আমি, সে ও অন্তরালের চিঠি

লেখকঃ তারাশঙ্কর

প্রিয় রাজন,

অনেকদিন পর তোমায় লিখছি। তোমার গত চিঠির জবাব দিতে কিছু দেরি করে ফেললাম। ইচ্ছের অভাব যে নয় তা তুমি জান। আসলে ইদানিং নিজেকে এত বেশিরকম কাজে জড়িয়ে ফেলেছি যে এখন আর নিজের দিকে তাকাবার অবসরটুকুও হয়ে উঠছে না। আজ সকাল বেলা উঠেই তাই প্রতিজ্ঞা করেছি, চিঠিটা লিখতেই হবে। কেবল তোমার প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য নয়, বহুদিনের বন্ধ মনের ঘরে কিছু তাজা বাতাসের প্রয়োজন অনুভব করি আজকাল। সাততাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে তাই আজ তোমায় লিখতে বসা।

কোথা থেকে শুরু করব তাই ভাবছি অনেকক্ষণ ধরে! তুমি তো আমাকে আমাদের এই যুদ্ধের শুরু থেকেই চেনো। আজ থেকে ৮ বছর আগে যে লড়াই শুরু করেছিলাম, সেখানে তুমি সেই প্রথম দিকের সাথী, সহযোদ্ধা, বন্ধু। তখন অনেকেই অনেকবার জানতে চেয়েছে, একজন বিষমকামী হয়েও সমকামী অধিকার নিয়ে আমার আগ্রহের জায়গাটা কোথায়! সত্যিটা বলতে কেন জানি বাঁধত। মনে হত, উত্তরটা না হয় একান্ত ব্যক্তিগত হয়েই থাক। কিন্তু ইদানিং মন কেমন করে, কাউকে সব কথা বলে হালকা হতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, যার জন্য আজ আমাদের এত বড় অর্জন, তার কথা সবাই মিলে ভুলে গেলে বড় অন্যায় হবে। এমন সময় তুমি আবার সেই প্রশ্ন করলে এতদিন পর, আর আমিও সুযোগ পেয়ে গেলাম।

এই গল্পের শুরু আজ থেকে ১২ বছর আগে। তখন আমি ভার্সিটির থার্ড ইয়ার এ। মফস্বল থেকে আসা আমি তখনো পুরো শহুরে হয়ে উঠতে পারি নি। আর জানই তো, ছোট শহরগুলোর বেশিরভাগ পরিবারই কিছুটা রক্ষণশীল। আমার স্কুল, কলেজ এমনকি কোচিং এও মেয়েদের আলাদা ব্যাচ ছিল। তাদের সম্পর্কে তাই লজ্জা যেমন ছিল, আগ্রহও ছিল তেমন। ভেবেছিলাম ভার্সিটি এসে সে সমস্যার সমাধান হবে, চুটিয়ে প্রেম করার ভীষন শখ ছিল আমার! কিন্তু ততদিন পর্যন্ত প্রেম দেখা দেয় নি, আসলে তখন পর্যন্ত মেয়েদের সাথে ভাল করে কথা বলাটাই রপ্ত করে উঠতে পারি নি, সংকোচটাও রয়ে গিয়েছিল। তো, একদিন রাত ৯ টার দিকে আমার এক বন্ধুকে ফোন দেয়া জরুরী হয়ে পড়ল, এদিকে মোবাইলে ব্যালেন্স নেই। দৌড়ে হলের গেটের পাশের দোকানে গেলাম, একবারে বেশ কিছু টাকা রিচার্জ করতে বলে রুমে আসলাম। কিন্তু টাকা আর আসে না! বিরক্ত হয়ে আবার দোকানে গেলাম, ফ্লেক্সি-মামার সাথে কিছুক্ষণ রাগারাগি করার পর দেখা গেল আমারই দোষ, তাড়াহুড়ায় নাম্বার ভুল করেছি!

এত্তগুলান টাকা, তাও নিজের টিউশনি করে চলা জীবন, এমনি এমনি ছেড়ে দিতে মন চাইল না। ‘যদি ফেরত পাই’ এই আশা নিয়ে ফোন দিলাম সেই নাম্বারে। মার্জিত একটা নারীকন্ঠে জবাব পেলাম, হ্যালো! আমার সমস্যা খুলে বললাম। উনি চুপ করে পুরোটা শুনে বললেন, চিন্তা করবেন না, এখন বেশ রাত হয়েছে, কাল সকালেই পেয়ে যাবেন। আমি ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রেখে দিলাম।

পরদিন সকাল বেলা ঘুম ভাঙল মেসেজ টোন শুনে। চোখ অর্ধেক খুলে দেখলাম, রিচার্জ মেসেজ, পুরো টাকাটাই এসেছে। সাথে সাথেই সেই নাম্বার থেকে ফোন-
-টাকা পেয়েছেন?
হ্যাঁ, থ্যাংক্স এ লট!
-ওয়েলকাম! এমন ভুল কেউ করে?
আসলে একটু তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলাম তো, তাই খেয়াল করি নি।
-কি করেন আপনি?
ডিইউ তে, এপ্লাইড ক্যামিস্ট্রি!
-হলেই থাকেন?
জ্বি।
-আচ্ছা, আমি যদি আপনাকে মাঝে মাঝে ফোন দেই, বিরক্ত হবেন?
(কিছুটা থতমত খেয়ে) নাহ, বিরক্ত কেন হব!
-আচ্ছা, আমি পরে ফোন দেব, কেমন! এখন রাখছি, বাই!

আমি খুব অবাক হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। আমার সাথে কোন মেয়ে কথা বলতে চাইতে পারে নিজের আগ্রহে, এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। একটু পর মনে হল, আমি তার সম্পর্কে কিছুই জানি না। নিজের উপর একটু রাগ হল কিছু জিজ্ঞেস করি নি কেন এই ভেবে।

সেদিন আর কোন ফোন এল না, পরের দুদিনেও না! কেমন জানি একটা অভিমান হতে লাগল! সেই তো ফাঁকিই দিলে, তাহলে কেন মিছেমিছে সেদিন অমন আগ্রহ দেখানো! ঠিক করলাম এরপর ফোন দিলেও ধরব না। সেই রাতেই আমার মোবাইলের স্ক্রিনে ‘সে’ নামে সেভ করা নাম্বারটা তার উপস্থিতি জানান দিতে লাগলো। ধরব না ধরব না করেও শেষ পর্যন্ত কলটা ধরলাম।

সেদিন অনেক কথা হল, অনেকক্ষণ। জানতে পারলাম ওর নাম শুভেচ্ছা, এবার ইন্টার পরীক্ষা দেবে, চিটাগাং থাকে। এত সহজভাবে যে কোন মেয়ের সাথে আমি কথা বলতে পারব ভাবি নি, অবশ্যই ওর কৃতিত্ব। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার যেটা ছিল, সে আমার আসল রূপটা ধরতে পেরেছে, আমি যেমন খুব চঞ্চল আর দুষ্টু, সেও তেমনি, বুদ্ধিমতী আর প্রখর রসবোধসম্পন্ন। এমন মানুষের সাথে কথা বলেও আরাম! আমাদের নিয়মিত কথা হত। সব বিষয়ই আসত আমাদের কথায়- দু’জনের পরিবার, বন্ধু, চারপাশের মানুষ, সিনেমা, খেলা, রাজনীতি, আমার ক্যাম্পাস পলিটিক্স- সব। কথা বলতাম কারণ কথা বলতে ভাল লাগত তাই, অন্য কিছু সে সময় মাথায় আসে নি। বন্ধুরা অবশ্য ততদিনে ওর কথা জেনে গেছে, নানারকম রসাল কথা বলতেও ছাড়ত না! আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম।

একরাতে ওকে বেশ বিষণ্ণ মনে হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, এড়িয়ে গেল। একটু পর বলল, একটা গান শুনবেন? অবাক হয়ে বললাম, তুমি গাইতে পার? ‘পারি মানে! আমি এখানকার রেডিওর রেগুলার সিঙ্গার, জানেন!’ অদ্ভুত একটা অভিমান হল। এতদিন ধরে কথা বলে আমি এটা জানলাম না! ‘একটু রাখছি, পরে ফোন দিচ্ছি’ বলে রেখে দিলাম। রেখে দিয়ে নিজের উপর নিজেই রেগে গেলাম। আজব! আমি এমন করছি কেন? ওর সব কিছু কেন আমাকে জানতে হবে! নিজেকে সতর্ক করলাম, সরি বলার জন্য ফোন দিলাম আবার। ফোন ধরেই সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?
-আরে নাহ, রাগ করব কেন? কি যে বল!
তাহলে ওভাবে রেখে দিলেন যে?
-উম, আসলে..সরি!
রাখেন তো! রাগ আপনি করতেই পারেন। আমি তো জানতামই আপনি গান অনেক পছন্দ করেন, আরো আগেই শোনানো উচিৎ ছিল আমার।
-নাহ, ঠিক আছে, হয়ত লজ্জা করে বলনি।
আপনার কাছে আমার আবার লজ্জা কিসের?
-তাই নাকি? কোন লজ্জা নেই? (আমি দুষ্টুমির স্বরে বলি)
এবার সে বেশ লজ্জা পেল মনে হয়। কী ব্যাপার! সেই দুরন্ত মেয়ে আজ লজ্জাবতী লতা! একটু চুপ করে থেকে অস্ফুটে বলল, আমাকে চিনতে আপনাকে এখনো সাত সাগর পাড়ি দিতে হবে।


নাহ, সাত সাগর পাড়ি দিতে হয় নি। সেই মুহূর্তেই অনেক কিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু কিছু বললাম না। সেই রাত ছিল আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় রাত। আনন্দিত বিস্ময়ে সেদিন অন্য এক শুভেচ্ছাকে আবিষ্কার করলাম। সারারাত, আক্ষরিক অর্থেই সারারাত সে আমাকে একের পর এক গান শুনিয়েছে। আমি এতই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে ওর যে পরের দিকে কষ্ট হচ্ছিল তা খেয়ালই করি নি। পরদিন ওর গলা বসে গেল। কপট অভিমান নিয়ে সে বলল, শাস্তি দিয়ে মন শান্ত হয়েছে? যদিও মনে হচ্ছিল না সেই শাস্তিতে তার বিন্দুমাত্র আপত্তি আছে!

আমি ওর মাঝে ডুবে যেতে থাকলাম। যে প্রেম ছিল আমার আজীবনের স্বপ্ন, তা যেন নিজ থেকে এসে আমাকে ধরা দিল। আমার জগৎ শুধু ওকে নিয়েই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। কিছুই তলিয়ে দেখি নি, সম্ভব-অসম্ভবের ভাবনা ভাবিনি, কেবল ঝলমলে স্বপ্নের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সামনে ছুটে চলা, আশার রঙ্ধনু নৌকায় পাল তুলে ভেসে যাওয়া। আমরা কেউ কাউকে কোনোদিন ভালবাসার কথা বলি নি। বলার প্রয়োজন আছে তাও কখনো মনে হয়নি। অনন্ত কালের দহনে পুড়ে যে প্রেম খাঁটি হয়েছে, তার ঝলক আপনিই বোঝা যায়; মনের বাগানে যে ফুল ফোটে, তার সৌরভ এমনিতেই ছড়িয়ে পড়ে, মুখে না বললেই বা কি যায় আসে তাতে!

আমি তখন পর্যন্ত ওর সাথে দেখা করতে চাইনি, এমনকি ওর ছবিও দেখিনি। এবার ওকে দেখার তীব্র ইচ্ছে জেগে উঠল। সেকথা ওকে বলতেই ও যেন কেমন মিইয়ে গেল। এটা-সেটা বলে কাটানোর চেষ্টা, আমি খুব কষ্ট পেলাম। সেদিন আর কথা হল না। এরপর আরো কয়েকদিন সেই একই অবস্থা। একদিন ভীষণ ক্ষেপে গেলাম, আমি এমনিতে খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ কিন্তু রেগে গেলে হুঁশ থাকে না, প্রচন্ড রাগারাগি করলাম ওর সাথে। ও কোন কথা বলে নি, চুপ করে সব হজম করেছে, আর শুধু কেঁদেছে। এক সময় আমার উন্মত্ততা খুব বেশি বেড়ে গেলে ও ফোন কেটে দিল। আবার কল দিলাম, ফোন বন্ধ। মাথা কিছুটা ঠান্ডা হলে খুব খারাপ লাগতে লাগলো, ছি! এসব আমি ওকে কি বলেছি! সারারাত ট্রাই করলাম ওর নাম্বারে, এখনো বন্ধ। আমার কাছে ওর বাসা বা কোন বন্ধুর নাম্বারও নেই। ছটফট করে কাটল সারা রাত। সকাল বেলা একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসল। ‘হ্যালো, রায়হান ভাইয়া, আমি শায়লা, শুভেচ্ছার ফ্রেন্ড।’ ওর গলায় কিছু একটা ছিল, আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম, শুভেচ্ছা ভাল আছে তো? ডুকরে কেঁদে উঠে শায়লার জবাব, ভাইয়া শুভেচ্ছা আর নাই, ভাইয়া, ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, ও আর নাই…..

আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। কি বলে এই মেয়ে, শুভেচ্ছা নাই মানে… ধুরর….এটা কোন কথা হল নাকি, ও কই যাবে….আমাকে ছেড়ে শুভেচ্ছা কই যাবে…আগেও তো কত বকছি, কাল না হয় একটু বেশিই বলে ফেলছি….নাহ, এটা সত্যি না…আচ্ছা আমি ঠিক শুনলাম তো?…নাকি স্বপ্ন দেখতেছি, জেগে উঠলেই সব মিথ্যা হয়ে যাবে….হঠাৎ মনে হল আমার গায়ে কোন শক্তি নাই, আমি যেন ভেসে বেড়াচ্ছি…ধুপ করে মেঝেতে পড়ে গেলাম, মাথায় আর হাঁটুতে ব্যথা লাগতেই বুঝতে পারলাম, এসবই সত্যি….আমার বুক ফেটে শুধু একটা চিৎকার বের হয়ে এল….

যখন চোখ মেললাম তখন আমি হসপিটাল এ। পাশেই আমার সবচে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আশিক বসে আছে। আমার জ্ঞান ফিরতে দেখেই ও সবাইকে বাইরে থেকে ডেকে নিয়ে এল। মা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, আমি তার বুকে মাথা রেখে আমার সমস্ত জমানো দু:খ চোখের পানিতে মুছে ফেলার চেষ্টা করতে থাকলাম। একটু সুস্থ হলে আশিক জানাল, ওরা এর বেশি কিছু আর জানতে পারেনি, শায়লার নাম্বারটাও তারপর থেকে বন্ধ। একবুক প্রশ্ন আর ভয়াবহ রকমের অপরাধবোধ নিয়ে আমি আমার নিয়তিকে মেনে নিলাম।

তুমি হয়ত ভাবছ, এক গল্প করতে যেয়ে আমি অন্য গল্প ফেঁদে বসেছি। এ পর্যন্ত শুনে তা মনে হতেই পারে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, আসল গল্প শুরু এর পরেই, আর তোমার উত্তরও!

প্রায় ২ বছর পর একদিন, তখন আমি পাশ করে বের হয়ে সবে একটা কাজে জয়েন করেছি, এক মেয়ে আমার সাথে দেখা করতে অফিসে এল। গেস্ট রুমে গিয়ে দাঁড়াতেই সে বলল, ভাইয়া আমি শায়লা। আমি কোন কথা বলতে পারলাম না, যেন ভয়ংকর শীতের রাতে হঠাৎই জানলা খুলে গিয়ে আসা ভীষণ ঠান্ডা বাতাস আমার হাড় পর্যন্ত জমিয়ে দিয়েছে! শায়লা বলতে লাগলো, আমি সময় নেব না, আপনাকে একটা জিনিস দেবার ছিল, তাই এসেছি…আর পরে কোন যোগাযোগ না করার জন্য আমি সরি, কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না…ব্যাগ থেকে একটা চামড়ার মোটা ডায়েরি বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা শুভেচ্ছার ডায়েরি, আপনাকে দিতে বলে গিয়েছে। আমি হাত বাড়িয়ে ওটা নিলাম, শায়লা আর কিছু না বলে বের হয়ে গেল।

বাসায় ফিরেই ডাইরি খুলে বসলাম, আর জানা হল এক অদ্ভুত আর আমার কাছে অচিন্তনীয় এক ভালবাসার গল্প! সেই গল্প এক ভালবাসার কাঙাল তরুণের গল্প, আচরণ আর কন্ঠস্বর কিছুটা মেয়েলী হওয়ায় পদে পদে অপমানিত হবার গল্প, প্রায় বন্ধুহীন এক জীবনের গল্প। ভাগ্যের ফেরে আমার সাথে তার পরিচয় ঘটেছিল, যে প্রেমের জন্য আমরা দুজনেই উতলা ছিলাম তা আমাদের দুজনের জীবনেই এসেছিল অথচ কি নির্মম অসহ্য যন্ত্রণাময় সে ভালবাসা! আমার মতই সে ভেসে গিয়েছিল ভালবাসার ভেলায়, এমন এক মুহূর্ত তার জীবনেও এসেছিল যে সময়ে সমস্ত হিসেব-নিকেশ তুচ্ছ হয়ে যায়, আত্মবিনাশী সেই ক্ষণে অচেতন হবার পর যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন আর পিছু ফিরবার রাস্তা ছিল না, কারণ ততক্ষণে প্রেমের দাবি নিয়ে আমিও হাজির হয়ে গেছি। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমি কেঁপে উঠলাম, কি অসহ্য মানসিক গ্লানি আর যন্ত্রণা নিয়ে সেই দিনগুলো সে কাটিয়েছে! শুভ নামের সেই ১৭ বছরের সদ্য তরুণ আমার কন্ঠস্বরে মুগ্ধ হয়েই আর কিছু কথা বলতে চেয়েছিল, সেই চাওয়া তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেছে খাদের কিনারে। অভিনয় করা ছাড়া তার আর উপায় ছিল না। নিয়ত ভালবাসার মানুষের সাথে মিথ্যে বলার অপরাধবোধ আর হারানোর আশঙ্কা সেই সদ্য তরুণের মনে কি গভীর হতাশার বুদবুদ তৈরি করতে পারে তা তো তোমার অজানা নয়! তাই পৃথিবী থেকে তার এই প্রস্থান সে আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল, আমার সেদিনের সেই চাপ আর আচরণ শুধু ট্রিগারের কাজ করেছে। মনে পড়ে এখনো তার সেই শেষ লাইন, ‘আমি হয়ত নরকেই যাব, পুরুষ হয়ে আরেক পুরুষের প্রেমে পড়ার শাস্তি নাকি তাই, জানি তুমি স্বর্গ পাবে, বিধান মানার পুরস্কার, আমি তাতে খুশিই অনেক…শুধু দু:খ এতটুকুই, এ জীবনে না পেলেও পরজন্মে তোমাকে পাব সেই আশাটুকুও আমার নেই! তবুও বলব, মুখ ফুটে যা কোনদিন বলতে পারি নি…ভালবাসি!’

না, এই ডাইরি পড়ার পরে তার প্রতি আমার প্রেম আসে নি আর! এমন ভালবাসাকে শুধু শ্রদ্ধাই করা যায়। কিন্তু আমি ভুলতে পারি নি শুভকে, আমার শুভেচ্ছাকে। এর পরের কিছু বছর আমার কেটেছে এই বিষয়গুলো জানতে, এরকম আরও শত মানুষের সাথে মিশতে। শুভ তার জীবনকে সম্পূর্ণ করে যেতে পারে নি, কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর কোন শুভকে ভালবাসার জন্য আমি হারিয়ে যেতে দেব না। নিজের অনিচ্ছায় যে জীবনে স্রষ্টা তাদের পাঠিয়েছেন, সেই জীবনাচরণ যেন তাদের বন্ধুহীন না করে। গন্তব্য এখনো অনেক দূরের পথ, কিন্তু দেখ, এখন আর ভালবেসে কেউ ভয় পায় না অন্তত! ইশ, আমি যদি আর কিছু আগে বুঝতাম!

চিঠিটা কিছু বড় হয়ে গেল। তবে আশা করি তোমার উত্তর পেয়ে গেছ। আমি সেই দিনের স্বপ্ন দেখি রাজন, যেদিন তুমি আর তোমার নীল এদেশেই তোমাদের সুখের ঘর সাজাতে পারবে। শুভ আমার সেই পথ চলার প্রেরণা, তোমরা শুধু পাশে থেক।

ভাল থেকো, সবাই মিলে, ভালবাসায় থেকো!

তোমার
রায়হান ভাই

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৩ই আগস্ট, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.