এক মুঠো স্বপ্নের খোঁজে

লেখকঃ সবুজের নীলাকাশ

নিজের মনের সাথে অবিরাম যুদ্ধের পর একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে,রোহানের কাছেই যাব।ব্যাগ গোছাতে গোছাতে রোহানকে নিয়ে সাত পাঁচ ভাবনায় অন্তর্ধান নিবেশ করলাম।যতদূর জানি বি,বি,এ শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরীরত আছে সে।অধ্যয়নে ব্যস্ত থাকাকালীন কখনো ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু এবারে আর রেহাই মিললো না।পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছি ঢাকায় যাওয়ার জন্য,উদ্দেশ্য বিসিএস পরীক্ষা।কিন্তু বিপাকে পড়ে গেলাম এই ভেবে অজানা অচেনা ঢাকায় কার কাছে যাব,কোথায় উঠব?আমার ভাবনায় উৎকন্ঠার রেখাপাত হতে লাগল।কোন কূল কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ এই প্রথমবার ঢাকায় যাচ্ছি,তাও একা।তাই মনে একটা সঙ্কিত অনুভব বিরাজ করছে।হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়ল জয় নামে এক বন্ধুর সুপরামর্শে।তবে প্রথম প্রথম তার পরামর্শে সায় দিতে চাইনি।পরক্ষণে ভেবে দেখলাম এছাড়া দ্বিতীয় কোন অবলম্বন আপাতত আমার সান্নিধ্যে নেই।তাই আর আদি অন্ত না ভেবে রাজি হয়ে গেলাম।জয় আমাকে রোহানের কাছে যেতে বলেছিল।

রোহানের নামটা শুনেই আঁতকে উঠি আমি ।একটা অপরাধবোধ যেন ঘিরে ধরতে লাগল আমার সর্বানুভূতিকে।রোহান আর আমার সম্পর্কের বিচ্ছেদ হয়েছে প্রায় দুবছর হল। এর মাঝে ওর সামনে দাঁড়াবার সাহস কল্পনায়ও হয়নি আমার।খুব বেশি হলে চলতি পথে কদাচিৎ দু’একবার দেখা হয়েছিল। তবে শুধু পাশ কাটানো ছাড়া কোন উপায় ছিল আমার।অথচ আজ তাকেই বেছে নিলাম আমার সমস্যার সমাধান করার জন্য।হায় নিয়তি!

ঢাকায় যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম সেই সাথে রোহানের সাথেও একপ্রকার কথা হল তার ফ্ল্যাটে ওঠার ব্যাপারে।রাতে নিশ্চিন্ত মনে ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলাম।পরদিন বিকাল ৫টায় বাসযাত্রায় ঢাকায় পাড়ি জমাতে হবে ।হয়তো অর্ধেক রাত বাসেই অতিবাহিত হতে পারে তাই তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু চোখজোড়া যেন বেজায় তন্দ্রাহারা,ঘুমের কোন লক্ষণই নেই।হূদয়ের অন্তপুর থেকে ধেয়ে আসা কিছু টুকরো স্মৃতি ক্ষণেক্ষণে কড়া নাড়ছে উচ্ছল মনটাতে।আমি বারংবার চেষ্টা করলাম উদ্ভূত অতীতটাকে চাপা দেয়ার জন্য ।

আসলে যে অতীতটাকে আড়াল করার জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি, সেই অতীতটাই কাল আমাকে বর্তমানের কাছে নিয়ে যাবে।হাজার চেষ্টা করেও ধরা দিলাম কিছু জীবন্ত অতীতের কাছে।অকপটে একের পর এক স্মৃতিময় দিন চোখের সামনে ভাসমান হতে লাগল।উপলব্ধি করতে লাগলাম রোহানের সাথে কাটানো প্রথম দিনটি ।যেদিন তার মুখের কিছু উক্তি আমার তৃষিত মনটার খোড়াক জুগিয়েছিল।সাত সতের ভাবতে ভাবতে চোখের কোণায় এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু অনুভব করলাম।চোখ মুছে আবারও ঘুমানোর চেষ্টায় মগ্ন হলাম।তারপর কখন যে দুচোখ জুড়ে ঘুমের আবেশ নেমে এসেছিল টের পাই নি।

পরদিন বিকাল সাড়ে চারটায় বাবা মার কাছে বিদায় নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে ছুটলাম তল্পিতল্পাসহ।তল্পিতল্পা বলতে দু’তিন থাকার জন্য আনুসঙ্গিক যা প্রয়োজন হয় আরকি।বাসস্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বাস চলে এলে বাসে উঠে নিজস্ব সিটে বসে পড়লাম।পাশের সিটে ছিলেন এক বৃদ্ধ দাদু,ঢাকায় যাচ্ছেন বড় মেয়ের কাছে।যেতে যেতে খানিকটা গল্পও হল ওনার সাথে। এদিকে রোহান ফোন দিয়ে খবর নিতে শুরু করল-বাসে উঠেছি কিনা,সিট ঠিক ঠাক পেয়েছি কিনা,বাস কখন রওয়ানা দিল,কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।রোহানের কাছ থেকে এসব বহুবিধ কৌতুহলী প্রশ্ন শুনে মনে হল তার কাছে আমি যেন ছোট্টটি আছি এখনো। যেন এক প্রেমিক চাতক পাখির মত পথ চেয়ে আছে তার প্রেমিককে কাছে পাওয়ার জন্য। ঠিক এক সদ্য জমে ওঠা প্রেমে দুই প্রেমিকের নিঃস্বার্থ প্রেমালাপের মত।আমার অনুভবে খুশির ছটা প্রবাহিত হচ্ছে।মনে হচ্ছে এতদিন যে স্বপ্নটার খোঁজে একা পথে হেটেছি, সে স্বপ্নের খুব নিকটে আমি।ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে জানালার ধারে মুখ রেখে ভাবনায় ডুব দিলাম।

দ্বাদশ শ্রেনীর শেষ পর্যায়ে এইচ,এস,সি প্রস্তুতি কোচিং করতে গিয়ে রোহানের সাথে আমার পরিচয় হয়।সেখান থেকে বন্ধুত্ব,ভাললাগা, তারপর ভাললাগার গন্ডি পেরিয়ে ধীরে ধীরে ভালবাসায় পদার্পণ করে আমাদের সম্পর্ক। এই পরিণত সম্পর্কের হাত ধরে শুরু হয় দুজনের পথচলা।রোহানের মুখে একটা শুনে একদিন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম আমি।সে বলেছিল, “জানো শিমুল ইতিহাসে শুধু প্রেমিকা প্রেমিকাদের নাম আর তাদের ভালবাসার কাহিনী স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে যেমন-শিরি ফরহাদ,লাইলী মজনু,রাধা কৃষ্ণ আরো অনেকের।আজ মানুষ ভালবাসার উদাহরণ দিতে গিয়ে অবলীলায় তাদের নাম উচ্চারণ করে।তাই আমারো ইচ্ছে করে ইতিহাসে আমার নামটা যোগ করার জন্য।যেখানে আমার নামের পাশে কোন প্রেমিকার নাম থাকবেনা, থাকবে একজন প্রেমিকের নাম।দুই পুরুষের ভালবাসা নিয়ে রচিত হবে অভূতপূর্ব প্রেমকাহিনী।মানুষ আজীবন স্মরণ করবে রোহান আর শিমুলের অমর প্রেমকে”

রোহানের মুখে এমন অবাস্তব আজগবি কথা শুনে অবাকের পাশাপাশি অট্ট হাসি হেসে ওর কথাগুলো উড়িয়ে দিয়েছিলাম।তখন কল্পনায়ও বুঝতে চেষ্টা করিনি ঐ আজগবি কথাগুলোর ভাবার্থ,তাৎপর্য। হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়ল পাশে সিটের দাদুর ডাকে। দাদু হাতে আপেল নিয়ে বললেন-এই যে দাদুভাই আপেল খাবা?
-ধন্যবাদ দাদু,আমি জার্নির সময় কিছু খাই না।
-ও ঠিক আছে।

আমি আবার ভাবনায় মনটা শোপে দিলাম। রোহান আর আমার ভালবাসা দিন দিন গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগল।তখনও সে ছিল আমার সমস্ত আবেগজুড়ে,হূদয় জুড়ে।কিন্তু কালক্রমে আমার অজান্তেই তার প্রতি আমার সব ভাললাগা,ভালবাসা আস্তে আস্তে শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে শুরু করল। এইচ,এস,সি রেজাল্টের পর রোহান ঢাকায় বেসরকারী ভার্সিটিতে ভর্তি হল আর আমি নিজ জেলাতেই থেকে গেলাম।এই দূরুত্বটাই রোহানকে মন থেকে সরিয়ে দিতে আমাকে স্পৃহা দিতে লাগল।পরবর্তীতে আমাদের যোগাযোগটা ফোনেই সীমাবদ্ধ থাকল।তাও শুধুমাত্র রোহানেরই বদৌলতে।আমার ইচ্ছে হলে ওকে ফোন দিতাম কখনোবা ইচ্ছাটাতে বেখেয়ালের ভাটা পড়ে যেত। রোহানকে ভুলতে হয়তো পেতাম না ,যদি না অন্য কেউ আমার ভাললাগা চিত্তে চেপে বসত।ভার্সিটিতে ইমন নামের এক ছেলেকে প্রথম দেখেই তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করলাম।আর সেদিন থেকেই রোহান নামটি ভাটা পড়ে ইমন নামটি উদ্ভাসিত হল আমার মনের মন্দিরে।

ইমনের ভালবাসা পাবার আশায় দিন দিন তার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে উঠে পড়ে লাগলাম।কাকতালীয়ভাবে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লাম দুজনে। দু’তিন মাসেই অতিরঞ্জিত হল আমাদের ভালবাসার সম্পর্ক।এদিকে রোহান ফোন দিলে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে কয়েকটা কথা বলে ফোন কেটে দিতাম।আর দিনভর ইমনের সাথে ফোনালাপে মেতে উঠতাম। রোহান ঢাকা থেকে এসে বাড়ি না গিয়ে সোজা আমার কাছে আসতো দেখা করার জন্য।ওকে দেখলে কেন জানি অস্বস্তি অনুভব করতাম,সহ্য করতে পেতাম না।মনে মনে প্রমাদ দিতাম, ও সামন থেকে গেলেই বাঁচি।তবুও অসহ্য অনুভবটাকে নিজের মাঝে ডুবিয়ে রোহানের সাথে মিথ্যে ভালবাসার অভিনয়ে নিজেকে নিয়োগ করলাম। আমি ভেবে পেতাম না, আমার এই সীমিত ভালবাসায় সে কীভাবে অনন্ত স্বরুপ ভালবাসার খোঁজ পেল।

হঠাৎ ভাবনা থেকে চমকে উঠলাম ফোনটা বেজে ওঠার কারনে।রোহান ফোন করেছে আমাদের বাস কোথায় তা জানার জন্য। আমি বাহিরে বিভিন্ন ব্যানার তাকিয়ে জায়গার নাম বলে দিলে সে ফোনটা কেটে দেয়।তারপর আবার অতীত ভাবনায় মনোনিবেশ করলাম।ভাবতে বেশ ভালই লাগছিল।

মিথ্যে অভিনয়ের স্বাদ আস্বাদন করতে করতে মাঝে মাঝে হাঁফিয়ে উঠতাম।তাই একদিন ইচ্ছে করেই রোহানকে ইমনের ব্যাপারে সব খুলে বললাম।ইমন আর আমার সম্পর্কের কথা শুনে রোহান যেন নির্বাক আর স্পন্দনহীন হয়ে গেল।আমার সামনেই টলমল করতে লাগল সে।তার এরুপ অবস্থা দেখে তাকে রিকশায় নিয়ে বাসায় পৌছে দিয়ে আসি। ওর অসুস্থতায় আমার লেশমাত্র কষ্ট অনুভব হয়নি বরঞ্চ তাকে রেখে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি বারবার।এ ঘটনার রেশ ধরেই রোহান আমার সাথে তিনদিন কোন প্রকার দেখা কিংবা ফোনদেয়া অতঃপর কোন যোগাযোগই করত না।চতুর্থদিনে ঠিকই আবার আমার ধারের কাছে ঘেঁষত।তবে এরপর থেকে ওর সাথে যতবার দেখা বা কথা হয়েছে আমাদের মাঝখানে শুধু ইমনের প্রসঙ্গই এসেছে।কখনো ইমনকে কেন্দ্র করে ঝগড়াও হত।

আমি প্রতিনিয়ত আমাদের কথার মাঝখানে ইমনের প্রশংসা জুড়ে দিতাম এবং আমার আর ইমনের অন্তরঙ্গ মুহুর্তগুলো রোহানকে শেয়ার করতাম।এসব শুনতে শুনতে রোহান ইমনকে একপ্রকার হিংসা করতে লাগল।তার ঐ হিংসার বহিঃপ্রকাশ করার জন্য একটু ঈর্ষাকাতর স্বরে আমাকে বলল আমি কাকে চাই রোহানকে না ইমনকে?আমি এক মিনিটও ভাবার সময় নিই নি প্রতিত্তর দিতে।কারণ এতদিন থেকে এমনই এক দিনের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতেছিলাম আমি।ওর প্রশ্ন শোনা মাত্রই ভালবাসার মোহে হিতাহিত জ্ঞান বিসর্জন দিয়ে উল্লাসিত চিত্তে অপকটে ইমনের নামটাই প্রকাশ করি।
এরপর আমার ইচ্ছাকে সায় দিয়ে রোহান তাকে ভুলে যেতে বলে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়।ওর প্রস্থান আমাকে কিঞ্চিত পরিমান কষ্ট দিলেও ইমনকে ভেবে সেই কষ্ট নিমিষেই শূন্যে বিলীন হয়ে যায়।

সময়ের দোলায় অগ্রসর হতে থাকে ইমন আর আমার ভালবাসার লীলাখেলা।কিন্তু খুব বেশী দীর্ঘায়িত হলনা আমাদের এই প্রেম প্রেম খেলা।একদিন এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পেলাম ইমনের বিয়ের খবর।কথাটা শুনে মোটেও বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না অবুঝ মনটাকে।তাই তৎপর হয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পেলাম সত্যি সত্যি সে পালিয়ে বিয়ে করেছে তার প্রেমিকাকে। আমার সব স্বপ্ন যেন ক্ষণিকেই মরুময়তায় পরিণত হয়ে গেল।একদিকে বিশ্বাসঘাতকতা আর একদিকে সত্যিকারের ভালবাসা হারানোর আক্ষেপ আমাকে পীড়া দিতে লাগল।চারপাশের দেয়ালজুড়ে শুধু একাকীত্ব আর থৈ থৈ কষ্টের কালো অমানিশা আমার পিছু ধাওয়া করতে শুরু করল।নিয়তির এ নির্মম আঘাতে শীর্ণ,নিথর হল আমার মন আমার চলন্ত জীবন।

চাইলেই হয়তো ছুটে যেতে পারতাম রোহানের কাছে। কিন্তু কোন দাবি নিয়ে দাঁড়াব তার সামনে।যেই আমি একদিন তাকে,তার স্বচ্ছ ভালবাসাকে অকপটে প্রত্যাখান করেছিলাম।তার ভালবাসা পেয়েও বুকে আগলে রাখতে পারিনি আমি। হৃদয়ের কানায় কানায় পূর্ণ কাতরতা,অব্যক্ত অসহনীয় কষ্ট আর একরোখা জেদ নিয়ে ভালবাসা নামক মরীচিকাটাকে মুক্তি দিলাম।মনের সব ভাললাগাকে চিরতরে বলীদান করে সব নিছক স্বপ্ন থেকে অব্যাহতি নিলাম এই ভেবে,অলীক সুখের কল্পনা করে দুঃখ বাড়িয়ে আর কি হবে।তাই নিতান্তই মন ভোলানো ভালবাসার মোহে আর নিজেকে জড়াতে চাই নি।

বাসের ধাক্কায় চমকে উঠে ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলাম।তখন রাত ১.৫০,যাত্রা সমাপ্তি করে আমাদের বাস ঢাকার বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান করছে।সাথে সাথে রোহানের ফোন পেয়ে কথা বলতে বলতে বাস থেকে নেমে তাকে চারিদিক খুঁজতে লাগলাম। ফোন কেটে দিয়ে হঠাৎ ঝড়ের মত দৌড়ে এসে আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার সামনে হাজির হল রোহান।আর কিছু না বলে নিষ্পলক দৃষ্টিতে আমার পানে চেয়ে রইল ।ওকে সামনে দেখে আমার সমস্ত অনুভূতি যেন অসার হয়ে থমকে গেল।সব দ্বিধা ভুলে আমিও তার চাহনিকে আশকারা দিয়ে আমার চোখজোড়া ওর চোখে নিবদ্ধ করলাম।

কিছুক্ষণ পর আমাদের চার চোখের মিলিত দৃষ্টিকে নিষ্কৃতি দিয়ে অটোতে উঠে রোহানের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।অটোতে ঘুমন্ত আবেগে রোহানের কাঁধে মাথাটা শোপে দিয়ে সারাটা রাস্তা অতিক্রান্ত করে প্রায় ১৫ মিনিট পর ফ্ল্যাটে পৌছে গেলাম।দীর্ঘযাত্রার পর ক্লান্তি আর অবসাদের কারনে কিছু না বলেই বিছানায় ঢলে পড়লাম আমি।রোহানও কিছু না বলে আমার পাশে শুয়ে পড়ল।

সকাল সোয়া নয়টার দিকে ঘুম ভাঙল আমার।একটা লম্বা আড়মোড়া দিয়ে রুমের চারপাশটা এক নজর বুলিয়ে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইলাম।একটু পর রোহান রুমে ঢুকে আমাকে দেখে বলল,শুভ সকাল শিমুল। আমি কিছু না বলে রোহানের আপাদমস্তক অবলোকন করতে ব্যতিব্যস্ত হলাম। চোখে খয়েরি ফ্রেমের চশমা,চুলগুলো এলোমেলো,মুখে চিকচিকে কালো খোঁচা দাঁড়ি।ওকে দেখে কেন জানি ওর প্রতি আমার সুপ্ত ভালবাসাগুলো মনের গভীর থেকে উঁকি দিয়ে আমার অনুভূতিকে অদ্ভূত শিহরণে আর্দ্র করে তুলেছে।
রোহান আমাকে নিশ্চুপ দেখে ভ্রু কুচকিয়ে আবার বলল,কি ব্যাপার চুপচাপ কেন,ঘুম ঠিকঠাক হয়েছে তো?
আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে বললাম,শুভ সকাল।হ্যাঁ সুন্দর একটা ঘুম দিয়েছি।
-যাও ফ্রেশ হও।আমি নাস্তা রেডি করছি।

ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসে পড়লাম,সাথে রোহানও।নাস্তা সেরে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখে ওকে বললাম,
-দশটা বাজতে চলল আজ অফিস যাবে না?
-না যাব না।আজ আমার ছুটি।
-ছুটি মানে?
-তুমি আসবে বলে দুদিনের ছুটি নিয়েছি।
-তাই!সত্যি আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।
-এ আর কি,তোমার জন্যই তো নিয়েছি।
-চশমা পড় কবে থেকে?
-এই তো পাঁচ ছয় মাস হবে।খুব বিশ্রী লাগে তাইনা?
-আরে না।অনেক সুন্দর লাগে।
-তাই নাকি?তোমার ভাল লাগলেই আমার চোখ আর চশমা সার্থক।
-হা হা হা।যা বলেছো।
-আমার কথা হেসে উড়িয়ে দেবে এটাই স্বাভাবিক।
-বাদ দাও তো।আচ্ছা তুমি কি এই রুমে একাই থাক?
-না আরেকজন আছে।ওনি এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেছেন।একটা কথা বলব?
-বলছো ই তো।হুকুম নেয়া লাগে নাকি।
-না মানে কথাটা হচ্ছে, ইমন….. কেমন আছে?
-ইমন! হঠাৎ এ প্রশ্ন।
-না এমনিতেই জানতে ইচ্ছে হল,তাই আরকি।
-ইমন আছে ইমনের মত, আমি আমার মত।
-মানে কি?
-আসলে আট মাস আগে আমাদের রিলেশন ব্রেকআপ হয়ে গেছে।(একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম)
-ও মাই গড! কেন,কীভাবে হল? তোমরা তো দুজন দুজনকে ভীষণ ভালবাসতে।

আমি রোহানকে ইমনের বিয়ের ব্যাপারে পর্যায়েক্রমে সব খুলে বললাম।আর এভাবে কথায় কথায় অনেক কথাই হল রোহানের সাথে। তবে একটা কৌতুহল আমার সব ভাবনাকে এলোমেলো করে তুলছে। আমাদের কথা চলাকালীন রোহানের ফোনে বারবার কল আসা আর তা কেটে দিয়ে রোহানের লুকায়ে যাওয়াটা।আমি কলটা ধরতে বলাতে রোহান দ্রুত রিসিভ করে একটু দুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে লাগল।প্রায় ৪০ মিনিটের মত কথা বলল সে। কথোপকথন শুনে আন্দাজ করলাম, রোহান নিশ্চয়ই কোন সম্পর্কের পথে হাঁটছে।আবার নিজেই নিজেকে স্বান্তনা দিলাম এই ভেবে, নাও তো হতে পারে।জিজ্ঞেস করতে চেয়েও নিজের মাঝেই দমিয়ে রাখলাম।বিকেলে প্রচুর উৎসাহ নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে।আমি মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম রোহানকে বলেই দেবে যে, আমি তার কাছে থেকে যাব। কিন্তু আমি বলার আগেই আমার কৌতূহলের অবসান ঘটে আমার সব আশার মুখে ছাই পড়ল যখন রোহনের মুখেই শুনলাম তার ভালবাসার কথা।আমার সামনেই তাদের রোমান্টিক ফোনালাপ শুনে বুকের গহীনের প্রচ্ছন্ন কিছু কষ্ট যেন ছাইচাপা আগুনের মত আমার হূদয়টাকে দহন করতে শুরু করল।

তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম পরীক্ষা শেষ করেই বাড়ি ফিরে যাব।

পরেরদিন,
পরীক্ষা দিয়ে এসে ব্যাগ গোছাতে লাগলাম।রোহান আমাকে অনেকবার মানা করল না যাওয়ার জন্য।কিন্তু বুকের ভিতরের জর্জরিত কষ্ট আমাকে আর সেখানে থাকতে দিল না। সন্ধ্যায় রোহানকে সাথে নিয়ে চললাম বাসস্ট্যান্ডে।টিকিট কাটার একঘন্টা পর বাস চলে এল।বিদায় নেয়ার জন্য রোহানের দিকে চেয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম।আমার পানে নিক্ষেপিত রোহানের চোখের ছলছল কোমল দৃষ্টি অবলীলায় বলে দেয় সে এখনো আমাকে ভালবেসে।কিন্তু হয়তো সে পারেনা তার অটল সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্যুত হতে।কারণ সে এখন একটি সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ।

আমিও পারলাম না আমাদের দুজনের মাঝে তৈরী হওয়া কালো দূরত্বের দেয়ালটাকে ঠেলে তার কাছে ছুটে যেতে।তাকে বলতে পারলাম না, তুমি আমাকে গ্রহন কর তোমায় নতুন করে পাবার আশায় নিজেকে উৎসর্গ করার জন্যই এসেছি তোমার কাছে।আমি আর পেলাম না আমার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের খোঁজ।তাই রিক্ত হস্ত আর শূন্য হূদয় নিয়ে চলে যাচ্ছি।রোহানকে ছেড়ে আমি বাসের দিকে যত এগিয়ে যাচ্ছি ততই যেন বেড়ে যাচ্ছে আমাদের দূরত্ব।

আমি আর পেছনে তাকতে পারছিনা।পিছন ফিরলেই শূন্যতার হাহাকারে আমার বুকটা কেঁপে ওঠে,স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় কাতরায় আমার সমগ্র স্বত্তা।
আমার আশার ফুলগুলো যেন নীরবে শুকিয়ে সবকিছুকে ধীরে ধীরে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে।আমার সরল মনটা কেমন যেন চৌচির হয়ে যাচ্ছে বৈশাখের ফাটল ধরা মাঠের মত ঢাকাকে বিদায় জানিয়ে।

হয়তো এটাই শেষ নয়।নিরন্তর ছুটে চলা এ জীবনটা অতৃপ্তির বেদনা ভুলে গিয়ে আবার স্বপ্ন দেখবে, আবার নতুন আশায় বুক বাঁধবে।আবার ছুটে চলবে চেনা,অচেনা,জানা,অজানা কোন সম্পর্কের দ্বারে দ্বারে এক মুঠো স্বপ্নের খোঁজে।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১ই জানুয়ারী, ২০১৫।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.