সাতরঙের ঠিকানা

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

১.

রিক্সা থেকে নামলাম। ভ্যানিটি ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে ভাঙতি ৫ টাকা খুঁজছি, কিন্তু পাচ্ছি না। বাসার গেইটে লিমন দাড়িয়ে আছে। তার চোখে ভয় লক্ষ্য করছি । ডাক
দিলাম
-এই লিমন, দেখে যা তো।
কাছে আসতেই বললাম
-ভাঙতি পাঁচ টাকা হবে তোর কাছে?
-দাড়া আপু, আমি দিচ্ছি।
রিক্সাওয়ালাকে টাকা মিটিয়ে দিয়ে এবার লিমনের দিকে তাকালাম ভালোভাবে। তাকে বললাম
-কি রে, তোর চোখ রসগোল্লার মতো হয়ে গেল কেন! মনে হচ্ছে আস্ত ব্যাঙ গিলে ফেলেছিস!
-আপু বাসায় বড়খালা এসেছে!
-তাই না কি! তাহলে তো সর্বনাশ। ছোটকি কোথায়!
-কই আর থাকবে, বড়খালার সাথে।
সকাল থেকে একটা ভাঙা হারমোনিয়াম নিয়ে সেটার ১২ টা বাজাচ্ছে দুজনে। পাশের বাসার কাকী এসে অনুযোগ করে গেছে। কি যে করি!
চোখে মৌলিক আতঙ্ক নিয়ে আমি বললাম
-চল্, ভেতরে যাই।
ভেতরের অবস্থা আরো ভয়াবহ। খালা ভাঙ্গা হারমোনি নিয়ে গলার জোড় প্রদর্শন করছেন, তাতে ব্যাকাপ সিঙ্গার হিসেবে আছে ছোটকি। আম্মা, খালার গুনগ্রাহী। বাবা চুপ করে শোনে যাচ্ছে এই অব্যাক্ত সঙ্গীতসমস্যা।
আমাকে দেখেই খালা বলে উঠলো
-আরে রূপা, মাত্র এসেছিস! ভালোই হলো। আরেকটা গান ধরি। তুই ও আমার সাথে গলা মেলা।
-না, না। আমি হাত পা ধুয়ে ছবি আঁকব। ছবি জমা দিতে
হবে।

একথা বলে আমি তাড়াতাড়ি আমার রুমের দিকে পা বাড়ালাম।
আমি বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছাড়লাম। বাইরে থেকে এসে আমার গোসল করতে ভালো লাগে। বারবার ঐ বাসের ছেলেটার কথা মনে পড়ছে। কিছুটা বখাটে টাইপ।
তবে চেহারায় আছে অনিন্দ্যসুন্দর পুরুষালী ভাব, যা সবাইকেই কাছে টেনে নেয় নিজস্ব মাদকতায়। আমার খুব ইচ্ছে করছে তাকে একটু ছুঁয়ে দিতে, কিন্তু আমরা যে
অসহায়! আমাদের ভিতরেই চাপা দিয়ে রাখতে হয় আমাদের অব্যাক্ত ইচ্ছাগুলো।
স্নান সেরে তাড়াতাড়িই বেরুলাম। এমন সময় লিমন বললো
-আপু, বাইরে একটা ছেলে অনেকক্ষণ ধরে ঘুরঘুর করছে। দ্যাখতো চিনিস কি না!
আমি তাড়াতাড়ি জানালার দিকে তাকালাম।
তাকাতেই দেখি সেই ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে ক্যাবলাকান্তের মতো দাঁত বের করে দিয়েছে। আমার মাথায় দুশ্চিন্তা ভর করলো। বাবাকে বলবো? না লিমনকে?
আচ্ছা যাক কটা দিন। তারপর দেখি কি হয়।
খাবার টেবিলে বসলাম। খালা বললো
-শোন্ রূপা, আমরা বিকেলে সিনেমা দেখতে যাবো।
যাবি না কি?
আমি মনে মনে হতাশায় গুঙ্গিয়ে উঠলাম। তারপর বললাম
-না, যাবো না। আমার আর্ট শেষ হয় নি।
-সারাদিন কি এমন আর্ট আর্ট করিস?
-খালা, সারা দেশ হকে বাছাইকৃত ১০০ জনের মাঝে আমি আছি। বুঝতেই পারছো, আমার আর্ট করাটা কত জরুরি। আর মাত্র ৭ দিন সময় আছে আর্ট পেপার জমা
দেয়ার।
খালা বিরবির করে যে কি বললো তা বুঝতে পারলাম না।
খালা নিঃসঙ্গ একটা মানুষ। তার কোন সন্তান হয়,নি। কয়েকবছর হলো খালু মারা গেছে ও রেখে গেছে বিশাল সম্পত্তি। আমাদের স্নেহের মাধ্যমেই খালা তার সন্তানের অভাবটা পূর্ণ করে। কি অদ্ভুদ উপযোগীতা!

২.
-এই যে শুনুন?
আওয়াজটা অনুধাবন করে আমি পিছনে ঘুরলাম। দেখি সেই ছেলেটাই! আমি তাড়াতাড়ি পা চালাতে লাগলাম।
আমার বুকের ভিতরটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। কেন যেন খুব ভয় পাচ্ছি।
ছেলেটা ” এক্সকিউজ মি, এক্সকিউজ মি” বলে পিছন পিছন আসছে। আমি তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে কলেজের ভিতর ঢুকে গেলাম। সারা শরীর ঘামছে। তৃষাকে এগিয়ে
আসতে দেখলাম। তৃষা এসেই আমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো
-কি রে, কি হলো! এত্তো,ঘামছিস কেন!
-আর বলিস না । প্রায়ই গুন্ডার মতো একটা ছেলে আমাকে ফলো করে। মুখে দাঁড়ি গোঁফ আছে। আমার না খুব ভয় করছে। কাল ফলো করে বাসায় সামনে পর্যন্ত গেছিলো। আজকেও ফলো করতে করতে কলেজ পর্যন্ত চলে আসলো।
-আরে দূর, ছেলেদের ভয় পাওয়ার কি আছে! ওরা কি তোকে খেয়ে ফেলবে? বরঙ চ ওদের মতো নিরীহ আর কেউ নেই। নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরানো যায়।
-সব ছেলেই তো তোর বয়ফ্রেন্ডের মতো না।
-সে যাই বল, ছেলেটাকে দেখতে হবে রে।
-আমি যাবো না।
-সব ব্যাপারে এতো না না করিস কেন? আমার সাথে যাবি। ওকে? মে বি বিকেলে পার্কে কোন না কোন মেয়ের সাথে দেখা যাবে।
-তুই জানলি কি করে?
-এটা জানার জন্য জৌতিষী হতে হয় না। অনুমানেই বলা যায়।
সারাটা ক্লাশ সেসব চিন্তা করেই কাটলো। আরো চিন্তা করছি, কি আঁকবো! আর মাত্র ছয়টা দিন আছে!
ক্লাশ শেষে তৃষা বললো
-চল, পার্ক থেকে ফুচকা খেয়ে আসি।
-তুই জানিস যে আমি বাইরে কোন খাবার খাই না।
-তাহলে আমি খাবো আর তুই দাড়িয়ে থাকবি। ঠিক আছে?
আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে প্রায় হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে নিয়ে চললো পার্কের দিকে।
পার্কে বসে আছি। দেখি যে একটা ছেলে চুপচাপ দাড়িয়ে আছে হাতে একগুচছ ফুল নিয়ে। কিন্তু তার পাশে কেউ নেই। অনেকটা হতাশায় আবৃত এক মানবের
মতো। তৃষাটা ফুচকা মুখে দিয়েও অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। কিভাবে যে এতো কথা বলে মেয়েটা। হঠাৎ কে যেন আমার পাশ দিয়ে দ্রুতবেগে হেঁটে গেলো। অল্প
একটু সময়, কিন্তু তার মধ্য পেলাম তীব্র এক “পুরুষ পুরুষ” ঘ্রাণ। এরকম ঘ্রাণের জন্য বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
ইচ্ছে করছিলো তার ঘ্রানটা আরেকটু নিতে। তার গমনপথে তাকিয়ে ছিলাম ফ্যালফ্যাল করে। হঠাৎ সে কি মনে করে পিছন দিকে ফিরল। ফিরেই দুজনের
চোখাচোখি হয়ে গেলো। আমার বুকটা ধক্ করে উঠলো।
সেই যুবক!
সে আমার দিকে এগুতে লাগলো। আমি কিছু না বলে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। পিছনে তৃষা ডাকছে
-পাগলের মতো কই চললি রূপা….
সেই ছেলেঃ সে আপনার বান্ধবী?
-হা।
-সে এতো অদ্ভুত কেন…?
আমি আর শোনতে পাই নি। তাদের কথাবার্তা আমার শ্রবনসীমার বাইরে চলে গেছে। বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম আমি।

৩.
বাসায় এসে হাঁফ ছাড়লাম। কারনটা হল আমার মুখ। আমি তার প্রতি দূর্বল, কিন্তু আমি তার সামনে আমার মুখটা দেখাতে পারবো না। কারনটা আমি জানি, আমার
পরিবার জানে ও জানে তৃষা। তৃষাও জানতো না যদি না আমার মুখের পর্দাটা টান মেরে খুলে না ফেলতো। তৃষা আমার মুখের ভয়াবহ অবস্থা দেখার পর কখনো,সমবেদনা জানায় নি, কখনো জানতে চায়নি, “কিভাবে কি হলো”।
সত্যিই, ওর মতো বান্ধবী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

বাসায় এসে রংতুলি নিয়ে বসলাম। আর মাত্র,কয়েকটা দিন আছে। দিনকে রাত ও রাতকে দিন করলাম। অবশেষে আঁকলাম সেই মনঃপূত দৃশ্য। সাতরঙে রাঙিয়ে দিলাম।
দৃশ্যটা ছিল অনেকটা এরকম
“একটা নিরিবিলি নির্জন বাগানে একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে, তার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে একজন যুবক। জানাচ্ছে তার প্রগাঢ় ভালোবাসা। বাগানে কসমস ফুলের মেলা। বেশ কিছু প্রজাপতি উড়ছে তাদের আশেপাশে। তুলির আঁচড়ে সাতটি রং খুঁজে পেয়েছে তাদের ঠিকানা। এ যেন বসন্ত বয়ে যাওয়া প্রকৃতির উপর সাতরঙের আর্শীবাদ।

শেষ করে উঠলাম।ছবিটার নাম দিলাম “সাতরঙের ঠিকানা ” । কালকে জমা দেব। যদিও হালকা দুশ্চিন্তা ভর করছে মনের মাঝে, তবুও মনে হচ্ছে ভালো
কিছুর অপেক্ষায় আছে আমার বেশ কিছু সময়। এমন সময় লিমন এসে বললো
-আপু, রাস্তার ঐ দিকে দাড়িয়ে আছে যে ছেলেটা, সে কি তোকে ডিস্টার্ব করে?
আমি বকের মতো জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে তাকে দেখতে লাগলাম। তাকে আমার ভালোলাগে, কিন্তু এ মুর্হুর্তে ভালোলাগার থেকে বাস্তবতা টা আমার মনে প্রাধান্য পেল বেশি। কারন যে যদি জানতে পারে……
আমি চোখমুখ শক্ত করে লিমনকে বললাম
-হ্যাঁ, তুই কিছু করতে পারবি।
দাড়া আপু, দেখ আমি কি করছি।
দশমিনিট পর্যন্ত কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ করে ধুমধাম শব্দ হতে লাগলো। ওকে আমার ভাইসহ আরো পাড়ার অনেক ছেলে পেটাচ্ছে। আমার বুকটা মোচড় দিয়ে
উঠলো। চোখ ভেঙে নামলো কান্নার বন্যা। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারবো না। চলে যাওয়ার আগেও তার মুখটা আমার চোখে ভাসছিলো। মায়াবী রক্তাক্ত এক নিষ্কলুষ
মুখ। বাথরুমে কল ছেড়ে চিল চিৎকার দিয়ে কাঁদছি। কিন্তু আমার কান্নাগুলো ইট, কাঠ, পাথর ছাড়া আর কেউ
শোনল না।
তাকে হাসপাতালে ভর্তি করালো। তৃষার মাধ্যমে জানতে ইচ্ছে করে, সে কেমন আছে। তৃষাকে বলতেই সে খবর এনে দিলো। সে ভালো আছে। তবুও আমার বুকের
মাঝে একটা ক্ষত দাগ আছে। যা কিছুক্ষন পরপর যন্ত্রনাদেয়। অনুভূত করায়, তাকে, তাকে কাছে পাওয়ার বাসনা জাগে। মন পুড়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। সেই ধোঁয়া জল হয়ে
আমার চোখ দিয়ে ঝরে। অনুতপ্ত হই তার জন্য। ওদিকে তৃষাকে দিয়ে তার খবরাখবর নেই। সে ভালো,আছে।

৪।
আজ এক্সিবিশন । সাত দিন থাকবে । একশটা ছবি সেখানে টানানো । সেখানে এককোণে আমার ছবিটা আছে । সাত রঙে রাঙানো সেই ছবিটা । প্রতিদিন যাই , আসি , সবার ছবি দেখছে , কেউ কেউ ছবি কিনে রাখছে । এক্সিবিশন শেষ হলে সেগুলো ক্রেতার ঘরে যাবে । সেখানে এককোণে শিল্পীর একটা ছোট্ট সাইন ছাড়া আর কিছুই থাকবে নাহ । কেউ মনেও করবে নাহ কে এঁকেছে এই ছবিটা । সবার ছবিই প্রায় বিক্রি হয়ে গেছে । আমার ছবিটা হয় নি। খুব যে টাকার দরকার তা না । আফসোসের ব্যাপার হলো যে , ” আমার ছবিটা কেউ পছন্দ করে নি ।”
আজ সপ্তম দিন । লোকের ভীড় বেশি! একজন অনেকক্ষণ ধরে আমার ছবিটা দেখছে । আমার বুক ধুকপুক করতে লাগলো । যদি পছন্দ হয় ! তারপর কাউন্টারে এগিয়ে কথা বলল । আর তারপর আমার দিকে আঙ্গুল তাক করলো ক্যাশিয়ার। লোকটা আমার কাছে এসে বলল
-” আমি আপনার ছবিটার জন্য ৩৫০০০ টাকা দিতে রাজি আছি । আপনি কি বিক্রি করবেন ?”
আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিলো। কারন সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া ছবিটা ছিলো ২০০০০ টাকা ! আমি কোনরকম হুঁ বলতেই তিনি ঘসঘস করে চেক এ এমাউন্ট লিখে কাগজটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলো । আমি কিছু বললাম নাহ । খুশিতে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে ।
তাকে দেখার খুব ইচ্ছা করছিলো। ফুলের দোকান থেকে একটা বুকে কিনে রওনা দিলাম হাসপাতালের দিকে । সেখানে ওয়ার্ড খুঁজে বেডের দিকে এগুতেই দেখি তৃষা বসে আছে । তার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে । আমার কেন জানিনা খুব মন খারাপ হলো। সাথে রাগ ও হলো । আমি বেরিয়ে এলাম হাসপাতাল থেকে । ফুলগুলো ড্রেনে ফেলে দিলাম। ফুলগুলো ডুবছে, ভাসছে, সেই ময়লা পানিতে। অনেকটা আমার স্বপ্নের মতো ।

৫।
বাসায় এলাম। দিন কেটে যাচ্ছে । গতানুগতিক দিন। যেমন কাটে । কোন বৈচিত্র্য নেই । একঘেয়ে জীবনে সে এলো না আসার মতো । একদিন কলেজ থেকে আসতেই দেখি যে আমার ছোট বোন বলছে , ” আপু তোর জন্য একটা পার্সেল আসছে । “
আমি অবাক হলাম ! আমায় কে পার্সেল করবে? সেরকম তো কেউ নেই জানামতো । পার্সেল নিয়ে রুমে বসলাম । ঘরে শেষ বিকেলের রোদ এসে পরছে । আমি খুললাম । খুলে অবাকই হলাম ! আমার ছবিটা ! আর একটা চিরকুট । সেখানে লেখা

“আমি তোমার সাথে ৫ টা মিনিট কথা বলতে চাই ! আমি কাল সকাল ৭ টায় গির্জার ভেতর অপেক্ষা করবো । আর কখনো তোমায় বিরক্ত করবো না । শুধু ৫ টা মিনিট সময় চাই তোমার জীবন থেকে ! “
আমার খুব কান্না পেতে লাগলো । শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম , যাবো!
কাল যেন আসতেই চায় নাহ ! তবু সময় অপেক্ষা করে নাহ । সকাল হলো ! আমি ৬ টায় উঠলাম । বোরখা পরে চললাম গির্জার দিকে ।
গির্জাটা বেশ শুনশান এলাকায়। সচরাচর কেউ আসে নাহ । ভালোই হলো কেউ দেখবে নাহ !
হাটতে হাটতে চলে এলাম গির্জার বাগানে । দেখি যে সে দাড়িয়ে আছে । শাদা একটা শার্ট পরে। আমায় দেখে হাসল । আমার বুকটা কেমন যেন করে উঠলো। পুরুষালী সৌন্দর্যে ভরপুর সেই পুরুষ ! আমি কাছে আসতেই হাঁটু গেড়ে বসে একগুচ্ছ গোলাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল
-আমি তোমায় ভালোবাসি !
এবার আমি বলতে শুরু করলাম , “আপনি তো আমার মুখটাই দেখলেন নাহ! এখনি এতো ভালোবাসা! “
তখনি আমি চিন্তা করলাম এর শেষ হয়তো এখানেই । আমি তারপর বললাম
-“আমায় দেখবেন নাহ ?”
এই বলে আমি তার জবাবের অপেক্ষায় না থেকে আমার হিজাব সরিয়ে নিলাম। আমার খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত মুখ ভেসে আসলো।

৬।
সে হতবাক হয়ে বলল
-“তুমি তুমি…………………
আমি তখন কান্না জড়ানো স্বরে বললাম
-হা আমি হিজড়া । সমাজের চোখে একজন ভয়ানক কীট। আমি মানুষ না , আমি হিজড়া! সমাজ তাই বলে ! আমায় আমার মত করে চলতে দেয় নাহ , আমায় আমার মতো বাঁচতে দেয় নাহ । আজ যদি বাইরে জানাজানি হয় , কাল আমার বাবার মুখে থুথু দিবে সব । অথচ আমার বাবা মার কোন দোষ নেই ! আমি এই কষ্ট বয়ে বেরাচ্ছি । বেড়াবো আজীবন । আপনার তো খুব আগ্রহ ছিলো ! আশা করছি এবার আর নাই । এই বলে আমি হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলাম । তার পায়ের কাছে বসে। সে নির্বাক! কান্নার ফাঁকে ফাঁকে একটা কথাই বললাম
-“প্লিজ আপনি বাইরে কাউকে বলবেন নাহ । আমি আপনার পায়ে পড়ি ।” এই বলে আমি তার পায়ে ধরতে গেলাম ! সে কিছু না বলে চলে গেলো! আমি বসে কাঁদতে থাকলাম। আমার আঁকা সেই ছবিটার মতো !

৭।
অনেকক্ষণ পর বাসায় এলাম । রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে একা একা বসে আছি । হঠাত করে জানালার কাছে দারালাম । ওপাশে লোকের আনাগোনা । হথাত তৃষাকে দেখলাম! তার বাইকের পেছনে বসা ! আমার খুব কান্না পাচ্ছে ! বিছানায় বসে আছি । চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে । এমন সময় পেছন থেকে ছোটকি আমায় জড়িয়ে ধরে বলল
-“তোর কি মন খারাপ?”
আমি কিছু বললাম নাহ ! সে বলে যেতেই লাগলো
– ” আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে । সেগুলো জীবনে যদি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ধরি তাহলে দুদিনের দুনিয়া তো মন খারাপ করে চলে যাবে রে । “
আমি ছুটকির দিকে তাকালাম । সত্যিই সে বড় হয়ে গেছে। চোখের পানি মুছলাম । সে বলছে
-“জানিস খালা আমাদের সবাইকে নিয়ে কক্সবাজার যাবে । আমরা সবাই কিছুক্ষণ পর খালার সাথে কেনাকাটা করতে যাবো । তোর কিন্তু কোন না চলবে নাহ!
আমি ভাবলাম এরাই তো আমার জীবনের মানে । প্রবল ভালোবাসার বাঁধন । মন হালকা হলো কিছুটা । আমি ছুটকির সাথে নিচে যাচ্ছি । একলা ঘরে পরে রইলো আমার আঁকা সাতরঙের ঠিকানা …………………………।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.