রূপসাগরে মনের মানুষ

লেখক: চিন্ময়ের ইতিকথা
উৎসর্গ: হাসান মুগ্ধ (বৈরাগী)

১.
গেরুয়া রঙের একটা চাদর। মাথার চুল এলোমেলো। চোখগুলো শান্ত ও আয়ত। হাতে একটা একটা একতারা। গান গাইছে সে
“মনো ভবে ভবে পাল
কি দিয়া সাজাইলা এ সংসার
শূন্য থেকে শুরু সবই শূন্যের মাজার……”
.
লোকটার নাম সাধন বৈরাগী। যখন আমি তাকে দেখি, তখনই আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। বুকের মাঝে কিছু একটা ঝটপট করে। হয়তো সেটা আমার প্রাণপাখি। তার স্মিত হাসি আমাকে চুম্বকের মতো টানে। কিন্তু কখনো তাকে বুঝতে দেই নি। বৈরাগী একতারা হাতে সারাদিন গান গেয়ে যায়। সন্ধ্যায় কোন বাড়িতে এসে বলে,”মা, আছো কি!” তখন লোকজন বেড়িয়ে এসে তাকে খাবার দেয়। আমার খুব ইচ্ছে করে, তাকে নিজের হাতে মাখিয়ে খাইয়ে দেই। কিন্তু সে ইচ্ছেগুলো মনের দেয়ালে মাথা কুটে কুটে আহত হয়। ঈশ…. আমি যদি লোকটার পাশে বসে পুরো একটা রাত তার গান শুনতে পারতাম!
.
-কি রে শুভ, কি চিন্তা করস!
আমি হঠাৎ বাস্তবে চলে এলাম। দেখি, বিকাশ আমায় ডাকছে।
আমি প্রতিউত্তর দিলাম
-না রে, কিছু না।
-সারাদিন বাউলের গান শুনলে চলবো? আজ ইস্কুলে যাবি না?
-তুই রেডি থাক, আমি বাসা থাইক্যা রেডি হইয়া আইতাসি।
.
এই বলে আমি বাসার দিকে রওনা হলাম। মনে হতে লাগলো, স্কুলের কথা। কালকে রেজাল্ট দিবে। স্কুলের অমনোযোগী ছাত্রের লিস্টে প্রথমেই আমার নামটা শোভা পায়। ক্লাস ৯ চলে গেলো, একাউন্টিং এর ” এ” ও বুঝি না। কখনো দমবন্ধ করে, কখনো বা নাভিশ্বাস ফেলে ক্লাসটাকে রেহাই দিলাম বিকাল ৪ টায়। সাইকেলে চেপে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। ১১ কিমি দূরত্ব পারাপারে ছাত্রদের জন্য এর থেকে ভালো যান আর নেই। চুপচাপ আমি আর বিকাশ চলতে লাগলাম রাস্তা ধরে।
.
২.
ধানগুলো নিজেদেরকে সোনালী রঙে রাঙিয়ে নিয়েছে। এবার মানুষের ঘরে যাবার অপেক্ষা করছে। চুপচাপ পাশাপাশি সাইকেল চালাচ্ছি আমি আর বিকাশ । রাস্তার মোড়ে একটা জটলা। স্বভাব-বশত কৌতূহল সামলাতে পেরে আমি ও বিকাশ গেলাম জটলার দিকে। গিয়ে দেখি যে একটা লোক বসে আছে মাটিতে। দুপাশে দুটো সুটকেস উল্টানো। সে খোঁজে খোঁজে একটা বক্স বের করলো। সেখান থেকে কিছু জীবাণুনাশক বের করে ব্যাবহার করতে লাগলো ছড়ে যাওয়া চামড়ায়। আমি একরাশ প্রশ্ন নিয়ে তার দিকে তাকালাম। সে আমার চোখের জিজ্ঞাসা বুঝতে পেরেই মনে হয় বললো -আমি ড. আরিফুর রহমান। নিমপাড়া গ্রামে যাবো। পথে অটো অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। এখন নিমপাড়া কিভাবে যাবো?
-আপনি কি রহমত মোল্লার বাড়ি যাবেন?
সে কিছুটা অবাক হয়ে জিগ্যেস করলো
-হ্যা, কিন্তু তুমি কি করে জানলে?
আমি তার প্রশ্ন উপেক্ষা করে বললাম
-আপনাকে আমি পৌঁছে দেই…
-কিন্তু তুমি আমার জন্য কষ্ট করতে যাবে কেন?
আমি স্মিত হেসে বললাম
-কারন আপনি আমাদের বাড়িতেই যাচ্ছেন।
.
মালপত্র বিকাশের সাইকেলে ও ডাক্তারকে আমার সাইকেলে নিয়ে চললাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। যখন বাড়িতে পৌছুলাম তখন মসজিদ থেকে সুমিষ্ট আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। হাত মুখ ধুয়ে নামাজ পড়ে বকুল তলায় বসলাম। এই ডাক্তার আমার বাবার বন্ধুর ছেলে। গ্রাম দেখার সুবাদে আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছে। তার চাকরি হয়েছে রামগোপালপুর হাসপাতালে। হাসপাতালটা আমাদের স্কুলের কাছেই।
.
৩.
শান বাঁধানো পুকুর পাড়ে একা একা বসে আছি হঠাৎ করে চোখ পড়লো যে ডাক্তার আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তিনি বললেন
-তোমার নামটা তো জানা হলো না?
-শরীফুল মোল্লা। ডাকনাম শুভ।
-তোমাদের গ্রামটা তো ঘুরে দেখতে হয়। আচ্ছা, তোমাদের গ্রামে দেখার মতো কি কি আছে?
-আহামরি কিছুই না। সবগুলো গ্রামের মতোই আমাদের গ্রামটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মণ্ডিত। সব কবি লেখকের কবিতা বা গল্পের মতো আমাদের গ্রামটা। তবে যদি বলেন স্পেশাল কি? তাহলে বলব, “সাধন বৈরাগী”।সে লালনকে লালিত করে তার কণ্ঠে। তার সুরে জোছনাও বিলীন হয়ে যায়। কোকিল পর্যন্ত ঈর্ষা করে।
-আর তুমি কর কি?
-আমি! আমি আফসোস করি। এতো সুন্দর কণ্ঠ তো আমারো হতে পারতো। মানুষকে মুগ্ধতার জালে জড়াতে পারতাম।
-তোমারও তো গুণ আছে!
-কথার সাবলীলতা ও তারল্য কোন গুন না। ক্যানভাসারদেরও সেই গুন থাকে। তাই আমি তুচ্ছ!
বুঝতে পারছি সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নীরবতার মর্মে আঘাত করে বলল
-দেখাতে নিয়ে যাবে না? সেই সাধন বৈরাগীকে?
-হা যাবো।
আমি উঠে চলে এলাম। ডাক্তার বসে বসে কি যেন ভাবে। হয়তো জোছনা দেখে…। দেখুক। আমি আমার মতো চলে এলাম আমার রুমে। রাতটাকে পাড়ি দেবার জন্য।
.
রাতটা যেন গড়িয়ে গড়িয়ে কাটলো। কিছুতেই শেষ হতে চাইছে না।কিন্তু তাকে শেষ তো হতেই হবে। এটাই নিয়ম। পরদিন স্কুলে গেলাম। আজকে রেজাল্ট। আল্লাহই জানে একাউন্টিং এ কি করবো? রেজাল্টের সময় বুকটা ধুকপুক করছে। কিন্তু আমি ষষ্ঠ হলাম। মার্কশীট নিতেই চোখ চলে গেলো একাউন্টিং এর ঘরে। ৩৩ পেয়েছি। তার মানে গ্রেস দিয়ে পাস করিয়েছে। আচ্ছা, আমি কি লেবেনডিস মার্কা ছাত্র? না মনে হয়। কারন লেবেনডিস মার্কা ছাত্রদের রোল ৬ হয় না। বিকাশ চতুর্থ হয়েছে। ক্লান্ত গাধার মতো ধীর গতিতে চলতে লাগলাম বাড়ির দিকে। বাড়ি যখন পৌছুলাম তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে। হাতমুখ ধুয়ে গেস্ট রুমে উপস্থিত হলাম। দেখি যে তিনি ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছেন। আমি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গলা খাঁকড়ি দিলাম। তিনি আমার দিকে মুখ তুলে মুচকি হেসে বললেন –আরে ভিতরে আসো। এটা ওটা নিয়ে তার সাথে খেজুরে আলাপ জুড়ে দিলাম। মাঝখানে আম্মা এসে বেরসিকের মতো বললেন
-খাবার তৈরি। খেতে এসো।
আমরা দুজন বাধ্য ছেলের মতো খাবারদাবার সম্পন্ন করলাম। তারপর আমি বললাম
-কি, যাবেন না কি! সেই বাউলকে দেখতে?
-চলো, যাওয়া যাক।
বেরিয়ে পড়লাম তাকে নিয়ে। শীতল বাতাস যেন আমাদের হাড় চিড়ে ভিতরের মজ্জা জমিয়ে দিবে। চারদিকে জোছনায় আবৃত। নদীর ধারে বসে আছে একজন লোক। দূর থেকে ভেসে আসছে সেই সুমধুর সুর। প্রাণে দোলা দেয়া সেই গান
.
“তারে ধরি ধরি মনে করি
ধরতে গেলে আর পেলামনা
দেখেছি….
দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা”
.
গানটা বুকে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ কে বিঁধছে। এই পরিবেশের মোহনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে এই গান। আরিফুরের দিকে তাকালাম। অবাক হয়ে দেখলাম,”সে কাঁদছে”! চোখের পানি লুকানোর কোন চেষ্টাই করলো না। সে বললো
-চলো, বাসায় চলে যাই।
তারপর সে আমার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে চলতে লাগলো। আমি তার পাশাপাশি নিশ্চুপ চলতে লাগলাম। নিঃস্থব্ধতার মাঝে বিশাল শব্দ করতে লাগলো, পায়ের নিচে আত্নহুতি দেয়া কিছু শুকনো পাতা।
.
৪.
গ্রামের ছেলেরা সবাই ৬ টার সময় উঠে পড়ে। কিন্তু আমার উঠতে একটু দেরী হয়। সেজন্য প্রায়শই আব্বা আমাকে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার সাথে তুলনা করেন। তবে সব কথায় কান দিলে হয় না, এটা বিশ্বাস করে বাবার কথাগুলো ধুলোতে উড়িয়ে দেই। আজকে আমার ঘুম ভেঙে গেছে তাড়াতাড়ি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৫:০২ বাজে। তাড়াতাড়ি উঠার কারনটা টের পাই তারপরেই। লুঙ্গির কিছুটা জায়গা দখল করে আছে আঠালো কিছু তরল পদার্থ। মুখটা চুপসে গেলো। এতো তাড়াতাড়ি গোসল করতে হবে। যাই হোক, কাঁধে একটা তোয়ালে ফেলে রওনা দিলাম পুকুরের দিকে। পুকুর পাড়ে বসে আছেন ডাক্তার। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলছে -এতো তাড়াতাড়ি গোসল করবে? আমার চেহারায় লজ্জা-মিশ্রিত সঙ্কোচের অভিব্যক্তি দেখা দিলো। কিছু বলতে পারছিলাম না। চুপ করে ছিলাম। তারপর চুপচাপ পুকুরে নেমে পড়লাম। ঈশ… পানি তো নয়, যেন ঠাণ্ডা কাঁচের টুকরো। চামড়ায় ঠাণ্ডা গেঁথে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ দাপিয়ে উঠে পড়লাম। উঠার সময় দেখি ডাক্তার আমায় চোরাচোখে দেখছে। প্রথমে অবাক হলেও তারপর বুঝতে পারলাম, এটা স্বাভাবিক। আমাকে দেখতে আহামরি কিছু না।তবে শরীর জুড়ে গিজগিজ করছে অসংখ্য পেশী। গোসল ও নাস্তা শেষ করে বেরুলাম ডাক্তারকে নিয়ে। সাইকেলে করে প্রথমে যাচ্ছি পুরনো কালীমন্দির। ডাক্তার নেমেই বললো
.
-অপূর্ব। আচ্ছা, এ সম্পর্কিত কোন মিথ চালু আছে?
-হ্যা আছে তো। একবার কয়েকটা ছেলে তুকতাক শেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। তাদেরকে বললো যে, যদি অমবশ্যায় কালীদেবির জিহ্বা আনতে পারে তাহলে তাদদেরকে তুকতাক শেখানো হবে। তারা চারজন বন্ধু ভরা অমবশ্যায় রওনা দিলো কালী দেবীর মন্দিরে। কিন্তু মন্দিরে গিয়ে কেউ আর সাহস করতে পারছে না। অবশেষে একটা সাহসী ছেলে ঢুকলো। ঢুকে দেখে ভিতরে কোন মূর্তি,নেই! তারপর বেরিয়ে এসে টর্চ মেরে দেখে যে মূর্তি আছে। আবার ঢুকে দেখে যে মূর্তি নেই। তারপর যখন আবার ঢুকতে যাবে তখন ফিসফিস করে কে যেন বলছে,”মরবি”! ছেলেটার জিদ চেপে গেলো। তখন সে মন্দিরে ঢুকলো আর শোনতে পেল আর্ত-চিৎকার। বাকি বন্ধুরা পড়িমরি করে দৌড় দিল। তার পরদিন সেই ছেলেটার কাটা মাথা পাওয়া গেল মন্দিরে।
এক নিঃশ্বাসে আমি ঘটনাটা বললাম।তারপর ডাক্তারবাবু বললো
-তুমি এসব বিশ্বাস করো?
-আমি বিশ্বাস অবিশ্বাস কিছুই করি না।
ডাক্তার আর কোন কথা বললো,না। আমি তাকে সারা গ্রাম দেখিয়ে নিয়ে এলাম। বাড়িতে এসে বললো
-আজ বৈরাগী আসবে না?
-না। কেন জানি না, বৈরাগী বুধবারে গান গায় না।
আমি তার চোখে একটা ঝিলিক দেখলাম। কে জানে, কিসের ঝিলিক এটা!
.
৫.
গ্রামের একজন লোক পা ভেঙে ফেলেছে। ডাক্তারের কাছে খবর দিলো তাকে দেখে আসতে। ডাক্তার কালবিক্ষেপ না করে রওনা দিল তাকে দেখতে। আমি কেন যেন ডাক্তারের ঘরে ঢুকলাম। যদিও এটা অন্যায়, তবুও ঢুকলাম। ল্যাপটপের পাশে পড়ে আছে একটা নীল রঙের ডায়েরী। চুপচাপ পড়লাম পুরোটা। পড়ে আমার নিজের কাছেই কষ্ট লাগতে থাকে। সত্যিই মানুষের জীবন কত অদ্ভুত। চুপচাপ বেড়িয়ে এলাম তার ঘর থেকে। তখন সন্ধ্যা নামে। আজকে বৃহস্পতিবার। ডাক্তার এলো। তার মুখ হাসিখুশি। তার হাসিমুখ দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠলো। আমার আশঙ্কাই কি ঠিক! জানি না। খেতে ইচ্ছে করছে না, তবুও আম্মার ডাকে না করতে পারলাম না। কারন, না খেলে আবার রেডিও শুরু হয়ে যাবে। খাবারের টেবিলে বসলে যার হুঁশ থাকে না, তার এমন মনমরা আচরণে সবাই অবাক হয়েছে। আব্বা দু বার বলেছে , কিছু হয়েছে? আমি কাঠখোট্টা টাইপ একটা না বলে এড়িয়ে গেলাম। কোনরকম খাবার গুঁজে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আকাশ থেকে জোছনা আসছে ভেসে ভেসে। আমার জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে আমার ঘরে। যেন জিগ্যেস করতে চাইছে, “তোমার মন খারাপ কেন? ” কিন্তু কেন যে আমার মনটা খারাপ , তা আমি জানি না। রাত্র তখন নয়টা বাজে। দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম। আমিও চুপচাপ বেরিয়ে পড়লাম। দেখি ডাক্তার চুপিচাপি বেরুচ্ছে। জানি কোথায় যাবে। আমি তার পিছু নিলাম। আমার সন্দেহটাই তাহলে ঠিক হলো। নদীর দিকে যাচ্ছে। আমি একটু শব্দ করে ফেললাম। ডাক্তার পিছন দিকে তাকালো। আমি তাড়াতাড়ি আগেই একটা গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়েছিলাম। তাই দেখতে পায় নি। সে যখন নিশ্চিত হলো তার পেছনে কেউ নেই, তখন আবার চলতে শুরু করলো। বৈরাগী আপন মনে গান গাইছে। সে বৈরাগীর পেছন থেকে ডাক দিলো -স্বদেশ! বৈরাগী চমকে উঠলো। তার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। আমি সব বুঝতে পেরে গেলাম। তার মানে আমার আশঙ্কাই ঠিক। ডায়রির কথাগুলো মনে পড়তে লাগলো:
.
আমি আরিফ। আজ সেরাকন্ঠের অডিশনে যাচ্ছি। জানি না কি হয়। অডিশনে গিয়ে একটা ছেলের চোখে চোখ পড়ে যায়। খুব ভালোলাগে তাকে। তার নাম স্বদেশ। তার সাথে কথা হয়। তারপর আমরা দুজনেই সেরাকন্ঠের অডিশনে ইয়েস-কার্ড পাই। যখন টপ ১২ থেকে টপ টেন সিলেক্ট হবে, তখন আমার অ্যাকসিডেন্ট হয়। স্বদেশ প্রতিযোগিতা ছেড়ে চলে আসে আমাকে দেখার জন্য। তখন বুঝতে পারি, আমি ওর স্বপ্ন থেকেও বড় হয়ে গেছি। আমরা দুজন বাদ পড়লাম। তবে আমরা খুশি। আমরা একসাথে থাকতে শুরু করলাম। আমার পার্টিতে যাওয়ার অভ্যাস ছিলো । আর সেসময় স্বদেশের জেগে উঠেছিলো তীব্র লালন-প্রেম। লালনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করে সে তার কণ্ঠে। সাথে তার পোশাক চেঞ্জ করে ফেলে। তাকে পার্টিতে নিয়ে যেতে পারতাম না। সে কারনে রাগারাগি হতো। একদিন সে বললো,
“আমি সারাদিন লালনের গান গাইবো ও রাতটা কোনভাবে কাটিয়ে দিব। “
আমি অবাক হলাম। সে ভাঙিয়ে বললো যে,
“আমি বাউল হতে চাই”
আমি অবাক হলাম। তাকে বাধা দিলাম। কিন্তু সে মানল না। বললো,
“আমার মতো হতে পারলে আমার খোঁজে চলে এসো, আর আমি তোমার মতো হতে পারলে তোমায় খুঁজব। তবে ঠিকানা দেব না আমরা। দেখি, কার আত্মত্যাগ বড়”।
এই বলে সে চলে গেলো। আমি ভেবেছিলাম, আমি আমার মতো থাকবো। কিন্তু এই চারটে বছরে আমাকে উপলব্ধি করিয়ে দিয়েছে তার অনুপস্থিতির মানে। আমি পরাজিত। তবে আমি জয়ী।
.
৬.
বৈরাগীর দুগালে দুহাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে ডাক্তার। বৈরাগী চুপ করে দাড়িয়ে আছে। ডাক্তার বললো
–আমি তোমার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল ছেড়ে এই রামগোপালপুর চলে এসেছি। আশা করছি তুমি আমার জন্য,এই গ্রাম ছেড়ে রাগগোপালপুরে আসতে পারবে। কি বলো স্বদেশ? পারবে না?
বৈরাগী কোন কথা বলছে না।
-কি হলো স্বদেশ কথা বলো!
দেখলাম যে বৈরাগী ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরে আছে। সে অঝোর নয়নে কেঁদে চলছে।
-কি হলো, আমাকে ছেড়ে আর কখনো চলে যাবে?
-না। আমার ভুল হয়ে গেছে। আমায়….
-চুপ। কোন মাফ চাওয়াচাওয়ি নেই। আজকে এর শাস্তি আছে।
-কি শাস্তি দেবে আমায় বলো?
ডাক্তার এদিক ওদিক দেখে ঝট করে মাছরাঙা পাখির মতো মুখ ডুবিয়ে দিলো। পান করছে বৈরাগীর সুধা-ওষ্ঠ। গভীর আবেগে আলিঙ্গন করছে একে অপরকে। তারপর বৈরাগীকে ডাক্তার বললো
-আজ এই জোছনায় সারারাত গান গাইবে। আমি তোমার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে থাকবো। কি হল! শোনাবে না!
বৈরাগী মুচকি হেসে বললো
-অবশ্যই।
কুয়াশা বাড়ছে। আকাশ থেকে গলে গলে জোছনা পড়ছে।একি! আমার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। বৈরাগী গান গাইছে
.
“মিলন হবে কতদিনে
আমার মনের মানুষের সনে
ও আমার মনের মানুষেরও সনে”…..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.