এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়

লেখকঃ একলা পথিক

খণ্ডঃ এক
আজ পহেলা বৈশাখ । সারা বছর জুড়েই ঢাকা শহরের রাস্তায় অহেতুক যানজট লেগেই থাকে প্রচলিত এমনকথাটা জগদ্বিখ্যাত হলেও বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে রাস্তার ট্র্যাফিক জ্যাম যে এতোটা তীব্র ভোগান্তির কারণ হতে পারে সেটা আজ মিতুল হাড়েহাড়ে উপলব্ধি করছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে উত্তরা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি. চত্বর গামী একটা বাসে চেপে বসলেও এখন পর্যন্ত মহাখালী চৌরাস্তাই পার হতে পারেনি। অবস্থা এমন যেন কচ্ছপ গতিতে গাড়ীগুলো সব সারি বেধে আজ মহাকাল পাড়ি দেবার ব্রত সাধনে মেতেছে। অথচ ঠিক ১২ টার মধ্যেইকিনা মিতুলের টি.এস.সি. চত্বরে থাকার কথা।কিন্তু রাস্তায় জ্যামের প্রচণ্ডতা এতোটাই ভয়াবহঠেকছে যেন আরেক বৈশাখ পার হয়ে যাবে তারটি.এস.সি চত্বর পৌঁছাতে পৌঁছাতে । যেদিকে চোখ যাচ্ছে সেইদিকেই লোকজন গিজগিজ করছে ।মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ আজ ঢাকা শহরে এসে হাজির হয়েছে।ইট-কাঠ-পাঁথরের ঢাকা শহরের যান্ত্রিক মানুষগুলোর ঘটা করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করাটাকে মিতুলের কাছে স্রেফ লোকদেখানো আদিখ্যেতা ও আজাইরা ঢং বলেই মনে হতে লাগলো । শহরের ট্র্যাফিক ব্যবস্থার চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখে মিতুল মনে মনে গালাগাল করে ট্র্যাফিক শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিদের চৌদ্দ গুষ্ঠির জাতপাত উদ্ধার করতে লাগলো।

খণ্ডঃ দুই
মিতুল চট্টগ্রামের ছেলে। আর এটা মিতুলেরদ্বিতীয়বারের মত ঢাকা আগমন।কিন্তু শত কষ্টের মাঝেও মিতুলের ভেতোরে আজ এক অন্যরকম প্রশান্তি বিরাজ করছে।চঞ্চল অস্থির সেই মানুষটিই যেন আজ একেবারে ধীর প্রশান্ত নিপাট এক ভদ্রলোক। সত্যি বলতে কি, মানুষ যখন গভীর সুখে নিমগ্ন থাকে তখন তার নিকট সামান্য দুঃখ-যন্ত্রণাকে সুখের ভেতোর বিলাসিতার অসুখ বলেই মনে হয়।কিন্তু এই বিশেষ দিনটির জন্যই যে মিতুলকে প্রায় দুই বছর যাবত অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।মাহেন্দ্র সেই ক্ষণটির জন্য কতগুলো বিনিদ্র রজনী যাপন করতে হয়েছে।কষ্টটা হয়ত শারীরিক কোন মহা দুরারোগ্য ব্যধি ছিল না। তারপরেও মিতুলের কাছে এই কষ্টটাই ছিল মারাত্মক ভয়ংকর কোন শারীরিক জটিল ব্যধি অপেক্ষাও অতীব দুঃসহনীয় কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কারণ কষ্টটার নাম যে ছিল অপেক্ষা। প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা। প্রিয় মানুষের জন্য অপেক্ষা। নিজের জীবনের চেয়েও যাকে অধিক ভালোবাসে সেই প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষা।আর মিতুলের এই অন্তিম অপেক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটবে তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষ রাজনের সাথে দেখা হবার মাধ্যমে। যার জন্যে এতোদিন এতোরাত এতো এতো অপেক্ষা। মিতুলের সেই কাছের ঘনিষ্ঠ প্রিয় মানুষটিই হলো রাজন।

খণ্ডঃ তিন

রাজনের সাথে মিতুলের পরিচয় প্রায় বছর দুয়েক হবে। পরিচয় ফেসবুকের এক নকল(ফেইক) আইডির মাধ্যমে। যদিও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার খাতিরে দুইজনের আইডিই ছিল শতভাগ ফেইক।মিতুল তখন ফেসবুকের রঙিন দুনিয়ারসবেমাত্র পদার্পণ করেছে। একেবারেই নতুন শ্রেণীর আনকোরা ছাত্র বলতে যা বুঝায়।এমনিতেই ফেসবুকে নতুন তার উপর আবার বিভিন্ন বিকৃতি ও অশ্লীল রুচি সম্পন্ন মানুষের উপদ্রব।একপর্যায়ে ফেসবুকের উপর তার বিরক্তির মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যেন তার কাছে এটাকেফেসবুকের বদলে ভার্চুয়াল যৌনপল্লী বলেই মনে হতে লাগলো। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে লগ ইন করেই ইনবক্সে আসা একটা এস.এম.এস. দেখে মিতুলের চোখ আটকে গেলো। এস.এম.এস. টা ছিল এমন, “আচ্ছা, আমি কি তোমার সাথে কিছুক্ষণ চ্যাট করতে পারি ? যদি তুমি কিছু মনে না করো ?”। যেখানে এখানকার অধিকাংশ পাবলিকেরাই চ্যাটিং এর শুরুতেই কাউকে চেনা নাই জানা নাই এমনকি ন্যূনতম Hi, Hello সম্বোধনটুকু পর্যন্তও বিনিময় না করেই সরাসরি সেক্স পার্টনার খোঁজার নিমিত্তেHeight, Weight, Age, Top, Bottom, Place, Dick Sizeসদৃশ যাবতীয় নোংরা প্রতীকী শব্দগুলো ব্যবহার করে জ্বালিয়ে মারে। সেইখানেই কিনা কারো এমন ভদ্র মার্জিত শোভন ও কোমল সম্বোধন তার প্রতি মিতুলকে কিছুটা হলেও বাড়তি মনোযোগ এবং আকর্ষণ প্রদান করতে বাধ্য করে। তাই কাল বিলম্ব না করে মিতুলও তৎক্ষণাৎ প্রতিউত্তরে তার ইনবক্সে এস.এম.এস. লিখে পাঁঠায়, “ আমাকে নক করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আর হ্যাঁ অবশ্যই আমরা চ্যাটিং করতে পারি।আপনি পরবর্তী সময়ে ফেসবুকে বসলে আমাকে অনলাইনে পেলে অবশ্যই নক করবেন”। তারপর কয়েকদিন গড়িয়ে গেলেও মিতুল আর তাকে কখনোই অনলাইনে পায়না। এমনকি ঐদিক থেকে তার এসএমএস এর কোন প্রতিউত্তরও আর আসে না।ইতোমধ্যে মিতুলও তাকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎ আচমকা অনলাইনে আসা মাত্রই মিতুল দেখে তার ইনবক্সে একটা এসএমসএস এসেছে, “আমি আসলে ভীষণ দুঃখিত যে তখন আপনার এসএমএস এর প্রতিউত্তরদিতে পারিনি। একটু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমাকে বেশ কিছুদিন হসপিটালে থাকতে হয়েছিল তাই আর ফেসবুকে বসতে পারিনি। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবেন না”। এতদিন পর তার এসএমএস টা দেখে মিতুল কিছুটা হকচকিয়ে গেলো এবং মিতুল খেয়াল করলো সেও তখন অনলাইনেই রয়েছে । তাই মুহূর্তের মধ্যেই সেও পাল্টা জবাব দিয়ে দিলো।এভাবেই ধীরেধীরে পরিচয়, একে অন্যকে জানাশোনা,ফাজলামো করা আর মিষ্টি মধুর চ্যাটিং করতে করতে একপর্যায়ে বন্ধুত্বের মত মধুর সম্পর্কের সখ্যতা গড়ে উঠলো দুইজনের মধ্যে।এমনও দিন গেছে সারাটা দিন কেটে গেছে দুইজনের শুধু ফেসবুকেই চ্যাটিং করতে করতেই। নাওয়া খাওয়া ঘুম ক্লাস ভুলে সারাদিন ফেসবুকে বুদ হয়ে থাকার জন্য মিতুলকে যে কতশত মায়ের বকুনি হজম করতে হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

খণ্ডঃ চার

রাজন আমেরিকার নামকরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি. করার সুবাদে বিগত কয়েক বছর যাবত আমেরিকাতেই মোটামুটি স্থায়ী।কিন্তু কিছুটা আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে তারা দুইজন দুইজনের এতো ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও আদৌ কেউ কিন্তু কাউকে কখনো দেখেনি। অর্থাৎতাদের মধ্যে সামান্য ফোনালাপ তো দূরের কথা কেউই কারো একটা ছবি পর্যন্তও দেখেনি।রাজনঅবশ্যঅনেকবারইমিতুলকেতারনিজেরছবিদেখাতেচেয়েছেকিন্তুমিতুলনিজেথেকেইদেখতেচায়নি।ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে বিষয়গুলো বড্ড সেকেলে ও কিছুটা আদিখ্যেতাপনামনে হলেও মিতুলের কাছে এটাই স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে লাগলো। কারণ তার মতে প্রেম করবো মানুষের সনেআত্মার সনে। তার বাহ্যিক চাকচিক্য ও জামাকাপড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নয়। তার মানসিকতা ব্যক্তিত্ব এবং তাকে কতোটা ভালোবাসাতে পারবে তার ভিত্তিতে।তাই একদিন মিতুল রাজনের অনুপস্থিতিতে তার ফেসবুক ইনবক্সে নিজের মনের কথাগুলো লিখে দিলো আর রাজনের উত্তরের অপেক্ষায় থাকলো। রাজনও মিতুলের এমন উদার মানসিকতা আর তার প্রতি মিতুলের গভীর ভালোবাসাকে সেদিন উপেক্ষা করতে পারেনি।কাউকে না দেখে না চিনে, কাছ থেকে মেলামেশা না করে, এমনকি তার সাথে আদৌ কোন প্রকার নুন্যতম মৌখিক বাক্য পর্যন্ত বিনিময় না করে,সে মানুষ হিসাবে কেমন,তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট কেমন এতো কিছুর আগামাথা না ভেবে কেবলমাত্র ফেসবুকে কয়েকদিনের সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহারের উপর নির্ভর করেই কাউকে এতো বিশ্বাস ফেলা এবং ভালোবাসার মত কঠিন সম্পর্কে জড়ানোর জটিল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে সে আর যাই হোক অন্তত মানুষ হিসেবে যে মহান ও বিশাল সুহৃদয়ের এটা নিয়ে রাজনের আর কোন সন্দেহ থাকলো না।আর এমন একজন মানুষকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পাওয়াটা তার জন্য বিধাতার নিকট হতে সর্বোৎকৃষ্ট উপঢৌকন বলেই মনে হল।এমন একজন মানুষকেই যে সেও এতদিন মনে মনে খুজতেছিল। তাই রাজনও আর কাল বিলম্ব না করে মিতুলের কোন ছবি বা এমনকি তার সাথে কোন ফোনো যোগাযোগ ব্যতিরেকেই শুধুমাত্র মানুষ মিতুলের প্রেমে পড়ে মিতুলের ফেসবুক ইনবক্সে নিজের পূর্ণ সম্মতির কথা একটানে লিখে দিলো “মিতুল তোমার এসএসএম এর প্রতিউত্তর দেবার মত কোন সহজ ভাষা আমার জানা নেই। শুধু এইটুকুই বলতে পারি আমিও তোমাকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি। আর সারাজীবন ভালোবেসে একসাথে পাশে থাকতে চাই”।সেইদিন থেকেই শুরু হল দুইজনের প্রেম ভালোবাসার এক অন্ধ খেলা।

খণ্ডঃ পাঁচ
মাস খানেক হতে চলেছে রাজন আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছে।রাজন সপরিবারে ঢাকাতেই থাকে। কিন্তু দেশে ফেরার পর থেকে দুইজনের কারো ভেতোরেই যেন আর তর সইছে না একজন আরেকজনকে এক নজর দেখার জন্য , সামান্য একটু কথা বলার জন্য। কিন্তু অতিরিক্ত ক্লাস আর পরীক্ষার কারণে মিতুল এতদিনে ফুরসৎ পায় নি ঢাকায় এসে রাজনের সাথে দেখা করার জন্য। মিতুল অবশ্য রাজনকে চট্টগ্রাম যেতে বলেছিল কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত দেশের বাইরে থাকায় তার বাবা-মা রাজনকে একা একা কোনভাবেই ছাড়তে চায় নি বলে তার আর চট্টগ্রাম যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাই অগত্যা মিতুলকেই ঢাকা আসতে হল তার ভালোবাসার মানুষের সাথে দেখা করার জন্য। অতঃপর অনেক হিসাবনিকাশ কষে এই পহেলা বৈশাখের দিনটাকেই তারা বেছে নিলতাদের ফেসবুকের প্রলম্বিত ভার্চুয়াল ভালোবাসাকে বাস্তবে পরিণত করার স্মরণীয় দিন হিসেবে। দীর্ঘ দিনের অনলাইন ভালোবাসার প্রথম দেখা প্রথম আলাপের মুহূর্ত হিসেবে পহেলা বৈশাখের মত দিনটাকে বেছে নেবার পেছনে এটাও একটা কারণ। তাছাড়া বিশেষ বিশেষ দিনে প্রিয়জনের সাথে বিশেষ কিছু মুহূর্ত উপভোগ করার মজাই আলাদা তাও আবার সেইটা যদি হয় এমন কোন প্রিয়জন যার সাথে কিনা আজই প্রথম দেখা তাহলে তো আনন্দের সীমা থাকে না।

খণ্ডঃ ছয়

অবশেষে অনেক চড়াই উৎরাই আর ঢাকা শহরের অসহনীয় যানজট অতিক্রম করে মিতুল শাহবাগের মোড়ে নামলো।ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ১১ টা বেজে প্রায় ৪৫ মিনিট ছুঁইছুঁই। যেহেতু ১২ টার সময়েই তার টিএসসি তে থাকার কথা তাই মিতুল কোনরূপ দেরি না করে শাহবাগ মোড়ের ফুলের দোকান থেকে রাজনের প্রিয় লাল গোলাপের তোড়া কিনে নিয়ে রিক্সা নিল টিএসসির উদ্দেশ্যে। রাজনের কথামত মিতুল টিএসসি চত্বর থেকে বুয়েটের দিকে যাবার পথে রমজান আলি মামার টি-স্টল এর সাথেই যে বুড়ো বটগাছটা আছেতার ঠিক সামনের কে.এফ.সি. রেস্টুরেন্টে গিয়ে নামলো।এখন শুরু হল মিতুলের আরেক নতুন অপেক্ষা আর সেটা হল রাজনকে দেখার অপেক্ষা তার সাথে কথা বলার অপেক্ষা।কিন্তু এতদিন এতরাতের প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে ভেবে মিতুলের ভেতোরে এতক্ষণ আনন্দ ও সুখানুভূতির যে দোলা বিরাজ করতেছিল হঠাৎ করে সেটা কেমন যেনউবে গেলো। আচমকাই সে ভীষণ আনমনা ও বিচলিত হয়ে পড়লো।রাজন কি তাকে পছন্দ করবে কিনা, তাকে যদি পছন্দ না করে দূর থেকে দেখেই ফিরে চলে যায়, অথবা রাজন আদৌ তার সাথে দেখা করতে আসবে কিনা। আবার ভাবতে লাগলো সে নিজেও তো দেখতে একেবারে খারাপ নয়। স্মার্ট,হ্যান্ডসাম, আধুনিক আর রাজনের দেয়া ড্রেসকোড অনুযায়ী সবুজপাঞ্জাবী আর সাদা পায়জামাতে তাকে নিজেকে দেখতেও যে বেশ সুদর্শন লাগছে সে নিজেই এটা বুঝে কিছুটা আনন্দিত হল এবং আত্মবিশ্বাস পেল নিজের উপর হল। তাকে দেখে রাজনের অন্তত অপছন্দ হবে না এমন আত্মবিশ্বাস বুকে চেপেরাজনের জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগলো। এদিকে ততক্ষণ বারোটা বেজে গেছে। মিতুল চারদিকে চেয়ে দেখছে শতশত তরুণতরুণী আজ বৈশাখী সাঁজে ঘোরাফেরা করছে। তরুণীদের অধিকাংশই শাড়ি পরিহিত আর তরুণেরা বেশিরভাগই বিভিন্ন নকশা ও ডিজাইনের পাঞ্জাবী পরিধান করে এসেছে বৈশাখী উৎসবে। কিন্তু এতো তরুণের ভিড়ে কখন সে দেখবে তার সেই কাঙ্ক্ষিত তরুণটিকে যে আজকে লালপাঞ্জাবী পরে আসবে শুধুমাত্র তার জন্য। মিতুল অবশ্য আগে থেকেই রাজনকে বলে রেখেছিল যে সে নিজে পরবে সবুজ পাঞ্জাবী আর রাজনকে পরতে হবে লাল পাঞ্জাবী।পাশাপাশি মিতুলের হাতে থাকবে রাজনের প্রিয় গোপালের তোড়া। আর রাজনের হাতে থাকবে মিতুলের পছন্দের রজনীগন্ধা ফুলের তোড়া।তাহলে নাকি দুইজন দুইজনকে চিনতে সুবিধা হবে।আর তাছাড়া আজকে তাদের দুইজনের একজন আরেকজনকে চেনার একমাত্রই সহজ উপায়ই হচ্ছে এই ড্রেসকোড অর্থাৎ লাল ও সবুজ পাঞ্জাবী আর ফুলের তোড়া।

খণ্ডঃ সাত

আচমকা মিতুল তার কাঁধে কারো হাতের কোমল স্পর্শ অনুভব করলো। একটা মৃদু আওয়াজ তার কানে ভেসে এলো, “এইযে মিস্টার এতো উদ্বিগ্ন হয়ে কি ভাবছ শুনি ? একবার পেছনে ফিরে দেখো আমি এসে গেছি”। মিতুল মুহূর্তের মধ্যে পেছনে ফিরে দেখতে পেলো একদম গাঁড় লাল রঙের পাঞ্জাবী পরা আর বাম হাতে একতোড়া রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে এক অদ্ভুত সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে।মিতুলের আর বুঝতে বাকী রইলো না যে এই নিশ্চয়ই রাজন হবে। এই তার স্বপ্নের সেই মানুষটি যার জন্যে এতো অপেক্ষা এতো প্রতীক্ষা। লাল পাঞ্জাবীতে তাকে যেন সাক্ষাৎ রাজপুত্রের মত লাগতেছিল।মিতুল নির্বাক দাঁড়িয়ে কোন কিছু বলার ভাষা যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। রাজন নিজের হাতে থাকা রজনীগন্ধার তোড়াটা মিতুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-

– কি হল এতো অবাক হবার কি আছে?

~ না মানে ! আমি আসলেবুঝতে পারছি না কি করবো কি বলবো, ভাবতেই পারছি না ?

_ এতো মানে মানে করার কি আছে। আমি কি এলিয়েন নাকি যে আমাকে দেখে এতোটা হতবাক হয়ে গেছো। আরে আমাকে তোমার হাতের গোলাপের তোড়াটা অন্তত দাও। নাকি ওইটাও দিবে না, হাবার মত দাঁড়িয়ে থাকবে।

রাজনের হঠাৎ আগমন ও সহজসরল সম্বোধনে মিতুল পুরোপুরি নির্বাক ও বিস্মিত হয়ে গেলো। মিতুল যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। সত্যি কি সে কোন ঘোরের মধ্যে আছে নাকি বাস্তবের মাটিতে। যাই হোক রাজনের কথায় মিতুল কিছুটা লজ্জা পেলো এবং নিজেকে সামলে গোলাপের তোড়াটা রাজনের হাতে দিয়ে বলল

~ আচ্ছাতুমি কি সত্যিই রাজন? যদি সত্যিই রাজন হও তাহলে আমার হাতে একটা চিমটি কাটো।

_ হা হা হা… আরে বোকা মিথ্যার কি আছে। আচ্ছা ঠিক আছে এইতো চিমটি কেটে দিলাম হয়েছে এবার ?

~ উহ… এতো জোরে দিলে কেন ? ব্যথা লাগছে তো।

_ হা হা হা… কেন একটু আগেই তো বিশ্বাস করতে চাইছিলে না। এখন কি বিশ্বাস হয় আমাকে?

~ হা! ঢের বিশ্বাস হয়েছে।আসলে এভাবে ব্লাইণ্ড ডেট আমি আমার জীবনেও কোনোদিন কারো সাথে করিনি তো তাই কেমন যেন একটা অদ্ভুত ভয় কাজ করতেছিল আমার ভেতোরে। আমরা কেউ কাউকে চিনি না জানিনা অথচ কীভাবে কি হয়ে গেলো ভাবতেই ভীষণ অবাক লাগছে। সেই জন্য প্রথম প্রথম একটু অপ্রস্তুত ছিলাম বুঝতে পারিনি।

_ ও আচ্ছা তুমি জীবনে এই প্রথম ব্লাইণ্ড ডেটিং করলে আর আমি বুঝি রোজরোজ ডেটিং করে বেড়াই তাই না ? আমার ভেতোরে বোধহয় কোন ভয় কাজ করে নি? আমি বুঝি নির্লজ্জ বেহায়া ?

~হা হা হা… কি যে বল না। আমি কি ওভাবে বলেছি নাকি ! আচ্ছা যাও সরি। হয়েছে এবার।

_ ঠিক আছে আর সরি বলে নিজের সাতখুন মাফ পেতে হবে না। চল রেস্টুরেন্টের ঐ কর্নারে গিয়ে বসে কথা বলি। নাকি ওখানে হেটেও যেতে পারবে না। কোলে করে নিয়ে হবে ?

~ উহ… তুমি আসলেই একটা ফাজিল। আমি হেটেই যেতে পারবো । কোলে নিতে হবে না।

মিতুল আর রাজন রেস্টুরেন্টের একদম দক্ষিণ কর্নারের একটা টেবিলে গিয়ে বসলো। তখনো মিতুলের হাত-পা থর থর করে কাপতেছিল। সে স্বাভাবিকই হতে পারছিল না। মিতুলের এই বেহাল দশা দেখে রাজন ফাজলামো করে বলতে লাগলো-

_ আচ্ছা মিতুল এখন বল আমাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে কিনা ?বর হিসেবে আমাকে কেমন মানাবে তোমার সাথে? আমার কিন্তু বউ হিসেবে তোমাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তুমি দেখতে কিন্তু হেব্বি সেক্সি। হা হা হা…

~ হা হা হা হা…ধুর ফাজিল । কিসব উল্টাপাল্টা বলোনা। তোমার কথা শুনে আমি তো হাসতে হাসতে মরলাম।কেন পছন্দ হবে না। তোমাকে তো আমি বলেছি তুমি যেমনই হউ না কেন আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। শুধুই তোমাকে চাই। জানো, রাজন আজকের এই দিনটার জন্য আমি কতদিন কতরাত যে অপেক্ষা করেছি সেটা তোমাকে বলে বোঝানো যাবে না।মাঝে মাঝে ভাবতাম এইসব ফেসবুকের রিলেশনের কোন ভিত্তি নাই। এইগুলো শুধুই ধোঁকাবাজি। কিন্তু আমি মোটেও তোমার উপরে বিশ্বাস হারাই নি। অপেক্ষা করেছি এই মাহেন্দ্র ক্ষণটির জন্য। যেন মনে হচ্ছে হাজার বছরের অপেক্ষা আজ শেষ হল। আর আমি তোমাকে যেমন কল্পনা করেছিলাম তুমি দেখতে তার চেয়েও অসাধারণ অপূর্ব। আজকে তুমি এখানে না আসলে অথবা আমার সাথে প্রতারণা করলে আমি হয়তোবা মরে যেতাম না কিন্তু সারাটা জীবন তোমার সাথে ফেসবুকে ভাগাভাগি করা সমস্ত কথাগুলোকে স্মৃতি হিসেবে বুকে জড়িয়ে বেঁচে থাকতাম।আমার হৃদয় পটে তোমার যে ছবি আমি একেছিলাম সেই ছবির মানুষটাকেই বুকে নিয়ে ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে বেঁচে থাকতাম। আর কাউকে হয়ত কোনোদিন ভালবাসতে পারতাম না।তোমার স্থানে কাউকে বসাতে পারতাম না।

_ আমি জানি তুমি আমাকে এতোটা ভালবাসবে আর সেটা উপলব্ধি করার মত অসীম ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছিলেন বিধায় আমিও তোমাকে চিনে নিতে ভুল করিনি। আমিও তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি মিতুল।তোমার হাত ধরে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই।তোমার সাথে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জীবনটাকে উপভোগ করতে চাই। তুমি শুধু আমাকে এতোটুকু সুযোগ দিও। এর চেয়ে বেশি কিছু আমার চাই না।

খণ্ডঃ আট

প্রায় ঘণ্টা খানেক মিতুল আর রাজন অনর্গল গল্প করে চলছে। তাদের গল্প করার ভাব দেখে মনে হচ্ছে বিগত দুই বছরের সমস্ত মনের কথা, ভাবাবেগ , আলাপ-আলোচনা আজ একদিনেই মিটিয়ে নিচ্ছে। মন প্রাণ খুলে একে অন্যের সাথে হৃদয়ের গহীনে জমাকৃত সমস্ত ভালোবাসার ডালি ও পসরা সাজিয়ে বসেছে। এতক্ষণ আলাপের এক পর্যায়ে আচমকা মিতুল রাজন কে প্রশ্ন করে বসলো-

~ আচ্চা রাজন তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো ?একদম সত্য বলবা ?

_ কেন মিতুল তোমার মনে কোন সন্দেহ আছে আমাকে নিয়ে ? এতক্ষণ আমাকে দেখে কি তোমার মনে হয়েছে যে আমি তোমার সাথে কোন কারণে অভিনয় করতেছি?

~ যদি আমাকে সত্যিই ভালোবেসে থাকো তবে এইবার একটা সত্যি কথা বলবা? প্লিজ মিথ্যার আশ্রয় নিবা না যাহ্‌ সত্য তাইই বলবা ? কথা দাও?

_ আচ্ছা কথা দিলাম । বল কি জানতে চাও আমার কাছে ?

~ তুমি কি সত্যিই আমার রাজন কিনা ? যার সাথে আমি এতদিন ফেসবুকে চ্যাটিং করেছি। যার জন্য আমি এতদিন অপেক্ষার প্রহর গুনেছি। যারে না দেখেই মন প্রান অন্তরসব তার চরণে সঁপে দিয়েছি। যার জন্য জীবন বাজি রাখতে পর্যন্ত দ্বিধা করবোনা। সত্যি করে বলো তুমি কি আমার সেই রাজন? এই যে আমার মাথায় হাত রেখে বলো। তুমি আমার সাথে কোন ছলচাতুরী বা নাটক করছ না তো ?যদি এখন মিথ্যা বল তাহলে সারাজীবনেও আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারবোনা। আর তুমি কি চাও যে আমি এভাবে তোমাকে ঘৃণা করি। নিশ্চয়ই একজন বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তুমিও সেইটা চাইবে না। তাই আমার কাছে সত্য স্বীকার করো।

_ মানে কি, মিতুল তুমি এইগুলা কি বলতেছ ? আমি তোঁ কিছুই বুঝতেছিনা ?

~ আমার আর কিছুই বলার নাই। আর তুমি সব কিছু বুঝেও না বোঝার ভান করতেছো। তাই বলছি এখনি সব সত্য স্বীকার করো। শুরুতেই কষ্ট পাওয়া ভালো তাহলে হয়তো নিজেকে সামলাতে বেশি বেগ পেতে হবে না। সেইজন্যই তোমাকে জোরাজুরি করেই জানতে চাচ্ছি নইলে নিশ্চয় আমাদের প্রথম দেখা হবার দিনেই এভাবে তোমাকে আক্রমণ করতাম না।

_ আচ্ছা মিতুল কি কারণে আমাকে তোমার এমন মনে হচ্ছে ? কি এমন দেখলে আর বুঝলে যে আমি তোমার সেই রাজন নই ? আমি তো পুরাই অবাক হয়ে যাচ্ছি তোমার কথা শুনে।

~ তোমার সাথে আমার দেখা হবার পর থেকে তোমার কিছু আচার-আচরণ আর ফেসবুক চ্যাটিং এ বলা রাজনের চেহারার গঠনের সাথে তোমার চেহারার কিছু অমিল দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি তুমি আসল রাজন নউ। তুমি অন্য কেউ। ওর হয়ে এখানে প্রক্সি দিতে এসেছ। মিথ্যা অভিনয় করতেছো। সত্যি বলতে কেউ যখন কাউকে মন থেকে ভালোবাসে তখন তার সমস্ত বিষয় হৃদয়ে ধারণ করে। তাই চুল পরিমাণ পরিবর্তন হলেও সেইটা সহজেই ধরা যায়। আমি রাজনকে কোনোদিন চোখে দেখিনিসত্যি কিন্তু ওর নিজের সম্পর্কে আমাকে বলা ওর সমস্ত কথা পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে আমার অন্তরে গেঁথে আছে। যার সাথে তোমাকে মেলাতে পারছিনা।

_ কি মেলাতে পারছ না ? তুমি এইসব কি বলছ মিতুল ? বিশ্বাস করো আমিই তোমার সেই রাজন ? প্লিজ বিলিভ মি !

~ আর মিথ্যা বলো না। তুমি ধরা পড়ে গেছো এমনিতেই। আর সেটা তোমার চোখে মুখে স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে। আসলে একজনের শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়া অভিনয় আরেকজন পালন করতে গেলে সেইটা আপনাআপনিই প্রকাশ পেয়ে যায়। ঠিক যেমন তোমার অভিনয় আমার কাছে পরিষ্কার ধরা পড়ে যাচ্ছে।যেমন রাজন বলেছিল ওর ঠোঁটের নিচে বামদিকে একটা বড় কালো তিল আছে, ওর মাথার চুলগুলো কিছুটা কোঁকড়ানো ধরণের আর কপালেছোটবেলাতে পাওয়া একটা বড় আঘাতের চিহ্ন লাল হয়ে আছে। হাসলে নাকি তার দাঁতের পাটি পুরাটাই বের হয়ে যায়। কিন্তু তোমার মাঝে সেইগুলো একেবারেই অনুপস্থিত। আরো বলেছিল আমাদের যখন প্রথম দেখা হবে সে পেছন দিক থেকে এসে ডানহাত দিয়ে আমার চোখ বন্ধ করে আমাকে চমকে দেবে আর বাম হাত দিয়ে ফুলের তোড়া আমার বুকে চেপে ধরবে। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য যেটা আমার চোখে লেগেছে তা হলো ও আমাকেদুষ্টামি করে জান পাখি বলে ডাকতো এবং আমাদের দেখা হলেও প্রথমেই ও আমাকে জান পাখি বলেই সম্বোধন করবে বলেই ঠিক করেছিল কিন্তু তুমি একেবারেই তার বিপরীত আচরণ করেছো। এখন সত্যি করে বল তুমি কে আর রাজন কে ?

_ তুমি যখন সত্য ধরেই ফেলেছ তখন আর মিথ্যা বলে শুধুশুধু তোমাকে কষ্ট দেবার কোন মানেই হয় না। গোপন করার কোন অর্থই হয় না। হ্যাঁ মিতুল তুমি একদম ঠিক ধরেছ আমি রাজন নই। আমি অয়ন। এবং তোমার সত্য ও পবিত্র ভালোবাসা দেখে আমি আসলে অভিভূত হয়ে গেছি যে এভাবে কেউ কাউকে অন্ধের মত ভালবাসতে পারে। সেটা আমার জানা ছিল না। পৃথিবীতে তাহলে সৎ ও খাটি ভালোবাসা বলে এখনো কিছু আছে তা তোমার কাছ থেকেই শিখলাম। তাই আর মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে সত্য স্বীকার করলাম।

~ আচ্ছা থাক আমাকে আর আমার ভালোবাসার ফিরিস্তি গেয়ে শোনাতে হবে না। এখন বল আমার সাথে এমন নাটক কেন করলে ? কি অন্যায় করেছিলাম আমি ? কেন এমন প্রতারণা করলে আমার সাথে ? আর তুমি যদি অয়ন হউ তাহলে রাজন কে ? সে কোথায় আছে ?

_ হ্যাঁ সে আছে। রাজন এখানেই আছে।

~ কোথায় সে আমি তাকে দেখতে চাই আর তার কাছে জানতে চাই সে আমার সাথে কেন এমন করলো ? আর কেনই বা তোমাকে আমাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি করে পাঠালো? প্লিজ বলো সে কোথায় ?

_ এইতো মিতুল তোমার একটু পেছনের টেবিলেই সে বসে আছে। তুমি পেছনে ঘুরে তাকালেই তাকে দেখতে পাবে ?

খণ্ডঃ নয়

মিতুল পেছনে ঘুরে তাকিয়ে যা দেখল তাঁতে তার চোখ রীতিমত বিস্ফোরিত হলো। সে দেখে একটু পেছনের একটা চেয়ারে হুবহু অয়নের দেখতে এক সুদর্শন যুবক বসে আছে। ঠিক তার দেয়া ড্রেসকোড অনুযায়ী লাল পাঞ্জাবী আর সাদা পায়জামা পরিহিত অবস্থায়। যার ছবি মিতুল কল্পনার ক্যানভাসে একেছিল অবিকল তার মতন দেখতে। তার দিকে মিতুলের চোখ পড়া মাত্রই সে মৃদু হেসে উঠলো। মিতুল দৌড়ে তার কাছে গেলো এবং গিয়েই সরাসরি তার দুধসাদা মুখে সজোরে কষে একটা চড় বসিয়ে দিল।মিতুল তার শার্টের কলার চেপে ধরে তাকে টেনেহিঁচড়েচেয়ার থেকে তুলে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “আমার সাথে কেন প্রতারণা করলে? কেন আমাকে ঠকালে? নিজেই যদি দেখা না করবে তাহলে কেন এতদিন মিথ্যা অভিনয় করলে”।হঠাৎ মিতুলের এমন আচরণ আর চিৎকারে রেস্টুরেন্টে উপস্থিত সবাই রীতিমত ভিরমি খেয়ে গেলো। পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরে অয়ন দৌড়ে এসে মিতুলকে শান্ত করতে লাগলো। রাজনের কাছ থেকে মিতুলকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলো। কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করে মিতুল ভীষণ অবাক হল যে তার এমন আচরণে সবাই হকচকিয়ে গেলেও রাজন দিব্যি মিটিমিটি করে হেসেই চলেছে একটা টুঁশব্দ পর্যন্ত করছে না। এতো মানুষের ভিড়ে অপমান লাঞ্ছনা সহ্য করেও বেহায়ার মত রাজনকে হাসতে দেখে মিতুলের মাথায় অত্যধিক রাগ চেপে গেলো। সে তৎক্ষণাৎ অয়নকে বলল তুমি ওকে হাসতে নিষেধ করো নইলে কিন্তু আমি আবার ওকে মারবো। অয়ন মিতুলকে উদ্দেশ্য করে বলল ওই হাঁসিটাই যে এখন ওর জীবনের একমাত্র সঙ্গী তাছাড়া ওর জীবনে আনন্দ-উল্লাস বলে আর কিছু অবশিষ্ট নাই। অয়নের কথায় মিতুল বিস্মিত হয়ে তার কাছে জানতে চাইলো কেন কি হয়েছে রাজনের ?

অয়ন যা বলল, “তোমার সাথে ফেসবুকে রাজনের পরিচয় হবার কিছুদিন পর আমেরিকাতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় রাজন তার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।এখন ওর কথা বলার মাধ্যম হচ্ছে লিখে লিখে কাউকে কিছু বোঝানো নতুবা ইশারা-ইঙ্গিতে কাউকেকিছু বোঝানোর চেষ্টা করানো। শুধু তাইই নয় ওর বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকেও কেটে ফেলা হয়েছে। ভালো করে খেয়াল করে দেখো রাজন যে চেয়ারে বসে আছে তার পাশের চেয়ারে একটা ক্র্যাচ রাখা আছে। ও এখন ওই ক্র্যাচে ভর দিয়েই হাঁটাচলা করে। এতদিন রাজনের জীবনের একমাত্র সঙ্গী ছিল ঐ ফেসবুক আর তুমি। তোমার সাথে অনালাইনে হাসি-আড্ডা-আনন্দ-বেদনায় মেতে থাকতে ভালোবাসতো। তোমার ভেতোরেই ও যেন জীবনের নতুন অর্থ খুঁজতে শুরু করলো”।

অয়নের অনর্গল বলে যাওয়া কথাগুলো মিতুলের গায়ে কাঁটার মত বিঁধল। এমন অসহায় একজন মানুষের শরীরে না বুঝে রাগের বসে কীভাবে হাত তুলতে পারলো সেটা ভেবে নিজেকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছা হচ্ছিলো মিতুলের।

~ তাহলে তুমি কে ? তোমাকে কেন পাঠাল আর তোমার চেহারার সাথেই বা ওর চেহারার এতো মিল কেন ?

¬_ আমি আর রাজন দুই ভাই। হ্যাঁ আমরা দুইজন যমজ ভাই। আমাদের দুইজনকে দেখতেও হুবহু একইরকম লাগে। আর আমাদের দুইজনের মধ্যকার সম্পর্কও একেবারেই বন্ধুসুলভ তাই রাজন সবসময়ই তোমার বিষয়ে আমাকে সবকিছুই জানাইত। সবই ঠিকঠাক চলতেছিল কিন্তু বাধ সাধল ওর মারাত্মক এক্সিডেন্ট এর পর দেশে ফেরার কথা শুনে যখন তুমি রাজনের সাথে দেখা করতে চাইলে তখন। রাজনও কিছুতেই পারছিল না তোমাকে না দেখে থাকতে। কারণ সেও তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসে। কিন্তু কোনমতেই সে চাইছিল না তার এই অসহায়,নির্বাক ও জরাগ্রস্থ জীবনের সাথে তোমাকে জড়িয়ে তোমার জীবনকে নষ্ট করতে। একবার ভেবেছিল তোমার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিবে কিন্তু সে আসলেই তোমার প্রতি এতোটাই দুর্বল যে সেটা করাও ওর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অতঃপর আমার শরণাপন্ন হতে বাধ্য হল। কারণ আমি আর ও দেখতে যেহেতু একই রকমের তাই সে আমাকেই কাজে লাগাতে চাইলো। আমাকে এক প্রকারে জোরজবরদস্তি করেই রাজি করাল তোমার সাথে দেখা করতে কথা বলতে। এখানে ওর কোন খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। ও তোমাকে হারাতে চায় নি। শুধু চেয়েছিল যে আমিও যদি অন্তত তোমাকে পাই তবে ও সারাজীবন অন্ততপক্ষে তোমাকে দূর থেকে দেখতে তো পাবে। আর এটাই ছিল ওর অসহায় জীবনের একমাত্র চাওয়া। সেই জন্যই আমাকে তোমার কাছে পাঠাইছে আর এতো নাটক করেছে। কিন্তু তুমি তোঁ সবই বুঝে ফেলেছ। এখন কি আর করা।

খণ্ডঃ দশ

অয়নের মুখের নিষ্ঠুর সত্য কিছুকথা শুনে মিতুল নিজের চোখকে আর সংবরণ করতে পারলো না।অঝোরে কেঁদে ফেললো। এতো ভালোবাসা কোন মানুষ কোন মানুষকে করতে পারে সেটা ভেবে সে মূর্ছা যাচ্ছিল। অতঃপরধীর ধীর পায়ে মিতুল রাজনের কাছে গেলো। রাজন তখন নিচের দিকে মুখ করে তাকিয়ে সেই একই চেয়ারেই বসে ছিল।মিতুল আস্তে করে তার পায়ের উপর হাত রেখে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে রাজনের মুখের দিকে তাকাল। মিতুল দেখল দুধসাদা মুখখানিতে তার চড়ের আঘাতে লালদাগ বসে গেছে।মিতুল আলতো করে রাজনের মুখে হাত বুলিয়ে দিলো।মিতুল রাজনের মুখখানি হাত দিয়ে উপরে তুলতেই রাজন ফুঁপিয়েফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। মিতুল তখন রাজনের পায়ের উপর মাথা ঠেসে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আর জোরে জোরে বলতে লাগলো-“ কেন তুমি এমন করলা? আমি কি তোমার দেহের জন্যে তোমাকে ভালবেসেছি ? আমি কি দেহের পাগল ? আমি ভালবেসেছি তোমাকে শুধু তোমাকে। আমার সাথে ফেসবুকে চ্যাঁট করা সেই রাজনকে। তোমার হাত-পা না থাকলে না থাকুক তো তাঁতে কি হয়েছে ? ঐগুলো কিচ্ছুই চাই না আমার। আমার সাথে তোমার কোন কথাও বলা লাগবে না। আমি শুধু একজন মানুষকে চেয়েছি যাকে আমি এতদিন মনে প্রাণে ধারণ করেছি তাকে। আমি তোঁ তোমার দেহের সনে প্রেম করিনি আমি প্রেম করেছি তোমার মনের সনে আত্মার সনে। কিন্তু তুমি কীভাবে বিশ্বাস করলে যে তোমার পা নেই, বাকশক্তি নেই বলে আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেবো ? এতদিন আমার সাথে কথা বলে আমার উপর এতোটুকু আস্থা অর্জিত হয়নি। আমাকে তুমি এইভাবে অবিশ্বাস করলে। বোকা বানাতে চাইলে কেন ?”।

রাজন শুধু অসহায়ের মত মিতুলের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। আর মিতুলের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে রাজন হাত দিয়ে মিতুলের ঠোঁট চেপে ধরল তাকে থামানোর জন্য। কিছু একটা বলার জন্য নিজের ঠোঁটকেবার কয়েকবার নাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুই বলতে পারলো সে। কিন্তু রাজনের মৌখিক অভিব্যক্তি দেখে মিতুল বুঝতে পারলো নিশ্চয় রাজন তার কৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে চাচ্ছিল। মিতুল দ্রুত রাজনের ঠোঁট দুখানি হাতের তালুতে বন্দি করে তার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল, “আজ থেকে তোমার কোন কথা বলার চেষ্টাও করা লাগবে না। আমি আর তুমি আজ থেকে এক। আমরা দুইজন শুধুই দুইজনার। মনে করবা আমাদের একই দেহে দুটি প্রাণ। তোমার সমস্ত কথা আমি বলবো। তোমার পা নেই তোঁ তাঁতে কি হয়েছে । তোমার সমস্ত পথচলা আমি চলবো।আমি চলা মানেই তোমারও চলা আর আমি কথা বলা মানেই তোমারও কথা বলা। তোমাকে আমার জন্য আর কষ্ট করতে হবে না।আমি তোমাকে আজীবন ভালোবেসে যাবো তুমি শুধু আমার পাশে থেকে এই হাতটি শক্ত করে ধরে রেখো”।

খণ্ডঃ এগার

মিতুলের মুখনিঃসৃত মধুর বাণী শ্রূত হয়ে রাজন সজোরে চিৎকার করে কেঁদে মিতুলকে জড়িয়ে ধরল। মিতুলও রাজনকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। অয়ন দূর থেকে সবকিছু দেখে নিজের চোখের পানি মুছে মৃদুমুচকি হেসে উঠলো। রাজন আর মিতুলকে কোনপ্রকার ডিস্টার্ব না করে সে সেখান থেকে প্রস্থান করলো। মিতুল রাজনকে চেয়ার থেকে উঠিয়ে দাড় করাল। রাজন ক্র্যাচে ভর করে দাড়াতে চাইলে মিতুল রাজনের এক হাত নিজের কাঁধে নিয়ে ক্র্যাচ টাকে ফেলে দিয়ে বলল, “আজ থেকে আমিই তোমার ক্র্যাচ। আমি যতদিন তোমার পাশে থাকবো ততদিন তোমার আর কাঠের ক্র্যাচে ভর করে চলতে হবে না”। অতঃপর রাজন মিতুলের কাঁধে ভর করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো। দুইজন একই সাথে অজানা কোন রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলো একান্তে নিরিবিলি কিছুটা মুহূর্ত উপভোগ করতে। অবশেষে অনেক বেদনা কষ্ট আর পাহাড়সম ভুল বোঝাবুঝির পর এক বৈশাখে দেখা হল দুজনার।এক বৈশাখে মিল হল দুজনার। এক বৈশাখে জয় হল ভালোবাসার।

( গল্পের মূলভাবঃ প্রেমই স্বর্গ প্রেমই নরক, প্রেমই বাঁচা মরা, প্রেম কইরো না দেহের সনে, আত্মার সনে ছাড়া। )

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১৪ই এপ্রিল, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.