ইসলামে সমকামিতার গোপন ইতিহাস

লেখকঃ অন্যস্বর

ইসলামে একসময় সমকামিতাকে খুব স্বাভাবিক প্রবণতা ভাবা হতো।

ইসলামের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় অটোমান সাম্রাজ্য। অটোমানে গে বা লেসবিয়ান সেক্স ট্যাবু ছিল না। ১৮৫৮ সালে সেখানে আইন করে সমকামিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল।

সমকামিতার সাথে অপরাধের ধারণা সম্পৃক্ত হয় কলোনিয়াল ইউরোপীয়দের হাত ধরে, যখন তারা খ্রিষ্টান ধর্ম নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যায়।
খ্রিষ্টান শাসকরা তার কলোনীগুলোতে সমকামিতার শাস্তি বিধান করে আইন পাশ করে। সম্প্রতি ইউরোপের দেশগুলো সমকামিতাকে বৈধতা দিলেও তাদের অধিকাংশ সাবেক কলোনিগুলোতে সমকামিতা এখনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ইসলামের আজকে যে এন্টিহোমোসেক্সুয়াল অবস্থান তার পেছনে ভূমিকা রয়েছে খ্রিষ্টান ধর্মের।

ইসলামের শুরুর দিকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সমকামিতার প্রচলন ছিল।এবং সমাজ তা অনুমোদন করতো।

এমন অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান আছেন যারা মনে করেন নবী মোহাম্মদ জেন্ডার এবং যৌন সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

আরব পুরুষের মধ্যে অল্প বয়সী ছেলেদের সাথে সেক্স করবার রেওয়াজ চালু ছিল।অনুমান করা হয় এই কালচার তারা গ্রহন করেছে গ্রীকদের থেকে।
ভারতবর্ষ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো পার্সিয়ান কালচার দ্বারা প্রভাবিত।পার্সিয়ান সমাজে বয়স্ক লোকেরা অল্প বয়সী দাড়ি গজায়নি এমন ছেলেদের সাথে সেক্স করতে পছন্দ করতো।অল্প বয়সী এই ছেলেদের বলা হয় আমরাদ। দাড়ি গজালে আমরাদ’রা পুরুষ হয়ে যায় এবং ক্রমে তারাও অন্য আমরাদদের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

As
আমরাদের সাথে গ্রুপ সেক্স করছে অটোমানের সম্ভ্রান্ত পুরুষেরা; ছবিসুত্র : গুগল সার্চ

তৎকালীন সময়ে একজন পুরুষ বাচ্চা জন্ম দেওয়ার দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে পারলে, আমরাদ, হিজরা কিংবা প্রস্টিটিউট যে কাউরো সাথে সেক্স করতে পারতো। এ ব্যাপারে সমাজের বিশেষত অভিজাত গোষ্ঠীর পূর্ণ অনুমোদন ছিল।

দুইজন পুরুষের সঙ্গমরত অবস্থায় এই ছবিটি পাওয়া গেছে অটোমানের ১৯ শতকের একটি বইতে; ছবিসুত্র : ইন্টারনেট

ইরানি ইতিহাসবিদ আফসানাহ নাজমাবাদি লিখেছেন সরকারী সাফাবিদ লিপিকররা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শাহ বা শাসনকর্তাদের সেক্সুয়াল লাইফ নিয়ে লিখতেন। তাদের বর্ণনায় মুখান্নাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। মুখান্নারা(কিছু গবেষকের মতে তারা হিজরা) পুরুষদের আকর্ষণ করার জন্য তাদের দাড়ি সবসময় সেভ করে রাখতো। তৎকালীন সমাজে তাদের গ্রহনযোগ্যতা ছিল। সম্ভ্রান্তদের সেবায় তাদের নিয়োজিত করা হতো।

কিন্তু সে সময়ের সমকামী আচরণগুলো আজকের সমকামিতা ধারণার সাথে মেলালে ভুল হবে বলে দাবি Ludovic Mohammad Zahed নামের একজন ফ্রেঞ্চ সমকামী ইমামের।
তার মতে প্রাচীন মুসলিম সমাজে সমকামিতার প্রচলন ছিল পেট্রিয়ার্কির কারণে। অর্থাৎ আমি পুরুষ, আমি সম্পদের মালিক, সুতরাং আমি অল্পবয়সী ছেলে, হিজড়া, মেয়েমানুষ যে কাউকে রেপ করতে পারি।

বেহেস্তের বর্ণনায় সমকামিতার উল্লেখ

কোরানের কোথাও বলা নাই বেহেস্তের সব ভার্জিনরা মেয়েমানুষ। কোরানে হুরদের পাশাপাশি গেলমানদের উল্লেখ আছে। গেলমানরা হলো বেহেস্তের সুদর্শন তরুন,যারা সেখানে পুরুষদের সেবা করবে।

তাদের (জান্নাতিদের) জন্য অপেক্ষা করে থাকবে চিরসুন্দর বালক ও কিশোরের দল, পবিত্র ঝর্ণার পানি পেয়ালা হাতে।

(কোরআন- ৫৬: ১৭-১৮)

তাদের আশেপাশে সর্বক্ষণের জন্য নিয়োজিত থাকবে নিবেদিত প্রাণ সুদর্শন বালকের দল, যারা হবে সুরক্ষিত মণিমুক্তার মতো উজ্জল।

(কোরআন- ৫২:২৪)

সদোম এবং গুমরাহ’র ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা

আল্লাহ কিভাবে সদোম শহরবাসীকে শাস্তি দেন তার উল্লেখ আছে কোরানে। মূলত এই ঘটনার উল্লেখ থেকেই ইসলামের সমকামবিরোধী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
তবে অনেক মুসলিম স্কলার ইসলামের এই সমকামবিরোধী ব্যাখ্যা মানতে নারাজ।
দুইজন ফেরেস্তা যখন সদোম শহরে পৌছায়,লুত তার বাড়িতে তাদের রাত্রিযাপন করতে বলে। কিন্তু শহরের লোকেরা অতিথিদের ব্যাপারে জানতে পারলে তারা তাদের ধর্ষণ করতে চায়। ফলে আল্লাহ লুতের শহর ধ্বংস করেন।

এইখানে আল্লাহ সমকামিতার জন্য শাস্তি দেননি, শাস্তি দিয়েছেন অতিথিদের সাথে দুর্ব্যবহার করার জন্য,তাদের ধর্ষণ করতে চাওয়া সহ আরো নানা রকমের নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য।

প্রাচীন ইসলামি সাহিত্যে সমকামিতার অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়। দুইজন পুরুষের ভালবাসার অনুভূতি নিয়ে অনেক কবিতা রচনা করা হতো।

সে সময়ে কম বয়সী ছেলেদের সাথে জোরপূর্বক সেক্স করা আইনবিরুদ্ধ ছিল। ইয়াং ছেলেদের রেপ করার শাস্তি হিসেবে ধর্ষকের পায়ে বেত্রাঘাত করা হতো কিংবা একটা কান কেটে নেওয়া হতো। ইরানে এই শাস্তিগুলো প্রয়োগ করার প্রমান পাওয়া গেছে।

লেসবিয়ান সেক্স

পিতৃতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে প্রাচীন মুসলিম সমাজে লেসবিয়ান সেক্স এর ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানা যায় না।

১৬ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যে লেসবিয়ান সেক্স বৈধ ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসকরা বিশ্বাস করতেন অত্যধিক গরমে মেয়েদের যৌনাঙ্গে যে চুলকানির সৃষ্টি হয় তার একমাত্র উপশম অন্য মেয়ের কামরস। মুসলিম চিকিৎসকরা এই উপায় পেয়েছিলেন গ্রীক চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে।

অনেক পরে ১৬ শতাব্দীতে ইটালীয় চিকিৎসক এল্পিনি দাবি করেন গরম আবহাওয়া মেয়েদের মধ্যে অত্যধিক যৌন চাহিদা এবং বেশি খাওয়ার প্রবনতা তৈরি করে। এটা মেয়েদের শরীরে হিউমর ইমব্যালেন্স ঘটায় (হিউমর ব্যালেন্সিং প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসা পদ্ধতি। এই চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এখানে) এবং লেসবিয়ান সেক্সের প্রতি আকর্ষণ বাড়ায় । এই অসুখের প্রতিকারে ডা এল্পিনি দীর্ঘক্ষণ গোসল করার পরামর্শ দিতেন। মেয়েরা অন্য মেয়ের সাথে সেক্স করতে পারে এই ভয়ে অনেক পুরুষ তাদের স্ত্রীদের পাবলিক গোসলখানায় যেতে মানা করতো।

লেসবিয়ান প্রেম এবং বিয়ে

আরব লোককথা অনুযায়ী আল জারকা আল ইয়েমেন( ইয়েমেনের নীল চোখের নারী) এর সাথে এক খ্রীষ্টান রাজকন্যার প্রেম ছিল। আল জারকা ছিলেন একজন সিয়ার(Seer), ভবিষ্যত দেখতে পেতেন তিনি। তাকে ক্রুশে দেওয়া হলে কথিত আছে খ্রীষ্টান রাজকন্যা তার চুল কেটে নিজের কাছে রেখেছিলেন এবং আমৃত্যু শোক করেছিলেন।
রাজকীয় প্রাসাদে মেয়েরা অন্য মেয়েদের সাথে এক বিশেষ ধরণের চুক্তিতে সই করতো। এই চুক্তি অনুযায়ী তারা একে অপরকে নিরাপত্তা দেওয়ার ও যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নিতো। ফলে এই চুক্তিগুলো সিভিল পার্টনারশিপ বা বিয়ের থেকে আলাদা কিছু ছিল না।
প্রাসাদের বাইরেও এরকম চুক্তির প্রচলন ছিল বলে জানা যায়।
এছাড়া অনেক সুফি ভাবধারার কবিতা পাওয়া যায় যেখানে লেসবিয়ান প্রেম সেলিব্রেট করা হয়েছে।
উপনিবেশবাদের যুগে ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে এসে মুসলিম বিশ্বে লেসবিয়ান সেক্স নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়। আরব্য রজনীর গল্পে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এই বইএর কিছু গল্পে অমুসলিম মেয়েরা অন্য মেয়ের সাথে লেসবিয়ান সম্পর্কে জড়ালে গল্পের ‘হিরো’ এইসব মেয়েদের মুসলিম এবং বিষমকামীতে রুপান্তর করে।

ইসলামে ইউরোপীয় কালচারের কুপ্রভাব

ইউরোপীয়রা মুসলিম বিশ্বে তাদের কালচার পুশ করা শুরু করে দুইভাবে –
এক. কলোনিয়ালিজিমের মাধ্যমে মিশরে এবং ভারতে
দুই. অর্থনৈতিক দিক থেকে অটোমানে।

ইউরোপীয়রা সমকামিতাকে ইতিবাচকভাবে দেখা শুরু করে বিশ শতকের শেষ দিকে। তার আগে পর্যন্ত ইউরোপে সমকামীদের অসুস্থ মনে করা হতো।
ইউরোপীয় আগ্রাসনের কারণে মুসলিমরা সবকিছু পশ্চিমা মাপকাঠি দিয়ে বিচার করা শুরু করে। ইউরোপীয়দের মতে মুসলিমরা ছিল অনগ্রসর, দূর্বল। ফলে ১৯ শতকে মুসলিমরা তাদের কালচার নিয়ে লজ্জিত ছিল। তাদের মধ্যে একটা ঝোঁক দেখা যায় ইউরোপীয়দের আদলে নিজেদের কালচার্ড করার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সমকামিতা ইসলামে তার গ্রহনযোগ্যতা হারায়।

ইতিহাসের পরিহাস এই যে এন্টি- হোমোসেক্সুয়াল হওয়ার কারণে ইউরোপ আজকে ইসলামের নিন্দা করে, অথচ ইসলামের সাথে সমকামিতার সমঝোতার জায়গাগুলো তাদের পূর্বপুরুষেরাই ধ্বংস করে গেছে।

প্রসঙ্গত, ১৮৬৪ সাথে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষে আইন তৈরি করে সমকামিতাকে অবৈধ ঘোষণা করে। ২০১৮ সাথে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই আইন রদ করে সমকামিতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশে এই আইন এখনও বহাল আছে। এই দুইটি দেশেই মুসলিমরা সংখ্যাগুরু।


লেখাটা gaystarnews.com ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া; এখানে পরিমার্জিতরুপে অনুবাদ করা হলো।

mondroadmin Avatar

Posted by

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.