একজন মেঘবালকের গল্প

লেখকঃ শাহরিয়ার সুমন


‘হ্যালো আঙ্কেল, তুমি কি আমার আব্বুকে দেখেছ?’
আমি কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। একটি রাজপুত্রের মত দেবশিশু আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সাত আট বছরের একটি বাচ্চা, কিন্তু বয়সের তুলনায় অনেক গম্ভির। উজ্জ্বল বড় বড় চোখে গভীর মায়া। এমনভাবে কথা বলছে যেন আমি তার কতদিনের চেনা। কোনো সংকোচ ছাড়াই সে আমার হাত ধরে আছে। আমি এতটা বিস্মিত হয়েছি যে আমার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছে না। কারণ ছেলেটা হুবুহু আমার মত দেখতে। একই রকম কথা বলার ভঙ্গি, ঠিক আমার মত করেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
-না আঙ্কেল, আমি তো তোমার বাবাকে দেখিনি, কোথায় গেছে তোমার বাবা?
-জানিনা। আচ্ছা, তুমি আমাকে আঙ্কেল বলছ কেন? আমি তো এখনো ছোট।
-তাহলে কি বলে ডাকব তোমাকে?
-আমার নাম মেঘ।
আমি আবার নতুন করে চমকে উঠলাম, কতদিন পর কারো মুখে শুনছি এই মেঘ নামটা। অনেক বছর আগে কোনো একজন অনেক ভালোবেসে আমাকে মেঘ নামটা দিয়েছিল। কিন্তু আমি পারিনি তার ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে। তাই তো চোরের মত পালিয়ে গি্যেছি। সেই মানুষটি থেকে অনেক অনেক দূরে।
-জানো আঙ্কেল, আমি না এই শপিংমলে এসে হারিয়ে গেছি। তুমি কি আমার আব্বু আম্মুকে খুজে দিবে?
-অবশ্যই দিব, চলো আমরা দুজনে মিলে তোমার আব্বু আম্মুকে খুজি।
মেঘ খুব সহজেই আমার হাত ধরে হাটতে লাগলো। আমার খুব ইচ্ছে করছে মেঘকে কোলে নিয়ে আদর করতে, কিন্তু ভয় হলো মেঘ যদি সেটা পছন্দ না করে। মেঘকে নিয়ে কিছুক্ষণ হাটতেই হঠাৎ একজন মহিলা দূর থেকে দৌড়ে এসে মেঘকে জড়িয়ে ধরলো। তাদের পাশে এসে দাড়ালো একজন মধ্যবয়স্ক সুদর্শন তরুণ। মেঘের বাবা মায়ের দিকে ভাল করে চোখ পড়তেই আমার সমস্ত শরীর দিয়ে যেন বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য মনে হল আমার সম্পূর্ন পৃথিবী স্থির হয়ে গেছে, আমার সব ইন্দ্রিয়গুলো যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। এই আমি কাকে দেখছি? আমার কোনো ভুল হচ্ছে না তো? আট বছর পর আবার আমাদের এভাবে দেখা হয়ে যাবে কখনো ভুলেও কল্পনা করিনি আমি। কিন্তু আমাকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মেঘের বাবা বললো, চলো মেঘ, আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে। ওরা মেঘকে আমার চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে গেলো। পেছন থেকে শুনলাম মেঘের মা তাকে বকা দিচ্ছে, না বলে কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি? আমাদের একদম ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। আর তোমাকে না নিষেধ করেছি, অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলবে না।
ওরা দুজন কি সত্যি আমাকে চিনতে পারেনি? নাকি চিনেও না চেনার ভান করলো? একটা মানুষকে ভুলে যাওয়ার জন্য আট বছর সময় কি খুব বেশী?

প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে গেল বাদলের ঠিকানা খুজে বের করতে। আট বছর বিদেশে থাকার কারণে বন্ধুবান্ধব প্রায় সবার সাথেই আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দেশে যারা আছে তাদের নিজেদের মধ্যেও তেমন যোগাযোগ নেই। সবাই এখন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। কলিংবেল বাজাতেই মেঘ এসে দরজা খুলে দিল।
-কেমন আছ মেঘ?
-ভাল, কিন্তু তুমি কিভাবে আসছ? আমাদের বাসা কিভাবে খুজে পাইছ তুমি?
আমাকে দেখে মেঘ সত্যি অবাক হয়েছে, দুই হাত নিজের তুলতুলে নরম দুই গালে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
-জানো মেঘ, আমার না তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল, তাই ম্যাজিক করে তোমাদের বাসায় চলে এসেছি।
-তুমি ম্যাজিক জানো?
-হ্যা জানি
-আমাকে শেখাবে?
-আচ্ছা পরে শেখাব, এখন নাও তোমার জন্য চকোলেট আর আইস্ক্রিম এনেছি।
আমার হাতে চকোলেট আর আইস্ক্রিমের বাক্স দেখে মেঘ খুশী হয়ে গেল।
-আইস্ক্রিমের ফ্লেভার কি?
-ম্যাংগো
-তুমি কিভাবে জানো আমি ম্যাংগো ফ্লেভার পছন্দ করি।
-সত্যি বলতে কি, আমি জানিনা তুমি কোনটা পছন্দ কর। তবে একসময় আমি নিজে ম্যাংগো ফ্লেভার খুব পছন্দ করতাম।
-তোমার সাথে তো আমার অনেক মিল।
– হ্যা, তুমি কি জানো তোমার মত আমার নামও মেঘ?
-সত্যি বলছ?
-হ্যা, সত্যি বলছি। যখন দুজন মানুষের নাম মিলে মিলে যায় তখন তাদেরকে কি বলে জানো?
-কি বলে?
-তাদেরকে বলে মিতা
-মিতা মানে কি?
-মিতা মানে হল বন্ধু। তুমি কি আমার বন্ধু হবে?
– আমি তো অনেক ছোট, আমি কিভাবে তোমার বন্ধু হব?
-চাইলে বড়রাও ছোটদের বন্ধু হতে পারে।
– তাহলে এখন থেকে তুমি আমার বন্ধু।
এই বলে মেঘ হ্যান্ডশেক করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আমি মেঘের হাতটা ধরে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কি অদ্ভুত শান্তি লাগছে আমার ভুকের ভেতরে! অচেনা অজানা ছেলেটার প্রতি এত মায়া অনুভব করছি কেন আমি? শুধুমাত্র মেঘ বাদলের সন্তান বলে? হঠাৎ দেখি বাদল আমার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বাদলকে দেখে মেঘ বললো, জানো বাবা, এই আঙ্কেলটার নামও মেঘ। আমরা দুজন বন্ধু হয়ে গেছি। বাদল গম্ভির মুখে বললো, মেঘ তুমি ভেতরে যাও, টিভিতে কার্টুন দেখো। বাবার রাগী চেহারা দেখে মেঘ আর কিছু না বলে ভেতরে চলে গেল।
-কেন এসেছিস তুই?
– যাক অবশেষে চিনতে পেরেছিস তাহলে?
-আমার কি তোকে চেনা উচিত?
-জানিনা, তবে ভুলে যে যাসনি সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি
-তোর কেন মনে হচ্ছে যে আমি তোকে মনে রেখেছি?
– ভুলে গেলে নিশ্চয় নিজের ছেলের নাম মেঘ রাখতিস না?
– দেশে কবে ফিরেছিস?
-এই তো মাসখানেক হলো, সেদিন এভাবে তোদের সাথে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি।
-দেখা না হলেই ভাল ছিল।
-হ্যা, সেটা হয়তো ঠিক। বিয়ে করে বউ ছেলে নিয়ে সুখেই আছিস দেখছি।
– কেন তুই সুখে নেই?
-জানিনা, একা মানুষের আর সুখে থাকা! কোনোরকম দিন চলে যাচ্ছে।
– বিয়ে করিসনি কেন?
-করেছিলাম, ডিভোর্স হয়ে গেছে।
-কেন?
– বিয়ের পর বউ জানতে পারলো আমি বাই সেক্স্যুয়াল, তাই ডিভোর্স দিয়েছে
– এই সত্যটা এতদিন পর বুঝতে পারলি তাহলে?
-হ্যা, অনেক আগেই বুঝতে পেরেছি, তবে নিজেকে নিজে মেনে নিতেই অনেক সময় চলে গেল।
-এখন তাহলে সবকিছু নতুন করে শূরু কর।
-শুরু করার কিছু নেই, সব শেষ হয়ে গেছে। আচ্ছা অহনা কোথায়, ও জানে তুই সমকামী।
-হ্যা জানে, অহনাকে আমি সবকিছুই বলেছি
– সবকিছু জেনেও সে তোকে গ্রহণ করেছে! বাঙ্গালী মেয়েরা দেখছি সত্যি অসাধারণ।
– অহনার কথা থাক, সে এখন ফেনীতে। তুই কি দেশে থাকবি নাকি আবার ফিরে যাবি?
-জানিনা, এখন আর আমার কোনো ঠিকানা নেই বন্ধু, শেকড়বিহীন মানুষের কো্নো পিছুটান থাকেনা।


আট বছর আগের কথা, আমি আর বাদল তখন ভার্সিটিতে পড়তাম। বাদল ছিল আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু, হয়তো বন্ধুর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই বাদলের সাথে আমার বন্ধুত্ব, আমাদেরকে সবাই মানিকজোড় বলে ডাকতো। একই হলে একই রুমে থাকতাম, দিনরাত ২৪ঘন্টা সারাক্ষণ দুজনে একসাথে ঘুরতাম, একই সাথে ক্লাসে যেতাম। বাদল যেখানে আমিও সেখানে। আমাদের বন্ধুত্ব এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল যে আমরা একে অপরের উপর যথেষ্ট জোড় খাটাতাম। আমি বাদল ছাড়া অন্য কারো সাথে মিশি বাদল সেটা পছন্দ করতো না, এমনকি সে এটাও চাইত না যে আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড হোক। সে নিজেও কারো সাথে তেমন মিশত না। বাদলের সমস্ত জগৎ ছিল শুধু তার মেঘকে নিয়ে। আমারও বাদলের আকাশের মেঘ হতে কোনো আপত্তি ছিল না, কারণ সে আমার সব অন্যায় আবদার নির্দ্বিধায় মেনে নিত। কত রাত আমরা এক বিছানায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছি। আমাদের দুজনের মাঝে কোনো লজ্জা বা আড়াল ছিল না। বিনা সংকোচে একে অপরের সামনে ড্রেস চেঞ্জ করেছি, কখনো পর্ণ মুভি দেখে একসাথে বসে হাত মেরেছি, কখনো মজা করে একে অপরকে কিস করেছি। কিন্তু আমাদের মাঝে কোনো পাপ বা যৌন লালসা ছিলনা, ছিল নিখাঁদ বন্ধুত্ব, দুষ্টামি আর ছেলেমানুষী। কিন্তু এসবের মাঝে যে কখন একে অপরকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছি নিজেরাও জানিনা। তবে সমকামিতা বিষয়টা তখন আমাদের দুজনের কারো মাথাতেও ছিলনা। নিজেদের যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ে কখনো সেভাবে কোনোদিন ভেবেও দেখিনি। এভাবেই চলে যাচ্ছিল আমাদের দিনগুলো। তারপর এল সেই অভিশপ্ত রাত, তখন আমরা ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। রাত তখন প্রায় ২টা, গরমের দিন, দুজনেই খালি গায়ে লুঙ্গি পরে শুয়েছি। প্রতিদিনের মত আমি বাদলকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছি। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, দেখি বাদল আমার শরীরের উপরে উঠে আমাকে কিস করছে। আমার ঠোট, ঘাড়, বুক সবখানে ক্রমাগত চুমু খাচ্ছে বাদল, অনেকটা নেশাগ্রস্তের মত। তার উথিত শক্ত লিঙ্গের স্পর্শে আমার তলপেটের নীচে শিরশির করে উঠলো। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে বললাম, কি করছিস তুই?
-আমি তোকে অনেক ভালোবাসি মেঘ
-পাগল হয়েছিস নাকি? আমি বাদলকে সরিয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু সে আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো, প্লিজ মেঘ, আজ আর আমাকে বাধা দিস না, আমি যে বহুদিন ধরে তোর ভালোবাসার কাঙাল হয়ে আছি, আমাকে একটু আদর কর না প্লিজ।
সেদিন আমি সত্যি বাদলকে বাধা দিতে পারিনি। কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রচন্ড পাপবোধ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। নিজের শরীরটাকে নিজের কাছেই ঘেন্না লাগছিল। প্রচন্ড ঘৃণা করতে শুরু করলাম বাদলকে। মনে হচ্ছিল সবকিছু বাদলের জন্যই হয়েছে, সেই আমাকে এই পাপের পথে টেনে এনেছে। এরপর থেকেই বাদলকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। হলের অন্য একটি ছেলের সাথে রুম এক্সচেঞ্জ করলাম, ক্লাসে বাদলের সাথে দেখা হলেও না দেখার ভান করতাম। দুজনের কথা বলা বন্ধ, এতদিনের বন্ধুত্ব যেন এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। সেদিনের পর থেকেই আমি যেন একটূ একটূ করে বুঝতে পারছিলাম যে আমার ছেলেদের প্রতিও একধরনের দুর্বলতা আছে। মেয়েদের মত ছেলের প্রতিও আমি সমান আকর্ষন অনুভব করি। ভাবলাম বাদলের সাথে এতদিন একসাথে থাকার কারণে বা সেই রাতের ঘটনার জন্য আমার ভেতরে কোনো মানসিক বিকৃতি তৈরি হয়েছে। একবার ভাবলাম কোনো মানসিক ডাক্তারের কাছে যাব, কিন্তু ডাক্তারকে বলবই বা কি? পরে নিজেই নিজের চিকিৎসা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
অহনা, আমাদের ভার্সিটির সবচেয়ে রুপবতী মেয়েদের মধ্যে একজন, আমাদের একই ডিপার্টমেন্টের এক ব্যাচ জুনিয়র ছিল। অহনা অনেক আগে থেকেই আমাকে পছন্দ করতো। আমি তাকে প্রপোজ করলাম, শুরু হল আমার আর অহনার প্রেম। অহনার সাথে আমার সম্পর্কের কথা জানতে পেরে বাদল মানসিকভাবে খুব বড় আঘাত পেল। ক্লাস করত না, ক্যাম্পাসে আসাও ছেড়ে দিল। একদিন জানতে পারলাম সে নাকি হল ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে, শুধু পরীক্ষার সময় এসে পরীক্ষা দিয়ে যাবে। বাদলের চলে যাওয়ায় আমি একরকম খুশী হলাম। তখন পর্যন্ত আমার সাথে কোন মেয়ে ঐভাবে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। ভাবলাম অহনার সাথে একবার কিছু হয়ে গেলে আমার ভেতরের মানসিক বিকৃতিও পুরোপুরি সেরে যাবে। আমাদের রিলেশনের তখন প্রায় ছয় মাস, অহনা আমাকে অন্ধের মত ভালোবাসে, আমার জন্য সে সবকিছু করতে রাজী। অহনাকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গেলাম, তিনদিন হোটেলে ছিলাম। অনেক ভালোই সময় কাটলো আমাদের। কিন্তু হানিমুন শেষে ভার্সিটিতে ফেরার পর সবকিছু যেন হঠাৎ বদলে গেল, বদলে গেলাম আমি। অহনাকে আমার অসহ্য লাগতে শুরু করল, তাকে দেখলেই আমার বিরক্ত লাগে। এদিকে বাদলের জন্য মনের ভেতর তীব্র কষ্ট হতে লাগলো। এক ভয়ঙ্কর মানসিক যন্ত্রনায় প্রতিনিয়ত ছটফট করছিলাম আমি। আমি বুঝতে পারলাম যে আমি সত্যি বাদলকে অনেক ভালবাসি। বাদল ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। বাদলের মাঝেই আমার জীবনের সব সুখ, ওকে ছাড়া বেঁচে থাকা অর্থহীন। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। কোন মুখে বাদলের সামনে গিয়ে দাড়াব? একদিন বাদল যখন ভালবেসে নিজেকে আমার কাছে সমর্পন করতে চেয়েছিল, আমি তখন তাকে চুড়ান্ত অপমান করেছি। তাকে হিজড়া বলে গালি দিয়েছি, বলেছি তুই একটা পুরুষবেশি মহিলা।
এদিকে অহনার সাথেও মিথ্যে অভিনয় করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তাই সবকিছু ছেড়ে চোরের মত পালিয়ে গেলাম, সবার কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে। নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে ছেড়ে কাটিয়ে দিলাম দীর্ঘ আটটি বছর।

হুইস্কির গ্লাসে নিজেকে হারিয়ে ভাবছি অতীতের সেই দিনগুলোর কথা। পিচ্চি মেঘের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে আমি যেন নতুন করে ভেঙ্গে পড়েছি, মনে হচ্ছে এমন একটি ছেলে আমার কেন নেই? সমস্ত পৃথিবী আমার কাছে অসহ্য লাগছে, পৃথিবীর সবাই অনেক সুখী, সব কষ্ট শুধু আমার একার। আমার নিঃসঙ্গতার একমাত্র সাথী, রঙিন কাচের বোতলে ভরা স্কচ হুইস্কি। কোনদিন সাতটা আটটা খেয়েও ঘুম আসে না। কি কষ্ট! রাতের বেলা একা জেগে থাকার মত কষ্ট আর কিছুতে নেই। সেসময় নিজেকে এত একা লাগে। মনে হয় সারা পৃথিবী কত শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, শুধু আমার চোখে ঘুম নেই।
বাদলের বাসা থেকে ফেরার প্রায় দশদিন পর একদিন সকালবেলা আমার মোবাইলে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এলো। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই একটা বাচ্চা ছেলে আদুরে কণ্ঠে বললো, মেঘ আঙ্কেল, কেমন আছ তুমি?
-ভাল আছি, মেঘবালক। তুমি আমার নাম্বার কোথা থেকে পেলে?
-ভুলে গেছ? সেদিন আসার সময় তুমি নিজেই তো আমাকে নাম্বার দিলে।
-ওহ, একদম ভুলে গেছি আমি, এখন বলো, তুমি কেমন আছ?
-আমিও অনেক ভাল, তুমি কি জানো, আজ আমার জন্মদিন?
– শুভ জন্মদিন, মেঘ সোনা
– শুধু উইশ করলে হবে? আমার গিফট কোথায়?
-কি গিফট চাও তুমি?
-সেটাতো আমি বলব না, তুমি আমাকে সারপ্রাইজ দেবে
আমি হেসে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি এক্ষুনী তোমার সারপ্রাইজ নিয়ে আসছি।


অ্যাকুরিয়াম দেখে মেঘ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল, তার মুখ দিয়ে যেন কোনো কথাই বের হচ্ছেনা। আমি জানতাম অ্যাকুরিয়াম পেয়ে মেঘ অনেক খুশি হবে। আমি আর মেঘ দুজনে একসাথে অ্যাকুরিয়ামটি সেট করলাম, বাদলও আমাদের সাহায্য করলো। সবশেষে যখন রঙিন মাছগুলো পানিতে ছাড়া হলো, মেঘ মুগ্ধ গলায় বললো, Oh my God, মাছগুলো কি সুন্দর!
-উপহার পছন্দ হয়েছে?
-খুউব। আমি মাছদের হাত দিয়ে ধরতে পারব? আমি ধরলে এরা কি আমাকে কামড় দিবে?
-না, এরা কখনো তোমাকে কামড়াবে না, তুমি নিজের হাতে এদের খাবার দাও।
মেঘ খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমিও তাকে কোলে নিয়ে ওর কপালে চুমু খেলাম।
কিছুক্ষণ পর বাদলকে জিজ্ঞাসা করলাম, অহনা কোথায়?
-অহনা তো এখানে থাকেনা।
-তোর বউ তোর সাথে থাকে না তো কোথায় থাকে?
-তোকে কে বললো যে অহনা আমার বউ?
-তাহলে মেঘের মা কে?
-চল, সোফায় বসে কথা বলি। মেঘকে এখন অ্যাকুরিয়ামের সামনে থেকে সরানো যাবেনা।
এরপর বাদলের কাছ থেকে অবিশ্বাস্য এক সত্য গল্প শুনলাম।
‘ অহনার সাথে আমার বিয়ে হয়নি, সে আমার ভাবি, আমার কাজিন ফরিদ ভাইয়ের স্ত্রী। তুই আমেরিকা চলে যাওয়ার পর অহনা একদিন আমার সাথে দেখা করতে এলো। তখন আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। তুই তো পরীক্ষা না দিয়েই বিদেশে পালিয়ে গেলি। অহনা জানালো, সে তিন মাসের প্রেগনেন্ট। আর এই বাচ্চার বাবা কে সেটা বুঝতে আমার অসুবিধা হল না। তুই দেশে নেই, এই অবস্থায় অহনা একা সম্পুর্ণ ভেঙ্গে পড়েছিল। কাউকে কিছু বলতেও পারছিলনা। অ্যাবোরশন করা ছাড়া তার কোন উপায় ছিল না, তাই সে সাহায্যের জন্য আমার কাছে এসেছিল। কিন্তু আমি কিভাবে আমার মেঘবালককে নিজের হাতে খুন করতে পারি? আমি অহনাকে বললাম, তুমি অ্যাবোরশন করোনা, আমি চাই বাচ্চাটা পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখুক।
-কিন্তু বাদল ভাই সবকিছু জানার পর একজন কুমারী মাতাকে কে বিয়ে করতে চাইবে? তুমি কি কখনো আমাকে বিয়ে করতে পারবে?
-না অহনা, আমার পক্ষে কখনো তোমাকে বিয়ে করা সম্ভব না, কারণ তুমি নিশ্চয় এমন কাউকে বিয়ে করতে চাইবে না যে কখনো তোমাকে শরীর মন দিয়ে ভালোবাসতে পারবে না?
– তাহলে এখন আমি কি করব?
-তুমি আমাকে দুটা দিন সময় দাও, দেখি আমি কি করতে পারি।
ফরিদ ভাই তখন বিয়ে করার জন্য মেয়ে খুজছে। উনার এর আগে একটা বিয়ে হয়েছিল, ছয় মাসের মাথায় ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমি ফরিদ ভাইকে অহনার কথা সবকিছু খুলে বললাম, তিনি অহনাকে বিয়ে করতে রাজী হলেন। কিন্তু শর্ত দিলেন যে, তিনি এই বাচ্চার কোনো দায়িত্ব নিতে পারবেন না। আমি বললাম, ঠিক আছে, এই বাচ্চার সব দায়িত্ব আমার, বাচ্চাটি জন্ম নেয়ার পর আমি ওকে নিজের পিতৃত্বের পরিচয় দেব। তারপর অহনার সাথে ফরিদ ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেল, আমি হলাম মেঘের বাবা। অহনা মাঝে মাঝে ছেলেকে দেখতে আসে। সেদিন মেঘের জন্য কিছু জামা কাপড় কিনতেই আমরা সাথে শপিংএ গিয়েছিলাম।
বাদলের কথাগুলো আমি এতক্ষন স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম।
-এত ছোট একটি বাচ্চাকে একা লালন পালন করতে তোর সমস্যা হয়নি?
– না, কারন মা ছিলেন আমার সাথে, তিনিই মেঘকে নিজের নাতীর মত আদর যত্নে মানুষ করেছেন, মা জানে, মেঘ আমারই সন্তান।
– কেন করেছিস এইসব? আমি কি এসবের যোগ্য ছিলাম?
– আমি তো তোর জন্য কিছু করিনি, যা কিছু করেছি আমার মেঘবালকের জন্য করেছি।
– বিয়ে করলি না কেন?
– কাকে বিয়ে করব? যাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতাম, সে তো আমাকে ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে গেল।
-আজ যদি সে তোর কাছে নিজের সব ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়, তুই কি তাকে গ্রহণ করবি?
– গ্রহণ করতে পারি যদি সে কথা দেয়, সে আর কোনদিন আমার জীবন থেকে পালিয়ে যাবে না।
– কথা দিলাম। এখন আমি চাইলেও তোর কাছ থেকে পালাতে পারব না। আমাদের মেঘবালকই আমাদের দুজনকে একই সুরে বেধে রাখবে।
এই বলে আমি প্রচণ্ড আবেগ আর ভালোবাসায় বাদলকে জড়িয়ে ধরলাম, চুমু খেলাম তার উষ্ণ ঠোটে, কপালে, ঘাড়ে। আজ তো আমার ঋণ শোধ করার পালা। বাদল নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলো।
– দরজা খোলা, মেঘ এসে দেখে ফেলবে।
– আজ আমার কোন দ্বিধা নেই, কোন সংকোচ নেই। আজ আমি সমস্ত পৃথিবীকে চিৎকার করে বলতে পারি, আমি বাদলকে অনেক ভালবাসি।
– এতদিন কেন আমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকলি তুই?
– আমি শুনছিলাম তুই নাকি বিয়ে করে সংসারী হয়েছিস, তাই তোর সুন্দর জীবনে বাধা হয়ে দাড়াতে চাইনি। জানিস বাদল, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমি তোকে কোনদিন হারাইনি, তুই সবসময় আমারই ছিলি।
– কারণ তুই আমাকে সবসময়ই ভালোবেসেছিস। কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও তোর অবচেতন মনে এই ভাগ্যবান ব্যক্তিটির জন্য বিপুল ভালোবাসা জমা ছিল।
এমন সময় মেঘ এসে দেখল তার বাবা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। মেঘ বললো, তোমরা দুজনেই কি বন্ধু হয়ে গেছ?
বাদল বললো, হ্যা মেঘ সোনা, আর তোমার জন্য আজ আরো বড় একটা সারপ্রাইজ আছে।
– কি সারপ্রাইজ? মেঘ আগ্রহের সাথে জানতে চাইল।
বাদল মেঘকে আমার সামনে দাড় করিয়ে বললো, তুমি যাকে মেঘ আঙ্কেল বলে ডাকো, সে তোমার সত্যিকারের বাবা।
– তাহলে কি তুমি আমার মিথ্যা বাবা?
আমি মেঘকে বুঝিয়ে বললাম, ছিঃ মেঘ, এভাবে বলে না, বাবা কখনো মিথ্যা হয় না। দুজন বাবাই সত্যি। একজন বাবা তোমাকে ভালোবেসে এই পৃথিবীতে এনেছে, যার রক্ত তোমার শরীরে বইছে। আর অন্য বাবা তোমাকে ভালোবেসে অনেক যত্নে একটু একটু করে বড় করেছে।
– তাহলে তুমি আমাকে এতদিন দেখতে আসোনি কেন? কোথায় ছিলে তুমি?
-তোমার জন্মের আগেই আমি সবার সাথে রাগ করে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরে আসতেই আমার অনেক সময় চলে গেল।
– তুমি কি এখন থেকে আমাদের সাথেই থাকবে?
আমি মেঘকে জড়িয়ে ধরে বললাম, হ্যা বাবা, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবনা।
– আঙ্কেল, তোমার চোখে পানি কেন? মেঘ তার ছোট্ট হাতে আমার চোখের পানি মুছিয়ে দিল।
-মেঘ সোনা, তুমি কি একবার আমাকে বাবা বলে ডাকবে?
মেঘ অসহায় দৃষ্টিতে বাদলের দিকে তাকিয়ে রইল, হয়তো হুট করে আমাকে বাবা ডাকতে তার লজ্জা লাগছে। বাদল বললো, মেঘ, তুমি যে তোমার বাবাকে আঙ্কেল বলে ডাকছ তাই সে কাঁদছে।
– কিন্তু আমি তোমাদের দুজনকেই কিভাবে আব্বু বলে ডাকব?
আমি হেসে বললাম, আমাকে না হয় তুমি ড্যাড বলে ডাকো।
মেঘ খুব ধীর গলায় ছোট্ট করে বললো, ড্যাড। এক অদ্ভুত শান্তিতে আমার হৃদয় জুড়ে গেল।
পরিশিষ্ট
আমার গল্প এখানেই শেষ, মেঘবালককে বুকে নিয়ে আমি আর বাদল অনেক সুখেই আছি। মাঝে মাঝে বর্ষার রাতে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি বাদলকে ঘুম থেকে জাগিয়ে ছাদে চলে যাই বৃষ্টিতে ভিজতে। কখনো ঘুম থেকে জেগে আমাদের দুজনকে বিছানায় না দেখে খুজতে খুজতে মেঘও ছাদে চলে আসে। এসেই আদুরে গলায় বলে, তোমরা দুজন আমাকে একা রেখেই বৃষ্টিতে ভিজছ, এটা কি ঠিক হয়েছে?
– একদম ঠিক হয়নি। আমি দুহাত বাড়িয়ে মেঘকে কাছে ডাকি। মেঘ দৌড়ে এসে আমার কোলে ঝাপিয়ে পড়ে। বাদল বিরক্ত স্বরে বলে, এত রাতে বৃষ্টিতে ভিজলে মেঘের ঠাণ্ডা লেগে যাবে। আমি বলি, লাগুক, মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা লাগলে কিছু হয়না। চলো, আমরা তিনজনে একসাথে বৃষ্টিস্নান করি। বাদল যখন ঠাণ্ডায় কেঁপে আমাকে আর মেঘকে একসাথে জড়িয়ে ধরে, তখন আমার নিজেকে বড় সুখী মনে হয়, বেসুরো গলায় খুব গাইতে ইচ্ছে হয়,
‘এসো কর স্নান নবধারা জলে
এসো নীপবনে, ছায়াবীথি তলে।’
(সমাপ্ত)

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১১ই অক্টোবর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.