রোবট

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা
============================
এটি একটি মননশীল চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ।
=============================

১.
সালঃ 3.4*10^9
দুপুর ২ টা। নাইরা সিটি।
তাপমাত্রাঃ ৯৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
শহরটা একটা বিশাল মরুভূমির মাঝে অবস্থিত। দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর জুড়ে ঝুরিঝুরি সিলিকন ডাই অক্সাইডগুলো তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে প্রতিবারের দমকা হাওয়ায়। আর সেখানে সগর্বে মাথা তুলে
দাঁড়িয়ে আছে কিছু ক্যাকটাস। চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতেই যেন কিছুসংখ্যক রোবট আস্তানা গেড়েছে সেই ভূখন্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে। যেন বিদ্ধস্থ এক ভূতুড়ে শহরের মাথার উপর সূর্যটা অক্লান্তভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার নিঃশ্বাস, মনে হচ্ছে যেন বিষকন্যার প্রভাতরী।

২.
সেই শহরের চারটি শ্রেনীর রোবটের মধ্য চিংঘা দ্বিতীয় শ্রেনীর রোবট।
প্রথম শ্রেনীর রোবটদের ক্যামের আলফেক্টরাস UV থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে সফটওয়্যার ব্যাংক থেকে লুকিয়ে মানবীয় কিছু আবেগ নিজের মধ্য সেটআপ করেছে। যার ফলে সে প্রথম শ্রেনীর রোবটদের মত আবেগের স্বাদ পায় ও ভাবে “সত্যিই মানুষেরা কত সৌভাগ্যবান ছিল!”
প্রথম শ্রেনীর রোবটদের কে দেখে চিংঘা । তাদের মধ্য Male Female আছে। তারাই শহর নিয়ন্ত্রন করে। তারও ইচ্ছা জাগে প্রথম শ্রেনীর রোবটদের মত সেও কারো কাছে তার আবেগের ব্যাপারগুলো শেয়ার করবে। একদিন সে একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসে। সবার অগোচরে একটা চতুর্থ শ্রেনীর রোবট “ইনকা” কে আবেগের সফটওয়্যারগুলো ইনস্টল করে দেয়।
করেই সে বুঝতে পারল বড় ভুল হয়ে গেছে!

৩.
কারন সে সব সফটওয়্যার ইনস্টল করেছে ছেলেদের। তার কাছে কোন মেয়েদের সফটওয়্যার নেই!
সে শিউর, ইনকাও তার মত ছেলেই! প্রথম প্রথম ইনকা, চিংঘার টেলিপ্যাথিতে যোগ দিত না!
কিন্তু কালাবর্তে সেও সঙ্গীহীন মনোভাব বোধ করায় আস্তে আস্তে “থটফুল ডিসসাউন্ড” সফটওয়্যার দ্বারা
ভাবাবেগ আদানপ্রদান করত। আস্তে আস্তে তাদের কথাবার্তা হত। তারা ভাবত “ইস কত সুন্দর যান্ত্রিক কন্ঠ।”
তারা কথা বলত রাত্রে, যখন সব রোবটের কপ্রোটন মগজ বিশ্রাম নিত। হালকা হলদেটে সোডিয়াম আলোর মাঝে তীব্র শৈতিক অদ্ভুতুড়ে নির্জীব পরিবেশে তারা যোগাযোগ করত।তখন তারা তাদের ল্যান লাইনের হার্জ একেবারে কমিয়ে ০.৬৬৩ ন্যানো হার্জ এ নিয়ে কথা বলত যাতে তাদের ওয়েভ কেউ টের নাপায়।

৪.
দিন যায় মাস যায়।
রোবট দুটির মাঝে এক ধরনের অনুভূতি কাজ করে।
ইনকা চতুর্থ শ্রেনীর রোবট বলে তাকে কাজ করতে হয় অন্য রোবটদের বাসায়। আর বাসার মালিক তাকে কাজের বিনিময়ে তার লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি চার্জ করতে দেয়।
অপরদিকে চিংঘার কাজ হল নতুন রোবট তৈরী করা। সে একটা সরকারী দলানে থাকে যেখানেকঠোরতম নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক ব্যাবস্থা বিদ্যমান।
এরই মাঝে একদিন এর কথা।
ইনকাঃ চিংঘা , আমার এক ধরনের অনুভূতি হচ্ছে।
চিংঘাঃ গামা কম্পিউটার থেকে তোমার অনুভূতির গ্রাফটা নিয়ে স্ক্যান করে সার্চ দাও ওমেগাতে। দেখো কি আসে!
ইনকাঃ সার্চ দিলাম। একটা লেখা।
চিংঘাঃ কি?
ইনকাঃ I was Raped buy my house made.
চিংঘাঃ কি!!!! কিভাবে! (যান্ত্রিক কন্ঠে উদ্বেগ ও সংশয়েরছাপ। )
ইনকাঃ বাড়ির মালিকের ফিমেল বাসায় ছিলো না। সে ভেবেছে আমার কোন অনুভূতি নেই। আর তারপর তার নেপচুনিয়াম স্টিকটা……..

৫.
চিংঘা যেন ভাষাহীন হয়ে পড়েছে! এ কি শুনছে!
প্রতিশোধপরায়ন হয়ে উঠল তার কপ্রোটন।
চিংঘাঃ শোন, আমার প্ল্যানমত কাজ করবে। আর নিজেকে শক্ত কর! আমরা কাছাকাছি আরেকটা শহর আছে। দুজন সেখান যাব। পালাব এই শহর ছেড়ে। বাকিটা তখন দেখা যাবে! শোন দুটো কাজ একসাথে করতে হবে। তুমি তোমার নাইলন ৬:৬ এর তৈরী সুইচটা অফ করে দেবে।
ইনকাঃ কি সর্বনাশ! তাহলে তো একে মানুষের ভাষায় মৃত্যু বলে! আমরা ওয়ান টাইম রোবট। একবার অকেজো হয়ে গেলে তা আর রিপেয়ার করা অসম্ভব!

চিংঘাঃ আসলে তা হবে না। কারন টাইমার দিয়ে নেবে। শোন ওয়েক আপ টাইমারটা সকাল ৯.০৫ এ সেট করে নাইলনের সুইচটা অফ করে দেবে। তোমার সাথে আমিও করব। নষ্ট রোরটদুটোকে ফেলে দেবে Weast Me তে। যেখানে রোবটদের ভাঙা হয় তারপর আমরা পালিয়ে যাব!
ইনকাঃ যদি ধরতে পারে তাহলে তো মানব সফটওয়্যার এর একটা অনুভূতি না কি এক বছর পর্যন্ত দেয় যা কি না “আগুনে পোড়া ” বলে! সেটা না কি খুব কষ্টদায়ক।
চিংঘাঃ মুক্তির জন্য আমাদের এতটুকু করতেই হবে!!! পারবে না!
ইনকাঃ পারব।

৬.
রাত্রে ইনকা খেয়াল করল যে তাদের বাড়ির মালিক উদভ্রান্তের মত হাঁটছে । স্ক্যান করে দেখল যে
মালিকের হার্ড ড্রাইভ একদম শূন্য!
কোন ইনফরমেশন নেই!
কার কাজ বুঝতে পেরে তার প্রতি আকর্ষন টা যেন আরো বাড়ল। সত্যই এই রোবটটা তার জন্য,অসম্ভব ভাবে!
সকাল হল।
এখন তার কপ্রোটন মগজ টা তে সিগনাল দূর্বল হচ্ছে।
সে টাইমারে টাইম সেট করল ৯.৫০.
তারপর নাইলনের সুইচ অফ করে দিল।
তাকে বয়ে নিয়ে আসা হল সেই Weast Me তে। অন্য,রোবটগুলো একসাথে ফেলে দিল দুটি দেহ।
নিষ্প্রভ অবস্থায় সেই উত্তপ্ত মরুভূমির কোন একটা জাংকইয়ার্ডে পড়ে আছে দুটো রোবট।

৭.
জাগল চিংঘা।
জেগে দেখে ইনকা ঘুমিয়ে।
র‍্যামটা কেমন যেন করে উঠল। র‍্যামে প্রচুর চাপ পড়ছে। মাথায় যেন সব ইনফরমেশন জট লেগে আছে।
মানুষের ভাষায়, “তার বুকটা ধকধক করতে লাগল”।
সব শেষ!
টাইমারটা যদি টাইম মত কাজ না করে তাহলে সে অকেজো!
বুক হতে শিশুসুলভ কান্না বের হয়ে আসল।
বড়দের কান্নার সফটওয়্যার পায় নি তাই সিশুসুলভ কান্না বের হয়ে আসছে হার্ডডিস্ক ও ভোকাল কর্ড
থেকে।কাঁদছে শিশুদের মত। চোখের কাছের ক্যামেরাটায় শূন্য দৃষ্টি। যদি পানি থাকত তাহলে অঝোর ধারায় পানি সব বেরিয়ে সিলিকায় পড়ার আগেই বাস্প হয়ে যেতো উত্তাপের কারনে।
চিৎকার করে কাঁদছে সে।
ধূ ধূ সেই মরুভূমির প্রানীরা তার চিৎকার শুনে সচকিত হয়ে আবার মনোযোগ দিল তাদের কাজে।
চিংঘাঃ তোমার জন্য,এতকিছু করলাম তাও তুমি ঘুমিয়েই পড়লে!
মায়ার সব রেশ কাটিয়ে সে একটা কঠিন সিধান্ত নিয়েছে।
সে গিয়ে চালু করল রোবট গুড়ো করার মেশিন।
চালু করেই ভিতরে ঢুকে পড়ল।
মেশিনথেকে বের হয়ে আসল দলাপাকানো একখন্ড আবেগহীন লোহা!

৮.
৯.৫০ এ ইনকা জাগল।
চোখ খুলে আশেপাশের অবস্থা খেয়াল করল।
চিংঘার এই অবস্থা দেখে মাথায় যেন ১০০০ ভোল্টেজের শক খেল।
ওর র‍্যাম ফেটে যাচ্ছে। সে কাঁদতে পারছে না।
কারন কাঁদবার মত কষ্টের সফটওয়্যার তাকে ইনস্টল করে দেয়নি।
কাঁদতে পারলে র‍্যামের উপর চাপ কম পড়ত!
সে ভাবল যে আমার জন্য এতকিছু করেছে তাকে ছাড়া বাঁচা অর্থহীন।
ভাঙার যন্ত্রটা এখনো চলছে।
ইনকা এগিয়ে যাচ্ছে।
ঢুকল সেই যন্ত্রে।
বের হল আবেগহীন একটা লৌহদন্ড হয়ে।
*** সেদিন প্রথম শ্রেনীর রোবটরা ওয়েভে জ্যাম দূর করার জন্য রেডিয়াম বাষ্পের চালনা করেছিলো! যা কি না সিগন্যাল এনিউয়েশন করে কথা অস্পষ্ট করে দেয়। তাতে অনেকেই
ভুলভাল শোনে ****
এখন দুপুর দুটো বাজে। প্রচন্ড গরম।
সিলিকা উড়ছে। আর প্রবল বাতাসে দুটো লোহার টুকরো একটি আরেকটির গায়ে বাড়ি লাগছে।
সেই Weast Me এর হাজারো ভাঙাচোরার মাঝে অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে দুটো আবেগহীন নিষ্প্রান রোবট নামের লৌহখন্ড।

(সমাপ্ত )

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.