ভালোবাসবো তোমায়

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা

একদল পাগল বন্ধু থাকলে কার না ভালো লাগে! আমি অনি। অর্নিবান রায়। এবার ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্র। থাকি একটা মফস্বল শহরে। বাবা মা আর দু ভাই নিয়ে অবশ্য,দিনকাল বেশ কেটে যায় । একদল পাগলের কথা বলেছিলাম। কারন ১৭ মার্চ আমার জন্মদিন। আর সেই জন্মদিনে রাত্র ১১.৫৯ মিনিটে যদি সব ক্লোজ সার্কেলের বন্ধু যদি দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে আর সবাই একসাথে বলে উঠে শুভ জন্মদিন! কার না ভালো লাগবে!
আমি একা একটা বাসায় থাকি। আর বাবা মা থাকে অন্য বাসায়। কিছুদিনের মধ্য এ বাসায় এসে পড়বে।
যাই হোক রাত্র দুটো পর্যন্ত বিন্দাস মোডে আড্ডা দিয়ে ঘুমোতে গেলাম।
তারপর আবার সকালে উঠেই জড়িয়ে পড়লাম কর্মব্যস্ত জীবনে।
গোধূলীতে ফেরা হলো ঘরে । ওহো। বন্ধুরা গিফট দিয়েছিল। একটাও দেখিনি! । এমন সময় মা ফোন করল।
মাঃ তোর নামে একটা পার্সেল এসেছে। কানাডা থেকে।
বুকটা কেমন যেন ধড়াস করে উঠল! কিছু পুরনো আবেগের বানভাসা কষ্টে ! মার কাছ থেকে তাড়াতাড়ি পার্সেল টা নিয়ে ছাদের লাইট টা জ্বালিয়ে দেখতে বসলাম পার্সেলের ভিতর কি আছে?
। খুললাম।
বাতাস বইছে।
বাতাসটা বসন্তবলয় থেকে মুক্ত। । কেমন যেন ঝড়ো ঝড়ো।

দেখি একটা ডায়রী । ডায়রীতে নাম লেখা -” আফতাব” । ফ্লাশব্যাকের মত পিছিয়ে গেলাম কিছু বিজন দিনের কোলে। । তার পাশের বাসার বড় এক ভাই ছিলো । খুব ভালোবাসত। কখনও সরাসরি না বললেও অনেকবার আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে। তখন আমি নতুন কৈশোরে । তখনো পুরুষে পুরুষে শরীর ভাঙা যায় তা আমার ধারনার বাইরে । কিন্তু কেমন একটা টান অনুভব করতাম । ছোট বলে সে পথে পা বাড়ানো হয়নি। হুট হাট করে চলে গিয়েছিল কানাডায় । তারপর আর কথা হয়নি। কতদিন পর তার সাথে আবার পরোক্ষ যোগাযোগ! ডায়রীটা খুললাম। বকুলের বিরহী গন্ধমেশা । পড়তে লাগলাম আফতাবের ডায়েরী থেকেঃ

হঠাৎ করেই আব্বুর ফোন। আব্বু ফোন করেন না সচরাচর। তার মানে জরুরী কথা । ধরলাম।আব্বু বললঃ
আফতাব তুই তাড়াতাড়ি এসে পড়। কারন প্রিয়ার বিয়ে!

আশ্চর্য হয়ে গেলাম। বোনের বিয়ে আর আমায় বলল না! তারা ঠিক করে নিল। রাগ হয়! যখন খুশী সারপ্রাইজ ভালো লাগে! আমি তাড়াতাড়ি ভার্সিটি থেকে বাসায় এলাম। দেখি সব সাজ সাজ রব। প্রিয়ার বিয়ে ৫ দিন আছে। তাড়াতাড়িই সব কাজের ভার নিজের কাধে নিলাম। আফসোস আমি কাউকে চিনি না ওর শ্বশুরবাড়ির পক্ষের।
বিয়ের দিন।
অসম্ভব ব্যাস্ত।
এমন সময় একটা কন্ঠস্বরঃ কেমন আছেন?
আমি রীতিমতো চমকে গেলাম। চেয়ে দেখি অনিন্দ্যসুন্দর একটা লোক দাড়িয়ে।
আমিঃ আপনাকে ঠিক চিনতে পারি নি!
লোকঃ আমি বরের ছোট ভাই!
আমিঃ তাহলে তো আপনি আমার বেয়াই হন! আমি বউয়ের বড়ভাই।
-আপনাকে তো কনে দেখতে আসার সময় দেখিনি!
-আমার আসলে পরীক্ষা ছিল। তারপর ওই সময় আমাদের আর কথা হয়নি। বিয়ে হল আমার ছোট্ট সোনা বোনটার। কিন্তু তার সাথে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না। শেষপর্যন্ত আমাকেই যেতে হল!

ভাবলাম খারাপ কাটবে না দিনগুলো। সেদিন যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। খেয়েদেয়ে ঘুমোতে যাব। বউয়ের বড় ভাইয়ের সাথে। তিনি বললেনঃ এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বেন? চলেন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আমারও তেমন অমত ছিল না। কেন যেন ঘুমও আসছিল না। বললাম চলেন।

তাদের বাড়িটা গ্রামের দিকে পড়েছিল। দুজনে হাটছিলাম। একটা পুকুরপাড় । আমিঃ চলেন ওই পুকুর পাড়ে বসি। ওনিঃ চলুন।

দুজনেই বসলাম। পুকুর পাড়টা নিস্তব্ধ। চাঁদের আলোয় চারদিকে ভেসে যাচ্ছে।
আমিঃ আপনার নামটাই তো জানা হলো না!
ওনিঃ রাকিব। আপনার?
আমিঃ আফতাব।
তারপর অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট খুঁজছি। পাচ্ছি নাহ । সে তার প্যাকেট বের করে আমার হাতে একটা ধরিয়ে দিলো ।
আমিঃ বুঝলেন কি করে? আমার এখনি তা দরকার?
রাকিবঃ কিছু জিনিস তো বুঝা যায় যদি মনের টান টা কারো প্রতি থাকে আর কি ।
আমি অবাক হয়ে গেলাম! তিনি কড়া একটা ইঙ্গিত দিলেন । আমি কিছু বললাম না। কারন এ মুর্হুর্তে নিরবতা যেন দরকার ছিল।

কিছুক্ষন পর উনি কথা বললেন। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছিলাম আমরা।
তার মধ্য একটা অমোঘ আকর্ষনের দিক আছে। আমার মনে এমন লাগছে কেন?
কেমন জানি ভালোলাগার অনুভূতি! মনের মাঝে যেনো হাজারটা জোনাকী ঘুরে বেড়াচ্ছে এই মধুচন্দ্রিমার রাত্রে।
আমি হঠাৎ করে একটা কাজ করে বসলাম। আস্তে আস্তে তার আঙুলে অল্প একটু ছুঁয়ে দিলাম । একটু পর দেখলাম আমার আঙুল তার আঙুলে বাধা পড়ছে। চেতনে ।
কিছুক্ষণ পর চলে আসলাম রুমে। আমাদের রুমের পাশের রুমেই বোনের বাসর। ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লাম। দুজন । চুপচাপ। ঘুম নেই । কিছুটা অস্থির । হথাঠ করে পাশ রুম হতে শব্দ ভেসে আস্তে লাগলো । প্রথম প্রেমের। পবিত্র প্রেমের। আমি তার দিকে ঘুরে শুলাম। দেখি সেও জেগে আছে। তাকিয়ে আছি। সেও আমার দিকে একিভাবে তাকানো । আমি তার কোমর বরাবর হাত দিলাম । সে চুপচাপ । একটু কাছে টানলাম । সে কাছে এসে এলো। তার তপ্তশ্বাস আমার গলায়। হথাত সেও আমায় কোমর বরাবর হাত দিয়ে কাছে টানলো । দুজনের বুক পেট লেপ্টে আছে। আমি তার ঠোঁটের দিকে ঠোঁট বাড়িয়ে দিলাম। কড়া নিকোটিনের স্বাদ। পুরুষ দেহে কামনা ছুটছে । দু পুরুষের লোমের ঘর্ষণে কামতাপ বাড়ছে। চলছে সঙ্গম………।

তাদের বাসায় তিন দিন থেকেছিলাম। এই তিনটে দিনে তার সাথে হয়েছি আরো অন্তরঙ্গ। ঘুরেছি গ্রামের মেঠোপথ, গিয়েছি তার সাথে নৌকায়, ঘুরেছি গহীন অরন্যে, সে আর আমি যেন ছোট মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম।এক প্রাপ্তির অানন্দ। ভালোবেসেফেলেছিলাম ওকে।মনজুড়ে একটি নাম যেন বাজছিল। রাকিব।
প্রতিদিন ফোনে কথা হতো। বর্ষায় সে আমাদের বাসায় আসে। প্রচুর বৃষ্টি নামে সেদিন।
বিকেলের দিকে তাকে বলি ঃভিজবে? সে বলল চল।
ভিজলাম দুজনে। তারপর আসলাম আমরা বাসার ছাদে। ভিজে আবহাওয়া। চায়ের কাপ নিয়ে বসলাম ছাদে। চা শেষ করলাম। বললামঃকোন থেকে ছাদটা ভালো লাগে। চলো দেখি।সে অমত করল না। ছাদের কোনে দাড়ালাম। পিঠ ঘষে দাড়ালেন উনি। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেছিল আমায়। আমি তার দিকে ঘুরলাম। তার মুখের সেই সুন্দর হাসি।আমায় জড়িয়ে ধরে বললঃভালোবাস আমায়?
সেই প্রথম বললাম, ভালোবাসি। কেমন যেন ছেলেমানুষি হয়ে গিয়য়েছিল।কিন্তু ভালোবাসা হয়তোবা এমনই। ভালোবাসা যেন আরো গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। একটা সময় এলো যখন তাকে ছাড়া চিন্তা অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।
সে আর আমি চিন্তা করলাম আমরা কানাডায় চলে যাবো । কাউকে না জানিয়ে চুপিচুপি চলে গেলাম। গিয়ে চিন্তা করলাম সত্যটা সবাইকে জানিয়ে দিব।কারন এখন কোন মিথ্যের আশ্রয় নিতে হবে না।বাবা মা আমায় ত্যাজপুত্র করল। আমি ও জানিয়ে দিলাম , আর দেশ্মুখু হব না।

আমরা দুজনেই সেখানে চাকরী করছি। দু বছর কেটে গেছে। একদিন রাতে বাড়ি ফিরছি , এমন সময় উল্টো দিক হতে একটা গাড়ি আমায় ধাক্কা দিলো । আমার আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান ফিরলো হাসপাতালে । আমার দুটো পা আর নেই। কেটে ফেলেছে। রাকিব অনেক কেদেছিল।হুইল চেয়ারে বসে যাতায়াত করতাম। আস্তে আস্তে বোঝা হয়ে গেলাম। আমার মন মরা থাকতো। সারাদিন কিছু করার নেই। । একসময় বুঝতে পারলাম রাকিব আমার উপর বিরক্ত।

ক্রমে আমি বোঝা হয়ে গেলাম । রাকিব যেখানে সেখানে রাত কাটাতো। আমি ও এসব নিতে পারছিলাম নাহ । একদিন মলিন মুখে বলেই দিলাম, ” আমাদের এবার আলাদা হওয়া উচিৎ” ।
সেও না করে নি। যেন এ গতানুগতিক সম্পর্কে হাপিয়ে উঠেছে । মুক্তি মিলল এ সম্পর্কের । জানো আমি ভালো নেই । আজ বলে হালকা হলাম।

জানি নাহ কখনো তোমার দেখা পাবো কি নাহ , তবু এই দিন গুলোতে ভালবাসতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে কেউ একজন পাশবালিসের মতো থাকুক । আমায় ভালোবাসার বলয়ে জড়িয়ে কেউ বলুক ” আজীবন ভালোবাসবো তোমায়” ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.