অবনী স্যার

লেখকঃ সবুজের নীলাকাশ

শুভকে জোরালো স্বরে ডাকতে ডাকতে শুভর শয়ন কক্ষের দিকে উঁকি মেরে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল তার বন্ধু শান। শুভ হাত পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। শানের কণ্ঠস্বর কর্ণপাত হাওয়ায় পিঠ ঘুরিয়েই শানকে দেখে শুভ আচানক বিস্মিত হয়ে বলল ….

– কিরে শান তুই হঠাৎ এই সময়?
= তোর কোন খরব নাই এজন্যই এলাম। চারদিন ধরে ভাইয়ের বিয়ে খাচ্ছিস তবু খাওয়া শেষ হয় না নাকি?
– হুম, আমার একমাত্র বড় ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা। আমি কব্জি ডুবিয়ে খাব নাতো কে খাবে।
= তা তো দেখতেই পাচ্ছি। যতই খা তবুও সেই বাঁশের কঞ্চির মতই থাকবি তুই।
– সেই ভাল, মোটা হয়ে কোন কাজ নেই আমার। বাদ দে এসব স্কুলের খবর বল।
= সেই খরব দিতেই তো এলাম রে। তিনদিন হল আমাদের স্কুলে নতুন একজন স্যার এসেছে।
– বলিস কি!
= হুম। নাম অবনি রায়, মারাত্মক রাগী।
– তাই নাকি? তাহলে তো দেখতেই হয়। শোন দোস্ত কাল স্কুল যাবার পথে আমাদের বাসায় আসিস একসঙ্গে যাব।
= আচ্ছা দোস্ত।

শুভ দশম শ্রেণীর ছাত্র। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিচার করলে দেখা যাবে, সে ভীষণ সদানন্দ স্বভাবের। এক কথায় যেখানে শুভ সেখানেই মহানন্দ। তেমন ডানপিটে নয় সে তবে বড়ই নাছোড়বান্দা। মনে যখন যা চেপে বসে তা পূর্ণ না করা অবধি তার চোখের ঘুম যেন দরিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে হারিয়ে যায়। শানের কাছে নতুন স্যারের কথা শুনে শুভর মনে একটু উদগ্রীব ভাব জেগে উঠেছে। স্যারকে না দেখা পর্যন্ত স্বস্তি নাই তার। স্কুলে ঢু মারতে পরদিন সকালে শানের সঙ্গে প্রায় ৫ দিন পর স্কুলের চৌকাঠে পা রাখল শুভ।

প্রথম পিরিয়ডের পর অবনি স্যারের ক্লাস। কিন্তু প্রথম পিরিয়ড শেষ হবার পরও অবনি স্যারের কোন পাত্তা নেই। নতুন স্যারের মুখো দর্শন করার অভিলাষ নিয়ে শুভ থুতনিতে হাত ভর দিয়ে মৌন হয়ে বসে আছে।
কিছুক্ষণ পর শ্বেত-রঙের ধুতি, পাঞ্জাবী বেশধারী এবং হাতে লম্বা লাঠি সহযোগে ক্লাসে একজন আগমন করলেন। নতুন মুখ দেখে দ্বিধাহীন ভাবেই শুভর বোধ হল, ইনিই অবনি স্যার।

বয়স প্রায় ৩০ ঊর্ধ্ব,
শ্যামবর্ণ, বেশ লম্বা আর বেজায় গম্ভীর ভাব। যেন মুখে ডিম গুজে রেখেছেন। ক্লাসে উপস্থিতির পর পরই অবনি স্যার পড়া আদায় করতে আরম্ভ করলেন। বললেন…
– কার কার পড়া হয়নি দাড়াও।

স্যারের আহ্বান শুনে অনেকেই চট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু শুভর পড়া না হওয়া সত্ত্বেও সে বেঞ্চে কোমর ঠেসে বসেই রইল। পড়া ধরতে ধরতে এক পর্যায়ে অবনি স্যার শুভর সম্মুখে এসে শুভর মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ করে বললেন,
– তোকে তো এই তিনদিন দেখি নি। তুই কি এই ক্লাসেরই ছাত্র?
= জি স্যার
– তো কই ছিলি এতদিন?
= ইয়ে মানে… আমার বড় ভাইয়ের বিয়ের জন্য আসিনি।
– হুম, পড়া হয়েছে তোর?
শুভ মাথা নেড়ে না সূচক ইঙ্গিত দিয়ে নিম্নমুখী হয়ে রইল।
– আমি যে বললাম যার যার পড়া হয়নি তাদের দাঁড়াইতে। তোর কানে যায় নি?
শুভ আর স্যারের কথার জবাব দিল না, মাথা নিচু স্ট্যাচুর মত দাড়িয়েই থাকল।
– আজ প্রথম এসেছিস বলে মাফ করে দিলাম। কালকে কোন মার্জনা হবে না, বস।

এদিকে অন্য যাদের পড়া হয়নি তাদের শায়েস্তা দেখে শুভর গলার জল শুকিয়ে চর হয়ে গেল। সে মনে মনে বাক জপতে লাগল, শান ঠিকই বলেছিল এতটা রাগী স্যার এই প্রথম দেখলাম।

এর পরের দিন, যথারীতি পড়া দিতে পারল না শুভ। আর শাস্তি হিসেবে অন্য সবার মত তাকেও খেতে হল অবনী স্যারের লম্বা লাঠির ঠাটানো কয়েকটা উত্তম মধ্যম। রাতের বেলা স্যারের লাঠির প্রহার করা ব্যথাযুক্ত বাহুতে আলতো ছুঁয়ে শুভ গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হল । ভাবনায় তার হরেক রকম দুষ্টু বুদ্ধির আগমন প্রস্থান চলছে। অনেক ভেবে চিন্তে অবনি স্যারকে নাকানি চুবানি করার জন্য অবশেষে একখানা সহজাত ফন্দির সন্ধান পায় সে এবং পরদিনের অবনি স্যারের পিরিয়ডের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে।

পরদিন,
অবনি স্যারের পিরিয়ড শুরুর আগে শুরু হয় শুভর দুষ্ট বুদ্ধির প্রয়োগ। সে একটা চক এনে ব্লাকবোর্ডে একটা বড় মাথা, পেট সম্বলিত অনেক বড় একটা ছবি এঁকে নিচে লিখে রাখে অবনি রায়।
ছবি আঁকতে দেখে অনেকেই শুভকে বারণ করল এটা না করার জন্য। কিন্তু শুভর একরোখা স্বভাব কারো নিষেধের ডগার ধারে ঘেঁষল না। কাজ শেষে ভাল ছাত্রের মত সে চুপচাপ গিয়ে নিজস্ব সিটে বসে পড়ল। সারা ক্লাসময় সবর হট্টগোল। ক্ষনিকবাদে, অবনি স্যারের বুট জুতার টক টক আওয়াজ শুনে ক্লাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সবাই জলদি করে স্ব স্ব সিটে বসার ফলে এক নিমিষেই ক্লাস জুড়ে সুনসান নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল।

অবনি স্যার হাতে লাঠি দুলাতে দুলাতে ঠাট নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলেন। ক্লাসে আসার পর পরই পাঠ অধ্যয়নে ছাত্রদের মনোযোগ দিতে বলে অনর্গল পাঠ বুঝিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তখনও তার তীক্ষ্ণ নজর বেখেয়ালের চাপায় পড়ে বোর্ডে দিকে পৌছায় নি। পাঠ বুঝানোর এক সময় যখন বোর্ডে লেখার প্রয়োজন পড়ল তখন পাশ ফিরে বোর্ডে দৃষ্টি পড়তেই চোখে মরিচ ছিটা পড়ার মত লাফিয়ে উঠলেন তিনি। ঠিক যেন জ্বলন্ত উনুনে রাখা কড়াইয়ের গরম তেলে পোড়ন দেয়ার মত। অবনি স্যার প্রচণ্ড ক্রোধ-ভাব নিয়ে মারবেলের মত বড় বড় চোখ করে ক্লাসে সবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওদিকে স্যারের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে শুভর বুকে যেন ভয় এসে আসন পেতে বসেছে, হৃদকম্পনও বেশ জোরে সোরেই উঠা নামা করছে। সমস্ত ক্লাসে নীরব আকাশের মত নীরবতা বিরাজমান। সবাইকে দেখতে দেখতে হঠাৎ করে অবনি স্যার চেঁচিয়ে উঠলেন।

– এটা কার কাজ?
স্যারের প্রশ্ন শুনে কেউই জবাব দেয়ার দুঃসাহস দেখাল না, মাথা নত করেই রইল।
– ভাল চাও তো বল, নইলে গণ পিটুনি শুরু করব।
স্যারের কথায় সবাই শুভর দিকে লক্ষ করে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। শুভও ভয়ার্ত চোখে এদিক এদিক চেয়ে বেঞ্চ থেকে উঠে নতজানু ভঙ্গিতে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। শুভকে দাঁড়ানো দেখে এক পা দুপা করে অবনি স্যার শুভর নিকটে গিয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন,
– কাজটা তুই করেছিস। তোর সাহস দেখে তো অবাক হচ্ছি আমি। এখন কথা বল দেখি। কান ধর, কান ধর। আর বল, এমন কাজ আর করবি না।

স্যারকে উত্তেজিত দেখে শুভ প্রমাদ গুনতে গুনতে কাঁপা কাঁপা হাতদুটো দুইকানের দিকে উত্তোলন করল।
– এবার বল, এমন কাজ আর করবি না।

শুভকে শাস্তি দেয়ার মধ্য দিয়ে অবনি স্যারের পিরিয়ডের সমাপ্তি ঘটল। স্যার কক্ষ ত্যাগ করার পর ক্লাসের সবাই যেন নিঃশ্বাসে প্রশান্তির বাতাস পেল। পরে হুমড়ি খেয়ে সবাই শুভর বেঞ্চের কাছে এসে তার কর্মের জন্য লম্বা ঝাড়ি মারতে লাগল। শুভ কাউকে কিছু বলল না। ওর কানকাটা স্বভাব স্যারকে আবার রাগানোর উদ্দেশ্যে নতুন ফন্দির প্যাচ আঁটতে লাগল।

রাতে অবনি স্যারের পড়া ঠিক ঠাক রপ্ত করে আগামীকাল কি হতে চলেছে তা ভাবতে ভাবতে ঘুমের কোলে গলে পড়ল শুভ। পরদিন প্রথম পিরিয়ডের পর শুভ নতুন প্লান অনুযায়ী অবনি স্যার আসার আগে ক্লাসের সবার অলক্ষ্যে স্যারের চেয়ারের কাছে গিয়ে কালি আর তেল মিশ্রিত একটি কাগজ চুপিচুপি চেয়ারের মাঝখানে ঘষে নিজ সিটে বসে পড়ে। একটু পর অবনি স্যার ক্লাসে উপস্থিত হয়ে তার তেজ-দীপ্ত শরীরের ওজন চেয়ারে স্থাপন করেন। তারপর বরাবরের মত পড়া আদায় ও পরের দিনের পর বুঝিয়ে দিয়ে কক্ষ ত্যাগের জন্য চেয়ার থেকে উঠে এগুতে থাকেন। তখন পরিধান করা তার সাদা ধুতির পশ্চাৎ দিকে বৃহৎ কালো টিপ দেখে সবাই অট্টহাসি দিয়ে ওঠে।

হাসির শব্দ শুনে অবনি স্যার থমকে দাড়িয়ে সবার দিকে কড়া নজরে তাকাতেই সবাই নিশ্চুপ হয়ে যায়। তবুও তার ধুতির পাঁচায় কালি লাগার ব্যাপারটা অগোচরেই থেকে যায়। এদিকে শুভর মনে যেন আনন্দের ফুলঝুরি ঝুলছে তার কাজটা এবার ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে এই কারণে।

এভাবেই তাইরে নাইরে দুষ্টামি ছোঁয়া দিনগুলো পেরিয়ে স্কুল জীবনের অন্তিম টানল শুভ। দেখতে দেখতে পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের দিন শুভর কপালে জুটল শনির দশা। তার অন্যান্য বন্ধুরা যখন ভাল ফল নিয়ে উল্লাসিত হয়ে স্কুল থেকে বের হল
তখন শুভর দুচোখে টলমল জল সেই সাথে মনে ব্যাপক শঙ্কিত ভাব। বাড়িতে গেলেই বাবার হাতের বেত্রাঘাত একটাও মাটিতে পড়বে না। শুভ স্কুলের সীমানা পরিত্যাগ করে ভয়ে বাড়ির পানে আর পা বাড়াল না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার কোলে সূর্য ঢলে পড়ায় চারিদিক তিমির ভাব হতে লাগল। এদিকে শুভর বাড়ির সবার কাছে ওর অকৃতকার্যের সংবাদ পৌঁছে গেছে। শুভর বাবা ছেলের ফেল করার খবর শুনে ক্ষোভে চিৎকারে আকাশ পাতাল এক করতে লাগল। ওদিকে শুভ নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামের এক মেঠো পথের ধারে লেজ গুটিয়ে বসে অঝোরে অশ্রু-নিপাত করছে আর মনে মনে স্বীয় কৃতকর্মের জন্য নিজেকে বারবার ধিক্কার জানাচ্ছে।

চতুর্দিকে চোখ-বোজা কালো অন্ধকার, সবুজ ধানক্ষেতের ডাগায় ব্যস্ত জোনাকিরা অবিরাম জ্বলা নেভার খেলায় মত্ত। হঠাৎ করে সাইকেলের কিড়িং কিড়িং শব্দ পেয়ে শুভ মাথা তুলে দেখে কেউ একজন সাইকেলে করে তার দিকেই আসছে। শুভ চেয়ে থাকতে থাকতেই সাইকেল চালক তার সম্মুখে হাজির।

– একি শুভ তুই এখনো বাড়ি যাস নি?
= না স্যার, বাড়িতে গেলে বাবা আমাকে খুব মারবে।
– এতদিন খুব মজায় ছিলি এই তার ফল আজ পেলি। লেখাপড়ায় অধ্যবসায় থাকতে হয়। যেটা তোর মাঝে কখনোই দেখিনি আমি। এখন কেঁদে কি হবে। সময় গেলে সাধন হয় না শুভ।
অবনি স্যারের কাঁটা জড়ানো কথাগুলো শ্রবণ করার পর শুভ ডাক ছেঁড়ে কেঁদে উঠল।
– এই ছেলে এভাবে কাঁদছিস কেন, আমি কথা গুলো তোর ভালোর জন্য বললাম। অনেক রাত হয়েছে বাড়ি চল। চোখ মুছে সাইকেলের পিছনে ওঠ।

স্যার বলা মাত্রই শুভ সাইকেলের পেছনে সিটে বসে পড়ল। শুভর মনজুড়ে ভয়ের ঘনঘটা। অবনি স্যার শুভকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সাইকেল থামালেন। তারপর শুভকে নামতে বলে ঘরের তালা খুলে শুভকে ভেতরে আসতে বললেন। শুভ ঘরে প্রথম পদক্ষেপ ফেলেই ঘরের চারপাশ দেখতে লাগল। ঘরে তেমন কিছুই নেই। একটি চৌকি, চেয়ার টেবিল, টেবিলের উপর একটি ট্রাংক, আলনা আর দেয়ালে ঝুলানো ফ্রেমে বাঁধা অবনি স্যারের একটা সাদাকালো ছবি। শুভকে বসতে বলে অবনি স্যার থালায় করে ভাত নিয়ে এসে বললেন…
– দুপুর থেকে নিশ্চয়ই কিছু খাস নি। মুখটা শুকনো লাগছে, একটু খেয়ে নে দেখি।
শুভ চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে।
– কি হল নে, আমি হিন্দু বলে কি খাওয়া যাবে না?
= ছিঃ ছিঃ এভাবে বলছেন কেন স্যার। আসলে আমি বাড়ির কথা ভাবছি।
– এত ভয় পাচ্ছিস কেন? খেয়ে নে আমি তোকে তোর বাড়িতে নিয়ে যাব।

অবনি স্যারের দেয়া আশ্বাসে শুভর মন থেকে বিরূপ ভাবটা ধীরে ধীরে ম্লান হতে লাগল। খাওয়া শেষে শুভকে নিয়ে ওদের বাড়ির উদ্দেশ্য রওয়া দিলেন অবনি স্যার। বাড়ির উঠানে পা স্থির করতেই শুভর সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। পরে স্যারের পিছন পিছন সেও ঘরে ঢুকল। স্যার একটা কাশি দিয়ে শুভর বাবার ঘরের সামনে দাঁড়ালেন। কাশির আওয়াজ শুনে শুভর বাবা বললেন,
– কে?
= জি আমি অবনি রায়। শুভর স্কুলের টিচার।
= ও অবনি বাবু আসুন আসুন।

অবনি স্যার শুভর হাত টেনে তার সাথে শুভকেও ঘরে ঢোকালেন। শুভকে দেখে শুভর বাবা স্যারের সামনেই মুখে যা আসে তাই গুলির মত ছুঁড়তে লাগলেন। শুভর বাবার রূঢ় আচরণ দেখে অবনি স্যার তার মাথা ঠাণ্ডা করতে বলে বিভিন্নভাবে শুভর বিষয়ে শুভর বাবাকে বোঝাতে লাগলেন। সবশেষে শুভকে পড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওদের বাড়ি থেকে বিদায় নিলেন। অবনি স্যারের জন্য আজ কঠিন শাস্তি থেকে বেঁচে গেল শুভ। অথচ এই শুভই একটা সময় দুষ্ট কৌশলে স্যারকে কতবার হেনস্থা করেছিল।

এক সপ্তাহ পর,
সন্ধ্যায় বইখাতা নিয়ে শুভ অবনি স্যারের বাড়ি যাবার পথে দেখা হল তার এক বন্ধুর সাথে।
– কি রে শুভ কই যাস?
= অবনি স্যারের কাছে পড়তে যাই।
– অবনি স্যারের কাছে! ভাই ধোলাই খাওয়ার জন্য যাচ্ছিস তো যা। ওনার যে রাগ দেখলেই ভয় লাগে।

শুভ ওর বন্ধুর কথায় কান না দিয়ে পুনরায় হনহন করে যেতে লাগল। শুরু হল জীবন গড়ে তোলার জন্য শুভ নতুন অধ্যবসায়। অবনি স্যার শুভকে সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বুঝিয়ে দিতেন আর শুভ মনোযোগ সহকারে তা নিজের আয়ত্তে নেয়ার চেষ্টা করত। পড়ার সময় প্রায়ই শুভ স্যারকে একটা প্রশ্ন করত।
– স্যার আপনার আপন কেউ নাই?
= আছে । আমার একটা পরিবার আছে সেই পরিবারে অনেক সদস্য, সেখানে সবাই আমার মত ।
– কোথায় থাকে আপনার পরিবার?
= অনেক দূরে।

শুভ অবনি স্যারের এ কথার মানে বুঝত না আর কখনো বুঝার চেষ্টাও করত না। সময়ের হাত ধরে শুভর মনে বন্ধুর আসনে প্রতিষ্ঠিত হল অবনি স্যার । অবনি স্যারও তার সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না সবকিছু ভাগাভাগি করত ছাত্রবন্ধু শুভর সাথে। যখন দুর্গাপূজা চলে আসত তখন দিনভর শুভকে নিয়ে মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়াতেন। বিজয়ার দিনও শুভকে নিয়ে ছুটতেন প্রতিমা বিসর্জন দেখতে। শুভও বেশ মজা পেত স্যারের সাথে ঘুরতে।

এরপর যখন ঈদ আসত অবনি স্যার ঈদের কয়েকদিন আগে শুভকে বাজারে নিয়ে গিয়ে জোর করে শার্ট প্যান্ট ইত্যাদি কিনে দিতেন। আর ঈদের দিন যখন ঈদগাহে নামাজ আদায়ের পর শুভ বাড়ির দিকে ফিরত তখন অবনি স্যার শুভর অপেক্ষায় থাকত। শুভ কাছে আসতেই তার হাতে ঈদই গুঁজে দিত। শুভও পুলকিত হয়ে তা গ্রহণ করত।

এভাবেই পার হয়ে গেল ১ বছর।
শুভর পরীক্ষাও চলে এলো দোর গোঁড়ায়। পরিপূর্ণ প্রস্তুতির সুবাদে খুব ভালভাবে পরীক্ষাও শেষ হল এবং ফল হিসেবে সে পেল স্টার মার্কস। শুভর রেজাল্ট শুনে তার পরিবারের সবার মতই অবনি স্যারের মুখেও যেন ফুল চন্দন পড়ল। শুভও নিজের সাফল্যে বাঁধভাঙা আনন্দে উদ্বেলিত।

কিছুদিন পর বাড়ীর সবার আশা এবং ইচ্ছার খোরাক মেটাতে সবার থেকে বিদায় নিয়ে শুভকে উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি দিতে হল। ঢাকায় ভাল কলেজে ভর্তি হওয়ার তিন চার মাস পর পর সে বাসায় আসত। বাসায় এসেই এক ছুটে চলে যেত অবনি স্যারের কাছে। স্যারের সঙ্গে দেখা হওয়ার সাথে দুজনেই এত দিনের জমে থাকা না বলা কথাগুলো আদান প্রদানে ব্যস্ত হয়ে যেত।

১০ বছর পর,
ঢাকায় অনেক বড় এক ইন্ডাস্ট্রির মালিক শুভ এবং তার বড় ভাই শামস। দুই ছেলের হাতে ব্যবসার সব দায়িত্ব তুলে দিয়ে তাদের বাবা এখন অবসরে ঠাঁই নিয়েছেন। ঢাকায় একটা বড় ফ্লাটে তাদের সপরিবারের নিবাস এখন। শুভকে ব্যবসার কাজে প্রায় দু তিন মাসের মত বাইরে ব্যস্ত থাকতে হয়। গতকাল কক্সবাজার থেকে আসার পর ড্রয়ারে রাখা ব্যবসার বিভিন্ন কাগজ পত্র খুঁটে খুঁটে দেখছে শুভ। হঠাৎ কাগজগুলোর মাঝে একটা খাম শুভর দৃষ্টিগোচর হল। কৌতূহলী হয়ে খামটার পিঠ উল্টাতেই অবনি স্যারের নামটা দেখে বিস্ময়ে চমকে ওঠে সে। তারপর দ্রুত খামটা ছিঁড়ে নজর-নিবেশ করে চিরকুটটা পড়তে শুরু করল।

*শুভ চিঠিটা পাওয়া মাত্র তুমি গ্রামে চলে এসো,অবনি স্যার তোমাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে গেছে।

তোমার কেরানি কাকা

চিঠির পড়া শেষে তারিখে চোখ বুলাতেই আরো বেশি আঁতকে ওঠে শুভ। দুই মাস আগে এসেছিল চিঠিটা। শুভ আর সময়ক্ষেপণ না করে গাড়ি নিয়ে তাড়াতাড়ি ছোটে গ্রামে। গ্রামে পৌঁছেই দৌড়ে স্কুলে কেরানি কাকার রুমে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে জিজ্ঞেস করে …
– ও কেরানি কাকা অবনি স্যার কোথায়?
= কে বাবা?
– কাকা আমি শুভ। অবনি স্যারের শুভ।
= ও শুভ বাবা। তুমি এত দেরী করলে কেন? তোমাকে কতবার চিঠি লিখেছিলাম কিন্তু তোমার কোন সাড়া পাই নি।
– আমি ব্যবসার কাজে বাইরে ছিলাম। আগে বলেন অবনি স্যার কোথায়?
= কি আর বলব তোমায়। অবনি আর আমাদের মাঝে নেই। এক মাস হল সে ইহকাল ত্যাগ করেছে।

বলেই কেরানি কাকা কান্নায় ভেঙে পড়ল। প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুর কথা শুনে শুভর সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে গেল। পাহাড় সমান ওজন তার বুকে আঁচড়ে পড়ে নির্বাক করে দিল তাকে।

শুভকে বাক-শূন্য দেখে কেরানি কাকা বলল, শুভ আমার সাথে এসো অবনি তোমার জন্য একটা জিনিস রেখে গেছেন।
– কোথায় যাব?
= অবনির বাড়িতে।
কেরানি কাকা শুভকে অবনি স্যারের বাড়ি নিয়ে গিয়ে স্যারের ট্রাংক থেকে একটা বাক্স বের করে তার হাতে দিল। শুভ বাক্সটা হাতে নিয়ে খুলার সঙ্গে সঙ্গে অবাক হল। সেখানে কিছু টাকা আর টাকার উপর একটা চিঠি পেল সে। শুভ বক্সটা রেখে চিঠিটা মেলে পড়তে শুরু করল,

আমার ছাত্রবন্ধু শুভ,
তোমাদের ব্যস্ত নগরীর ইট-কাঠ গ্রামের এই অবনি স্যারকে ভুলিয়ে দিয়েছে আমি জানি। তোমাকে চিঠি পাঠানোর পর যখন তোমার কোন দেখা পেলাম না তখন তোমাকে দেখার আশাগুলো বুক-চাঁপা দিয়েই রাখতে হল। আমার যাওয়ার সময় যেন দিন দিন ঘনিয়ে আসছে ওপারের ডাক নিয়ে। কিন্তু তোমাকে একটা কথা না জানালে যে ওপারে গিয়েও আমার আত্মা শান্তি পাবেনা।

তোমাকে চিঠি পাঠানোর পর অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রতিদিন পোষ্ট অফিসে গিয়ে তোমার চিঠির খোঁজ করতাম। দুর্ভাগ্য আমার ভারাক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই শূন্য হাতে ফিরে আসতাম। আবার বাসায় এসে ভাবতাম চিঠি না পাঠিয়ে হয়তো তুমি নিজেই আসবে। কিন্তু তোমার অপেক্ষায় পথে চেয়ে দিন দিন আমার শরীরটা খারাপ হাতে লাগল। তাই আমার সবকথাগুলো চিঠিতে লিখে রাখলাম।

তুমি মাঝে মাঝে আমাকে প্রশ্ন করতে আমার আপন কেউ আছে কিনা? প্রতিত্তরে আমি বলতাম আমার আপন অনেক মানুষ আছে। সত্যি কথা বলতে আমার আপন বলতে কেউই নেই। আমি একজন অনাথ,এতিম। চট্টগ্রামের এক এতিমখানায় বড় হয়েছি। সেখান থেকে লেখাপড়া শেষ করার পর তোমাদের গ্রামের স্কুলে আমার চাকরি হয়। চাকরি পাওয়ার পর বেতনের যে টাকাটা পেতাম তার একটা অংশ ঐ এতিমখানায় দিয়ে আসতাম।

কয়েক মাস থেকে বুকের ব্যথাটা বেড়ে যাওয়ার কারণে টাকাগুলো আর দিয়ে আসতে পারিনি। তাই টাকাগুলো জমিয়ে রেখেছি তোমাকে দিয়ে পাঠাবো বলে। কিন্তু তোমার দেখা বুঝি আর পাব না। যদি কখনো চিঠিটা পড় তাহলে আমার শ্রমদ্বারা উপার্জিত টাকাগুলো আমার প্রিয় এতিমখানা, আমার আপন ঠিকানায় পৌঁছে দিও।

যদি তোমার অবনি স্যারকে সত্যি ভালবাস তাহলে তোমার প্রতি আমার শেষ আবদার থাকবে, তুমি ঐ এতিমখানায় তোমার পরিশ্রম করা আয়ের একটা অংশ প্রতিমাসে দিয়ে আসবে। এতে আমার আত্মা পরম শান্তি পাবে। তোমার প্রতি আমার ভালবাসা,দোয়া সবসময় থাকবে শুভ। কারণ তুমি যে আমার আত্মারই অংশ। তুমি খুব সুখী হও ভাল থেকো।

ইতি
তোমার অবনি স্যার।

চিঠিটা শেষ হওয়ার পর তা বুকে আষ্টে নিয়ে অবনি স্যারের সেই সাদাকালো ছবিটার দিকে আবেগ ভরা, অশ্রু-ভেজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শুভ। অবনি স্যারের মায়াময় শান্ত চোখগুলোও যেন চেয়ে আছে তার ঘরটার দিকে, চেয়ে আছে তার সম্মুখে দাঁড়ানো প্রিয় ছাত্রের দিকে।

( গল্পটি সেসময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা)
******* সমাপ্ত ********

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.