একটি ভুল ও তার শেষ পরিণতি

লেখকঃ আমার আছে জলের

দৃশ্য -১

রাহাতঃ ভালো আছিস নিশ্চয়ই?
কাব্যঃ ভাল থাকবনা কেন? । ভালোদের নিয়ে আমি বেশ ভালো আছি।
রাহাতঃ তাহলে আমাকেও তোদের দলে নে আমিও ভালো থাকি।
কাব্যঃ উহু, নেওয়া যাবে না। এতো সোজা না। বললেই হলো..
রাহাতঃ তাহলে কি করবো আমি? আমি যে তোর কাছে থাকতে চাই..
কাব্যঃ হাহা, এতো সহজ বুঝি আমাকে পাওয়া। কালো পাথর হয়ে আকাশের চাঁদ চাস। যা আগে উড়তে শিখ….
রাহাতঃ উড়তে জানি না তো?
কাব্যঃ তাহলে নদীতে গিয়ে ডুবে মর…
রাহাতঃ নদী!!! নদী কোথায় পাবো? বরং তুই আমার যমুনা হ। আমি তোমাতেই ডুবে মরি..
কাব্যঃ আচ্ছা তোকে তোকে এত অপমান করি তোর কি একটুও আত্মসম্মানবোধ এ
লাগেনা? কেন করিস এসব?
রাহাতঃ তোকে ভালবেসে সকল অপমান সইতে রাজী আছি।
কাব্যঃ তোকে কতবার বলব যে তোকে আমি এখন ভালবাসিনা। তারপর ও
কেন আমার পিছনে বারবার ঘুরঘুর করিস। খবরদার আর কোন দিন আমারে ফোন দেওয়ার দুঃসাহস করবিনা(বেশ ঝাঝালো কন্ঠে)
রাহাতঃ কান্নাজড়িত কন্ঠে “আচছা ঠিক আছে।কিন্তু তোর যদি কোন দিন আমার
সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে ফোন দিস। আমি কিন্তু ঠিক ই তোর ফোনের অপেক্ষায় থাকব।
কাব্যঃ সেই সময় অথবা সুযোগ এলে তো(দীর্ঘঃশাস ছেড়ে)।

দৃশ্য-২
বিকেল হতে একদমে বৃষ্টি চলছে। বৃষ্টির দিনে বিয়ে শাদি হওয়াটা একটু ঝামেলার। এতো ঝামেলা থাকা সত্ত্বেও সামিহা আর রাহাতের বিয়েটা কিন্তু বেশ জমকালো ভাবে হচ্ছে। আয়োজনের কোন ত্রুটি নেই বিয়ে বাড়িতে। সন্ধ্যা হতে পুরো বাড়িতে ঝাড়বাতি জ্বলছে। বাতিগুলোও খুব মজার। একবার জ্বলে একবার নিভে। সবমিলিয়ে কি সুন্দর একটা পরিবেশ!!!

দৃশ্য-৩

শহরের গলির ভিতর রাস্তার পাশে একটি ছোট্ট ঘর। ঘরটিতে আবছা অন্ধকার আবছা আলো, তেমন পরিষ্কার না। কোন কিছুর প্রস্তুতি চলছে এ ঘরে। টুলের উপর দাড়িয়ে একটি ছেলে সিলিং ফ্যানে দড়ি লাগাচ্ছে। দড়ির আরেক পাশে একটি ফাঁস দেওয়া।

দৃশ্য-৪

সামিহা তার বান্ধবীদের মাঝে বসে আছে। কি সুন্দরই না লাগছে মেয়েটাকে। অন্যদিনের চেয়ে আজ মেয়েটাকে বেশি ভালো লাগছে। বান্ধবীরা হাসি তামাশা করছে আর ও মুখ লুকিয়ে অননরত শুধু কেঁধেই চলেছে। বিয়ের আসরে মেয়েদের হাসিতামাশার মাঝে ওর কান্নার যেন কোনই দাম নেই কারো কাছে। কেউ একটিবারের জন্য তার কান্নার কারন ও শুধাবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলনা। কারন বিয়ের দিন মেয়েদের কান্না করাটাই সহজাত। জিনিসটা অদ্ভুত না। বিয়ে একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন, অথচ সেই দিন তাকে কাঁধতেই হবে ।
তাকে থাকতে হবে গম্ভীরমুখে. এদিকে রাহাতের ও একই দশা। শালাশালীরা হাজার চেস্টা করেও হবু দুলাভাই এর মুখ থেকে কোন মধুর কথা বা হাসি বের করতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার।তার বুক যে কান্নায় ফেটে যাচ্ছে তখন। কি এক অজানা বিপদের ডংকা তখন বেজেই চলেছে ওর হূদয়জূড়ে।

দৃশ্য-৫

ছেলেটি একা বসে আছে, ঘর এখন পুরো অন্ধকার। শুধু একটি সিগারেট জ্বলছে। অন্ধকার ঘরে সিগারেটের আগুন ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। হঠাত ওয়ারড্রোব খুলে কি সব জিনিস যেন বের করল আর পাগলের ন্যায় চুমু খেতে লাগল।এক পর্যায়ে কান্না থামিয়ে কি যেন লিখতে বসল।কিন্তু চোখের পানি যেন
কাগজটা ভিজিয়ে দিচ্ছে বারবার।

দৃশ্য-৬

বিয়ে বাড়িতে কিছুক্ষণের জন্য লোডশেডিং হয়েছে। সামিহা মেয়েটাও একটা পাগল। এর মধ্যে সে ওয়াশরুমে গিয়ে ঝামেলা পাকিয়েছে। ওয়াশরুমের দরজা খুলতে পারছে না। এ নিয়ে তার বান্ধবীরা বাইরে হাসাহাসি করে যাচ্ছে, যেন এরচেয়ে মজার আর কিছু নেই।কিন্তু অনেক্ষন হল বের হচ্ছেনা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল বান্ধবীরা। সবাই একপর্যায়ে দরজা ভেংগে ভিতরে ঢুকল। ভিতরে বিষ পানে মৃত মেঝেতে শায়িত একটা নিথর দেহ। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে।

দৃশ্য-৭

কান্নাভেজা একটা চিঠি। চারপাশে এলোমেলো করে রাখা কয়েকটা জন্মদিনের,ভালবাসা দিবস ও পহেলা বৈশাখের কার্ড। অনেকগুলু মৃতপ্রায় লাল গোলাপ ও । পাশে রাহাতের কয়েকটা ছবি।। তার পাশেই রাখা সুন্দর ফুটফুটে একটা অপ্সরীর ছবি। ছবিটা আর কারোর নয়। “সামিহার”। কাঁপা হাতে রাহাত চিঠি খুলে পড়তে লাগল-

“প্রিয় তুই “

জানি এই চিঠিটা যখন তুই পড়বি তখন আমি প্রিথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমাব। তোর সাথে সম্পর্ক হওয়ার পূর্বে আমার আরেকটা রিলেশন ছিল।তাও একটা একটা মেয়ের সাথে। তুই হয়ত ভাবতেছিস, আমি সমকামী হওয়ার পরও কেন আমি একটা মেয়ের সাথে রিলেশন করেছি। তার একমাত্র কারণ হল বন্ধুদের সাথে ধরা প্রেমের বাজি। আর আমার এই বাজির শিকার ছিল সামিহা। যদিও আমার কাছে তা নিছক খেলা ছিল কিন্তু ও আমাকে পাগলের মত ভালবাসতে শুরু করে আর আমিও ভালবাসার অভিনয় করে যেতে থাকি। একসময় অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে আমি নিজে থেকেই সম্পর্কের ইতি টানি। ও সেদিন বাচ্চাদের মত কান্না করেছিল আর আমি পাষানের মত ওর কান্না শুনতে থাকি। এই সম্পর্ক ছিন্নের কারণ হিসেবে তখন কিভাবে আমি তাকে উত্তর দেই যে “আমি একজন সমকামি”। তাই সেদিন নিজেকে এজিদের চেয়েও নিকৃস্ট মনে করে নিজেকে নিজেই ধিক্কার দিচ্ছিলাম। এর কয়েকদিন পর ই আমার এই অন্ধকার জিবনে আলো জালাতে তোর আগমন ঘটে। বেশ ভালই কাটছিল দিনগুলো।এর মধ্যে হঠাত অমানিষার অন্ধকার যেন ঘিরে ফেলল আমাকে।মরণব্যধি ক্যান্সার এসে বসবাস শুরু করল আমার দেহে। ডাক্তার বলল আমার আয়ুস্কাল নাকি খুব সন্নিকটেই ফুরিয়ে আসছে। বুঝলাম সামিহার সেই দিনের বুক ফাটা আর্তনাদ তাহলে বিফলে যায়নি। এর পর থেকে নিজেকে একজন অভিসপ্ত পাপী মনে করেই তোর কাছ থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলাম। আমি চাইনি আমার এই অভিসপ্ত জিবনের সাথে তোকে জড়িয়ে আরো কস্ট দেই। তাই তোকে বারবার অপমান করতে থাকি যদিও আমার হূদয় ভেংগে তখন ক্ষতিবিক্ষত হচ্ছিল বারবার ।তবুও তুই আমার পিছু ছাড়সনি। জানি তুই আমাকে অনেক ভালবাসিস। বিশ্বাস কর আমিও তোকে অনেক ভালবাসিরে।কিন্তু প্রকৃিত আমার সাথে তার নির্মম খেলা তখনো বন্ধ করেন নি। দুই দিন আগে শুনতে পেলাম তোর সাথে যার বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই মেয়েটি সামিহা। আমি যেন বিস্ময়ে থ হয়ে গেলাম তখন। কিছুই মিলাতে পারছিলাম না যেন। তাই শেষমেষ জিবনের সবচেয়ে কঠিন কিন্তু মহৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম নিজেকে ধংস করে দেওয়ার। এটাই যে আমার শেষ পরিণতি। আমায় কখনো ভালবেসে থাকলে মাফ করে দিস, ভাল থাকিস সবসময় আর সামিহাকে বলিস এই অভিশপ্ত আমি কুন দিন ও সুখি ছিলাম না ওকে কস্ট দিয়ে।

ইতি
কাব্য।

শেষ দৃশ্য-

বাইরে ঝড়ো বৃষ্টি, একটু একটু পরপর বিজলী চমকাচ্ছে। রাহাত ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে সে রাস্তায় নামলো, সারা দেহ রক্তে রঞ্জিত। হাতে তখনো চিঠিটা রয়েছে তবে ছেড়া ও রক্তে ভেজা। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে ও।হয়ত নদীর দিকে।এই যমুনার কালো জল যেন আজ তাকে মরণ ডাক ডাকছে।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১ই আগস্ট, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.