অপেক্ষা

লেখকঃ আনন্দধারা

ডিসেম্বর ৩১, ২০১৪

আজকের দিনটা পৃথিবীর সব মানুষের জন্য একটা বিশেষ দিন হিসেবে পালিত হবে। পালিত হবে বছরের শেষদিন হিসেবে। পুরনো বছরের সকল গ্লানি, কষ্ট আর না পাওয়াকে পেছনে ফেলে নতুন একটা দিনের শুরু করবে পৃথিবীর সকল মানুষ, নতুন নতুন আশা নিয়ে, নতুন নতুন স্বপ্ন বুনে এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। শুধু থমকে থাকবে আমার জীবন। যেটা থমকে গিয়েছে গত বছরের ঠিক এই দিনটায়। ভাবতে ভাবতে চোখের কোনে পানি জমে উঠলো হামিদের।

আজ বুধবার। স্বাভাবিকভাবেই অফিস খোলা। কিন্তু আজ অফিস করাটা কোনভাবেই সম্ভব নয় তার পক্ষে। রাতে ঘুম হয়নি একটুও। হয়না অনেক রাত। আজকাল ঘুমের ওষুধগুলোতেও কি ভেজাল দিচ্ছে? তা নাহলে শান্তির একটা ঘুম কেন হয় না হামিদের গত একটা বছর ধরে? তন্দ্রা মত যদিওবা লেগে আসে কখনো, কেটে যায় মুহুর্তেই। বুকের ভেতরটা খা খা করে প্রতিনিয়ত। বারবার মনে হয়, মীরান নেই। আর কোনদিন ফিরে আসবে না তার জীবনে। কোনদিনও না।

হামিদের এই পরিবর্তনটা কারোই চোখ এড়ায় না। বাবা-মা আর ছোটবোন তার মন ভালো করার বৃথা চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছে অনেক আগেই। এখন হামিদের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলা, আর তার অনুপস্থিতিতে চোখের পানিতে বুক ভাসানো ছাড়া কিছুই করার নেই তাদের। বন্ধুরাও কম চেষ্টা করেনি। যে হামিদ আগে বন্ধুদের কোন পার্টিই বাদ দিত না, সেই হামিদকে আজ পার্টিতে আনা তো দূরের কথা, ফোনেই পাওয়া যায় না একটু কথা বলার জন্য। শুধু অফিসের কাজে ফোনটা খোলা থাকে ৯ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত। এরপর বাসায় পৌঁছেই সুইচড অফ। এভাবেই চলে আসছে হামিদের জীবন গত একটা বছর ধরে।

ব্রাশ হাতে আয়নায় মুখ দেখতে গিয়ে আজকাল আর ভয়ে আঁতকে ওঠে না হামিদ। অথচ এই মানুষটাই কত ফ্যাশন সচেতন ছিল বছর খানেক আগে। ক্লিন সেভ না করে কখনোই ঘর থেকে বের হতো না। আর সেই মুখে আজ খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চুলটা নেহায়েতই দায়সারা ভাবে কাটা। ঘুমহীন রক্তিম চোখের নিচে কালি পড়তে পড়তে এখন অনেকটা গর্তের মত হয়ে গেছে।

ব্রাশ করে নাস্তার টেবিলে বসে হামিদ। ঘড়ির কাটায় তখন ৯টা। মা নাস্তা দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন,

– অফিস যাবি না আজকে?
– না মা। শরীর ভালো না। আর মনটাও ভালো নেই আজকে।
– শুধু কি আজকে? তোর শরীর যে কতদিন ধরে খারাপ সেটাতো আমি জানি। একবার একটু ডাক্তার দেখা বাবা। এভাবে চলতে থাকলে তো তুই… (বলেই শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকেন হামিদের মা)
– সেরকম কিছু হবে না মা। তুমি ভেবো না। আমার হচ্ছে কই মাছের প্রাণ। এত সহজে মরবো না।
– শুকিয়ে কি হয়েছে আমার ছেলেটা। খাওয়ায় কোন রুচি নেই। তোর কি হয়েছে বাবা? বল না একবার! আমি তো আর সহ্য করতে পারছি না তোর কষ্ট। (রীতিমত ফোঁপাতে থাকেন তিনি)
– মা, তুমি কেঁদো না তো। আমি ঠিক আছি। বের হবো।
– বের হবি মানে? তোর না শরীর খারাপ বললি? অফিসেও তো যাবি না। তাহলে? বাসায় শুয়ে রেস্ট নে।
– কাজ আছে একটু মা। দুপুরের আগেই চলে আসবো।

মা’কে কাঁদতে দেখাটা কোন ছেলের পক্ষেই সহ্য করার মত কোন বিষয় না। তাই হাসির ভান করে মা’কে জড়িয়ে ধরে হুট করে বাইরে বেড়িয়ে পড়লো হামিদ।

বাসা থেকে আজিমপুর খুব একটা দূরে না। রিকশা নিয়েই যাওয়া যায়। একটা রিকশা নিয়ে আজিমপুর কবরস্থান চলে এলো হামিদ। হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। মীরানের খুব প্রিয় ফুল ছিল গোলাপ। কিন্তু তার জীবদ্দশায় তাকে একটা গোলাপও দেয়া হয়নি। কবরস্থানে ঢোকার সময় কথাটা মনে হতেই ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল হামিদ। কী এমন ক্ষতি হতো তাকে একটা গোলাপ দিলে! এমন আরো অনেক অব্যক্ত আফসোস এক এক করে বিদ্ধ করে আসছে হামিদকে গত একটা বছর ধরে।

মীরানের কবরে প্রতি শুক্রবারেই জুম্মার নামাজের পর একবার করে আসা হয় তার। কিন্তু আজ বুধবার হলেও সে এসেছে। কারন আজ মীরানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। চারপাশে সুনসান নিরবতা। মাঝে মধ্যে ভেসে আসছে গাড়ির প্যাঁ -পুঁ শব্দ। শীতের সকাল বলে কথা। শুক্রবার হলে তাও একটা কথা ছিল। বুধবারের মত একটা কর্মব্যস্ত দিনে কুয়াশার চাদরে মোড়ানো কবরস্থানে কবর জিয়ারত করতে কারো না আসাটাই স্বাভাবিক।

মীরানের কবরের কাছে হঠাত একজনকে দেখে থমকে গেল হামিদ। ছয় ফিট লম্বা মানুষটাকে পেছন থেকে দেখে সহজেই বলে দেয়া যায় কে। রেজা। মীরানের বড় ভাই। মীরান মারা যাবার পর প্রথমদিকে প্রায় শুক্রবারেই আসতো কবর জিয়ারত করতে। দেখা হলে সামান্য কুশল বিনিময় করে পাশ কাটিয়ে চলে যেত হামিদ সব সময়। পারতপক্ষে এই লোকটার সাথে দেখা করতে চায় না সে কখনোই। আজও চাইলো না। তাই পেছন দিক ফিরে দ্রুত হাঁটা দিল। এই মানুষটার মুখোমুখি হবার কোন ইচ্ছাই তার নেই।

– হামিদ ভাই! (পেছন থেকে ডাক দিলেন রেজা সাহেব, এবার আর না দাঁড়িয়ে উপায় নেই। ঘুরে দাঁড়ায় সে।)
– আসসালামুয়ালাইকুম। ভালো আছেন রেজা ভাই?
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। চলে যাচ্ছেন যে? মীরানের কবর জিয়ারত করবেন না?
– করবো। পরে।
– আমাকে দেখে চলে যাচ্ছেন?

(হামিদ নিশ্চুপ। চোখের পানি সামলাতে নিচের দিকে তাকালো।)
– দেখেন হামিদ ভাই, আমি জানি আমি অনেক বড় অপরাধী। আমার অপরাধের ক্ষমা হয়তো স্বয়ং আল্লাহ্‌ তা’আলাও করবেন না। কিন্তু একটা কথা আজ আপনাকে বলি। ভাই আপনি দয়া করে আমাকে মাফ করে দেন।
(বলেই হামিদকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন রেজা সাহেব)
– আরে আরে আমার কাছে মাফ চাইছেন কেন?
– আমি আপনার কাছেই সবচেয়ে বড় অপরাধী। আপনি মাফ না করলে আল্লাহ্‌ও আমাকে মাফ করবেন না।
– আমি মাফ করবার কে? কি বলছেন যা-তা। আমার কাছে কেন মাফ চাইছেন?
– হামিদ ভাই, আমি আপনার ভাবির থেকে কিছুদিন আগে আপনার আর মীরানের সম্পর্কের কথাটা জেনেছি।
– আমাদের সম্পর্কের কথা মানে? কি সম্পর্কের কথা?
– এমি, মানে আমার স্ত্রীর কাছে মীরান সব খুলে বলেছিল। আপনার আর তার ভালবাসার কথা। এমি এতদিন কথাটা আমার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। কয়েক মাস আগে যখন কবরস্থানে আপনার সাথে প্রায়ই আমার দেখা হয়ে যাওয়ার কথাটা এমিকে জানাই, তখনই সে আমাকে খুলে বলে সব কিছু।
– এখন আর জেনে কি লাভ বলেন? আমার যা হারানোর তাতো আমি হারিয়েই ফেলেছি।
– আমাকে মাফ করে দেন হামিদ ভাই। আমি জানি আমার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। তাও যদি পারেন, মীরানের বড় ভাই হিসেবে আমাকে মাফ করে দিয়েন।
– মীরানের বড় ভাই হবার সুবাদে মীরানের খুনিকে মাফ করে দিতে বলছেন?
– হামিদ ভাই, প্লিজ! (হামিদের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ে রেজা সাহেব।)
– ওঠেন রেজা ভাই। নিজেকে সামলান ( কাঁদতে কাঁদতে রেজা সাহেবকে দুই হাত দিয়ে ধরে দাঁড় করায় হামিদ)
– বলেন ভাই, আমাকে মাফ করেছেন।
– আমার মাফ করা না করায় কি যায় আসে? আমি আপনাকে মাফ করলেই কি আমার মীরান আমার জীবনে ফিরে আসবে? (বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠে হামিদ।)
– না ভাই। তা আসবে না। তাও আমি একটু স্বস্তি পাবো।
– বাহ্‌, স্বার্থপরের মত এখনো কেবল নিজের স্বস্তির কথাটাই ভাবলেন। আমি কি করে স্বস্তি পাবো বলতে পারেন? কি করে শান্তির একটা ঘুম ঘুমাতে পারবো? আমার মীরান… আমার মীরান… (কথাটা আর শেষ করতে পারে না হামিদ। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ে)

রেজা সাহেব আর কোন কথা বলতে পারেন না। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে জড়িয়ে ধরেন হামিদকে।

– আমি জানি আমি সত্যিই ক্ষমার অযোগ্য। আপনি আমাকে শাস্তি দেন হামিদ ভাই। আমার যোগ্য শাস্তি। আমাকে মেরে ফেলেন। তারপরও আপনি শান্ত হন।

দুজনের স্বাভাবিক হতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে। পরিস্থিতি ঠিকঠাক করতে হামিদই প্রথম মুখ খোলে।

– রুফাইদা কেমন আছে?
– জ্বি ভালো। আপনি আমার মেয়ের নাম জানেন?
– খুব ভালোভাবেই জানি। আমি আর মীরান বলতাম রুফাইদা আমাদের মেয়ে।
– আছে, ভালো আছে। তিন বছরে পা দিল। আচ্ছা হামিদ ভাই, যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
– করেন।
– মীরানকে আপনি কিভাবে চেনেন? আপনাদের বয়সের পার্থক্যই বলে দেয় আপনারা সহপাঠী ছিলেন না। আমার মনে হয় আপনি বয়সে আমার চেয়েও বড় হবেন। তাহলে আপনাদের পরিচয়টা হলো কিভাবে?
– সেটা অনেক বড় কাহিনী।
– আমি জানতে চাই। প্লিজ। বলবেন আমাকে?
– মীরানের সাথে আমার দেখা আমার এক বন্ধুর বাসায়। একটা প্রোগ্রামে এসেছিল। সেখানে অল্প টুকটাক কথাবার্তা হয়। সে ব্যস্ত ছিল তার সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে। আর আমার বন্ধুটি সেদিন ব্যস্ত থাকায় খুব একটা সময় দিতে পারেনি আমাকে। তাই অনেকটা একা একাই বসে ছিলাম। বসে বসে দেখছিলাম মীরান আর তার বন্ধুদের। তাদের হাসাহাসিতে হাসছিলাম আর গল্পে তাল মিলাচ্ছিলাম একটু একটু করে। সেদিন ওই পর্যন্তই। এর অনেকদিন পর আরেকটা প্রোগ্রামে ওর সাথে দেখা। সেদিন অনেক কথা হয়। যাবার আগে আদান প্রদান হয় ফোন নাম্বারের। মীরানের হাসিটা ছিল অতুলনীয়। মনে গেঁথে যায় আমার। রাতে বাসায় ফিরে এস এম এস করি মীরানের মোবাইলে, বাসায় ঠিক মত পৌঁছেছে কিনা জানার জন্য। মীরান তৎক্ষণাৎ রিপ্লাই দেয়। সেই থেকে শুরু। নিজেরা ফেইসবুকে আর মোবাইলে একে অপরকে জানতে থাকি। এভাবে এক সময় দুজনের প্রতি দুজনের ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায়।
– আচ্ছা আপনাদের মধ্যে কে প্রথম ভালবাসার কথা প্রকাশ করে? আপনি? নাকি মীরান?
– মীরান। সেও এক অদ্ভুত ঘটনা। একবার মীরান কী একটা কারনে খুব রাগ করলো আমার উপর। ঠিক করলো আর কথা বলবে না। আমিও মন খারাপ করে কোন যোগাযোগ করলাম না। পরদিন সকালে মীরানের বিশাল এস এম এস। এখনো আমার মোবাইলে সযত্নে সেভ করা আছে সেটা। দিনে কমপক্ষে চার পাঁচ বার পড়ি। লিখেছিল, “ রাতে ঘুমাতে পারি নাই। একবার চোখ লেগে আসছিল, কিন্ত ৩টা বাজে আপনাকে স্বপ্নে দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। বারবার আপনার কথা মনে পড়ছে। মনের সাথে অনেক যুদ্ধ করলাম, কিন্তু আর কিছুতেই পারছি না। আমি আপনার কাছে গুরুত্বহীন বা কম গুরুত্বপূর্ণ হতে পারি, কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি আপনি কিভাবে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন। এই কয়েকটা ঘন্টা আমাকে পুরোপুরি বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমি আপনার প্রেমে পড়ে গেছি।”
– হা হা হা! মজার তো! ছেলেপেলের কাজ, কি আর বলবো!
– আমিও তাই ভেবেছিলাম। আর সেটা ভেবেই কোন উত্তর দেইনি।
– তারপর?
– তারপর আর কি? উনি তো রেগেমেগে ফায়ার! ফোন দিয়ে ঝাড়ি। কেন উত্তর দিলাম না। আমি তাকে না ভালবাসলে যেন সরাসরি বলে দেই। এইসব কথা। বোঝেনই তো। এই বয়সের ছেলেদের মাথায় রোমান্স কিভাবে ভর করে।
– আমার ভাই নাহয় ছেলে মানুষ, ভুলে করে ফেলেছে। আপনি কেন সেটাকে আস্কারা দিলেন? আপনি তো যথেষ্ট সমঝদার একটা মানুষ।
– ইশ্‌! আমি যদি সমঝদার মানুষ না হতাম তাহলেই বোধ হয় ভালো হতো।
– মানে? ঠিক বুঝলাম না।
– আমি বয়সে মীরানের চেয়ে বারো বছরের বড়। তাই মীরানের আবেগ-অনুভূতিকে ছেলেমানুশি ভেবে পাত্তা দেইনি তখন। ভেবেছিলাম এতে করে মীরান আস্তে আস্তে দূরে সরে যাবে আমার থেকে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক কষ্ট দিয়েছি তাকে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অতশত হিসাব না কষলেই হয়তো ভালো হতো। যে কটা দিন মীরান বেঁচে ছিল আমরা কিছুটা দিনের জন্য হলেও একসাথে থাকতে পারতাম।
– তার মানে আপনি ওর প্রস্তাবে রাজি হন নি?
– হইনি, আবার হয়েছিও।
– সেটা কি রকম?
– আমি মীরানকে বলেছিলাম এদেশে থেকে আমাদের ভালবাসার স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না। তাই তাকে বলেছিলাম বাইরে যাবার জন্য চেষ্টা করতে। মীরান ছাত্র হিসেবে ভালো ছিল, সেটা আমার চেয়ে আপনিই ভালো জানেন। তাই ওর হায়ার স্টাডিজের জন্য ওকে বাইরে এপ্লাই করতে বলেছিলাম। সে যেতে পারলে আমিও গিয়ে সেটেল্ড হতাম ওর সাথে। এমনটাই ছিল আমার ইচ্ছা। আর সেই শর্তে তার ভালবাসার প্রস্তাবে রাজিও হইনি তখনো। ভুল করেছি। মস্ত বড় ভুল করেছি। সুন্দর ভবিষ্যত রচনার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বর্তমানকেই হারিয়ে ফেলেছি আমি। (বলতে বলতে চোখ ছল ছল করে ওঠে হামিদের)
– আপনাদের এই ভালবাসার পথে আমিই আসলে কাঁটা হয়ে দাঁড়াই। মীরানের চাকরিটা হবার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। কিন্তু মীরান গোঁ ধরে বসে বাইরে যাবে হায়ার স্টাডিজের জন্য। কিছুদিন পর খুব ভাল একটা প্রস্তাব আসে। মেয়ে কানাডিয়ান সিটিজেন। এই মেয়েকে বিয়ে করতে পারলে সে সহজেই কানাডায় যেতে পারবে তার হায়ার স্টাডিজের জন্য। তাই এবার আমরা বাসার সবাই মিলে মীরানকে শক্ত করে ধরি। মীরানের আর পালাবার পথ থাকে না। তার রাজি না হবার কোন কারন না পেয়ে আমি আর আপনার ভাবি আলাদাভাবে বসি মীরানের সাথে। জানতে চাই তার কোন মেয়েকে পছন্দ কিনা। উত্তরে যা শুনি তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বলল, সে একজনকে পছন্দ করে, কিন্তু সেটা কোন মেয়ে না, একটা ছেলে।

মাথায় রক্ত উঠে যায় আমার। ঠাস করে চড় মেরে বসি আমার একমাত্র ছোট ভাইটার গালে, ভুলে যাই সে আর আগের ছোটটি নেই। অনেক বড় হয়েছে। ভালো চাকরি করছে। ভুলে যাই তার নিজের পছন্দ- অপছন্দের অধিকার আছে। প্রচন্ড চিৎকার করে বাসা মাথায় তুলে ফেলি আমি। গালাগালি করে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে… (আর বলতে পারেন না রেজা সাহেব, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।)
– বাসা থেকে বের হয়েই আমাকে ফোন দেয় মীরান। বলে, “ হামিদ ভাই, আমাকে আমার একমাত্র ভাই আজ বাসা থেকে বের করে দিয়েছে গলা ধাক্কা দিয়ে। আমার অপরাধ কি জানেন? আমি ভালবাসি আপনাকে। বিয়ের প্রস্তাব আসছিল অনেকদিন থেকেই। যতভাবে পেরেছি আটকে রেখেছিলাম এতদিন, এমনকি আপনি কষ্ট পাবেন ভেবে আপনাকেও জানাইনি কিছু। কিন্তু আজকে আর ঠেকাতে পারিনি। মেয়ে কানাডিয়ান সিটিজেন দেখে বাসার সবাই উঠে পড়ে লেগেছে এই মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দেয়ার জন্য। আমি না করতে করতে এক সময় কথা কাটাকাটি হয় ভাইয়ার সাথে। বলে ফেলি, আমি একজনকে ভালবাসি। ভাইয়া তখন বলে, ঠিক আছে, তুই যাকে ভালবাসিস তার সাথেই তোর বিয়ে দেব। ওই মেয়ের ফোন নাম্বার দে, বাসার ঠিকানা দে, আমরা প্রস্তাব পাঠাই। হয় এই মেয়েকে বিয়ে করবি না হয় বিয়ে করে বউ রেখে বাইরে পড়তে যাবি। এই কথা শোনার পর আর কোন উপায় থাকে না। বলে ফেলি আমি ভালবাসি একটা ছেলেকে। বলার সাথে সাথেই কান ফাটানো শব্দে ভাইয়া চড় মারে আমার গালে। একা ডেকে মারতো, আপত্তি ছিল না আমার। মারলো ভাবি আর আমাদের মেয়েটার সামনে। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছিল জানেন? শুধু তাই না। আব্বুর নিষেধ সত্ত্বেও ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল আমাকে বাসা থেকে। আচ্ছা হামিদ ভাই, শুধু ছেলে হয়ে একটা ছেলেকে ভালবাসাটাই কি আমার অপরাধ? মনের উপর তো জবর দখল চলে না তাই না? তাহলে কেন শুধু আপনাকে ভালবাসার অপরাধে আমাকে বাবা-মা, ভাই-ভাবির আদর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হতে হলো? হামিদ ভাই, খুব শীত করছে। একটা স্যুয়েটারও আনি নাই। এত রাতে কোথায় যাবো কিচ্ছু…..” বলতে না বলতেই গাড়ির প্রচন্ড হর্নের শব্দ পেলাম, সেই সাথে মীরানের প্রচন্ড চিৎকার। শুনতে পেলাম আসে পাশের মানুষদের হইচইয়ের শব্দ। হাত থেকে পড়ে গেল আমার মোবাইলটা। বলতে পারলাম না “আমি তো আছি। আমার বাসায় চলে আসো।”

কথাটা শেষ করেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো হামিদ। রেজা সাহেব তখন পাথরের মত শক্ত হয়ে বসে আছেন। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা।
– রেজা ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি। জানি উত্তর দেবেন না। তাও করি। আচ্ছা, সমপ্রেমী কি আমরা সাধ করে হই? একটা বয়সের পর আমরা আবিষ্কার করি আমাদের আকর্ষণটা সমাজের আর দশজন পুরুষের মত মেয়েদের প্রতি না। এই উপলব্ধিটা যে আমাদের জন্য কী পরিমান কষ্টের, সেটা আপনি বুঝবেন না। কোনদিনও বুঝবেন না। এরপর শুরু হয় আমাদের আজীবন কষ্টের পথ চলা। কাউকে ভালো লাগলে সেটা বলতে পারিনা আপনাদের মত। বলতে যদি পারিও কখনো, ভালো লাগাটাকে ভালবাসায় রূপ দেয়া সম্ভব হয়না। আর যদি সৌভাগ্যক্রমে কারো সাথে ভালবাসা হয়েই যায়, সে ভালবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের চির পরিচিত পরিবার, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর সমাজ। সেই সাথে পাপবোধ তো আছেই। কোথাও পালিয়ে গিয়ে যে বাঁচবো সে উপায়ও নেই। আচ্ছা রেজা ভাই, মীরান যদি সমপ্রেমী না হয়ে একজন প্রতিবন্ধি হতো, অন্ধ হতো বা কালা হতো, পারতেন আপনারা ওকে দূর দূর করে পরিবার থেকে তাড়িয়ে দিতে? পারতেন না। সমাজের মানুষ যত কানাঘুষাই করুক না কেন, আপনারা পরিবারের লোকজন কিন্তু ঠিকই তার পাশে দাঁড়াতেন। যত কষ্টই হোক না কেন, ঠিকই আগলে রাখতেন নিজের ভাইকে। কিন্তু পারলেন না তার ভালবাসার স্বীকৃতি দিতে। পারলেন না নিজের একমাত্র ভাইয়ের এত বছর ধরে বয়ে আনা কষ্টের ভাগীদার হতে। বরং তাকে মেরে ফেললেন। কেড়ে নিলেন আমার ভালবাসার মানুষটাকে আমার কাছ থেকে। আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট কি জানেন?
– কি?
– মীরানকে একটা বারের জন্যও বলা হলো না “ভালবাসি”। ভেবেছিলাম তার ভালবাসার ডাকে সাড়া দেবো সাড়ম্বরে, দেশের বাইরে গিয়ে। কিন্তু আপনি, আপনারা তা আর হতে দিলেন না।
– আমার অপরাধের শাস্তি আসলে দুনিয়াতে পাওয়া সম্ভব নয় হামিদ ভাই। মৃত্যুর পরেই নাহয় স্রষ্টার আদালতে গিয়ে আমার অপরাধের যোগ্য শাস্তি পাবো আমি। আসি।
– স্রষ্টার আদালতের রায়ের অপেক্ষায় তো আমিও আছি। সেদিন তাকে বলবো, “যদি তোমাকে সত্যিই প্রভু বলে স্বীকার করে থাকি, যদি একদিনের জন্য হলেও মন থেকে তোমাকে ডেকে থাকি, তাহলে আমার ভালবাসা, আমার মীরানকে তুমি আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমাদেরকে যেমন তুমি সৃষ্টি করেছো, আমাদের মনের এই ভালোবাসাও তোমারই সৃষ্টি। দুনিয়াতে তোমার ভয়ে, সমাজের ভয়ে, পরিবারের ভয়ে আমরা এক হইনি। আজ আমাদের নিষ্পাপ ভালবাসার প্রতিদান তুমি দাও।” আমি অপেক্ষায় আছি রেজা ভাই, আমি অপেক্ষায় আছি।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.