মা

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১।
নিত্যানন্দ দাশের মাথা খারাপ হয়ে আছে। এখন পর্যন্ত তার মদের টাকা যোগার হয় নি। কি করবে কিছু চিন্তা করতে পারছে না।তবে হ্যা চিন্তা একটা আছেই।আর তাকে সেটাই বাস্তবায়ন করতে হবে! যে করেই হোক।
নিত্যানন্দ দাস।সংক্ষেপে নিতাই! বাবা নগেন দাশ ও মা শেফালী রানীর বড় ছেলে। বাসায় একটা বোন আছে। এইট এ পড়ে। বাবা প্যারালাইজড হয়ে পড়ে আছে
অন্ধকার ঘরের এককোনে। তার স্বপ্নগুলোও যেন আজ অন্ধকারের করাল গ্রাসে ছেয়ে আছে।
ছেলেটার জন্য আগে দুঃখ হত। কিন্তু এখন কেমন যেন ঘৃণা হয়! হঠাৎ করেই যেন বদলে গেছে তার আদরের
টুকরো ছেলেটা।এখন বই থেকে হাতে দিনরাত মদ নিয়ে থাকে। সে কিছু বলতেও পারেনা করতেও পারে না।শেষ বয়সে শেফালী রানী সেলাইয়ের কাজ করে দিন
গুজরান করছে।

২।
নিতাই আস্তে আস্তে মায়ের রুমে গেল।সেখানে ছেড়াঁ শিকোর মাঝে ভাঙা পাতিলে তোলা আছে তার মায়ের দু দিনের পরিশ্রম আর তার দু ঘন্টার ফূর্তির মূলধন।চুপি
চুপি করে এসে সরিয়ে দিল সে টাকাটা।এখন সে খুশি।কারন তাকে আর মদের পিয়াসে থাকতে হবে না।
সকাল হল। তার বোন রাত্রি মাকে ডেকে বলল
-‘মা ওমা আজ যে দুশো টা টাকা দিতেই হয়। নয়তো স্যার
আমার নাম কেটে দিবে।’
মাঃদাড়া রে দিচ্ছি।
মা ঘরে গিয়ে হাত দিল সেই ভাঙা পাতিলে। কিন্তু এ কি!সেখান।টাকাটা নেই!ধক করে উঠল বুকটা। কি করবে! এখানেই রেখেছিলো! মা জানে এটা কে নিয়েছে……..
শেফালীর মুখে কোন ভাষা ছিল না।সে মেয়ের সামনে গিয়ে রিক্ত হস্তে দাড়াল। তার দাড়ানোর ভঙ্গীটাতেই এমন
কিছু,ছিল যা টের পেয়েছিল তার মেয়ে রাত্রি। কিছু বলেনি।তার দাদার স্বভাব জানা ছিল। শুধু বড় বড়
কাজল ছাড়া চোখ দুটো ভেসে যাচ্ছিল বেদনা নামের কিছু লবনাক্ত পানিতে। পুকুর পড়ে বসে
একটি মেয়ে কাঁদছে,সে দৃশ্য কেউ অবলোকন করে নি। দুঃখ দুর্দশা, অযাচিত কলেবর সময়, আর তা যেন এই
পরিবারটিতে নিত্যদিনই প্রতীয়মান।

৩।
বেহেড মাতাল হয়ে নিতাই ঘরে এলো ৩ দিন পর। এসেই বাড়ি চেঁচিয়ে মাথায় তুলল। তার এই রূপের কাছে কেউ পরিচিত ছিল না। এসেই তার মার কাছ থেকে টাকা চাওয়া অারম্ভ হল।তার মা তাকে সরাসরি বলে দিল যে তিনি দিবেন না।মাতাল ও রাগের বশবর্তী হয়ে সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে মাকে একটা ঠেলা দিল।
বললঃ দূর হ হতভাগী!
তার মা উল্টে পড়ে গেল।চেয়ারের কানায় কোমড়টা লেগে ৪৭ উর্দ্ধ সেই মহিলার মুখে কোন অভিশাপ
বানী ফোটে নি।
বুক চিরে সেদিন শেফালী রানীর মুখ থেকে একটা অস্ফুট কথাই বেরিয়েছিলো। মাগো!
শেফালীর কোমরের ব্যাথা দিন কি দিন বেড়ে উঠছিল।সেদিন সন্ধ্যেতে ব্যাথাটা এতো প্রবল ছিল যে তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না। দাড়াবার শক্তিটাও যেন নেই।তার ঘরে কেউ নেই।মুখটাতে কেমন যেন তিতা তিতা একটা স্বাদ। প্রচুর শীত করছে। জলতেষ্টায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে। হাতটা বাড়ালো। জলের ঘটিটা অনেক কষ্ট হল আনতে। এনে যখন মুখে লাগাবে তখন দেখে জলশূন্য ঘটিটা তার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে।তার গলাটা সিরিশ কাগজের মত হয়ে গেল।একটু জল দেয়ার মতও কেউ নেই!তার মেয়েটা আজ গিয়েছে মাসির বাড়ি।যেতে চাইছিল না। কিন্তু তার মা তাকে জোড় কর।পাঠালো।যাক মেয়েটা বেরিয়ে আসুক।তাহলে একটি মুখের কিছুদিনের খরচ কমবে! আর তারপর তার অসুখটা বেড়ে উঠেছে। আজ তার মুখে পানি দেবার মত কেউ নেই! বাসায় তার ছেলেটা আছে।
ডাকলঃ

নিতাই আছিস!ওরে নিতাই।একটু পানি দিয়ে যাবি!
-‘পারব না। কাজে ব্যাস্ত।’
নিতাই ঘর থেকে জবাব দিল। তার মা জানে যে নিতাই প্রায়ই একটি ছেলে নিয়ে তার কামারায় এসে বিশ্রী জিনিস করে।শেফালী কিছু বললে নিতাই গালাগাল দেয়। তাই আর কিছু বলে না।
শেফালী আবার বললঃ

ওরেনিতাই,খুব তেষ্টা পাচ্ছে রে।দে না এক গ্লাস জল!
নিতাইঃ শালী হারামজাদাী,তুই বিষ খেয়ে মর।
শেফালী আর কিছু বলে নি।বিষ যদি হাতের কাছে থাকত তাহলে ভালোই হত।

ভগবান মনে হয় সুপ্রসন্ন হয়েছিল শেফালীর প্রতি।তাই
তাকে আর কষ্ট দিতে চাননি! কিন্তু পরে আসি সে কথায়।দিন দিন শেফালীর যেন অবনতিই হচ্ছিল।

৪।
একমাস পরের কথা।একদিন শেফালী একটু সুস্থ বোধ করছে।সে উঠে দাড়াতে পারছে।সেইদিন রাত্রে রাত্রি তার মাকে ডে কে বললঃ
মা মা এই নাও ৫০০ টাকা।
মাঃ তুই কোথা থেকে পেলি!
রাত্রিঃ আমি আসলে মাসির বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে ঝি এর কাজ করেছি।
তার মা নির্বাক বসে রইল।কারন কিছুই আর বলার ছিল না!
এমন সময় সেই জায়গায় দা নিয়ে। উপস্থিত হল নিতাই!
বললঃটাকাগুলো দে।
মাঃদিব না।না দিলে কি করবি! মাকে মেরে ফেলবি!
নিতাইঃনা দিলে কোপ দিয়ে হাত ফেলে দিব।আমি দুদিন ধরে খেতে পারছি না।দে,দে বলছি। মা সেই টাকাটা দিল না। হাতাহাতির এক পর্যায়ে রাগের মাথায় সে দা চালিয়ে দিল। আর্তনাদ করে উঠল মা মেয়ে একসাথে।হাতের ও কাধেঁর কাছে কোপ লেগেছে।ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে।মা কাঁদতে লাগল।টাকাগুলো রক্তে ভিজে যাচ্ছিল।নিতাই টাকাগুলো টানাটানি করছিল কিন্তু মা তার মেয়ের পরিশ্রম করা টাকাগুলো ছাড়ছিল না!হঠাৎ সে তার মায়ের পেটে একটা লাথি মারল।যেই মা তাকে পেটের মাঝে লালত্যের দ্বারা বড় করেছে আজ সেই পেটে লাথি পড়ল!কিছু বলল না। টাকাগুলো তার মুখের দিকে ছুঁড়ে দিল। ওদিকে তার মেয়ে এই সংসারে থাকতে থাকতে বুঝে গেছে যে বিপদে চোখের জলের দাম নেই।সে
তার মাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালের দিকে রওনা হল।সমস্ত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল তার বাবা।আর তার চোখের জলই প্রমান যে সে যা দেখেছে তা ছিল নির্মম বাস্তব। বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল মায়ের।ছেলে হয়ে মাকে এভাবে মারল!তার আর বাঁচার শখ নেই। ওদিকে ডাক্তার দেখে বলছে যে ১০০০ টাকা লাগবে। আগে নিয়ে আসো।কাল দুপুরের মাঝে দিতে হবে। তা না হলে চিকিৎসা হবে না।

৫।
সেই রাত্রে সে একটা সড়কের পাশের গাছতলায় বসে কাঁদছিল।কারন টাকা জোগার অসম্ভব।একটা লোক এসে বললঃকান্দ ক্যান?রাত্রি সবকিছু বলল। তখন লোকটি বললঃ ৬ জনের লোড নিতে পারবা! তাহলে ১২০০ টাকা পাবে।রাত্রি আর না করল না।কারন তাছাড়া তার উপায় নেই! রাত্রির কুমারী থেকে ব্যেশ্যা হয়ে যাওয়ার আর্তচিৎকার গুলো শুধু মনে হয় পেঁচা,শিয়াল আর এই রাত্রিই শুনেছিল! যা হয়তো মর্মস্পর্শী
ছিল না!ভোর দিকে সে অপ্রকৃতস্থ ভাবে কাপড়ে রুধির দাগ নিয়ে চলল টাকাগুলো মুষ্টিতে করে।পথে দেখা হলো এক মাতালের সাথে।মাতালটি তার টাকা কেড়ে নিয়ে যায়। সে ছিলো নিমাই।

মা মারা গেছে। শুধু আফসোস। তার মৃত্যুতে কেউ কাঁদল না!তার ছেলে খবরই জানে না।বোনটি যেন পাথর হয়ে গেছে।বাবাটা শুধু দম আটকে বসে আছে।ভাবছে এখনও কেন মরন হয় না তার!পাড়াপড়শি তার মাকে
শ্বশান ঘাটে নিয়ে যাচ্ছে।পথের চা স্টলে গান বাজছে ‘যাবে যেদিন শ্বশানঘাটে………’

শেষকৃত্য সারল।সেই বাড়িতে নামল মৃত্যু নিরবতা।এখন কেউ সেই বাড়িতে সন্ধ্যা প্রদীপ দিচ্ছে না।মেয়েটা বাবার কাছে বসে কাঁদছে।ওদিকে ছেলেটা বোধহয় দাঁতের
মর্যাদা বুঝল।তবে দাঁত থাকতে না।সন্ধ্যায় খবর পেয়ে দৌড়ে গেল শ্বশানে।সেখানে সদ্য পোড়া কিছু ছাই বাতাসে উঠছে।শেফালী আর কষ্ট পাচ্ছে না।ভগবান তাকে কোন কষ্ট দিচ্ছে না।নীরবতা খান খান হয়ে গেল সদ্যোজাগ্রত শিশুর বুকফাটা আর্তনাদে যা কেউ শোনে নি।তার
মা ও না।
নিতাই চিৎকার করে কাঁদছে।মা
ওমা মাগো কই তুমি?মা মা মা মা……..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.