দিকে। ঈশ যদি একবার দেখতে পারতাম। কিছুক্ষণ পর বাঁশির সুর বন্ধ হয়ে গেলো। সারাদিন কানে বেজে চলছে সেই বাঁশীর সুমধুর সুর। চিন্তা করি, কালকে কি বাঁজবে সেই বিষের বাঁশি? দিন গড়িয়ে রাত্রি এলো। কাটা মুরগীর মতো ছটফট করে কাটালাম রাত্রটা।

পরদিন দুপুরে ঝলমলে রৌদ্রে তৈরি হয়ে থাকি সেই বাঁশির সুর শোনার জন্য। বসন্তে উড়ে পাখি, শঙ্খচিল ও প্রজাপতি। মন ভরে দেয় মহুয়া ফুলে। আবার যেন স্বর্গ থেকে ভেসে আসছে যেন সেই সুর। সুর শোনে চোখের পানি ধরে রাখা দুষ্কর। বাঁশি বাজে মধুর লগনে। একসময় শেষ হয়ে যায়। চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে থাকি। দিন কেটে যাচ্ছে শঙ্খনীলে। প্রতিদিন দুপুরের অপেক্ষায় থাকি। বাঁশির সুর শোনি। তার প্রতি তীব্র টান অনুভব করি। ভালোলাগা তাকে। ইচ্ছে করে বেসামাল আবেগগুলো তার তরে ভাসিয়ে দিতে। খুব ইচ্ছে জাগল বাঁশি-ওয়ালা লোকটার কাঁধে মাথা রাখব, আর শুনব বাঁশির সুর। এমনি অখণ্ড ইচ্ছে যখন আমায় তাড়িয়ে বেড়ায় তখনি মনে পড়ে বাবার নিষেধ বানী
-“জায়গাটা বিপদসংকুল। বনে প্রচুর সাপসহ অচেনা অনেক পোকা আছে। কামড় দিলে ফল মারাত্মক হতে পারে। বনের পাশ দিয়ে হাঁটো সমস্যা নেই। কিন্তু ভিতরে আশা করি ঢুকবে না।”

কৌতূহল ও আবেগগুলো বাবার নিষেধ-বানীকে ডিঙোতে পারে না। আর তাই আমার যাওয়া হয় না মহুয়া বনে। এক-বুক অতৃপ্তি নিয়ে শোনে যাই বাঁশির সুর…….
বাবা মাঝে মাঝে বাচ্চাদের মতো আচরণ করে। তার একটা জ্বলন্ত উদাহারন হল “চেঁচামেচি”. অযথা শোরগোল বাধাবে। কাজের লোকদের গালিগালাজ করবে। কিন্তু কতক্ষণ পরে ঠিক। আজ এমন একটা দিন। ব্রেকফাস্ট সেরেই এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম। কারণ টা অতি সাধারণ। আর তা হল বাবার ঔষধের জন্য ব্যবস্থাপত্র হারিয়ে গেছে। আমার সবগুলো ঔষধের নাম মুখস্থ। কিন্তু বাবা ওভার শিউর হওয়ার জন্য পাগলের মতো খুঁজে না পাওয়ার পর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।

মুচকি হেসে চিন্তা করলাম ” মাঝেমাঝে বড়দের পাগলামি দেখতে খারাপ লাগে না। ” যাই হোক, বাবার প্রেসক্রিপশন টা খুঁজে বের করতে হবে। বাবার রুমে গেলাম। ঘরটা যা তা হয়ে আছে। আমি খুঁজতে লাগলাম সারা ঘর জুড়ে। কিন্তু প্রেসক্রিপশন টা পাচ্ছি না। বাবার ডেস্কের তালাবন্ধ ড্রয়ারে কি আছে? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলাম। তারপর ভাবলাম, “থাকতেও তো পারে. বাবা যে ভুলো-মনা।” বার ড্রয়ারের চাবি থাকে কোথায় তা আমি জানতাম। টেবিলের নিচে টেপ মেরে আটকে রাখে চাবি। ভাবে, কেউ জানবে না। চাবিটা নিলাম। ড্রয়ারটা খুললাম। কেমন যেন অপরাধ-বোধ কাজ করতে থাকল মনে। শত হোক, এটা একজন লোকের নিজস্বতা। হোক না ব্যক্তিটি আমার বাবা। কিন্তু ভাবলাম, যা হয় হোক, আগে দেখি তো। খুঁজতে খুঁজতে পেলাম চমৎকার একটা প্যাকেট। কি সুন্দর কাগজে মোড়ানো। প্যাকেট টা খুললাম। ভিতরে একটা খাম। দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করছি। খামটা খুলে একটা চিঠি পেলাম। আশপাশ দেখে চুপ করে চিঠিটাতে চোখ বুলাতে থাকলাম। চিঠিটা পড়ে আমার হিসাব মিলাতে পারছিলাম না। আমার চোখ থেকে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। এই প্রথম নিজের উপর রাগ হচ্ছিল ভীষণ রকম। আমি চিঠিটা আগের মতন প্যাক করে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। এমন সময় শোনতে পেলাম সেই মনোহর বাঁশির সুর। সমস্ত দুঃখের তার কেটে দিচ্ছে যেন তার বাঁশির সুরের দুঃখ। করুন সুরে তার দুঃখগুলো প্রকাশ হচ্ছে বাঁশির সুরে। তার দুঃখের কাছে আমার দুঃখগুলো কেন যেন ফিকে বলে মনে হল। তার মনে যেন দুঃখের পাহাড়। ইচ্ছে করছে তার বুকের সাথে বুক লাগিয়ে গভীর আলিঙ্গনে প্রতিটা হৃৎস্পন্দন নিজে উপলব্ধি করতে। তার দুঃখগুলো আমার সাথে ভাগ করতে। বাবার নিষেধ-বানী আর ধূপে টিকল না। অবাধ্য হয়ে আবেগের টানে রওনা দিলাম মহুয়া বনে…….

লাল মহুয়া, সবুজ পাতা ও নীল আকাশের রঙের গয়না দিয়েছে প্রকৃতি। সুর ধরে এগুতে থাকলাম। এগুতে এগুতে একসময় দেখলাম বিশাল এক মহুয়া গাছের নিচে বসে বাঁশী বাজাচ্ছে ঐ বাঁশীবাদক। বসন্ত বাতাসে মহুয়া ফুল ঝরে পড়ছে। কাছে এসে দাঁড়ালাম। কণ্ঠে মধু ঢেলে মনে সাহস সঞ্চয় করে পিছন থেকে আমি বললাম,
-আপনার বাঁশীর সুরের ক্ষমতা অসাধারণ।অনেক সুন্দর বাজান আপনি। সেই মনোহর বংশীবাদক পিছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলল,
-আমি জানি।
আমার চোখ রসগোল্লা হয়ে গেলো। অস্ফুট একটা স্বর মুখ থেকে বেরুল
-বাবা!!
আমার চোখে তখনো কান্নাটা শুষ্ক হয়ে লেগে আছে। একটু আগে চিঠিটা পড়ে যা ভাবছিলাম তার বাস্তব রূপ দেখলাম এখন। বাবাকে, বাবার বাঁশির সুরে আমাকে চিঠির প্রতিটা শব্দ বিশ্বাস করতে বাধ্য করল, চিঠিটা ছিল জামিল ভাইয়ের। বাবাকে উদ্দেশ্য করে লেখা…

“স্যার,
আপনাকে মুখে বলতে পারব না বলেই চিঠির আশ্রয়ে আশ্রিত হলাম। আমি ক্রমশই আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি। শুনেছি মানুষ প্রেমে পড়ার পর আবেগ প্রবন মুহূর্তগুলো কাটায়। কিন্তু কখনো চরম মুহূর্ত থেকেও বন্ধন সৃষ্টি হতে পারে। আপনি আমাকে ভালোবাসেন তা জানি। আমার পরিবারের দুঃসময়ে আপনি পাশে ছিলেন। এইজন্য সারা জীবন কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবো। সারাদিন আপনার অফিস আর বাড়ীতে কাটানো সময় গুলো আমাকে জানান দিত আমার প্রতি আপনার ভালোবাসার তীব্রতা। প্রথম দিকে ভাবতাম, বিপত্নীক আপনি আমাকে দিয়ে শরীর জ্বালা মেটাতেই আপনার এই ভালোবাসার নাটক। কিন্তু আমার প্রতি আপনার যে কেয়ারিং, টান কিংবা মায়া যা’ই বলেন না কেন তা আমার ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু স্যার সত্যি বলতে কি, আপনার প্রতি আমার ভালোবাসার ছিটে ফোঁটাও ছিল না। হতে পারে তা আপনার আমার বয়সের পার্থক্যর কারণে কিংবা আমার এই ছোট্ট মনে অন্য কারো বিচরণ ঘটেছে বলে। স্যার, আপনি মালয়েশিয়া থেকে আসার আগেই আমি বাড়ী ছাড়ছি। আপনি এসে আমাকে হয়তো আর দেখবেন না। দয়া করে খুঁজতেও চেষ্টা করবেন না। এতে করে আপনারই মঙ্গল হবে। যদিও আপনার এত তাড়াতাড়ি আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু আমার হাতে সময়ও যে নেই। কাল রাতে জানতে পারি আমি যাকে এতদিন দূর থেকে ভালবেসেছি সেও আমাকে আমার মতন ভালোবাসে। কিন্তু আপনার ভালোবাসাকে সম্মান করতে গিয়ে আমার আর তার ভালবাসাকে অসম্মান করে নর্দমায় ফেলতে পারব না বলে পালাচ্ছি। দয়া করে ভুলেও ঘাঁটাতে যাবেন না আমার ভালোবাসার মানুষটি কে ছিল?
স্যার, ভালো থাকবেন। পারলে আমায় ক্ষমা করবেন।
-জামিল”

ছোট একটা চিঠি, কিন্তু ভাবের প্রগাঢ়তা টা ছিল বিশাল। বুঝতে পারলাম যে খামটা বিবর্ণ হয়ে গেলেও বাবার ভালোবাসাটা বিবর্ণ হয় নি। কালস্রোতে জামিল ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসার ঝর্ণাধারা আমার ক্ষীণ হলেও বাবার ভালোবাসা স্রোতস্বিনী হয়ে গেছে। চিন্তা করছি, আমার টা কি ভালোবাসা ছিল? না কি কৈশোরের আবেগ? যা কালের টানে ভেসে যায়? আমিও জামিল ভাইকে মিস করতাম। কিন্তু তা কি বন্ধু হিসেবে? ভালোলাগা না কি অন্যকিছু? বুঝতে পারছি না। যাকে আবেগের সুতো দ্বারা গাঁথতে চাইতাম, সে কিনা আরেকজনের গাঁথা ফুলের মালা! আর সেই “আরেকজনটা” আমার
বাবা!
বাবা আমার চিন্তার সুতোয় টান মেরে বললেন,
-ছোটবেলা থেকেই বাঁশি বাজাতে পারতাম। গ্রামে বড় হয়েছি। মহুয়া বন দেখে আবার বাজানোর চিন্তাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।তাই বাঁশি নিয়ে চলে এলাম। তুই এলি কেন? তোর না আসা বারণ!
এতক্ষণে বারণটা বুঝতে পারলাম। চোখের আবেগ গুলোকে সামলিয়ে বাবাকে বললাম,
-বাদ দাও সেসব কথা। তুমি আমাকে ছাদে বাঁশি বাজিয়ে শোনাবে।
-সংকোচে ফেললি।
-হোক সংকোচ। এটা একটা প্রতিভা।
-হা তা ঠিক। চল।
ছাদে চলে এলাম। এককোণে দাড়িয়ে আছি। পাশে মহুয়া গাছ। হাত বাড়ালেই ফুল ছুঁতে পারব। মনে হচ্ছে মন মহুয়ার বনে আছি। বাবা বাঁশীতে
রবীন্দ্রসংগীতের সুর তুলছে,

“কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে
তোমারে দেখিতে দেয় না
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাই না”

আমি আমার কষ্টগুলো কে ছেপে রেখে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। তার চোখে অধীর অপেক্ষা, কণ্ঠে ভালোবাসার আকুতি। জমিলকে কাছে পাওয়ার। তাই মনে মনেও চাইলাম না জমিলকে। অকুণ্ঠ অতৃপ্তির এক আবেগ নিয়ে বাবা বেঁচে আছে। আছে কিছু আশা।হয়তো যা কখনো পূরণ হবে না থাক বাবা কিছু দেখা অদেখা মিষ্টি ব্যথিত আবেগ নিয়ে বেঁচে থাক। আমি বনের দিকে তাকিয়ে আছি। ভালোবাসার রঙে মহুয়া ফুটেছে। কি সুন্দর তীব্র লাল
মহুয়া ফুল……….

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.