কাগজের বানানো এক স্বপ্নের শহরে

লেখকঃ আকাশ


আমিনুল রহমান সাহেব এই মুহূর্তে বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে আছেন। তিনি দেখতে বেশ লম্বা, তামাটে গায়ের রং। কিন্তু তার বসার ভঙ্গিতে এমন কিছু একটা আছে যেটাতে মনে হতে পারে বেঁটে, ছোটখাটো কেউ বসে আছে। আজ দ্বিতীয় আষাঢ়। বৃষ্টির নাম গন্ধ নেই। আগে আষাঢ় মাসে প্রথম সাত দিন সাত কন্যা নামত অর্থাৎ বৃষ্টি হত। মেয়েরা বাপের বাড়ী ছেড়ে শশুর বাড়ী যাবার সময় কান্না করতো তাদের দুঃখে মেঘ রাও কান্না করতো। তবে আজ কালকের মেয়েদের বিয়েতে তেমন কান্না কাটি করতে দেখা যায় না। তাই মনে হয় মেঘেরাও কান্না করে না। কাঠ ফাটা রোঁদের ঝিমানো মধ্য দুপুর। দুপুরে ভাত খাবার পর এই সময় আমিনুল সাহেব সাধারণত প্রচণ্ড হিম শীতল রুমে সামার ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে ভাতঘুম দেন। ডাক্তার বলেছেন পর্যাপ্ত পরিমাণে তার ঘুম দরকার। ৬ মাস আগে হার্ট এর অসুখ এর কারণে তিনি সকল প্রকার কাজ থেকে অব্যাহতি নিয়ে সরকারী চাকুরী জীবীদের মত রিটায়েট জীবন যাপন করছেন। যারা সারাজীবন খুব ব্যস্ত সময় পার করেন তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ বেকার থাকা প্রায় অসম্ভব। কিছু না কিছু নিয়ে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু আমিনুল রহমান সাহেব বেশ আছেন। তার মধ্যে সুখী সুখী ভাব চলে এসেছে। আমিনুল সাহেব আজ নিয়মের ব্যতিক্রম করলেন। বিছানায় না যেয়ে বারান্দায় চলে এলেন। ঘুমাবেন কি? তিনিতো ঠিক মত দুপুরে কিছু খেতেই পারেননি। কারণ আজ সকালে তিনি একটি ভয়ংকর সত্য জানতে পেরেছেন। এরকম সত্য যেটা জানার পরও তার করার কিছুই নেই। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। তিনি মোটামুটি ক্ষমতাধর একজন মানুষ। তিনি শ্রীলঙ্কা ও পরে ডেনমার্কের বাংলাদেশি অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। তার ক্ষমতা এখানে কোনই কাজে লাগবে না। কিন্তু তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই এই মুহূর্তে তিনি খুব বিচলিত। কিছু কিছু মানুষের চেহারা পড়া যায় না। তাদের দেখলে মনে হয় তাদের মত সুখী মানুষ দুনিয়াতে নেই। আমিনুল রহমান সাহেব সেই দলের। তিনি বীর বীর করে বলছেন কিছু একটা করতে হবে, কিছু একটা করতে হবে। ছেলের মাকে কি জানাবেন ব্যাপারটা? কিন্তু সামিরুন দেশের বাইরে। এখন তাকে কিছু জানানোর মানে হয় না! ছেলে সাথে কি কথা বলবেন? কিন্তু কিভাবে বলবেন? কোথা থেকে শুরু করবেন কিছু বুঝতে পারছেন না। তিনি অনেকটাই নিচু গলায় ডাকলেন, আকাশ। বাবা আকাশ। একটু শুনে যাও তো বাবা। একটু পরেই আকাশ এসে তার বাবার সামনে এসে চুপ চাপ দাঁড়ালো।

-বাবা লাঞ্চ করেছ?
-হু। একা একা কি খাও না খাও কিছুই তো দেখি না। বাপ ব্যাটা এক সাথে খাওয়া যায় না? খাবার টেবিল হচ্ছে ফ্যামিলিদের মেম্বারদের একান্ত জায়গা। তাই খেতে বসে টুক টাক গল্প করে যেতে পারে।

আকাশ শীতল গলায় বললও,

-আমার একা খেতে খেতে অভ্যাস হয়ে গেছে। কারো সামনে বসে খেতে পারি না।

এই কথা বলেই সে ভিতরে চলে গেলো। আমিনুল সাহেব জানেন কোন এক বিচিত্র কারণে সে তার বাবা কে সহ্য করতে পারে না। ছেলে তার মা ভক্ত। যদিও তাকে সহ্য করতে না পারার মত কিছু নেই। আমিনুল সাহেব ছেলের গায়ে হাত তোলার তো দুরে থাক। জীবনে উঁচু গলায় কথা বলেছেন কিনা মনে করতে পারলেন না। আকাশ ছোট বেলা থেকে শান্ত শিষ্ট, চাহিদা কম। তাকে নিয়ে কখনো কোন কমপ্লিন আসেনি। অবশ্য তিনি কি কখনো সেই ভাবে আকাশ এর খোঁজ খবর করেছেন? সারাজীবন তো বিজনেস ও দেশ বিদেশ করেই কাটালেন। আমিনুল সাহেব কিছুটা দমে গেলেন। মনের মধ্যে এক ধরনের অপরাধ বোধের খোঁচা অনুভব করছেন। আসলে ছেলের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষে তার সাথে এমনি দূরত্ব তৈরি হয়েছে যে এখন ছেলেকেই হারাতে চলেছেন। চাইলেও সেই দূরত্ব মিটানো যাবে না। coz it’s too late. তিনি একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠা আমিনুল রহমান সাহেবের অনেক দিনকার অভ্যাস। সকালে ঘুম থেক উঠে নামাজ সেরে তিনি কিছুক্ষণ বাগানে হাঁটাহাঁটি করেন। তিনি দোতালা থেকে নিচে নেমে এলেন। তার বাড়িটা ১০ কাঠা জমির উপর আজ থেকে পায় ২৩ বছর আগে তিনি বাড়িটা করেন। পুরানো ডিজাইনের বাড়ি। কোন আর্কিটেকচারকে দেখানি। নিজের ইচ্ছে মতন করিয়েছেন। বাগান ও যে খুব পরিকল্পনা করে করেছেন তা বলা যাবে না। বাড়ির গেটের দুই পাশে দুটা নারিকেল গাছ। এবং চার পাশ জুড়ে বড় বড় কাঠ গাছ। কিন্তু পুরো উঠান জুড়ে সবুজ ঘাসের কার্পেট। তিনি লোক লাগিয়ে নিয়মিত ঘাস পরিষ্কার করান। বাগানে নেমেই দেখলেন নীল রং এর শাড়ি পরে কে যেন হাঁটছেন। চশমা সাথে না থাকায় তিনি ঠিক ধরতে পারছেন না। খানিকটা কাছে যেতেই তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলেন সামিরুন! সামিরুনের বয়স ৪৬। কিন্তু তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই। এখনো তাকে রূপবতী বললে ভুল বলা হবে না। সামিরুন রাজনীতির সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত। তার হাতে টকটকে লাল কালারের কফির মগ। ক্লোবাট ব্লুর সাথে লালের কম্বিনেশন সাধারণত যায় না। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে হাতে লাল কালারের কফির মগ না থাকলেই বরং বেমানান লাগতো। সামিরুন হেঁসে বললেন গুড মর্নিং।
গুড মর্নিং। তুমি কখন এলে? তোমার ফ্লাইট না ৪দিন পর?
কাজ শেষ তাই চলে এলাম। জানাইনি কারণ ভাবলাম তোমাদের বাপ-ব্যাটা কে সারপ্রাইজ দেই।
ভালো করেছ। তোমার কাজ কেমন হল?
হু ভালো। আমি মনে হয় এবারকার নির্বাচনে একটা নারী আসন পেয়েই যাবো।
ভালো, খুব ভালো। কিন্তু তুমি মহিলা আসনে নির্বাচন করবে আমাকে বললেই পারতে। আমি সুপারিশ করে দিতাম।
তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি অন্যের দয়া নেই না। নিলে ভাইয়া মারা যাবার পর তার আসনে দাঁড়ালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হতাম।
এটাকে দয়া বলছ কেন?
ঠিক আছে বাদ দাও। তুমি মনে হয় আমাকে কিছু বলতে চাঁচ্ছ। বলে ফেল, আমি সাওয়ার নিতে ঢুকব।
ই য়ে… সামিয়া আকাশের ব্যাপারে কিছু বলতে চাচ্ছিলাম।
হু বল
তোমার কি মনে হয় না আমাদের আকাশ একটু অন্যরকম? মানে আমার মনে হচ্ছে, ও মনে হয় অপজিট সেক্স এর প্রতি ইন্টারেস্টেড না। বুঝতেই পারছ আমি কি বুঝাতে চাচ্ছি?
হু জানি। আমাদের আকাশ সমকামী! এটাইতো বলতে চাঁচ্ছ? শুন এমনকরে বলার কিছু নেই। অটিস্টিকদের গড এর স্পেশাল ক্রিয়েশন বলা হয়। কারণ তারা অন্য সবার থেকে আলাদা। আল্লাহ্‌ যাদের অনেক বেশি পছন্দ করেন তাদের অন্য সবার থেকে আলাদা ভাবে ক্রিয়েট করেন। আমি মনে করি আমাদের আকাশ ও অন্য রকম স্পেশাল। তাই আল্লাহ্‌ তাকে একটু অন্যভাবে তৈরি করেছেন। এবং আমি চাই এই সত্যটা তুমি ও মেনে নাও।
তুমি জানতে? কবে থেকে? আকাশ কি তোমার সাথে শেয়ার করেছে? আমাকে বলনি কেন?
এখানে বলাবলির কি আছে? আর হ্যাঁ আকাশ আমাকে কিছু বলেনি। আমি নিজেই বুঝতে পেরেছি। আমি যতই ব্যস্ত থাকি না কেন ভুলে যেও না আমি ওর মা।
এখন আমাদের কি করা উচিত?
আকাশ পলাশ নামে এক জনকে পছন্দ করে। আমি ম্যানেজার কে বলে দিয়েছি পলাশের সম্পূর্ণ বায়োডেটা জোগাড় করে রাখতে। একটু আগে তার সাথে কথা হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় ম্যানেজার এর আসার কথা।
সামিরুন কথা শেষ করেই দোতালায় উঠে গেলেন। এক বারও পিছন ফিরে তাকালেন না! তাকালে দেখতেন আমিনুল সাহেবের চোখ নোনা জলে টল টল করছে, যে কোন মুহূর্তে বেরিয়ে আসতে পারে।

সামিরুন লাইবেরি রুমে বসে আছে। তার হাতে চার্লস ডিকেন্সের বই, “এ টেল অফ টু সিটিজ”। ফরাসী বিপ্লবের উপর লেখা। আগে অনেক বার পড়া। কিন্তু এই একটি মাত্র বই তার বার বার পড়তে ভালো লাগে। প্রতি পাতায় পাতায় উত্তেজনা। এমন সময় বাড়ির কাজের লোক এসে খবর দিল ম্যানেজার সাহেব এসেছেন। সামিরুন বললেন ম্যানেজার কে এই রুমে নিয়ে আসো, আর হ্যাঁ আকাশের বাবা কেও আসতে বল।
ম্যানেজার মাহাবুব হোসেন লাইবেরি রুমে বসে আছেন। তার সামনে অরেঞ্জ জুস এর গ্লাস। এখন পর্যন্ত তিনি গ্লাসে চুমুক দেননি। রুমে এসি চলছে। তার পরেও তার হাত পা ঘামছে। আসলে তিনি ম্যোডামকে খুবি ভয় পান। সামিরুন একটি রিম লেস চশমা পরে আছে। তার হাতে লাল রং এর একটি ফাইল। যেখানে পলাশের সম্পর্কে বিস্তারিত লিখা আছে। সামিরুন পড়তে পড়তে ভুরু কুচকে ফেলছেন। এর থেকে বুঝা যাচ্ছে তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। আমিনুল রাহমান চুপ চাপ বসে আছেন কিছু বলছেন না। সামিরুন ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে চোখ থেকে চশমা খুলে ফেললেন। মাহাবুব সাহেব বললেন ম্যেডাম পলাশ সাহেব কে আমি সাথে করে নিয়ে এসেছি। আপনি কি কথা বলবেন? না তার আর দরকার নেই। আপনি এখন যান। সামিরুন উঠে দাঁড়াল। আমিনুল রহমান পাথরের মূর্তির মত বসে রইলেন। সামিরুন এত স্বাভাবিক আচরণ কি ভাবে করছে? আমিনুল রহমান সাহেব এতো দিন জানতেন তিনি খুবি শক্ত প্রকৃতির মানুষ। এখন তিনি বুঝতে পারছেন, এতো দিন তার নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা ছিল।

সামিরুন আকাশের রুমের দরোজায় টোকা দিলেন। আকাশ বলল ভিতরে আস মা।
কি করে জানলে আমি? আকাশ কিছু বলল না। মিষ্টি করে একটা হাঁসি দিল। আকাশ ল্যাপটপ এ কি জেনো করছে। সামিরুন আকাশ কে দেখতে লাগলেন। মাত্র ২১ বছরে পড়লো। তার বাবার মতই লম্বা হয়েছে। কোঁকড়ানো চুল। দেখতে রাজ পুত্র না হলেও, মন্ত্রী পুত্র অনায়াসে বলা যায়। এতো বড় হয়েছে তার পরেও সারাক্ষণ থ্রি কোয়াটার প্যান্ট ও টি শার্ট পরে থাকে।
মা দাড়িয়ে আছ কেন? বসো।
সামিরুন ছেলের পাশে বসলেন। আকাশ তোমার সাথে কিছু কথা ছিল। পলাশের ব্যাপারে।
কিছু বলতে হবে না মা। আমি সব জানি!
সব জানো? কিভাবে?
মা, আমি কিন্তু তোমার ছেলে! তোমাকে যেমন কিছু বলতে হয় না। সব নিজের থেকে বুঝে যাও আমিও ঠিক তেমনি।
আমি দুঃখিত আকাশ।
দুঃখিত হবার কিছু নেই মা। তোমার তো এখানে করার কিছুই ছিল না। আর আমি প্রতারিত হতে হতে সহ্য হয়ে গেছি। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট পেতাম। কিন্তু এখন তেমন কিছু লাগে না। আমাদের দুনিয়ায় ৯০ ভাগ মানুষ প্রতারণা করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে মাত্র যেই ১০ ভাগ মানুষ প্রতারণার স্বীকার হয় তারা একে অপরের সাথে কখনো মিলে না। ঘুরে ফিরে তাদের ভাগ্যে আবার সেই অন্য এক প্রতারকই জুটে। আচ্ছা বাদ থাক এই সব কথা। আমার কথা শুন। জরুরি কথা আছে।
হু বলো
মা আমার বিবিএ পড়তে আর ভালো লাগছে না। চিন্তা করেছি ফিল্ম এন্ড মিডিয়া তে পরবো। ইউনিভার্সিটি অফ বোস্টনে এপ্লাই করেছিলাম। বোস্টন সিলেক্ট করার কারণ হচ্ছে, ওখানকার ফিল্ম এন্ড মিডিয়ার হেড হচ্ছে স্টিফেন স্পিলবার্গ। আমার মনে হয়েছে আমি যদি কিছু নাও শিখি, তারপরেও এতো বড় একজন ডিরেক্টরের আশে পাশে থাকতে পারলে আমার জীবন সার্থক। বোস্টন থেকে গত পরশু মেইল এসেছে। এবং তারা আমাকে ছোট খাট একটা স্কলারশিপ দিচ্ছে।
বাহ তাহলে তো খুবি ভালো খবর। কবে যাচ্ছ?
সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিক আমার ফ্লাইট।



শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ভি আই পি লাউঞ্জে বসে আছে আকাশ। তার এক পাশে সামিরুন অন্য পাশে আমিনুল রহমান। কেউ কোন কথা বলছে না। আকাশ নীরবতা ভেঙে বলল বাবা,মা তোমাদের জরুরি কিছু কথা বলা দরকার। স্কুলে থাকতে আমাদের ভাবসম্প্রসারন পড়তে হত। সেখানে একটা ভাবসম্প্রসারন এমন ছিল যে,

পথ পথিকে সৃষ্টি করে না
পথিক পথের সৃষ্টি করে।
এটার বিবরণে অনেকটা এমন থাকতো যে, কর্মঠ মানুষ কখনো অনন্যার পথে হাটে না। তারা সব সময় নিজের তৈরি করা পথে হাটে। ছোট বেলায় একটা জিনিস মাথায় ঢুকে গেলে সেটা সহজে বের হয় না। আমার মাথায় ও এই লাইন দুটো ঢুকে গেছে। তাই আমি ও তোমাদের তৈরি করা পথে হাঁটবো না। আমি হাঁটবো আমার নিজের তৈরি করা পথে, আমি চাই আমার ভবিষ্যতের জন্য যা করেছ সেটা দিয়ে একটা ট্রাস্ট করবে। প্রতি বছর এস.এস.সি এক্সাম এর পর শত বাঁধা পেরিয়ে ক্যাপশনে প্রতিদিন ৪-৫ জন স্টুডেন্টের ছবি ছাপা হয় পেপারে। যারা গোল্ডেন প্লাস পেয়েছে। এবং প্রত্যেকেই থাকে হত দরিদ্র। আমি চিন্তা করি এরা এতো কষ্ট করে এতো ভালো রেজাল্ট করে। একটু যদি সুযোগ পেত তাহলে কি না জানি করে ফেলত। তোমাদের ট্রাস্ট এর কাজ হবে তাদের খুঁজে বের করে সাহায্য করা। আমি আমার কল্পনা শক্তি দিয়ে দেখতে পাচ্ছি ১০ বছর পর তোমাদের ট্রাস্টকে সবাই বলবে স্বর্ণ তৈরির কারখানা। বাবা তোমার অনেক দিন এর ইচ্ছা বিক্রমপুরের জমিটার উপর নুহাস পল্লির মত একটা পল্লি বানাবে। কিন্তু আমি চাই সেটাও ট্রাস্ট এর অংশ থাকবে। সেখানে একটা অনাথ আশ্রম থাকবে। এবং সেখানে উন্নত পরিবেশে তাদের বড় করা হবে। আমার মতে পৃথিবীর সবচে খারাপ ভাগ্য অনাথরা নিয়ে জন্মে। এবং তারা খুব সহজে সেটা মেনে নেয়। তোমরা তাদের এমন ভাবে পরিচালনা করবে যাতে তাদের মনে এক বারও না আসে যে, তারা সবচে খারাপ ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে। তোমরা তাদের খারাপ ভাগ্য তোমাদের নিজের হাতে পরিবর্তন করবে। বাবা পল্লি বানালে তোমার একার স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু অনাথ আশ্রম করলে হাজায় হাজায় ছেলে-মেয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে। আর হ্যাঁ! আমার বুঝ হবার পর থেকে দেখছি তোমরা দুই জনই একে অপরের উলটো দিকে হাঁটছ। অনেক তো হল মা। বাবা তো এখন অবসর। তোমার কি উচিত না এখন বাবা কে সময় দেয়া? আকাশ উঠে দাঁড়ালো এবং মিষ্টি একটা হাঁসি দিয়ে বলল মা বাবা আমার ফ্লাইট এর সময় হয়ে গেছে। আসি কেমন? বলেই আকাশ উত্তরের অপেক্ষা না করে হাটতে লাগলো। তার অনেক ইচ্ছা করছিল বাবা, মার পা ধরে সালাম করতে। কিন্তু লজ্জার করনে করতে পারল না। আকাশ সামনে এগিয়ে চলছে এক বারও পিছন ফিরে তাকাচ্ছে না। পিছন ফিরে তাকালে খুবি সুন্দর একটা দৃশ্য দেখতে পেত। অবশ্য পৃথিবীর সব সুন্দর দৃশ্য আল্লাহ্‌ সবাইকে দেখান না। সবার জন্যই নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্য বরাদ্ধ থাকে………
পরিশিষ্টি
আকাশের বাবা মা দুই জনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিক্রমপুরে তাদের বিশ বিঘা জমির উপর ট্রাস্ট এর কাজ শুরু করবেন। ট্রাস্ট করার ব্যাপারে দুইজনই বেশ উত্তেজিত। ট্রাস্ট হবে আকাশের নামে। ছেলের নামে ট্রাস্ট! যেন তেন কাউকে দিয়ে তো করানো যায়না। পৃথিবীর সবচে সুন্দর স্থাপনা হতে হবে এটা। সামিরুন জাপানের বিখ্যাত স্থাপত্য শিল্পী হিডিসুগু অ্যানহা সাথে যোগাযোগ করেছেন। তিনি খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে আসবেন। জায়গা দেখে তারপর ডিজাইন শুরু করবেন। আর আকাশ? পলাশের সাথে সেও খুব ভালো আছে। জি হ্যাঁ ঠিকি শুনেছেন। আকাশ যাবার মাস খানিক পরেই সামিরুন এর সহায়তায় পলাশও আমেরিকা চলে আসে। আসলে তার সম্পর্কে কিছুটা ভুল তথ্য ছিল। পলাশের ভাই মারা যায় তিন বছর আগে। মারা যাবার সময় ছোট ছোট দুটি যমজ বাচ্চা রেখে যায়। পলাশের ভাবি রেশমা পলাশদের সাথেই থাকে। এবং তার ভাইরের বাচ্চা গুলি তাকে পাপা পাপা বলে ডাকে। এই থেকে ভুল ধারণা হয় পলাশ বিবাহিত। আকাশের নতুন একটা রোগ হয়েছে সেটা হচ্ছে কথা বলা রোগ! ২১ বছরের নিঃসঙ্গতার ফলাফল এখন পলাশকে ভোগ করতে হচ্ছে। সারাক্ষণ কথা বলে পলাশের মাথা ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পলাশ কিছু বলে না। মন দিয়ে আকাশের কথা শুনতেই থাকে। কথা বলতে বলতে আকাশ যখন ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে এক ধরনের ঘোর লাগা অনুভূতি কাজ করে এবং বুকের ভেতর খুব হালকা এক ধরনের চাপ অনুভব করে। এই চাপ কষ্টের চাপ না। মানুষ যখন তার অতি প্রিয় জিনিস টি পেয়ে যায় তখন ও এক ধরনের ঘোর লাগা চাপ অনুভব করে। আকাশের চাপ কে এই চাপের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১২ই আগস্ট, ২০১৩।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.