মেঘ বলাকার গল্প

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
-‘আমাদের কি আবার দেখা হবে?’
-জানি না।
-জানতে চাও কি?
-না।
কাট্ কাট্। কি হচ্ছে এসব! হচ্ছে না হচ্ছে না। এটা একটা ইমোশনাল সিন, অথচ তোমার এক্টিং দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব খুশী হচ্ছো। যেরকম খুশী জসীম ১০ লাখ টাকার লটারি পেলে হতো। অারো অাবেগ ঢালতে হবে। রেডি, স্টার্ট……

একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে অাছি। অামি দীপংকর। এ মুভির স্ক্রীপ্ট রাইটার। অামি এ স্ক্রীপ্ট নিয়ে একদম সন্তুষ্ট না। শুধু এটা কেন, অামার লেখা কোন মুভির স্ক্রীপ্ট নিয়ে সন্তুষ্ট না। অথচ এফ ডি সির প্রথম সারির স্ক্রীপ্টরাইটারের তালিকায় অামার নাম যে কি করে শোভা পায় তাই বুঝতে পারি না।
সচরাচর অামি গম্ভীর, তাই টিমে হাসি ঠাট্টার সাথে সর্বদা ভদ্র দূরত্ব বজায় রেখে চলি….। অাজকে শ্যুটিং শেষ হলেই টিম চলবে বোরা বোরা দ্বীপে। সেখানে বেশ কিছু শট আছে। আজকের শ্যুটিং প্যাক অাপ। সবাই যে যার রুমে চলে যাচ্ছে।
অামি অামার রুমে চলে এলাম। অাকাশ গর্জে উঠলো। ভারী বর্ষন হবে। হঠাৎ একটা ম্যাসেজ। পরিচালক বলছে
-রুম থেকে বাহির হবেন একটু?
অামি ততক্ষনে ফ্রেশ হয়ে এসেছি। দরজা খুলে বাইরে বেরুতেই দেখি পরিচালক অাবেদ হাসান দাড়িয়ে। তার দিকে মুচকি হেসে বললাম
-ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘরে পৌছুলো। কাল ৯ টায় ফ্লাইট। এখনো ঘুমোন নি?
-না। যদিও অাজ সারাদিন পরিশ্রম করেছি। যাই হোক, সিগেরেট?
মুচকি হেসে সিগেরেট ধরাতে ধরাতে বললাম
-এবারের মুভিটা ব্যাবসাসফল হবে বলে বিশ্বাস করি।
তিনি মুচকি হাসি দিলেন। প্রবল ব্যাক্তিত্ব যেন লুকানো থাকে ঐ হাসির পেছনে। এত পৌরুষদ্বীপ্ত কেন? বুকে ঘাঁ মারে। কষ্ট হয় অনেক। তার চোখের দিকে তাকাই। কেন যেন মনে হয় কিছু বলতে চান, যা খুব গোপন…। কিন্তু কখনোই কিছু বলেন না।
ততক্ষনে অামরা ব্যালকুনি তে দাড়িয়ে। ঝরো বাতাস, হঠাৎ টের পেলাম তিনি অামার হাতের পেশীতে ধরে অাছেন। কিছুই বলি না। অনুভব করি। চারদিকে ঝরো বাতাস। শ্রাবণের নীরব রাত্রি…….

২.
অামারা পৌছে গেলাম বোরা বোরা দ্বীপে। দ্বীপে পা দিয়ে শুধু একটা কথাই বললাম, অসাধারন। বোরা বোরা দ্বীপ, তাহিতি তে অবস্থিত এক সাউথ প্যাসিফিক অাইল্যান্ড। প্রকৃতি যেন সাতরঙ দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে দ্বীপটাকে।অাকাশ ও সমুদ্রে যেন কাঁচা নীলরং ঢেলে দিয়েছে। রং এখনো শুকোয় নি। সাথে ঝলমলে শ্রাবন দিন। অসম্ভব সৌন্দর্য্যমন্ডিত দ্বীপটা। আজকে শ্যুটিং হবে না। বীচের নরম বালিতে পা ছড়িয়ে বসে অাছি। হঠাৎ অাবেদ ভাই এসে পাশে বসলো। অামার দিকে তাকিয়ে বললো
-কি হলো লেখক সাহেব? মন খারাপ?
-না ভাই। অাসলে বিশালতা টা উপভোগ করছি।
-এই দ্বীপটা এতবার দেখেছি। তাও দেখতে ভালোই লাগে।
এই বলে অামার কাছে এসে ঘেঁষে বসলো।
কেন জানিনা অামার কাছে উনার শরীরের গন্ধটা ভালোলাগে। ইচ্ছে করে কাঁচের জারে ভরে রাখতে। তারপর যখন একা একা রাত কাটবে তখন জারটা খুলে অল্প অল্প ঘ্রাণ নিবো।
নিজের লাগামহীন ছেলেমানুষী ভাবনায় নিজের কাছেই কেমন লজ্জ্বা লজ্জ্বা লাগছে। তার শরীরের একটা পাশ অামার সাথে লেপ্টে অাছে। অামাদের পায়ের কাছে হার মেনেছে সমুদ্রের ঢেউ। প্রতিবার পা ছুঁয়ে যায়।
অামার একটা হাত তিনি তার মুষ্ঠির মাঝে নিলেন। শরীরটা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। ভিতর ভিতর কাঁপছি, কিন্তু এ কাঁপনি বাইরে প্রকাশ করা যাবে না। কখখ্নো। হঠাৎ করে অাবেদ ভাই বললো
-‘স্নান করবে সমুদ্রে?’

অামি তার দিকে তাকালাম। অাগ্রহ নিয়ে অামার দিকে তাকিয়ে অাছে। অামারো ইচ্ছে করছে। তিনি সাদা শার্ট ও জিন্সের প্যান্ট টা খুলে ফেললেন। তার দিকে রাক্ষসের মতো হা করে তাকিয়ে অাছি। পুরো শরীরটা সোনালী হলুদ। প্রত্যেকটা ভাঁজে ভাঁজে মাংসপেশি ফুলে উঠেছে। হালকা দাঁড়িগোঁফে অাবৃত ও অায়ত টলটলে চোখ দেখে বুকে যেন দ্রিম দ্রিম করে বাজছে।
ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি তার। এবার অামি অামার জামাপ্যান্ট খুললাম। জীমের বদৌলতে সেইরকম সুগঠিত শরীর পেয়েছি। চোখের কোনে তাকিয়ে দেখলাম অাবেদ ভাইয়ের অবস্থায় ও সেইম। দুজনে পানিতে নেমে দাপাদাপি করছি অার হালকা ছুঁয়ে যাচ্ছি একে অপরকে। বুঝতে পারছি যে দুজনেই দুজনকে চাই। খুব কাছাকাছি…….

৩.
রাত্রে পার্টি হচ্ছে। সফট ড্রিংস, হার্ড ড্রিংস সব ধরনের ব্যাবস্থা অাছে। সবাই অাকন্ঠ মদ গিলছে। হালকা মিউজিকের তালে বিয়ার গিলছি। এসব পার্টি ভাল্লাগে না। হাজিরা দেবার মতো শুধু এটেন্ড করা। অামি চলে গেলাম সী বীচে। দেখি যে অমল(ক্যামেরাম্যান) বসে অাছে। অমলের পাশে বসতেই বললো
-রাতের অাকাশটা দেখেছো?
-হা। ঐ যে দেখো সপ্তর্ষিমণ্ডল। দেখতে ভালো লাগে।
-মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কোন একটা তারার খোঁজে হারিয়ে যাই।
-কেন হারাতে চাও?
-কারন বেঁধে রাখার মতো কেউ ই তো নেই।
-পছন্দ হয় কাউকে?
-ঠিক হয় কি না জানি না। তবে কাছে থাকতে ভালো লাগে।
-কে সে?
সে অামার মুখের দিকে তাকিয়ে অামতা অামতা করতে লাগলো….। যখন মুখ খুলবে তখনি অামার ফোন এলো….।
-হ্যালো স্যার?
-কোথায় তুমি?
-সী বীচে…
-আচ্ছা তুমি কি এখন তোমার রুমে অাসতে পারবে?
-আসছি।
এই বলেই অভদ্রের মতো উঠে পড়লাম। তাকে কিছু না বলেই। সে হা করে তাকিয়ে অাছে অামার গমনপথের দিকে।
রুমের সামনে গেলাম। রুমে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেলাম। সারাটা ঘর মোমবাতি দিয়ে সাজানো। হরেক রঙের মোমবাতি। অামি বিষ্ময়ে থ হয়ে গেছি। বর্নমালা হাতাচ্ছি কিছু বলবার জন্য। কিন্তু সব বর্ণমালা যেন হারিয়ে গেছে।
-এসব কি স্যার। কার জন্য।
-দীপংকর, এসব শুধুই তোমার জন্য।
-কিন্তু কেন…?

স্যার কোন কথা বলতে পারছেন না। কিছুক্ষন অসহায়ের মতো দাড়িয়ে রইলো। তারপর ঝট করে বলেই বসলো, অাই লাভ ইউ। তারপর অামার দিকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো। অামি বিষ্ময়ে থ বনে গেছি। এসবের মানে বা কি! এবার স্যার অামার কোমড় জড়িয়ে ধরে অামার চোখের দিকে তাকিয়ে অাছে। নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছে। মদির রাত জানান দিচ্ছে কামনা। অামার দিকে এগিয়ে এলো স্যারের দুটি ঠোঁট। খুব। কাছাকাছি। হঠাৎ আমি ছিটকে সরে গেলাম। বেরিয়ে গেলাম রুম থেকে।
ফিরে গেলাম অতীতে। অালোকজগতের কালো অতীত। তখন অামি নতুন স্ক্রীপ্ট লিখি। এ দুয়ার ও দুয়ার ঘুরি কিন্তু কেউ অামার লিখা গ্রহন করে না। কেউ কেউ খারাপ ইঙ্গিত দেয়। একবার এখলাস নামে বিখ্যাত চিত্রপরিচালকের কাছে গেলাম স্ক্রীপ্ট নিয়ে। তিনি পড়ে অামায় বিশাল উৎসাহ দিলেন। অামি মনে মনে খুব খুশী হলাম। বাট তিনি অামার সাথে শোতে চান।এবার অার না করলাম না, সামনের নতুন ভবিষ্যত অামার কাছে অনেক কিছু। তাকে বিলিয়ে দিলাম অামার এ দেহ। অসহ্য,যন্ত্রনায় ভোগ্যবস্তু হলাম অামি।
তারপর অাবার ডাকলো অামায়। গেলাম। অাবারো ব্যাবহার করতে চাইলো বাধা দিলাম। তারপর ফোন বের করে অামার সামনে তুলে ধরলো। দুচোখ বিষ্ফোরিত। কারন তার সাথে অামার যৌনকর্মের ভিডিও তখন প্লে হয়েছে ফোনে। সে বললো তার কথামতো না চললে এ ভিডিও অামার বাবা মার কাছে পৌছে যাবে।

অামার স্ক্রীপ্ট সে গ্রহন করলো না। তার বদলে দিনরাত চলতো অামার উপর অকথ্য অত্যাচার। একসময় অার সহ্য করতে পারি নি। প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নিলো। একদিন মিলনের সময় টুটি কামড়ে ধরি তার। সকল রাগ ক্ষোভ বড় হতে থাকে। দাঁত দিয়ে টুঁটি ছিঁড়ে ফেলি। তারপর চোখের সামনে দেখি কাতরাতে কাতরাতে মারা যায়।
তারপর অামার জেল হয়। জানি মৃত্যুদণ্ড সুনিশ্চিত, অার তার বিরুদ্ধে কোন প্রমান ও রাখতে পারি নি। তবে সেসময় দেবদূত হয়ে অামার জীবনে এলো অাবেদ ভাই। অামায় সাহায্য করেন ও জেল থেকে দ্রুত বের করে নেন। তরপর তার সিনেমায় প্রথম কাজ করি ও সেবছর ই স্ক্রীপ্টের জন্য সবচেয়ে বড় সম্মাননা পাই। তারপর অার থামতে হয় নি। ১০ বছরে অনেক স্ক্রীপ্ট লিখি ও প্রায় শতভাগ সফল। তবে সে দশ বছরে তার সাথে কোন কাজ করি নি।
একটা জিনিস মনের মধ্য খচখচ করে এখনো। তিনি কেন অামায় সাহায্য করেছিলেন? কেন? তার উত্তর অাজো খোঁজি…।

৪.
অামি বাসায় চলে যাচ্ছি। ডায়লগ রাইটার কে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছি। কারন কালকে রাত্রে যা হয়েছে তারপর অার থাকা যায় না। অামি তাকে শ্রদ্ধা করতাম। কিন্তু তিনিও যে এমন কিছু চিন্তা করবেন তা কল্পনাতীত। অার কষ্টই বা কে পেতে চায় ভালোবেসে। অন্তত অারো কয়েকটা মাসের মধ্য বিয়েটা যেখানে সারতে হবে সেখানে এসব ভাবা বড় বেমানান। বাবা মা বিয়ে ঠিক করেছে। অার অামিও না করিনি। কেন যে বিয়েটা করছি তা জানি না। হয়তোবা শুধুই কর্তব্য। মা বাবার মুখে হাসি ফোটানো।
সিনেমাজগতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। এসব নোংরামি অার ভাল্লাগে না। ছেড়ে দিবো সব। মফস্বলে বাবার হার্ডওয়ারের দোকানে বসবো। যদিও ব্যাঙ্কে যে টাকা অাছে তা দিয়ে তিন পুরুষ বসে খেতে পারবে।
প্লেন ঢাকায় পৌছেছে। অামি সরাসরি রওনা দিলাম নেত্রকোনায়। দাদার বাড়ি। সেখানে কয়েকটা দিন থাকবো। অাকাশটা ঘনকালো মেঘে ছেয়ে অাছে। বাসে উঠতেই প্রবল বৃষ্টি। চারদিক ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পৌছুলাম তাড়াতাড়িই। বাবা মাকে না জানিয়ে চলে এলাম। অামার অাসাতে তারা অবাক ই হলো। তারা জানে যে অারো ২ মাস পড়ে অাসবো। মা জিগ্যেস করলো
-এসে পড়লি কেন?
– মা অামি অার স্ক্রীপ্ট লিখবো না। ভাল্লাগে না। অন্য কিছু করবো।
মা যেন খুশিই হলেন। বললেন
-ঘরের ছেলে ঘরে থেকেই কাজকর্ম কর।
হ্যা, অামি এই সিনেমাজগতে অার কাজ করবো না। বিতৃষ্ণা এসে গেছে। চুপচাপ বসে অাছি বাড়ির বাইরে হিজলতলায়। অাবার বৃষ্টি নামছে ঝমঝমিয়ে। বৃষ্টিতে ভিজছি অামি। চলে যাচ্ছে শ্রাবনের দিন। অাকাশে কয়েকটা বলাকা উড়ে যাচ্ছে। মেঘ বলাকা….।

৫.
বিয়েটা বাবা মাকে বলে অারো এগিয়ে নিলাম। শ্রাবণের ২৭ তারিখ অর্থাৎ অাগামী পরশু অামার বিয়ে। সারাবাড়ি সাজ সাজ রব। কারন অামি চাচ্ছি জীবনটা নতুন করে শুরু করতে। দেখতে দেখতে কেটে গেলো দিন দুটো।
অাজ অামার বিয়ে। সারাবাড়ি তে সুখ সুখ ভাব। কেবল অামার মনেই কোন সুখ নেই। থাকবে কি না কখনো জানি না। হঠাৎ একটা অচেনা নাম্বার হতে কল অাসলো। কল ধরতেই ওপাশের উদভ্রান্ত একটা কন্ঠস্বর বলে
-কোথায় তুমি?
-কে?
-অামি অাবেদ।
অামি চুপ করে অাছি। ওপাশের কন্ঠটা বলে
-প্লীজ তোমার বাড়ির বাইরে অাসো। অামি সেখানে অপেক্ষা করছি।
অামি হতবাক হয়ে গেছি। হাটতে হাটতে বাইরে চলে গেলাম । একি অবস্থা তার! দেখি তার বয়সটা অনেক বেড়ে গেছে। চোখের নিচে কালি ও চোখদুটো লাল লাল। সিগেরেটের কড়া গন্ধ। তার কাছে যেতেই বলে
-ফোন ধরোনি কেন!
অামার কিছু বলার ছিলো না। কারন অামি সিম চেঞ্জ করেছিলাম। সে জগত হতে বিছিন্ন হবার জন্য।
-কেন এমন করেছো। কেন তাকেই কষ্ট দাও যে ভালোবাসে তোমায়…?
অামি প্রতিউত্তরে বললাম
-অাজকে অামার বিয়ে। আর আপনাকে আমি শ্রদ্ধার সহিত দেখি।
-সে কারনে কি তোমার চোখ দিয়েও জল গড়াচ্ছে?
হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছলাাম।বললাম
-সে যাই হোক। কি মূল্য,এ ভালোবাসার। প্রথমে অামার কাছে বাবা মা। সারাজীবন ত তাদের কষ্টই দিলাম। এখন অার এতবড় কষ্টটা দিতে চাই না। তবে একটা প্রশ্নের উত্তর চাই। অাপনি কেন সেদিন অামায় বাঁচিয়েছিলেন?
তারপর সে অামায় বিচিত্র এক গল্প শোনালো। শুরু করলো এভাবে
-এখলাস ছিলো স্যাডিস্ট। সে অামার উপরও নির্যাতন চালিয়েছে। নিজের ছোট ভাইয়ের উপর ও।
-ছোট ভাই!!
-হা। ব্যাপারটা ফিল্ম ইন্ড্রাস্টির কেউ জানে না। বাবার প্রথম পক্ষের সন্তান সে। অামি দ্বিতীয় পক্ষের হওয়া সত্বেও বাবা যেন তাকেই বেশি ভালোবাসতো। অামি হতাম অবহেলিত। ততদিনে সে অামার মনে সমকামীতার বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছে। অামরা দুজনেই সিনেমাজগতে ঢুকলাম। তারপর তার লালসা অারো বিস্তৃত হলো। যেখানে যাদের পারছে তাকেই ইউজ করছে। অসহায় মানুষদের মাঝে অামি অামার ছাপ দেখেছি। তারপর থেকে প্রতিশোধস্পৃহা মনে জাগলো। অসমাপ্ত কাজটা তুমিই সমাপ্ত করলে। অামারও তার প্রতি ছিলো তীব্র,ঘৃনা। তাই সাহায্য করা।
কিছুক্ষন সবকিছু শোনে হজম করলাম। কিন্তু বাস্তবতা কি করে ভুলি। তারপর মুখ খোললাম
-সাহায্য করেছেন তা কখনো ভুলতে পারবো না। সে কারনে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্তু অামার পক্ষে অার কিছু করা সম্ভব না।
সে কিছুক্ষন চুপ করে ছিলো। তারপর সে বললো
-অাচ্ছা, একটা কাজ করতে পারি?
-কি?
-অামি কি তোমায় একটু জড়িয়ে ধরবো?
অাবিদের চোখ জল ছলছল করছে। দীপংকর তাকে জড়িয়ে ধরলো। ডুকরে কেঁদে উঠলো অাবিদ। ঝরো বাতাস উঠছে। অনেকক্ষন বুকের মাঝখানে জড়িয়ে ধরে রাখলো। এবার ছাড়লো দীপংকর কে। চলে যেতে লাগলো। বৃষ্টি নামছে। শ্রাবনের বারিধারা……

৬.
ঘরে গেলাম। মন খারাপ করে বসে অাছি। বরযাত্রী সব রেডি হচ্ছে। বাবা অামার ঘরে অাসলো। এসে অামার শুকনো মুখ দেখে বললো
-সবকিছু ঠিক বাবা?
-হ্যা বাবা, সব ঠিকই অাছে।
-সব ঠিক থাকলে অাবেদ কাঁদলো কেন?
অামি বাবার দিকে তাকালাম। তার মানে বাবা সব দেখেছে ও শোনেছে! কি উত্তর দিবো অামি! চুপ করে নিচু হয়ে থাকলাম।
বাবা বলতে লাগলো
-বিয়েটা কোন ছেলেখেলা না বাবা। তুমি যাকে বিয়ে করে অানতে যাচ্ছো তাকে ভালোবাসতে না পারলে সারাটাজীবন তাকে কষ্ট দেবার অধিকার রাখো না।
-বাবা, তুমি এ কথা বলছো!
-অামাকে বেশ ব্যাকডেটেড মনে করছো? সমকামীতা বিষয়ক অার্টিকেল পড়ার পর যখন বুঝেছি এটা রোগ না, তখন তোমাদের টা তোমাদের উপর ছেড়ে দিয়েছি। সমাজ টা তোমার সঙ্গ দিবে না। অার অামাদের কথা ভেবো না। কারন অামাদের মৃত্যুর পর তোমার অারো অনেকটা পথ চলতে হবে। তখন চাই না অামাদের প্রতি তোমার কোন অাক্ষেপ থাকুক।
-বাবা অাজ যে বিয়ে…
-ক্ষতি বেশি করার থেকে অল্প করাই ভালো…. তাই না?
-বাবা তাহলে পরিস্থিতি সামাল…অার তুমি খুব কষ্ট পেয়েছো?
কিছুক্ষন থেকে বললো
-তা পেয়েছি। তবে তোর সুখের তুলনায় তা কোন কষ্টই না। সন্তানের সুখটাই পিতামাতার কাছে অমূল্য। একমাত্র পিতামাতাই বুঝতে পারে। যখন বাবা হবি, তখন বুঝবি।
অামি তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিলাম।
অামি ফোন দিলাম অাবেদ ভাইকে। ফোন ধরছে না! অাতঙ্কে বুকটা ধক্ করে উঠলো। অাবার ফোন দিলাম। ধরছে না। মনে পড়লো এখন কোন বাস নেই। বাসস্ট্যান্ড এ গিয়ে দেখি একটা বেঞ্চে অসহায়ের মতো বসে অাছে। অামি কাছে যেতেই অামার সামনে উঠে দাঁড়ালো। অামি তার সামনে বললাম
-অাই লাভ ইউ ট্যু।
-সত্যি?
অামি কিছু না বলে তাকে জড়িয়ে ধরি। চোখ বেয়ে নামতে থাকে অঝোরে।বৃষ্টি তখনো থামে নি। বাঁচ্চাদের মতো হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলো। একদম বাচ্চামানুষ। এবার কানেকানে বললাম
-ছাড়ো ত এবার। সবাই কেমন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
সে ছেড়ে দিলো। অামার দিকে তাকিয়ে হ্যাবলার মতো হাসি দিলো। অাবার বুকটাতে গিয়ে লাগলো।
দুজনে হাত ধরে রাস্তায় নেমে পড়লাম। কোথায় যাচ্ছি জানি না। মাঝে মাঝে অাকাশের দিকে তাকাচ্ছি। কয়েকটা বক উড়ে গেলো।অামাদের মতো সেই বকদের ও হয়তো গল্প অাছে। ভেজা শ্রাবণের মেঘ বলাকার গল্প……

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.