ঘৃণা

লেখকঃ মাতাল ঋত্বিক

নিজেকে খুব নির্লজ্জ মনে হচ্ছে। মানুষ কি করে এতো লজ্জাহীন হয়! একটু আগে রেহানকে একটা এসএমএস দিলাম। দেয়ার পর অনেক সময় কেটে গেছে। রিপ্লে নেই। রিপ্লে আসবে না এটাই স্বাভাবিক। একটা ছন্নছাড়া মানুষের কাছে কি প্রেম আশা করা যায়? অথচ সেটাই করছি আমি। নিজের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে খুব অবাক লাগে। মানুষ অতীতকে এতো তাড়াতাড়ি কি করে ভুলে যেতে পারে- এটা ভেবে।

রেহানের সাথে কী অসাধারণ সময় কেটেছে আমার। গুলশান লেকের পাড় ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুজন হেঁটেছি হাত ধরাধরি করে। মধ্যরাত অবধি বসে থেকেছি পাশাপাশি। কি গভীর ভালবেসেছি দুজন দুজনকে। নাহ! দুজন দুজনকে না। ভালবাসাটা একতরফাই ছিল। এজন্যেই আজ এতো কষ্ট। খুব বৃষ্টি হলে ও বলতো, ঝুম বৃষ্টি কখন নামে জানো?
-কখন?
-আকাশ যখন ফুটো হয়ে যায়। আকাশ ফুটো হয়ে গেলে বৃষ্টিতে ভিজতে
হয়। এটাই নিয়ম। চল ভিজি।
নেমে পড়তাম দুজনে। ফার্মগেট মানিকমিয়া এভিন্যু হয়ে চন্দ্রিমা উদ্যান। বৃষ্টিতে রাজপথ দখল করে হাঁটার মজাই আলাদা। গাড়িঘোড়া কিছুটা কমে যায়। গতি হয় শ্লথ। দুটো ছেলে উন্মাদের মতো কাকভেজা হয়ে হাঁটছে। কখনো অট্টহাসিতে লুটিয়ে পড়ছে একে অপরের গায়ে। চন্দ্রিমা উদ্যানের ঝুলন্ত সেতুর উপর দাঁড়িয়ে বৃষ্টি খাওয়ার ভঙ্গিতে হা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। পথচারীরা অবাক হয়ে দেখছে সে দৃশ্য। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে এক ধরণের মাদকতা আছে।

একদিন সারা সন্ধ্যা রিক্সা করে ঘুরেছিলাম দুজন। রেহান জড়িয়ে ধরে রেখেছিল আমাকে। কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছিল আমার। রেহান বললো,
-কি ব্যাপার, তুমি অমন স্ট্যাচু হয়ে বসে আছো কেন?
-রিক্সায় এভাবে জড়ায়ে ধরোনা প্লিজ। মানুষ হা করে চেয়ে আছে।
-লজ্জা লাগছে? এতো কিসের লজ্জা? লজ্জা করলে প্রেম হয়?
তারপর আমার হাতটা চেপে ধরে বলেছিল,
-আজ এই দিনটা শুধু তোমার আমার।
আমি লজ্জা আর ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। অত ভালবাসা সইবে না আমার। অতো সুখ সইবে না। হলোও তাই। সইলো না অতো সুখ। হঠাৎ একদিন রেহান আমাকে তুচ্ছ করতে শুরু করলো। অকারণ। আগের মতো ফোন করে না। কথা বলে যন্ত্রের মতো। আড়ালে আড়ালে কতো জল ফেলেছি চোখের! গভীর রাত্তিরে বালিশ ভিজে গেছে। এতো ভিজে গেছে যে না উল্টে সে বালিশে ঘুমানো অসম্ভব। নির্ঘুম রাত্রিগুলো আমার শরীর ভেঙে দিয়েছে। চোখের নিচে সযত্নে রেখে গেছে কলঙ্কের ছাপ। হ্যাঁ, কলঙ্কই তো। অমন প্রেমকে কলঙ্ক ছাড়া আর কিইবা নাম দিতে পারি! মা রোজ রোজ জেরা করতে
বসেন,
-কি হয়েছে বলতো? বলতো সত্যি করে? মাকে মিথ্যে বলতে নেই।
আমি হেসে বলতাম,
-কিছুনা মা! পরীক্ষার সময় চোখের নিচে একটু আধটু কালি পড়বে, শরীর ভাঙবে। এই না হলে পরীক্ষা!?”
মা শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতো।

আগের মতো এক মুহূর্ত দেখা করার জন্য ব্যাকুল হয় না রেহান। ফোন করলে খুব ব্যস্ত এমন ভাব করে হুটহাট ফোন রেখে দেয়। কখনো রিসিভ না করেই কেটে দিয়ে এসএমএস দেয়, “পরে ব্যাক করছি লক্ষীটি!” আমি অপেক্ষা করি এক মিনিট, দু মিনিট। এক আলোকবর্ষ একশো আলোকবর্ষ। রেহানের ব্যস্ততা ফুরোয় না। আমি ছাড়া কিসের এতো ব্যস্ততা রেহানের? যে রেহান আমাকে ছাড়া দু’দণ্ড নিশ্বাস নিতে পারতো না। ঘন্টার পর ঘণ্টা পার্কের বেঞ্চিতে আমার প্রিয় একটা বই হাতে নিয়ে চাতকের মতো বসে থাকতো। দিনেরাতে একশোবার কল দিয়ে মেজাজ খারাপ করে দিতো, আজ সেই রেহানই কত সহজে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। কদিনেই সব কেমন উলটপালট হয়ে গেলো। প্রতি মুহূর্তে আমার বুক ভাঙে। বুকের ভেতর ছাই-ভস্ম উড়তে থাকে। দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয় সব। এখন তেমন দেখাও হয়না আর।

একদিন হঠাৎ বেইলি রোডের ফুটপাতে দেখা। সে আমাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলো। বড্ড অভিমানী হয়ে জন্মেছি আমি। তাকে যেতে দিলাম। না দেখার ভান করে হাঁটতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি ফিরে এসে সে আমার পাশাপাশি হাঁটছে।
-কেমন আছো রন?
-ভাল।
-দোয়া করো। ঢাকা ছাড়ছি। আর থাকা হচ্ছে না এখানে।
-ও আচ্ছা।
-কিছু বলবে?
-নাহ। কি বলার থাকবে!
-যাই রন, কিছু মনে কোরো না। ক্ষমা কর আমাকে।

রেহান চলে গেলো। যাক, চলে যাওয়াই ভাল। জনসংখ্যা খুব বাড়ছে ঢাকায়।দুই কোটি ছাড়িয়েছে। বাসায় এসে বাথরুমে ঢুকে কল শাওয়ার সব ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করলাম। বারবার মনে হচ্ছিল গোটা বিশেক প্যারাসিটামল খেয়ে একটা শান্তির ঘুম দেই। এই বীভৎস পৃথিবীর আলো যেন আর দেখতে না হয়। বড় ভীতু ছেলে আমি- পারিনি।

এরপর দীর্ঘ সময় নিয়ে জগতের নিষ্ঠুর চেহারাটা নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করেছি। লৌহ প্রাচীর হয়ে আবেগ আর প্রেমকে তুচ্ছ করে বাঁচার প্রতীজ্ঞা করেছি। চোখের জলকে বলেছি আশীর্বাদ। বিশ্বাসকে ঘৃণা করতে শিখেছি। স্বার্থপরতাকে হ্যাঁ বলেছি। এভাবে অনেক সূর্য পাড়ি দিলাম। পড়াশোনায় মন দিলাম। অতীত ভুলে গেলাম। সেই সাথে রেহানকেও। দৈবাৎ মনে হলে তীব্র ঘৃণায় দাঁত শক্ত হতো। খুব সুখি মনে হতো নিজেকে। রেহানকে ভুলতে পেরেছি ভেবে তৃপ্তি পেতাম। জীবন এখন অনেক সচল সহজ গতির জীবন। বাসা কলেজ মা বাবা ছোট্ট বোন আড্ডা বন্ধু- এই নিয়ে সুখের দিন কাটছে।

একদিন কলেজ থেকে বের হয়ে রিক্সা খুঁজছি। হঠাৎ রেহানের সাথে মুখোমুখি। সেই আগের মতোই এলোচুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কাঁধে স্কুলব্যাগ। আমাকে দেখামাত্র কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।
-কেমন আছো রন?
-ভাল। তুমি ভাল তো?

বলেই আমি রিক্সা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। উঠে বসলাম রিক্সায়। রেহান দাঁড়িয়েই রইলো। আমার চলে আসার দিকে তাকিয়ে রইলো। হয়তো আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল। আমি তৃপ্তি নিয়ে বাসায় এলাম। নিজেকে বিজয়ী মনে হল। তীব্র ঘৃণায় বুক ভর্তি হয়ে আছে। বেঁচে থাকুক ঘৃণাটুকু। এ আমার অর্জন। এ নিয়েই বাঁচতে চাই।…

এরপর প্রায়ই হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যেতো। একবার সাইন্সল্যাবে। আরেকবার শাহবাগের পুষ্পবিতানের সামনে। আরেকদিন সেই গুলশান লেকের ধারে। কিন্তু স্মৃতি আমাকে কাবু করেনি। দেখেই মস্তো হেসে বলেছি,
-আরে রেহান যে! কি খবর দেখাই যায়না? শরীরের একি হাল করেছো! বাসায় এসো ওকে।

বলেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে এড়িয়ে গেছি।

আরেকদিন ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছি। বাইরে বৃষ্টি। সবুজ রঙের একটা ডিমলাইট ভৌতিক আলো ছড়াচ্ছে। বাইরে খানিক পর পর বিকট শব্দে বাজ পড়ছে। বাজের শব্দে আমার আঁৎকে উঠার কথা। আশ্চর্য বাজ পড়ার শব্দটা নে আশ্চর্য বাজ পড়ার শব্দটা নেশার মতো লাগছে। ঝুম বৃষ্টি। আমি বৃষ্টি দেখছি। ঠিক তখনি রেহানের ফোন। নিরুত্তাপ কণ্ঠে কথা বললাম।
“কেমন আছো, ভাল আছো, কি করছো ইত্যাদি”
ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলাম এখন তুমি আমার কেউ না। আমি খুবই ভাল আছি। তোমার মতো কারো কথা ভাবার মতো অতো সময় আমার নেই। নির্লিপ্ত ভঙ্গি। যেনো সপ্তাহখানেকের পরিচয়।

কিছুদিন পর রেহানের আবার ফোন পেলাম। ব্যাকুল কণ্ঠস্বর। কোনরকম ভূমিকা ছাড়াই-

-রন আমাকে ক্ষমা করো প্লিজ!
-হা হা হা! ক্ষমার কিছু হয়েছে নাকি? কি করছো তুমি? কোথায় আছো? দিন কেমন কাটছে?
-আমি খুবই দুঃখিত। আমি ভুল করেছি। ভারী অন্যায় হয়েছে তোমার সাথে। আসলে… আসলে… সরি রন। আই এম এক্সট্রেইমলি সরি!
-কি আশ্চর্য! আমি ফোন রাখছি। তুমি কিন্তু বাসায় এসো ওকে? গ্রীন টি খাওয়াবো। বিশ্রী জিনিস। না খেলে বুঝবে না। অকে বাই।

ফোন কেটে দিলাম। কিন্তু ভেতরে শুরুহলো তমুল কালবৈশাখী। পাঁজর বোধহয় কিছুক্ষণের মধ্যে ফেটে যাবে। হাজার বছরের মৃত আগ্নেয়গিরিতে হঠাৎ যেন লাভার উদগীরণ শুরু হয়েছে। ঘৃণাটাকে জাগ্রত করতে চেষ্টা করলাম প্রানপণে। আমি হারতে পারবো না। ঘৃণাটাই আমার সম্বল। রেহানের প্রতি তীব্র ঘৃণা। রেহানকে আমি ঘৃণা করি। কোনকালেই তাকে ভালবাসতাম না। আমার কোন অতীত নেই। শুধু ভবিষ্যৎ বিশ্বাস করি। অতীত বলতে কিছুই নেই পৃথিবীতে।

অনেক চেষ্টা করেও পারিনি। নিজের কাছেই হেরে গেলাম। রেহানের ব্যাকুল দুটো শব্দই আবার তাকে আমার চোখে প্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলো। আবার আমরা অতীতে ফিরলাম। ফিরলাম গুলশান লেকে। হাতিরঝিলের সবুজ লনে। মানিক মিয়া এভিন্যুতে। আশুলিয়ার বিস্তীর্ণ ধানের খেতে। আষাঢ়ের তুমুল বারিধারায়। রবীন্দ্র সরবরে।…

এরপর অনেক দিন কেটে গেল রেহানের কোন খোঁজ নেই। ফোন নেই। ফোন দিলে রিসিভ করছে না। তারপরও একটা এসএমএস করলাম। রিপ্লে নেই। রিপ্লে কি আসবে? বারবার ফোন হাতে নিয়ে দেখছি, উদ্বিগ্নচিত্তে একটা রিপ্লের অপেক্ষা করছি।
কি নির্লজ্জ আমি! ছি!!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.