স্ট্রীটলাইটের আলোয় একজন ব্যর্থ যুবক

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা
উৎসর্গঃ বন্ধু প্রিয় মানুষ

১.
-কাকাই, কাকাই আমাকে একটা কাঁঠালচাঁপা ফুল এনে দিবে?
নাক ডুবিয়ে আমি বই পড়ছিলাম। আমার ভাইঝির কথা শোনে আস্তে করে মুখটা তুলে তার দিকে তাকালাম।কি নিষ্পাপ একটা মুখ!বয়স আর কত হবে । চার কিংবা সাড়ে চার।কিন্তু বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত শান্ত সে । এতটা শান্ত মেয়ে দেখা যায় না। আমার দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় তার সাথে খেলা করে। সে আমার মনের অনেকটা জায়গা দখল করে আছে। আমি চুপ দেখে সে আমার ভাবনার ঘুড়িগুলো উড়িয়ে দিয়ে বলল

-কি হল কাকাই ?দিবে না? দাও না ছাদ থেকে একটা কাঁঠালচাঁপা ফুল এনে।
আমি তার দিকে তাকিয়ে ভরসার হাসি দিয়ে বললাম
-তুমি যাও ত্রয়ী। আমি নিয়ে আসছি।

ছাদে উঠলাম। বাসার পাশেই কাঁঠালচাঁপা ফুলের গাছ। আমাদের বৃদ্ধ বাড়িটার “লাঠির” মতোই লাগছে গাছটাকে।ছাদের কোনায় চোখ যেতেই দেখি দিদি দাড়িয়ে আছে। একরাশ মুগ্ধতায় নিমগ্ন চোখদুটো মেলে তাকিয়ে অাছে শারদের দ্বাদশী চাঁদের দিকে। আমার দিদিটা বেশ পাগলামি করে । কাছে যেতেই একগুচ্ছ স্নেহভর্তি চাহনি নিয়ে বলল,
-এই রাতে ছাদে কেন?
-রিফ্রেশমেন্ট। তুই এখানে কেন দিদি ?
-এম্নি রে।
-মিথ্যে কথা। লুকিয়ে লুকিয়ে দাদাবাবুর সাথে কথা বলছিস।
-যা,আগে দাদাবাবু হয়ে নিক। -তুই তো অনেক লাকী দিদি।বিয়ের পর অস্ট্রেলিয়া চলে যাবি।
-তোরা আমাকে মিস করবি। নারে?

প্রশ্নটা যেন অনেকটা আত্নপক্ষ সমর্থনের মতো।আমি কিছু বলি নি।চুপ করে আছি।পকেট থেকে একটা সিগেরেট বের করে জ্বালালাম।দিদি কটমট করে আমার দিকে তাকালো, কিন্তু কিছু বলল না।কারন বাসার সবাই জানে।যে আমি সিগেরেট খাই। উপদেশবানীও ঝেড়েছে। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। আমার কোন চেঞ্জ নেই।তারপর থেকে অার উপদেশবানী ঝাড়ে না।অামি চুপ দেখে দিদি আমার চিন্তার সুতোয় টান মেরে বলল
-কি হল,চুপ যে?
আমি ছাদের পাশে কাঁঠালচাঁপা ফুলের গাছ থেকে একটা ফুল ছিড়লাম।দিদির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম,
-এটা কানে গোঁজ তো।
দিদি আমার হাত থেকে ফুলটা নিয়ে কানে গোঁজল। আমার দিকে তাকিয়ে মিস্টি করে হাসি দিয়ে বলল ,
-কেমন লাগছে এখন?
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।শঙ্খের উপর শেষ বসন্তের মোলায়েম রৌদ্র পড়লে যেমন এক পবিত্র অাভার সৃষ্টি হয়, সেরকম লাগছে। মনে মনে বললাম, “তোকে খুব মিস করবো রে দিদি।তুই চলে গেলে ঘরটা ফাঁকা হয়ে যাবে রে।”

এমন সময় পিছন থেকে কাশির শব্দ ভেসে এলো।বড়দা! আমি সিগেরেট টা ফ্লোরে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিলাম।বড়দা বলল
-খাবার রেডি।খেতে আয় দুজনেই।
ভদ্র ছেলের মতো নিচে চলে এলাম।

২.
খেতে বসলাম।বাবা,বড়দা,বৌদি,দিদি আর আমি। মা খাবার বেড়ে দিচ্ছে। আর ঠাকুমা তার ঘরে।ঠাকুমাকে গলা ভাত খাওয়াতে হয়।এ দ্বায়িত্ব টা দিদির।দিদি চলে গেলে যে কে করবে কাজটা। খাবার টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো। তাড়াতাড়ি সাইলেন্ট করলাম।কিন্তু যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। কাজলের ফোন।কোন কথা শোনতে চায় না। ভাবে সবসময় মিথ্যে বলি আমি।কিন্তু আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে সে।খাবার টেবিলেই মা কথাটা তুলল
-ঝুমার বিয়ের ডেট এগুতে চাইছে বরপক্ষের লোকেরা।
বাবা- কেন?
-প্রবীরের(দিদির হবু বর) না কি তাড়াতাড়ি বিদেশ যেতে হবে।পরশু ঝুমাকে নিয়ে প্রবীর যাচ্ছে পাসপোর্ট অফিসে।
-তা যাক। তবে আমি ভাবলাম একটু দেরীতে করলে আয়োজনের ব্যাপারটা…
-সে সমস্যা নেই।বড়খোকা ছোটখোকা সব সামলে নেবে। কি রে পারবি না?
আমরা দু ভাই সম্মতিসূচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়ালাম। খাওয়া শেষ হতেই মনে পড়লো ত্রয়ীর জন্য ফুল আনা হয়নি।ছাদে গেলাম।যেতে না যেতেই কাজল ফোন করেছে।তার কন্ঠে শাসনের সুর স্পষ্ট।
-কি হল কি? ভি আই পি হয়ে গেছো?ফোন দিলে রিসিভ করো না।সমস্যা টা কি তোমার… আমি দুম করে বলে বসলাম
‘লাভ ইউ পাখি’
মুর্হুতেই তার সমস্ত রাগ পানি হয়ে গেল।তারপর এটা সেটা নিয়ে কত কথা।আমার পড়ালেখার এবং ঘড়ির বারোটা বাজিয়ে তারপর ফোন রাখলো।নিচে নেমেই মনে হল “ত্রয়ীর জন্য কাঁঠালচাঁপা ফুল আনা হয় নি।” চুপচাপ পড়তে বসলাম।সবাই তখন ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। অতল তন্দ্রায় নিমগ্ন পুরো শহর। জেগে থাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় নিশাচর, প্রহরী কুকুর ও অামি…….. সারারাত……….

৩.
দিদির গায়ে হলুদের কেনাকাটা করতে যাচ্ছি সবাই। এছাড়াও বিয়ের জন্য আরো অনেককিছু কেনার বাকি আছে।আমাদের সবার মাঝে একধরনের চাপা উল্লাস কাজ করছে। তবে সবার উল্লাস ছাপিয়ে ত্রয়ীর কলকল কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।মাঝে মাঝে এতটাই অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে যে এদিক সেদিক চলে যাচ্ছে।সামলে রাখাই দায়।আমি বরের পাঞ্জাবী ও টোপর দেখছি।হঠাৎ করে পিছন দিকে তাকাতেই আমার বুকটা ধক্ করে উঠলো।ত্রয়ী নেই। এদিক সেদিক খোঁজেও পেলাম না।ইতিমধ্যে সবার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেছে।সারা মার্কেটে তন্ন তন্ন করে খৌঁজলাম। কিন্তু পাওয়াই যাচ্ছে না।হঠাৎ করে মার আর্তচিৎকারে আমার বুকের রক্ত ছলকে উঠলো। শব্দটা অনুসরন করে দৌড়ে রাস্তায় এলাম।রাস্তায় গিয়ে আমি যা দেখলাম তাতে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।রাস্তায় একদলা মাংসপিন্ড পড়ে আছে। আর আছে ত্রয়ীর লাল রক্তে ভেজা সাদা জামাটা।দাদা চিৎকার করে রাস্তায় পড়ে মাংসপিন্ডটাকে জড়িয়ে ধরেছে। হাউমাউ করে কান্নার শব্দটা গগনবিদারী আর্তনাদের মতো।
এক বাবার কলিজা ছেড়া ধন মাটিতে মিশে গেছে। চিরনিদ্রায়। সে আমাদের ছোট্ট ত্রয়ী। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না! যে একটু আগে কাকাই, কাকাই বলে সারাটা রাস্তা অস্থির করে ফেলছে, সে আর কথা বলবে না।আমি দৌড়ে গিয়ে তার ছিন্ন একটা হাত বুকে রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। অনেকেই সমবেদনা জানাতে এসেছে, কিন্তু যা হারানোর তা হারিয়ে ফেলেছি।আমার অনেকটা জগত।
অনেকটা…

এতকিছুর মধ্যও বিয়েটা থেমে থাকে নি।আমার মামারা সব আয়োজন করছে নিজ হাতে।দিদিটা চুপ করে বসে থাকে।দাদা সারাদিন ত্রয়ীর ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে রাখে।বৌদি প্রায় পাগলপ্রায়।আর আমি? নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের অতল শূন্যতা অামায় গ্রাস করে প্রতিনিয়ত। একবুক অবর্ণনীয় কষ্ট ও তরল গলিত কিছু নোনা পানি নিয়ে চাঁদহীন এক অাকাশ দেখি। সব কাহিনী ভাগ করি অাকাশের সাথে। না জানি অাকাশের বুকে কত কোটি কোটি দুঃখের কাহিনী জমা হয়ে অাছে। বিয়েটা যেন কোনরকম কাটলো।দিদি চলে যাবার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষন কেঁদেছে।কে জানে? কবে বিদেশ থেকে আসে।দেখতে দেখতে মাইক্রোবাসে করে দিদি চলে গেল।দুদিনের মধ্য মেহমানরা চলে গেল আপন ঠিকানায়।বড়ঘরে ত্রয়ীর ছবিটা চুপচাপ ঝুলছে। ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে ছবিতে দেয়া মালাটা।ছবিতে নিষ্পাপ একটা হাসি লেগে আছে । ঘরটা যেন শূন্য। ত্রয়ী ও দিদি চলে গেল। দূরে,বহুদূরে…

৪.
আমি মনপ্রান দিয়ে পড়াশোনা করছি।সামনেই আমার ভর্তি পরীক্ষা।এত কষ্ট নিয়ে চলা যায় না।স্বার্থপরের মতো চিন্তা করছি “যদি ঢাকায় কোন ভার্সিটিতে চান্স
পেয়ে যাই তাহলে কাজলের কাছাকাছি থাকতে পারবো।তাকে অনেক সময় দিকে পারব।” কাজলকে বললাম সে কথা। সে আমাকে উৎসাহিত
করলো।আস্তে আস্তে দুঃখগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে লাগলো। এটাই দুঃখের ধর্ম।এর মাঝে দুদিনের জন্য মাসির বাড়ি বেড়াতে গেছি।এসে দেখি বাসার পরিবেশ
থমথমে।কারনটা জানতে পারলাম তারপরেই।দাদা এখানে থাকবে না। ঢাকা চলে যাবে।
তার মতে “যেখানে তার বাচ্চাদের সুরক্ষা নেই সেখানে তাদের ভবিষ্যত চিন্তা করা তো বোকামী।” দাদা বাবাকেও নিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু বাবা এ জায়গা ছেড়ে নড়বে না।শত হোক, পৈত্রিক নিবাস।কেন যেন কষ্ট পেতে পেতে কষ্টগুলোকে আর কষ্ট মনে হয় না।দাদা চলে যাওয়ার দিন দাদাকে ট্রেনে তুলে দিলাম।তারপর ঘরে
চলে এলাম।আজ ঘরটাকে মৃত মৃত লাগছে। কখনো এমন অনুভূত হয় নি।কেমন যেন সূক্ষ্ম একটা বিচ্ছেদের সুর বাজছে।

মার দিকে এখন অার তাকাতে পারি না।হাড় যেন বেড়িয়ে পড়বে।বাবা কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে। সেদিন দেখি বাবা বারান্দায় দাড়িয়ে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে
ছিল দূরে। কেমন যেন অসহায়ের মতো। অামার মনের ভেতর সেদিন কেমন অনুভূত হয়েছিলো তা শুধু অামি জানি।
এখন আমার উপর অনেক দ্বায়িত্ব পড়েছে।আমিই প্রায় সবকিছু করি।দেখতে দেখতে পরীক্ষা চলে এলো।দাদার বাসায় উঠলাম। সেখান থেকে পরীক্ষা দিব।পরীক্ষা
দিলাম।হলও মোটামোটি।কাজলের সাথে দেখা করলাম। সেই অনেক ভালো আছে।কত্তো হাসিখুশী। কত রঙিন স্বপ্নের স্থিরচিত্র সাজিয়ে রেখেছে তার মনের গোপন
এলব্যামে।কিন্তু কে জানতো এ স্বপ্নের শেষ কোথায়। রেজাল্ট হল।আমি কোথাও চান্স পাই নি।কাজল এ কথা শোনার পর থেকে কেমন যেন আচরন করতে লাগল।আমি
তাকে চাপ দিয়ে ধরলাম। কি হয়েছে তাকে বলতেই হবে। অনেক চাপের পর সে বলল,”এ সম্পর্কটার ভবিষ্যৎ কি বল। তুমি তো আর ঢাকা ভর্তি হবে না।আমরা মাসে একবারও দেখা করতে পারব না…”
আমি আর কিছু বলি নি।চুপচাপ চলে এলাম।আর কবর দিয়ে এলাম শেষ ভালোলাগাটাকে ।


বাসায় চলে এলাম।সময় চলছে অতি ধীরে।ইতিমধ্য মা আরো অসুস্থ হয়ে পড়লো।ডাক্তার বললো স্নায়ুদৌব্যর্ল্য। কিন্তু পথ্যে কোন কাজ হচ্ছে না।আমরা মাকে
হাসপাতালে ভর্তি করে দিলাম।যে মা একদিন সমস্ত সংসার শক্ত হাতে চালিয়েছিল, সেই আজ এত দূর্বল। আমার কেন যেন কান্না পেয়ে যায়।চুপচাপ চোখের জল
গড়ায়।বাবা বলে,”চিন্তা করিস না,সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু কথাটার ভিত্তি যে কতটা তা বাবাও জানে।এর মধ্য দাদা মাকে এসে দুবার দেখে গেছে।মনে হল যে তার
কর্তব্যকর্ম টা করে আমাদের উদ্ধার করেছে।এরই মধ্য একদিন হাসপাতাল থেকে খবর এলো ,”তাড়াতাড়ি আসুন। পেশেন্টের আবস্থা ভয়াবহ।”

আমার বুকটা ধরফড়িয়ে উঠলো।আমি ও আমার রোগে শোকে জরাজীর্ন দূর্বল বাবা রওনা দিলাম হাসপাতালে।হাসপাতালে গিয়ে মার বেডের কাছে গিয়ে দেখি মামা
কাঁদছে।আর বলছে,”তোরা অনেক দেরী করে ফেলেছিস।
অনেক……”
আমার মা মারা গেছে।কেউ যেন আমার গলা টিপে ধরেছে।কলিজাটা মোচড়া শেষ করে দিচ্ছে নিজেকে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার।বারবার মনে হচ্ছে মা আমাকে বলবে”এখনও কিসব দুষ্টুমি করিস?বড় হবি না?” কিন্তু মা তো বলে না।মা যে নীরব।মারা গেছে।মার কাছে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বললাম”মা ও মা,একটিবার
চোখ খোল।ওমা খোল।মা… কিন্তু মার নিদ্রা আর ভাঙবে না।চিৎকার করে কাঁদছি
আমি।ডাক্তাররা তা দেখে ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে চলে গেলো।এটা তাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। যেন মারা যাওয়ার মধ্য অাহামরি কিছু নেই, শুধুই একটা
প্রকৃতিক নিয়ম। অার কিছুই না………
মাকে চিতায় নেয়া হল।চোখের সামনে জ্বলছে আমার
সোনার প্রতীমা মা।

৬.
এই ঘটনার পর সবাই কেমন যেন হয়ে গেছে।বাবার দেখা পাওয়াই ভার। দু-একদিন পর পর বাসায় আসে।সারারাত মদ খেয়ে কোথাও পড়ে থাকে।প্রায়ই ব্যেশাপাড়ায় যায়। জীবনের ত্যাগিদে একটা চাকরি নিয়েছি।ঘরে একটা কাজের মাসি রেখেছি।সে ঠাকুমকে খাইয়ে দেয়।আর
হ্যঁ,ঠাকুমা বেঁচে আছে।এতগুলো ঘটনা ও কালের সাক্ষী হয়ে।যেন জরাজীর্ণ এক অভিজ্ঞ হৃদয়ে সয়ে নিয়েছে সব। কিন্তু হৃদয় ত অভিজ্ঞ হয় না।হয় পাথর।কষ্টের কষাঘাতে হৃদয়ের পরিবর্তিত রূপ।এখন অামারো হৃদয় নেই। শুধু অাছে
একটি দ্বিখন্ডিত পাথর….

সারাদিন কাজশেষে ক্লান্ত আমি ঘরে ঢুকার পর মনে হয় কোন শ্বশানে আছি।রাত্রে আমি ঠাকুমাকে আমি গলা ভাত খাওয়াই।পরিবারের একমাত্র লোকই তো ঠাকুমা।এর
মাঝে দিদির চিঠি অাসে বিদেশ থেকে। ছোট ছোট চিঠি। কিন্তু সে চিঠিতে থাকে অপূর্ব এক সৌরভ।বকুল ফুলের মতো। ফুলটা হয়তো তাজা থাকে না। কিন্তু সে
সৌরভ রয়ে যায় অনেকদিন। চিঠিতে জানায় সে খুব ভালো আছে।সে ভালো থাক।
তাকে খুব মনে পড়ে।মনে পড়ে ত্রয়ীকে, মাকে ও কাজলকে।দাদা বলেছে তার কাছে থাকতে। কিন্তু আমি রাজী হইনি।মাঝে মাঝে ভাবি কাজল যদি থাকতো,তাহলে হয়তো ঠাকুমাকে সাহায্য করতো,বাবাকে সাহায্য করতো।কিন্তু মিছে দিবাস্বপ্নের জোয়ারে গা ভাসিয়ে নিজেই হেসে উঠি।
নিষ্ঠুর বাস্তবতার দিকে তাকাই। কোথাও কেউ নেই……

৭.
একদিন অফিস থেকে বাসায় এসে দেখি যে বাসার পাশে কাঁঠালচাঁপা ফুলের গাছটা প্রতিবেশী কেটে ফেলেছে। তাদের দিকে তাকাতেই তারা বলল “ঘর করবো
তো,তাই।”মার প্রিয় ছিল কাঁঠালচাঁপা ফুল।গাছটা মা লাগিয়েছিলো । স্মৃতিটা মুছে গেছে জীবন থেকে। আমি সবগুলো কাঁঠালচাঁপা ফুল আনলাম।অানমনে সুতোয় গাঁথছি
প্রতিটা কাঁঠালচাঁপা ফুল। দুটো মালা হলো।মালা দুটো নিয়ে বড়ঘরের সামনে এলাম।সেখানে ত্রয়ীর ছবিটার পাশে শোভা পাচ্ছে মার ছবিটা।দুটো মালা দুজনের
ছবিতে পড়িয়ে দিলাম।একটা ফুল হাতে রয়ে গেল। ত্রয়াীর কথাটা কানে বাজছে।

আমি পারি নি ত্রয়ীকে কাঁঠালচাঁপা ফুল এনে দিতে। ঘরজুড়ে থমথমে বিষাদময় নীরবতা বিদ্যমান।কেন যেন বেড়িয়ে যেতে মন চাচ্ছে এ বিষাদের অালয় থেকে।
বেরিয়ে পড়লাম।চোখ দিয়ে গলগল করে পানি ঝরছে। রাস্তায় আসলাম।রাতের শুনশান রাস্তার উপর শারদের চাঁদ অকৃপনভাবে ঢেলে দিয়েছে অপার্থিব এক জোছনা।
চারদিক ডুবে গেছে জোছনায়। কয়েকটা স্ট্রীটলাইট জ্বালানো। সবগুলো কষ্ট যেন আমায় জেঁকে ধরেছে। হাতে কাঁঠালচাঁপা ফুলটা তখনো ধরে রেখেছি।চোখ
দিয়ে উপচে পড়া জল নিয়ে উদ্দ্যেশ্যহীন ভাবে হেটে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে অাকাশের দিকে তাকালে অাকাশটাকে ঝাপসা মনে হয়। নক্ষত্রবিহীন এক অাকাশ।

যখন চোখটা মুছে তাকাই, দেখি যে কালপুরুষের পাশে
দুটো তারা ঝিক করে জ্বলে উঠে।
(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.