শ্রীঘরে

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.
রাত্র ১ টা।
অনেক কৌতুহলী লোকেরা তাদের কৌতুহলপূর্ণ মন নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের বাসায়। বাসার পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে আর বিষাদতমসাচ্ছন্ন। বেশ কিছু সংখ্যক
পুলিশ এসে হাজির হয়েছে আমাদের বাসায়। আমার কোমড়ে
দড়ি দিয়ে বেঁধে হাতে পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরিয়েছে। জ্যাঠিমা অঝোরে কাঁদছে। মার চোখেমুখে কোন ভাষা নেই। অতল কোন শূণ্যের ভিতর যেন মা বিরাজমান। ওদিকে বলাই
নামক নরপিশাচ টা মায়াকান্না জুড়িয়েছে।পুলিশেরা আমায়
টানতে টানতে তাদের গাড়ির ভেতর নিয়ে গেলো। আমার
জ্যাঠামশাই কে খুন করার দ্বায়ে।

*****

তার কিছুক্ষন আগে রাত্র ১১ টায়…….

কিসের যেন শব্দ শুনে আমি ঘর থেকে বের হলাম। এমনিতেও প্রসাবের বেগ চেপেছিলো। বাসার পাশে বাঁশবাগান থেকে কেমন যেন একটা গোঙ্গানি শুনলাম।দেখি যে আমার জ্যাঠামশাই এর বুকে আমার ছুড়িটা আমূল বিঁধে আছে। আর বলাইদার মত
কাকে যেন দৌড়ে চলে যেতে দেখলাম। হঠাৎ দেখি পিছনদিক
হতে কারা যেন আসছে। মা, জ্যাঠিমা ও জ্যাঠিমার ছেলে
বলাইদাকে দেখলাম।তারা এই অবস্থা দেখে কান্নার রোল তুলল।
আকাশ বাতাস ধ্বনিত হল সেই গগনবিদারী বুকফাটা আর্তনাদে।
পুলিশে খবর দিল। পুলিশ আসতেই বলাইদা বললঃ

আমি প্রসাব করতে বাইরে বেরিয়েছি। এমন সময় বাঁশের
ঝোপ থেকে অরিন্দমের গলা শোনতে পেলাম। সে বলছিলো
“এবার মর”। তারপর বাবার অার্তনাদ শুনতে পেলাম। গিয়ে দেখি বাবার বুকে অরিন্দমের ছুড়িটা বসানো।
সময় ও নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে আমি পাথর হয়ে গেলাম। আমার চোখ ছিলো পানিশূন্য। বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো এক অবর্ননীয় কষ্টে।

২.
আমাকে রাখা হলো শ্রীঘরে। এই জায়গাটা কেমন যেন বিষন্নতায়
ছেয়ে আছে।প্রতিটি ইটের গাঁথুনির দিকে তাকালাম।যেন প্রত্যেকটা ইট আমায় কিছু বলতে চাইছে। এই ঘরে
অনেকেই এসেছিলো। আরো আসবে। তাদের কথা কেউ হয়তোবা স্মরন করবে না। তাদের এই বদ্ধঘরে অতিষ্ঠ
হয়ে যাওয়া প্রানের কিছু দীর্ঘশ্বাসের সুরধ্বনি বয়ে বেড়াবে
এই ইট। তারপর, সেই ইটগুলো গল্প বলবে। অন্য কোন আসামীকে।স্মরন করাবে তাদের কথা। এটা হয়তো
জেলখানায় যারা থাকে তাদের চিরায়ত নিয়ম।তাদের আত্নকথা।

পূর্ণিমার চাঁদটা আজ ম্লান।অনেক উপরে ছোট্ট একটা জানালা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে আলো আমার ভারাক্রান্ত মনে। কাঁদছি। কেঁদেই চলেছি।গলায় লোকনাথ বাবার একটা লকেট ছিলো।তা হাতের মুষ্ঠিতে নিয়ে ঘরের অন্যকোনে গুঁটিশুটি মেরে হাঁটুর উপর দু হাত ও তার উপর মাথা রেখে কাঁদছি।

পুলিশ ইন্সপেক্টর আমার রুমে ঢুকল। আমি মাথা তুলিনি। সে আমার চুল ধরে মাথাটা তুলল। বড় বড় জলসিক্ত আঁখিতে আমি তার দিকে মায়াময় ও জোছনাকোমল দৃষ্টিপাত করলাম।
আমার গাল বেয়ে পড়া চোখের পানি চাঁদের আলোতে
ঝিকিমিকি করছিলো মনে হয়। আমার চাহনিতে এমন কিছু ছিলো যাতে কি না অফিসার অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।

-তুই তাকে খুন করেছিস?
-হয়তোবা সমস্ত অপরাধীদের মত আমার কথাটা চিরায়ত নিয়মের মতই হয়ে যাবে।কিন্তু তবুও বলছি। ঘটনার
স্রষ্টা আমি না। আমি প্রত্যক্ষদর্শী।

পুলিশ ইন্সপেক্টর ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। মনে হলো সে এই ধরনের উত্তরে প্রত্যাশী না।তুই থেকে তুমিতে চলে এলো।
-তুমি কি বলতে চাইছো? তুমি খুন করনি?

-আমার খুন করার কোন কারন ছিল না। আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি জ্যাঠামশাইয়ের ব্যাবসা সামলাতাম।জ্যাঠামশাই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলো যে আমার বাবার ভাগটা আমি পাব আর তার টা সে তার লম্পট পুত্রকে না দিয়ে কোন আশ্রমে দান করে দেবে।বলাইদা খুন করে আমার উপর দোষ চাপিয়ে দিলে সে তার বাবার ও আমারটা সহজেই পেতে পারে। কারন এ ধরনের মামলায় মৃত্যুদণ্ড হয়ে থাকে। অফিসার সূক্ষ্মতম দৃষ্টিতে আমার
দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল

-শালার পুত। গুল মারার আর জায়গা পাও না।এই জহির। এরে কিছুক্ষনমালিশ কর। দেখবি কথাবার্তা সব পকপক করে বেরুবে। আমাকে তারা উল্টো করে ঝুলিয়ে
দিল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়তে লাগল।অকথ্য নির্যতন করল আমায়। একসময় আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।আর পারছি না। এই কষ্ট ভোগ করতে। মা,
মাগো, ওমা দ্যাখো ওরা না আমায় মেরে ফেলছে।।
এই অন্ধকার নীরবের মাঝে আমি নির্যাতিত।কেউ দেখছে না। চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরেপড়া পানি চাঁদও দেখছে না।সে মেঘের বুকে মুখ লুকিয়েছে।

৩.
পরদিন সকাল সাতটায় আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হল।মুখটা অত্যন্ত বিস্বাদ হয়ে আছে।কেমন যেন ঘোরের মাঝে আছি।আমাকে ওরা বের করে, স্নান করায়। তারপর কয়েদীর পোশাক পরি । অপরাধীরা বাগানে কাজ করছে । আমি সেখানে গেলাম । মাঝে মাঝে ইন্সপেক্টর আসে। আমি তাকে চোরা
চোরা দৃষ্টিতে দেখি। কোন ভয়ে না। সেও দেখি আমার দিকে
তাকাই। চোখাচোখি হয়ে গেলে দুজনেই চোখ ফিরিয়ে নেই।পাড়ার সবাই বলতো আমি না কি অনিন্দ্যসুন্দর। হঠাৎ করে কেন যেন অপলক দৃষ্টিতে তাকে দেখতে লাগলাম।প্রবল পৌরুষত্বের ছোপ তার সর্বাঙ্গে বিদ্যমান।সৌষ্ঠব ও গড়নে
সে যেন সৌম।মন ও মুখ তার লৌহকঠিন। ইস্পাতের মত শক্ত তার স্নায়ু।তবে তার কুসুমকোমল হৃদয়টা আমি তার চোখের অর্ন্তপর্দা ভেদ করে দেখতে পাই।জেলখানার সময় ও যেন অতি ধীরভাবে বহমান।
অনেক সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটেছে সেখানে। ইচ্ছে করছে সদ্যপ্রস্ফুটিত সেই লাল গোলাপটা নিয়ে নিই। নিয়ে সেই ইন্সপেক্টর কৌশিক কে দেই। কিন্তু কেমন যেন সংকোচে
পড়ে গেলাম। ফুলটা ছিড়ে হাতে রাখলাম। কৌশিক সেটা দেখতে পেলো।দৃপ্ত পায়ে আমার কাছে এলো। কিছু বলার আগেই সে ঠাশ করে আমার গালে একটা চড় বসিয়ে দিলো।
-ফুল ছিড়া আমার একদম পছন্দ না।
ভবিষ্যতে কখনো এমন করবে না।
কিন্তু কেন যেন মনে হলো, কথাগুলো বলে সে নিজেই অনুতপ্ত হলো। চলে গেলো সে সেখান থেকে।

৪.
আজ আমার কেসের সর্বশেষ শোনানি হবে।আমাকে কাঠগড়ায়
দাড় করালো।দুই পক্ষের উকিলকে দেখলাম। আরো দেখলাম দর্শক আসনে আমার মা বসা।আমার বিচারে আজ
আমার মা দর্শক।দুই পক্ষের উকিল যুক্তির ঝড় তুলছে। অনেক
বাতবিতন্ডার পর বিচারক ফলাফল জানালেনঃ

তিনি আমার মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করলেন। আর এক সপ্তাহ পর ঠিক দুপুর বারোটায় আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে তোলা হবে।
নিজের মাঝে একধরনের অবিমিশ্রিত অাবেগ উপলব্ধি
করলাম।নিজের মৃত্যুর খবর নিজ কানে শোনা যে কি ভয়ঙ্কর অনুভূতি তা আপনারা জানবেন না।মা আছড়ে পড়ে কান্না করছে। আমাকে সেখান থেকে নিয়ে গেলো শ্রীঘরের দিকে।

******

আজ ঘরটাকে কেমন যেন অচেনালাগছে।আমারো ইচ্ছে করছে এই শিক, এই ইট, এই বিছানাপত্রকে সবকিছু বলে দেয়া কিন্তু পাচ্ছি না। কেন যেন নিজের আত্নকথাগুলো অন্তরালেই হারিয়ে যেতে চাইছে।সেই উপরের জানালা দিয়ে একটা রঙিন প্রজাপতি উড়ে আমার সামনে বসল। মনে হচ্ছে আহত। এমন সময় একটা পুলিশ আমার কাছে খাবার নিয়ে এলো। প্রজাপতিটাকে সে না দেখে মাড়িয়ে দিয়েছে। আমার খাবার রেখে চলে গেলো।প্রজাপতিটা মরে পড়ে আছে। প্রজাপতিটার দিকে তাকিয়ে
আছি।আমার স্বপ্নগুলোও ঠিক এমনভাবে মারা গেছে। প্রজাপতিটার মত।আর কিছুদিন পর এই স্বপ্নশূন্য মানুষটাও মারা যাবে। দিনগুলো এবার যেন তাড়াতাড়ি কাটছে। এর মধ্য পুলিশ ইন্সপেক্টরের সাথে আমার সেলে কথা হয়। প্রতিদিন।আমি বলি আমার ছোট ছোট স্বপ্নের অপমৃত্যুর কথা।সে বলে তার জীবনের কথা।তার সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।তার সাথে কথা বললে মনে হয় না যে আমি দু তিন দিন পর মারা যাবো।
আমার ভাঙা জীবনে তার হাসিটা পরিনত হয় আমার আশায়। আমার আরেকটি নতুন খন্ডের স্বপ্নে।কেন জানি না তার প্রতি আমি দূর্বল হয়ে যাই কয়েক ঘন্টার আয়ু নিয়ে।

৫.
আর মাত্র তিনদিন আছে। এবার আমায় ভালোমন্দ খাওয়াতে ও
পড়াতে লাগল।দুপুরে ইন্সপেক্টর নিজে এসে আমায় খাবার দিয়ে
গেলো।তার সামনে বসে খাচ্ছি। কেমন যেন লাগছে। আমি সংকোচে একটা লকমা তার দিকে তুলে দিলাম
-না না। তুমি খাও।
-খুনীর হাতে বলে খাবেন না!
– না তা না। আচ্ছা দাও।
তাকে খাইয়ে দিচ্ছি। কি যে ভালো লাগছিলো! খাওয়া শেষে তার দিকে তাকালাম। তার মুখটা কেমন যেন শুকনো।সে কোন কথা না বলে চলে গেলো।
রাতটা যেন চেয়েচিন্তে পার করে দেই।

****

আর দু দিন আছে। সারাদিন তার সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করছে।বাগানর পাশে বসলাম। তাকে ইচ্ছেটার কথা জানালাম।
সে আমার পাশে বসল। অনেক কথা হল দুজনাতে। সেই কথার কোন সুর নেই, রং নেই। তবে তার কাছে। আমার কাছে কথাগুলো ছিলো রঙিন, স্বপ্নীল, সুরেলা।কেটে গেলো দিনটি।

৬.
আর মাত্র একদিন আছে। কেমন যেন কান্না পাচ্ছিলো।
অনেক কষ্টে আবেগুলো ধরে রাখলাম। এখন দুপুর বারোটা বাজে। আরো ২৪ ঘন্টা পর আমি মারা যাবো। ভাবতে কেমন যেন শূন্যতা লাগছে।
কৌশিকঃ আজ কি কিছু করব তোমার জন্য।
আমিঃ আমার আপনার সাথে
নদীরতীরে জোছনা দেখতে ইচ্ছে করছে।
-সেটা জোগার করতে ঝামেলা হয়ে যাবে। তবু চেষ্টা করব।
আমি কল্পনা করছি কোন এক নদীর শাদা বালুর চরে মৃদুমন্দ ঝিরিঝিরি হাওয়ায় হাটব দুজনে।আকাশে থাকবে থালার মত থলথলে একটা চাঁদ।খালি পায়ে হাত ধরে হাটব কোন এক অজানায়। হঠাৎ করে দেখি যে সে মেঘযুক্ত মুখে আমার সামনে দাড়িয়ে আছে। আমি বুঝে গেছি সে অনুমতি পায়নি। এই সময় তার জন্যই আমার মায়া লাগছিলো।আমার জন্যই যত
কষ্ট। রাত্রে বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলাম। ঘুম আসছে না। একটু পর মারা যাবো। রাতটা নির্ঘুমে পার করে দিলাম।

৭.
আজ আমার মৃত্যুর দিন। সকাল থেকেই আমাকে ফ্রেশ হয়ে
খাবার দেয়া হল। ফ্রেশ হলাম। খেতে পারছি না। তবু জীবনের শেষ খাবার যেহেতু। খেলাম।তারপর স্নানে গেলাম। জীবনের জীবীত অবস্থার শেষ স্নান। ভালোভাবে স্নান করলাম।আয়নার দিকে তাকাতেই সকল স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। কান্নাগুলো বুক হেকে হু হু করে বের হতে চাইছে।।অনেক কাঁদলাম।তারপর বের হলাম। মা দাড়িয়ে আছে। মায়ের কাছে গেলাম।
-মা গো অনেক অপরাধ করেছি।
অনেক কষ্ট দিয়েছি। মাফ করে দিয়ো মাগো।
অনেক কাঁদলাম। মার কাছ থেকে আমাকে তারা টেনে নিয়ে আসল।
বিচ্ছেদ টা অনেক কষ্টপূর্ণ। কিন্তু আসতেই যে হবে। তারপর আমি গিয়ে আস্তে আস্তে ফাঁসিকাষ্ঠে দাড়ালাম।
জল্লাদঃ তোমার কি কোন শেষ ইচ্ছা আছে?
-আমি ইন্সপেক্টরের সাথে নীরবে পাঁচটা মিনিট কাটাতে চাই।
আমাকে নীরব একটা ঘর দেয়া হল ৫ মিনিটের জন্য।
কৌশিক আমার মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। পাঁচটা মিনিট যে বিরাট বিষন্নময়।আমি পকেট থেকে একটা জিনিস বের
করলাম।
সেই ফুলটা।।
শুকিয়ে গেছে।
তাকে দিলাম।
তার চোখটা জলাসিক্ত।
সে ফুলটা হাতে নিল।
তারপর আমায় আচমকা জড়িয়ে ধরে চোখের জলে ভেজাতে লাগল। গলে গেছে এ লৌহকঠিন হৃদয়। পাঁচটা মিনিট নির্বাক ছিলো দুটো মন। কিন্তু উপলব্ধির জোয়ারে ভেসে গিয়ছিলো।
পাঁচ মিনিট শেষ।দুজন সিপাহী আমাকে টানতে টানতে নিয়ে
গিয়েছিলো। পিছনে ফিরেছিলাম। তাকে বলতে চেয়েছিলাম “ভালোবাসি তোমায়।”

কিন্তু বলতে পারিনি। ফাঁসিকাষ্ঠে দাড়িয়ে আছি। কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে মুখ। মুখ ঢাকার আগ পর্যন্ত কৌশিক কে দেখলাম। এপার ও ওপারের মাঝে দাড়িয়ে আছি আমি।
এগারোটা পঞ্চান্ন বাজে। আস্তে আস্তে গড়াল জীবনের সবচেয়ে
মর্মস্পর্শী পাঁচটা মিনিট। থমথমে শ্রীঘরের নীরবতা ভাঙল ১২
টা বাজার ঢং ঢং শব্দে।

৮.
গলায় অসম্ভব টান পড়। কিন্তু এ কি! নিচের দিকে পড়ছি কেন! হতভাক হয়ে গেছি। চারদিকে হৈ চৈ। কি হচ্ছে! আমি নিচের একটা কুঠুরি তে পড়লাম। কোন বেজমেন্টে। আমার মুখের কাপড় সরিেয় নেয়া হল। কপিকল টা ভেঙে গেছে। আমি শুয়ে আছি। কৌশিক বসে থেকে আমার মাথাটা তার বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। তার হৃদস্পন্দন আমি পাচ্ছি। কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বললাম
-কি হয়েছে?
-শোন তোমাকে ফাঁসি দিতে গিয়েছিলো। কপিকল টা ভেঙে গেছে। আর যদি কাউকে কোনকারনে ফাঁসি না দিতে পারে তবে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়।
তুমি মুক্ত!
তুমি স্বাধীন।
মৃত্যুর পেট থেকে ফিরে আসার পর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।আনন্দ যেন মনের মাঝে ভর করতে থাকল। উঠে দাড়ালাম। সেই কলরব ছাপিয়ে চিৎকার করলাম

-আমি বেঁচে আছি। আমি বেঁচে আছি।

নিজের কর্কশ কন্ঠস্বর কখনো এতোটা সুমধুর লাগে নি! কি যে অনুভূতি নতুন করে বাঁচার তা বলে বুঝাতে পারব না!
আধ ঘন্টা পর।
কৌশিক থানা থেকে বের হল।
-শোন অরিন্দম। আমি রিজাইন দিয়েছি!
-কেন!
-কারন আর পুলিশের চাকরি করতে পারব না। আর অপরাধের মধ্য আর ভালো লাগছে না।
-তো কি করবে?
কৌশিক পিছন থেকে একটা লাল গোলাপ নিয়ে আমার সামনে ধরল।
“ভালোবাস আমায়”?
আমার আনন্দে চোখ দিয়ে পানি পরতে লাগল। প্রাপ্তির এত সুখ কেন ! আমি নিজেকে সাম্লাতে সামলাতে তার গালে হালকা করে একটা থাপ্পর দিয়ে বললাম

-গাছ থেকে ফুল ছিড়া আমি পছন্দ
করি না।
দুজনেই হেসে উঠলাম। বাসায় খবর পাঠালাম। তাদের কে
বললাম “আসতে দেরী হবে।
কৌশিক হোন্ডায় বসল। আমি তার পিছনে বসলাম। কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম
-ভালোবাসি তোমায়।
-জানি! এবার শক্ত করে আমায় ধরো।

আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। দেহটা শ্রীঘর থেকে মুক্ত হয়ে মনটা আবার পুলিশের শ্রীঘরে কায়েদ হয়েছে। তার পিঠে মাথা রেখে অনুভব করলাম “জীবনের মানে কি!”

বাতাস লাগছে। হোন্ডা চলছে। আস্তে আস্তে দূরে যেতে যেতে
মিলিয়ে গেল শ্রীঘরটা…….
*****(সমাপ্ত)*****

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.