আরেকটি ইনভেলপ

লেখকঃ এক্সট্রিম নয়েজ

ছোটবেলায় আমার দাদিকে বলতে শুনেছি, “যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ।”
তখন নিতান্তই ছোট ছিলাম এই কথার অর্থ বোঝার জন্য। তাই এ নিয়ে কতই না তর্ক করেছি দাদীর সাথে। এ ছাড়া দাদীর সাথে অন্য কোন মুহূর্তের কথা আমার তেমন মনে পড়ে না। স্মৃতির পাতায় দাদীর চেহারাটাও আবছা। তবুও মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে আমার কয়েক হাত দূরে বারান্দার গ্রিল ধরে অন্ধকারে দাড়িয়ে আমাকে দেখছে দাদী। আর বলছে, “কইছিলাম না। যায় দিন ভাল আর আসে দিন খারাপ। তখন তো আমার কথা শুনো নাই। এখন বুঝো মজা..”
জানি এসব আমার কল্পনা মাত্র। ওখানে আড়ালে কেউ নেই। বিমর্ষ অবস্থায় মানুষের কাছে অনেক অসত্যকেও সত্য মনে হয়। তবে এটা সত্য যে আমার আজকের এই মুহূর্তটা গত দিন গুলোর চেয়ে খারাপ। অনেক খারাপ। আর যদি গত বছরটার কথা চিন্তা করি তাহলে সেটা ছিল স্বর্গ, আর এখন আমি কোন এক কাল-কুঠুরিতে ভারী হয়ে আসা নিঃশ্বাসের যোগ বিয়োগ করছি।

সিমুর সেই আত্মত্যাগী চিঠির পর থেকে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। একটা সময় সকলের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগল। সিমুর কাছে, মা-বাবার কাছে। সায়মনের কাছেও। কয়েকটা দিন নিজেকে নিজের মনের কয়েদখানায় বন্দী করেই রেখেছিলাম।

আমরা মানবজাতিরা আসলেই খুব স্বার্থপর। একটুখানি উষ্ণতা পেলেই আমরা চৈত্রের ফাটল জমিন, বর্ষার সর্বগ্রাস আর হাড় কাঁপানো শীতের কথা ভুলে যাই। যেমন করে আমার বলিষ্ঠ বুকে সায়মনের কনিষ্ঠ মাথাটা রাখতেই সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম আরেকবার। স্মৃতিতে ব্যাকডেটেড হয়ে গেল সিমুর ত্যাগ। আর আমি সায়মনকে নিয়ে চললাম অপার্থিব সুখের সঙ্গোপনে।

বড় হিংসুটে ছেলে সায়মন। অফিসের রিসিপশনে বসা চিনি চাইনিজ মেয়েটা আমাকে হাসিমুখে “গুড-মর্নিং” কেন বলল! কফি দিতে এসে সুনীল কেন আমার ঘাড়ের সামনে দাড়িয়ে থাকে! সেদিন লাঞ্চ টাইমে অফিসের ফোনে কার সাথে এত হেসে হেসে কথা বলছিলাম!… সারাদিন অফিসে বসে সে এই সব কিছু নোট করবে, আর রাতে বাসায় এসে আমার কাছে কৈফিয়ত চাইবে। ওর ছেলেমানুষি আচরণে আমি কখনো ক্ষুব্ধ হই না। বরং মিট মিট করে হাসি আর মাঝে মাঝে ওকে আরো ক্ষেপীয়ে দেওয়ার জন্য মিছেমিছি ওর বিরুদ্ধে তর্ক করি। রেগে-মেগে ওর মুখটা একেবারে পাকা টমেটোর মত হয়ে যায়।

এগুলো আমাদের নিত্যদিনের কার্যকলাপ। দুজনেই জানি আমরা একে অপরের প্রতি কতটা বিশ্বাসী। তার পরেও এসব করা শুধুমাত্র দুজনের কিছুটা গোপন আনন্দ লাভের ছুতো মাত্র। কোন একটা বইতে যেন পড়েছিলাম। এই ধরনের খুনসুটি ভালবাসাকে পরিপক্বতা দেয়।

সায়মনের আরো একটা ব্যাপার যা আমাকে প্রতিদিন অসংখ্যবার নতুন করে ওর প্রেমে পড়তে বাধ্য করে তা হল ওর দ্বৈত চরিত্র। ঘরের ভেতর ও যতটা শিশুসুলভ আচরণ করে, বাহিরে তার পুরোপুরি উল্টো। বোঝার উপায় নেই এই সায়মনই ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে আমার সাথে অভিমান করে ঘরে। তখন মনেই হয় না এই ছেলের বয়স পঁচিশউর্ধ। অফিসে ওর আচরণ আমার সাথে শুধুমাত্র একজন সহকর্মী ছাড়া আর কিছুই জাহির করে না। নিতান্তই অফিসিয়াল প্রয়োজন ছাড়া একবারও আমার সামনে আসবেনা। আসলেও মিঃ ফাহিম ছাড়া কথা বলবে না। সারাদিন শুধু দেখবে আমি কি করি, কার সাথে কিভাবে কথা বলি। তারপর রাতে এসবের জন্য আমার টুটি চেপে ধরবে হাহাহা… বড়ই আজব ক্যারেক্টার।

এসব করেও যদি শান্ত হত তাহলেও ছিল। রাতে বিছানায় গিয়ে শুরু হবে তার ছেলেমানুষির দ্বিতীয় পর্ব। ফুল স্পীডে এসি চালু করে দিয়ে কম্বল ছাড়াই বিছানার একপাশে আমার দিকে পিঠ করে শুবে। আমিও কম্বল জড়িয়ে চুপচাপ অপরদিকে মুখ করে শুয়ে পড়ি। কুঁকড়ে মুকরে শীতে কনকন করে সায়মন। তবুও কম্বল গায়ে নেয় না। আমি কিছু না বলে চুপ করে শুয়ে থাকি। কিছুক্ষণ পড়ে সে একা একাই বলে, “মানুষ কত্ত পাষণ্ড। শীতে জমে যাচ্ছি আমি, আর সে আরাম করে ঘুমাচ্ছে।” আমি জবাব দেই না। কম্বল মুখে গুজে হাসি।

নিতান্তই ছেলেমানুষি ব্যাপার। তবুও এসব করতেই ভাল লাগে। কে জানে, হয়ত পাশের মানুষটি অতি প্রিয় হলে শিশুসুলভ হয়ে যাওয়া মানুষের একটা প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি।

কিছু সময় পরে মোড়াতে মোড়াতে সে নিজেই এসে কম্বলের নিচে ঢুকে। আমার শরীরের সাথে যাতে ছোঁয়া না লাগে ততটুকু দূরত্ব বজায় রাখে। বুঝতে পারি তার রাগ এখন সপ্তম বিষাণে। তবুও নাছোড়বান্দা আমি অসাড় হয়ে থাকি।

মিনিট দশেক গেলেই সায়মনের ধৈর্যের বাধ ভাঙে। হঠাৎ করেই কম্বল টেনে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমাকে টান দিয়ে সোজা করে আমার বুকের উপর উঠে বসে আমার গলা টিপে ধরে বলে, “তোমার সমস্যাটা কি বল তো!”

এমন পরিস্থিতিতে আমার ভূমিকা হচ্ছে কিছু না বলে দাঁত বের করে হাসা। এতে বিরক্ত হয়ে সায়মন “ধ্যাত” বলে বিছানা থেকে নেমে কিচেনে কফি বানাতে যায়। রাতের বেলায় কফি খাওয়া এক পর্যায়ে আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে গিয়ে শুধু নিজের জন্যেই কফি বানাবে। আমার জন্য না। আমি তখন পেছন থেকে গিয়ে ওর পাতলা কোমরে হাত দিয়ে ঘাড়ে ঠোঁট বুলিয়ে বলি, “আমার জন্য বানাবে না?”

-কোন দুঃখে! পারলে নিজেরটা নিজেই বানিয়ে খাও। আমার এত ঠেকা পড়ে নাই।
বলেই সে কফির কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে। আমি তখন নিজেই নিজের কফি বানাই আর ভাবি, “লাইফ ইজ সো বিউটিফুল।” ভাবতেই মনের ভেতর খুব তৃপ্তি অনুভব করি। সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করাও কঠিন।

আমাদের বারান্দাটা উত্তর-পূর্ব কোন মুখী। বারান্দার সামনেই একটা বড় ট্রেম্পেট গাছ। আকাশে চাঁদ না থাকলে গাছটার ডালপালা আর অন্ধকারে ছেয়ে থাকে বারান্দাটা। আর চাঁদনী রাতে চাঁদের আলোর সাথে ট্রেম্পেটের ছায়া মিলে একটা অপূর্ব মোহনীয় পরিবেশের জন্ম দেয়। সেই আলোয় সায়মনের মাথা কোলে নিয়ে পার করেছি অসংখ্য খুনসুটিময় রাত।

ছুটির দিনে আমি খুব বিশ্রাম প্রিয় হয়ে উঠি। কিন্তু সায়মন তার উল্টো। ছুটির দিনে তার প্রধান কাজ গোটা সিঙ্গাপুর চষে বেড়ানো। আর আলস্য সত্ত্বেও আমাকে তার সঙ্গী হতে হয়। ওর অসংখ্য পাগলামির একটা হল, বেড়াতে গিয়ে আশেপাশের লোকজনকে ফাকি দিয়ে সে চুমু খাবেই। ইউনিভার্সাল স্টুডিওস, জুরঙ বার্ড পার্ক, আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড, এমনকি এশিয়ান সিভিলাইজেশন মিউজিয়ামের গার্ডকেও ফাকি দিয়ে আমাকে দুটো চুমু খেতে সে মিস করেনি। ওর কথা হচ্ছে, “এখানে তো আমরা আজীবন থাকব না। কতজনেই তো কত রকমের স্মৃতি নিয়ে যায়। আমরা একটু ভিন্ন করলে সমস্যা কি! অন্তত আজীবন বলতে পারবে, এমন সব জায়গায় দাড়িয়ে আমরা চুমু খেয়েছি।” পাগল একটা। ওর এমন অদ্ভুত কথাবার্তা শুনতে শুনতে আমারও একসময় ভয় কমে গিয়েছিল।

আমাদের কোম্পানিতে সেবার রিক্রুটমেন্ট চলছিল। যেহেতু সিঙ্গাপুরে নানান জাতির বসবাস, তাই ভিন্ন ভিন্ন দেশীয় অসংখ্য বায়োডাটা আসছিল। প্রাইমারী সিলেকশন থেকে ২৫ জন কে চূড়ান্ত ইন্টার্ভিউর জন্য ডাকা হয়েছিল। সেখান থেকে ১০ জনকে বেছে নিয়ে চাকরি দেয়া হবে। আর এই দশ জনকে নির্বাচন করার দায়িত্ব ছিল ৪ জন সিনিয়র ম্যানেজারের কাঁধে। তাদের মধ্যে আমিও একজন। শেষের দিকে আমারা কনফিউশনে ভুগছিলাম দুজনকে নিয়ে। সর্বশেষ একটি পদের জন্য দুজন প্রার্থী সব দিক থেকেই সমান যোগ্যতার অধিকারী। কিন্তু যে কোন একজনকে তো বাদ দিতেই হবে। এদের একজন মালয়েশিয়ান, আরেকজন কলকাতার একটি মেয়ে। পরবর্তীতে আমার রিকমান্ডেশনেই কলকাতার মেয়েটিকে নিয়ে নেয়া হল। বাঙালী হিসেবে বাংলা ভাষার খাতিরেই হয়ত আমরা কলকাতার মানুষদের প্রতি কিছুটা আগ্রহী। সেই দিক থেকেই তমালিকা নামক সেই মেয়েটিকে আমার নির্বাচন করা।

তমালিকার জন্য চাকরিটা হয়ত খুব বেশী জরুরী ছিল। তাই তার প্রতি আমার এই অনুগ্রহকে সে আমার মহানুভবতা হিসেবেই নিলো। চাকরিতে জয়েন করার প্রথম দিন থেকেই সে বিভিন্ন ভাবে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাগল। কিন্তু এদিকে টের পেলাম সায়মন তমালিকাকে তেমন একটা পছন্দ করছে না। আগের মত সে তমালিকাকে নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করেনা ঠিক, তবে ওর ভেতর কেমন একটা উদাসীন মনোভাব আমি উপলব্ধি করতে পারি। বুঝতে পারছিলাম এটাকে ও খুব সিরিয়াসলিই নিচ্ছে। কিছুদিন যাওয়ার পর আমি একদিন সায়মনকে অনেক করে বুঝিয়ে বললাম যে, “তমালিকার সাথে আমার কোন ধরনের খাতির নেই। আমি ওর লাইন ম্যানেজার। এর বাহিরে ওর সাথে আমার কোন ধরনের কোন লেনদেন নেই। তবে ওর চাকরিটা আমার কারণে হয়েছে বলেই হয়ত ও আমার প্রতি খুব কৃতজ্ঞতা দেখায়। তবে সেটা ক্ষণিকের। কিছুদিন গেলেই দেখবে ঠিক হয়ে গেছে।”

আমার এই কথা গুলো সায়মনকে খুব বেশী সন্তুষ্ট করতে পেরেছে বলে মনে হল না। উত্তরে সে শুধু একটু মৃদু হেসে আমার গাল টিপে দিয়ে বলল, “আজ থেকে ওর সাথে একটু কম কম কথা বলবে। ওই মেয়ের চালচলন আমার ভাল মনে হয় না।”

কয়েকদিনের মধ্যেই সায়মন আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। কিন্তু তারপরেও ওর মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন আমি লক্ষ করেছিলাম। বেশীরভাগ সময়ই ও কেমন যেন চিন্তিত থাকত। কিন্তু কেন তা কখনই জানতে পারলাম না। ওর খাতিরে আমি তমালিকাকে কড়া করে বলে দিয়েছিলাম যে সে যেন অকারণে আমার কাছে না আসে কখনো। তবুও সায়মন কেন উদাস হয়ে থাকে তা বুঝতাম না। জিজ্ঞেস করলে হাসি মুখে বলে, “আরে না কিছু না, এমনি মাথাটা ধরছে।” তার এই মাথা ব্যথার রহস্য বুঝতে পারতাম না। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও যেত না। আমি বুঝতে পারতাম সে আমার কাছে কিছু একটা লুকচ্ছে। কিন্তু কি সেই কঠিন কিছু যা সায়মন আমার কাছেও গোপন করে!

প্রায় মাস খানেক পর। তমালিকার জন্মদিনে সে অফিসের সবাইকে দাওয়াত করল। চক্ষুলজ্জার খাতিরেই সবাইকে যেতে হল। আমার সাথে সায়মনও গেল। স্থানীয় একটা ক্লাবে প্রোগ্রাম ছিল। অফিসের কলিগদের বাহিরেও তমালিকার অনেক বন্ধুবান্ধব উপস্থিত ছিল। অনেক আগ্রহ নিয়ে তমালিকা আমাকে ওর বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল। ফর্মালিটি রক্ষার খাতিরে আমাকেও হাসিমুখে সবার সাথে পরিচিত হতে হচ্ছিল। কিন্তু ভেতরে ভিতরে খুব সংকোচে ছিলাম। জানিনা সায়মন এটাকে কিভাবে নিচ্ছে।

কেক কাটার পরে এক পর্যায়ে সেখানে ড্রিঙ্কসের ব্যবস্থাও ছিল। সাথে ডিজে পার্টি। আমি আর সায়মন খুবই সংযত হয়ে ছিলাম। কারণ এর আগেও কয়েক বার পার্টিতে ড্রিঙ্কস করে এক অপরকে জড়িয়ে ধরে লজ্জায় পড়েছিলাম। তবে সেগুলো অপরিচিত স্থান ছিল বলে সমস্যা ছিল না। আর এখানে তো সবাই পরিচিত। তাই খুবই হালকা মাত্রায় ড্রিঙ্কস করে দুজনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টায় ছিলাম। এদিকে সবাই ইচ্ছে মত নাচানাচি করছে। আমি আর সায়মন একটু দূরে চুপচাপ বসে আছি। তমালিকাও ওর বন্ধুদের সাথে নাচছিল। হঠাৎ সে এসে আমাকে আর সায়মনকে টেনে নিয়ে গেল। দুজনেই তখন সেখানে সৌজন্যতা রক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু এক পর্যায়ে তমালিকা অনেকটা অন্তরঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল আমার সাথে। বুঝতে পারছিলাম সে বেশী ড্রিঙ্ক করে ফেলেছে। আমি যতটা সম্ভব তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু সায়মন সেটাকে স্বাভাবিক ভাবে নেয়নি।

সেই রাতে বাসায় ফেরার পথে ট্যাক্সিতে সায়মন আমার সাথে একটি শব্দও করেনি। আমিও ওকে কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। বাসায় এসেই শুরু হল তুলকালাম কাণ্ড। সায়মন ধরেই নিয়েছে তমালিকার প্রতি আমি দুর্বল। কোন ভাবেই আমি ওকে বুঝাতে পারছিলাম না যে তার ধারনা ভুল। সে তার জেদ থেকে সরছেই না। তখন পর্যন্ত কখনোই আমি সায়মনের এই রূপ দেখিনি। এমন সামান্য একটা ব্যাপারে সায়মন এমন একটা ইস্যু দাড় করাতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না কখনো।

আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলাম সায়মনের ভুল ভাঙ্গাতে। তার ভুল তো ভাঙলই না, বরং আমাকে অবাক করে দিয়ে সায়মন হঠাৎ বলে ফেলল, “আমি আর তোমার সাথে থাকবনা। আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।” নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ সময় লাগল বুঝে উঠতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মনে হল আমি পৃথিবীতে একা। আমার কেউ নেই। আমি নিঃস্ব।

সেই রাতে অনেক চেষ্টা করলাম সায়মনকে শান্ত করতে। এক পর্যায়ে ওর পায়েও পড়লাম। কিন্তু সায়মন পাথরের মূর্তির মত ঠায় বসে রইল। একটি উত্তরও করলনা। একবার কিচেনের ছুরিতে আমার হাতের আঙুলটা সামান্য কেটে গিয়েছিল। তখন সায়মন কেঁদে কেঁদে ঘর মাথায় তুলে নিয়েছিল। আর আজ আমার চোখের জলে ওর হাঁটু ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু সায়মনের তাতে কোন ভাবান্তরই হচ্ছেনা। এমন কেন হয়ে গেল সায়মন!

সেই রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাত। ভোর হবার আগেই সায়মন বাসা থেকে চলে গেল। আমি নিথর হয়ে ওর বিদায় দৃশ্য দেখলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। সে অফিসে আসাও বন্ধ করে দিল। পরবর্তীতে ভাবলাম রাগ কমলে হয়ত চলে আসবে। কিন্তু সে আসেনি। কয়েকদিন পর আমি ওকে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম। সব গুলো হোটেল, পরিচিত জনদের বাসায় কোথাও ওর খোজ পেলাম না। এক পর্যায়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই হাসপাতাল গুলোতে খোজ নিলাম। কিন্তু সেখানেও ওর কোন খোজ নেই। কয়েক দিন পর সকালে অফিসে গিয়ে হাতে পেলাম সায়মনের রিজাইন লেটার। বাই পোষ্ট এসেছিল। খামটার ভেতর খুঁজতে লাগলাম, হয়ত আমার জন্য কোন মেসেজ থাকতে পারে। কিন্তু না। ব্যক্তিগত কারণে চাকরি ছেড়ে দেয়ার বাহিরে একটি কথাও লিখেনি সায়মন।

জ্ঞানীদের কথা, “মানুষ যাকে যত বেশী ভালবাসে, ঘৃণার বেলায়ও তাকে ঠিক ততবেশীই ঘৃণা করে।”
ওই অবস্থা থেকেই আমি সায়মনকে খুব খুব বেশী ঘৃণা করতে লাগলাম। সে আমাকে চলে যেতে চাইলে আমাকে আমার অপরাধ বলে যেতে পারত। কিন্তু তা না করে সে অকারণে আমাকে ছেড়ে গেছে। এর জন্য আমি ওকে কখনোই ক্ষমা করবোনা।

সায়মন চলে যাওয়ার পরে আমি খুব বেশী একাকীত্ব অনুভব করছিলাম। বার বার মনে হচ্ছিল, আমি কেন বেচে আছি এখনো। মনে হতে লাগল, এসব আমার পাপের সাজা। সিমুর প্রতি আমি যে অন্যায় করেছি, সেই সাজাই এখন আমাকে ভোগ করতে হচ্ছে।

কিছুদিন পরেই আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ফিরে এলাম বাংলাদেশে। সেই ঘর, সেই পরিবেশ, সেই মানুষজন। কিন্তু এর মাঝেও নিজেকে কেমন যেন অপরিচিত মনে হচ্ছিল। সিমু আমাকে হাসি মুখে গ্রহণ করল। যেন সে ভুলে গেছে অতীতের কথা। আমি ওকে সায়মনের কথা বললাম। মনে হচ্ছিল সেও এমন কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। বা-হাতে চোখ মুছে বলল, “যা হবার হয়ে গেছে। এসব নিয়ে আর চিন্তা করো না। তুমি ফিরে এসেছ এতেই আমি খুশি। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।” মা-বাবা আর সিমুর সহযোগে এক সময় আমিও আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম। এটাও হয়ত আমার স্বার্থপরতারই আরেক নিদর্শন।

কেটে গেল আরো কয়েক মাস। মন থেকে সায়মনকে মুছে ফেলতে চাইলেও মাঝে মাঝে সেই রাতে সায়মনের নিষ্ঠুরতার কথা মনে পড়ে। তখন আমার চোখে পানি আসে না, মায়া হয় না। বরং ক্রোধ জেগে উঠে। মনে মনে প্রার্থনা করতাম, আমাকে যেন আর কোনদিন সায়মনের মুখ না দেখতে হয়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা হয়ত আমার সাথে বার বার রসিকতা করতেই পছন্দ করেন।

আজ মায়ের রেগুলার চেক আপের জন্য হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। বিকেলে ফিরতেই বাড়ির কাজের মেয়েটি একটা ইনভভেলপ দিল। কুরিয়ারে এসেছে আমার নামে। সায়মনের চিঠি। থর থর করে কাঁপছিল শরীর। এত কিছুর পরে যখন আমি আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি, এখন কেন সায়মন আবার তার অস্তিত্বের জানান দিল।

ইনভেলপটার কথা সিমুকে জানতে দিলাম না। রাতে সিমু ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি নীরবে ইনভেলপটা নিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। ভেতর থেকে সায়মনের সেই মিষ্টি হাতের লেখা চিঠিটা বের করে এক নিঃশ্বাসে পড়লাম। আর তারপর মন হতে লাগল পৃথিবীটা অনেক গতিতে ঘুরছে। অতীত আবার ফিরে আসছে। সেই অনুভূতি, সেই কষ্ট, সেই বেদনা… ঠিক তেমনটা যেমনটা হয়েছিল সিঙ্গাপুরে সিমুর চিঠিটা পাওয়ার পর।

আর এখন গভীর রাত, পুরো পৃথিবী সুখনিদ্রায় মগ্ন। আর আমি বারান্দায় এক হাতে সায়মনের পাঠানো সেই ব্রাউন ইনভেলপ আর আরেক হাতে একটি দুঃস্বপ্নের মায়া ভরা চিঠি নিয়ে বসে আছি। দুচোখের পানি অজানা প্রশ্নোত্তর হয়ে ঝরছে। আরো একবার আজ আমি দিশেহারা। চিঠিটার দিকে যতবারই তাকাচ্ছি, মন শুধু একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে, এটাই কি ছিল নিয়তি?

ফাহিম,
জানি আমার এই চিঠি পাওয়ার জন্য তুমি মোটেই প্রস্তুত ছিলে না। আমিও চাইনি কোনদিন এভাবে তোমার সামনে আসতে। কিন্তু কি করব বলো, নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলাম না। কিছু সত্য যা হয়ত তোমাকে আরো আগেই বলা উচিত ছিল, নাহয় কখনোই না। কিন্তু এখন আর এটাকে চেপে রেখে আমি মোটেও শান্তি পাচ্ছিনা। না পারছি ভুলে যেতে, না পারছি এড়িয়ে যেতে। আমি তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। এই অন্যায় অবশ্যই শাস্তি যোগ্য। কিন্তু আমি কেন এসব করেছি, তা তোমাকে জানানো ছাড়া আমি আর একটা মুহূর্তও থাকতে পারছিনা।

ফাহিম, আমি জানতাম তুমি খুব চাপা স্বভাবের। তাই বলে তুমি যে নিজেকে এতটাও চেপে রাখতে পারো তা আমার জানা ছিলনা। যেদিন তুমি নেই নিউ কামার দের ইন্টার্ভিউতে ছিলে সেদিন মোবাইলের চার্জার খুঁজতে আমি তোমার ডেস্কে গিয়েছিলাম। ড্রয়ার খুলে খুঁজে পেলাম একটা ইনভেলপ। তোমার কাছে এসেছিল গত বছর। কিন্তু আমাকে তুমি জানাওনি। কৌতূহলের বশে খুলে দেখলাম তোমার স্ত্রীর চিঠি। সেই অবস্থায় পড়া সম্ভব ছিলনা। তাই আমি চিঠিটার একটা ফটোকপি করে নিয়ে নিলাম। পরে যখন চিঠিটা পড়ে তোমার স্ত্রী আর পরিবার অবস্থার কথা জানলাম, তখন নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমার জন্যই এসব কিছু হয়েছে। আমি এখানে তোমাকে নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছি। আর ওই দিকে একটা নিষ্পাপ মেয়ে নিজের ভালবাসার বলি চড়িয়ে হাহাকার করে মরছে। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। আমি অন্যায় করেছি। আমি কখনো ভাবিনি এমনটা হবে। নাহলে সেই শুরুতে যখন জেনেছিলাম তুমি বিবাহিত, তখনি তোমার প্রতি দুর্বল হতাম না। আমি তখন নিজের ভালবাসাকেই প্রধান ভেবেছিলাম। অনেক বড় অন্যায় করেছি আমি।

তমালিকাকে আমি শুধু উসিলা হিসেবেই ব্যবহার করেছি। আমি ভাল করেই জানতাম ওর প্রতি তোমার কোন আকর্ষণ নেই। আমার উদ্দেশ্য ছিল তোমার থেকে দূরে চলে যাওয়া। হয়ত এর জন্য আমি ভিন্ন রাস্তাও ব্যবহার করতে পারতাম। কিন্তু তখন আমার মাথায় আর কিছুই আসছিল না। আমি জানতাম আমি চলে গেলে তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে। এই জন্যই এসব করা। আমি কারো ভালবাসাকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেকে খুশি করতে চাইনি।

যখন শুনেছি তুমি সত্যিই ফিরে এসেছ। নিজেকে মানিয়ে নিয়েছ পরিবারের সাথে, বিশ্বাস করো আমি কতটা খুশি হয়েছি বলে বুঝাতে পারব না। মনে হচ্ছে আজ আমার ভালবাসা সত্যি সত্যি পূর্ণতা পেয়েছে। আমি কিছু করতে পেরেছি তোমার সুখের জন্য। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।

আর কিছু বলবনা ফাহিম। অনেক ভাল থেকো। আর আমাকে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো…

ইতি,
তোমার আদুরে বান্দর…

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ২৬ই ডিসেম্বর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.