অপ্রেমের গল্প

লেখকঃ বন্ধু বুনোফুল

হোটেল রুমের ধবধবে সাদা চাদরের উপর দুটি উলঙ্গ শরীর জানালা দিয়ে আসা শহরের আলোয় ভেসে যাচ্ছে।দুইজন ভিন্ন বয়েসের মানুষ।একজনের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।আরেকজন একুশ পেরিয়ে সবে বাইশে পড়লো।ত্রিশের কাছাকাছি ইব্রাহিম শুয়ে আছে উপুড় হয়ে।তার দুধ চায়ের মত গায়ের রঙে আলো পড়ে পিছলে যাচ্ছে।অসম্ভব রূপবান একজন মানুষ সে।শরীর ব্যায়াম করা না হলেও মোটামুটি ফিট বলা যায়।কোলের নীচে বালিশ রেখে মোবাইল টিপে যাচ্ছে একমনে।তার নিতম্ব আর পিঠের মাঝে যে অবতল জায়গাটা সেখানে মাথা দিয়ে আড়াআড়িভাবে শুয়ে আছে বাইশ বছরের জিতু। পা দুটো দেওয়ালে ঠেকান। আলতো করে নাচাচ্ছে ও। কি যেন ভাবছে। কফির মত গায়ের রঙে হালকা পাতলা একটা যুবক।মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল যেন সেখানে কোনদিন চিরুনি পড়েনি। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি।ঠিক রূপবান নয় কিন্তু একটা স্নিগ্ধতা আছে চেহারায়।হঠাৎ ইব্রাহিম হাসির দমকে কেঁপে উঠলো।
-কি ব্যাপার?হাস কেন?
-এই দেখ ফেসবুক সেলেব্রেটিদের কাণ্ড।দুইদিন আগেই দেখলাম এক পোলার লগে জান্টু সোনা বলে ছবি আপলোড দিতে।আবার আজকে দেখি নতুন একজন। এটাও জান্টু সোনা।
-তাতে তোমার সমস্যা কি? ওদের দিল অনেক বড়। অনেকে সেখানে এঁটে যায়। তোমার তো পুঁটি মাছের দিল। এইটুকুন।
-এইসব আলগা পিরিত ভালো লাগেনা মোটেই।এইসব প্রেমে আমার পোষায় না।
-কেমন চাও তবে?
-যাকে ভালোবাসব আমি তার বাসা হব,সে হবে আমার পাখি।সারাদিন সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াবে।কিন্তু রাত্রি এলে ঠিকই ফিরে আসবে আমার কাছে। ঠিক আমিও চাই সে আমার বাসা হোক।
-বুঝলাম না।
-অত বুঝে কাজ নেই। বড় হ বুঝবি।
-ওপেন রিলেশনের কথা বলছ? পলিগ্যামাস?
-হ্যাঁ। প্রেম জিনিসটা মনের বিষয়। শরীর হল অন্য বিষয়।
-কিন্তু যার সাথে প্রেম করবা সে মানবে?
-জানি মানবে না। তাইতো প্রেমও করা হয়না।
-তোমার কাওকে ভালো লাগেনা?
-লাগে তো।
-তাকে বলেছ?
-না। বললে একটা দায়িত্ব এসে যায়। ওটা পালন আমার দ্বারা হবেনা।তার উপর আমি বিবাহিত।এটাও বুঝতে হবে।
-আচ্ছা তুমি বিয়ে করলে কেন?
-বাবা-মা জোর করলো।বাড়ির বড় ছেলে।আর কোন উপায় ছিলোনা-এইসব শুনতে চাচ্ছিস তো?এইসব কিছুই না।বিয়ে আমি নিজে থেকেই করেছি।
-সেটা ভালো করেই জানি।তোমাকে চিনি বলেই জানি।তোমাকে জোর করে কেউ কিছু করাতে পারবেনা।কেন করলে?
-ভয়ে করেছি।
-ভয়ে? কিসের? রাতে একলা শুতে ভয় পেলে আমাকে বললেই পারতে।জিতুর কথা শুনে হেসে উঠল ইব্রাহিম।
-তখন তো তোর সাথে পরিচয় হয়নি।শোন বিয়ে করেছি আমি ভুলে যাওয়া থেকে বাঁচতে।
-ঠিক বুঝলাম না।
-বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমকামী সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কি?আজ পর্যন্ত কোন সম্পর্কই আমি চিরস্থায়ী দেখিনি।এখন শরীরের মধু আছে,যৌবন আছে।আশেপাশে মৌমাছি ঘুরঘুর করে।মধু ফুরালে কে থাকবে?একলা থাকতে বড্ড ভয় পাই।কেউ মনে রাখবে না।একটা বৌ থাকলে সেতো আর ছেঁড়ে যেতে পারবে না।চারপাশে বাচ্চা-কাচ্চা ঘুরঘুর করবে।আমারে দেবেনা ভুলিতে।হাহাহা।হাসির দমকে আবার কেঁপে উঠল ইব্রাহিম।
-একটা মেয়ের সাথে প্রতারণ হলোনা?
-না হলোনা।প্রতারণা যদি কারও সাথে হয়ে থাকে সে নিজের সাথে।দেখ আমি সমকামী।ঐসব সমপ্রেমী নই।শরীরের চাহিদা মেটানোর জন্য একটা পুরুষ দরকার।কিন্তু একজন নারীর সাথে বিয়ের সম্পর্ক তো আর শুধু শরীরের জন্য নয়।একটুখানি দায়িত্ববোধ,শ্রদ্ধা হচ্ছে সংসারের ভিত্তি।ভালোবাসা সেই সম্পর্কের নিয়ামক কিন্তু অপরিহার্য নয়।এইযে চারপাশে এত স্বামী-স্ত্রী দেখিস-সবার মধ্যেই কি প্রেম আছে বলতে চাস?সবাই প্রত্যেক রাতে শরীর টিপেটুপে রস বের করে বলতে চাস?কিন্তু তারপরেও তাদের সংসার টিকে আছে।
-তোমার কথাগুলো বড় অদ্ভুত।ঠিক রবি ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’র শেষ অধ্যায়ের মত।শুনলে মনে হয় ঠিক বলছ,সত্যি বলছ কিন্তু ঠিক মেনে নেওয়াও যায়না।
-না মানলে নেই।আমি যা বুঝি আমি তাই করব।কার কি এসে যায়?
-তুমি বড় একগুঁয়ে।
-আমার কথা বাদ দে।তুই কেন প্রেম করিস না?কাওকে পাস না?নাকি ভালো লাগেনা?
-ভালো লাগে তো একজনকে।কিন্তু তার হচ্ছে তোমার দোষ।প্রেমে পড়তে চায়না।
-বাহ!বাহ! বেশ তো।মালডা কেমন?ভালো হলে পরিচয় করিয়ে দিস।এক রাউন্ড নাহয় খেললাম।
-যাওতো খালি দুষ্টুমি।
-তাই না? আয় দেখাই দুষ্টুমি কাকে বলে।
এই বলে ইব্রাহিম একটু কাত হয়ে জিতুকে জড়িয়ে ধরল।জিতু কোন বাঁধা না দিয়ে নিজেকে সঁপে দিলো ইব্রাহিমের বাহুপাশে।চুমু আর শীৎকারের শব্দে ঘর ভরে উঠল।

সকালের রোদটা জানালার কাঁচ করে বিছানার কোলে এসে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।জিতু আড়মোড়া ভেঙ্গে ওপাশ ফিরে শুলো।
-ওঠ।ওঠ।এবার যেতে হবে না?বৌকে বলে এসেছি অফিসের কাজে বাইরে যাচ্ছি।ফিরতে হবে।
কিছু না বলে জিতু বিছানা ত্যাগ করে ঢলতে ঢলতে ওয়াস-রুমের দিকে চললো।বিছনার কিনারায় বসে জিতুর উলঙ্গ শরীরটা দেখছে।এই ছেলেটা তাকে তার আগের কথা মনে করিয়ে দেয়।যখন সেও ছিলো এর মতো।প্রেমের কাঙাল।বহু ঘাটের পানি খেয়ে ফেলেছে কিন্তু প্রেমের ঘাটে নৌকা বাধতে পারেনি।সবাই শরীর চেয়েছিল।পেয়ে চলে গেছে।তারপরে আস্তে আস্তে প্রেমে অরুচি ধরেছে।এখন অবশ্য একজনকে সে ভালোবাসে কিন্তু ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায় তেমনি সেও প্রেমের কথা মুখে আনতে ভয় পায়।কিন্তু তার কাছ থেকে দূরে থাকতে পারেনা।বৌকে ফাঁকি দিয়ে,সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মিলিত হয় কোন এক হোটেলে।শরীরে মিলন দিয়ে মনের কথা ঢেকে রাখার প্রচেষ্টা।খুব সফল হলো কি?
-এইতো হয়ে গেছে।চলো যাই।ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে কাপড় পরতে পরতে বললো জিতু।

কিছু না বলে ইব্রাহিম উঠে দাড়াল।জিতুর ঠোটে একটা আলতো পরশ দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো দুজনে।হোটেলের রিসিপশনে চেক আউট করে পা রাখল লবিতে।এখান থেকেই দুজনের আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা।
-চল আজ সকালে নাস্তাটা একসাথে সারি।ইব্রাহিমের প্রস্তাবে মনে মনে খুশি হলেও জিতু অবাক হল খুব।
-তোমার দেরি হয়ে যাবেনা?
-হলে হবে।একদিনই তো।
-চল তাহলে।

দুজনে মিলে গিয়ে উঠল এক রেস্টুরেন্টে।অর্ডার দিয়ে বসে আছে ।
-আবার কবে আসবে?জিতুর প্রশ্ন শুনে মোবাইল থেকে মুখ তুলল ইব্রাহিম।
-জানিনা।দেখি কবে আবার সময় হয়।
-গতবারেও একই কথা বলেছিলে……… মুখে একটা হাসির রেখা এঁকে বলল জিতু।
-কেন?এসেছি বলে কি খুব সমস্যা হয়েছে তোর?তাহলে আর আসব না।
-না না এসো।তুমি আসলে আমার খুব ভালো লাগে ।
-তোর ঐ ক্রাশ খাওয়া সাহেব রাগ করবে নাতো আবার?
-সে তো কিছু বোঝেই না।বুঝলে তো রাগ করবে।
আরও বোধয় কিছু বলতে চাইছিল জিতু।ওয়েটার চলে আসায় চুপ হয়ে গেল ও।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে দুজনে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত এলো।এখান থেকেই ইব্রাহিম বাসে উঠবে।
-পৌঁছে ফোন দিও কিন্তু।
-ন্যাকা ন্যাকা কাজ করতে ভালো লাগেনা।
-এটা ন্যাকা কাজ!!ঠিক আছে যাও ফোন দেওয়া লাগবে না।বলে ইব্রাহিমের থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল জিতু।
ইব্রাহিম ঠিকই বুঝলো জিতুর মন খারাপ হয়েছে কিন্তু ইচ্ছা করেই কিছু না বলে বাসের টিকিট কেটে বাসে উঠে বসল।জিতু দেখেও কিছু বললো না।শুধু বাস ছাড়ার পরেও চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো।তারপরে হাঁটা দিলো বাড়ির দিকে।বাসায় বলে এসেছিলো এসাইনমেন্টের কাজে রাত্রে এক ফ্রেন্ডের বাসায় থাকবে।

বাসের সিটে বসে ইব্রাহিম ভাবছে,এভাবে আর কত?জিতুকে ভালবাসে কিন্তু ভয় পায় বলতে।যদি কাছে আসার চেষ্টায় চিরতরে দূরে যেতে হয়?তার বিবাহিত জীবনে প্রত্যক্ষভাবে আরেকজনকে জড়িয়ে কি লাভ?গতরাতে যখন অন্য কাওকে ভালোবাসার কথা বলছিলো জিতু তখন ওর বুকের ভিতর কি যেন হয়ে যাচ্ছিল।হাসির আড়ালে সেই ঝড়টাকে ঢাকার চেষ্টা করেছিল ও।সফল হয়েছিল?

বাসায় ফিরে জিতু গোসল করতে বাথরুমে ঢুকল।গলার কাছে কি যেন আটকে আছে।কান্না আসি আসি করেও আসছে না।মনটা বিমর্ষো লাগছে ওর।ভালোবাসার মানুষ দূরে গেলে যেমন হয়।

(সমাপ্ত)

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১৪ই এপ্রিল, ২০১৫।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.