চিন্ময়ের ইতিকথা

লেখকঃ চিন্ময়ের ইতিকথা
উৎসর্গঃ চিন্ময় দা কে
(মৃন্ময়ী গল্পের বাকি অংশ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
৭.
চিন্ময় দা সেখানে কিছু না বলে চুপচাপ চলে গেলো। একপলক তার চোখটা দেখেছিলাম। মনে হল ভেজা ভেজা। মৃন্ময়ীও চলে গেলো সেখান থেকে।চুপচাপ বসে ছিলাম সেখানে। কিছুক্ষন পর মৌ এল। কোন কথা না বলে সেও বসে রইলো অনেকক্ষন। তারপর বাসায় চলে গেলাম।
বাসায় ঢুকার সময় ভয়ে ভয়ে ছিলাম। ঢুকতেই মার সামনে পড়লাম। মা চোখমুখ ভয়ঙ্কর করে রেখেছে। অামি ভয়ে প্রায় কাঁপছি। তার মানে সারা বাড়ি জেনে গেছে। মা এবার মুখ খুলল
-কতক্ষন ধরে খেতে ডাকছি। কথা কানে যায়। তাড়াতাড়ি খেয়ে উদ্ধার কর
যাই হোক অাসল ব্যাপারটা চাপা অাছে।ঘুমোতে গিয়ে দেখলাম যে চিন্ময় দা অামার সাথে ঘুমোতে অাসে নি। মনটা কেন যেন খারাপ হয়ে গেলো।
অাজ গায়ে হলুদ। অনেক অতিথি অাজ এসেছে। নিলয়কে দেখলাম। অামার দূর সম্পর্কের অাত্নীয়। এসেই মৃন্ময়ীর সাথে বেশ মাখামাখি করছে। ব্যাপারটা অামার ভালো লাগছে না। শেষে থাকতে না পেরে সেখান থেকে মৃন্ময়ীকে হাত ধরে টেনে অানলাম পুকুর পাড়ে। রাগত স্বরে জিগ্যেস করলাম
.
-নিলয়ের সাথে কিসের এত মাখামাখি তোমার?
-নিলয়ের সাথে করবো না তো কার সাথে করবো…
মানে!
-মানে অার কি, অামি নিলয়কে ভালোবাসি। অামাদের রিলেশনের একবছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। অামার পায়ের নিচে মাটি নেই। মনে হচ্ছে অামি যেন অতল শূন্যে অাছি। রাগে চিৎকার করে বললাম
-তাহলে অামার সাথে এরকম টা কেন করলে। বল কেন করলে…
-সিম্পল। পুরোটা ছিল মৌ এর সাথে একটা বাজি। মৌ বলেছিলো অভিক না কি প্রেমে পড়ার মত ছেলেই না। তা তো দেখাই গেছে।
রাগে শোকে অামি পাথর হয়ে গেলাম।

.
৮.
বিয়েটা কোনরকম কাটলো। বিয়েটা শেষ হওয়ার পরপরই চলে এলাম বাসায়। মাকে না জানিয়ে। সে কারনে মা পরে বকাবকি করেছিলো।এভাবে চলে গেলো একটা বছর।
.
অামি ক্লাস টেনে পড়ি। এর মাঝে একটা বছর মৌএর সাথে যোগাযোগ করি নি একবারও।
মনসা পূজো। সে উপলক্ষ্যে অামি ও মা গিয়েছিলাম মামার বাড়িতে। কেন যেন ঘরে থাকতে মন চায়নি। ছুটে গিয়েছি ঘাটে। দেখি সে চুপ করে বসে অাছে। তার পাশে গিয়ে বসলাম। কিছু বলল না। তার হাতটা ধরলাম। সে অামার হাতটা শক্ত করে ধরলো। অামি তাকে বলেছিলাম
-ভালোবাসিস অামায়?
সে কোন কথা বলে নি। চুপ করে অাছে।
-কি হল, কিছু বলবি না?
তখনও সে নীরব। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তার। হঠাৎ করে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো। শ্রাবনের প্রবল বর্ষনে একটা ছেলে একটা মেয়ের হাত ধরে রেখেছে। কেটে যাচ্ছে শ্রাবনবেলা….

.
৯.
তারপর শুরু হলো অামার অলিখিত প্রেম। যে প্রেম উপলব্ধি করায় পূর্ন প্রেমের মানে। ভুলে গেছি হয়তো মৃন্ময়ীকে, ভুলে গেছি চিন্ময়দা কে। শুধু এখন অপূর্ন সুখ খোঁজি এক নারীর চাহিদায়। নাগরিক ব্যাস্ততায়।
তার সাথে অামার কথা হয় প্রতিদিন। ফোনে। কখনো কল্পনা করি। তাকে অনুভব করি।
তার দিকে তাকিয়ে দেখি
সেই সুখে অাছে।
উড়োচিঠির মতো খবর এলো। তার বোনের বিয়ে। ছোট ভাইয়ের পরীক্ষার জন্য মা ব্যাস্ত। যাবে না। তাই এবার অামি একা যাবো।
যাওয়ার পর দেখি তার রূপলাবন্য অারো বেড়েছে। শাড়িতে তাকে অসাধারন লাগছে।অামাকে চুপিচুপি ডেকে নিয়ে গেলো খড়ের গাড়ার অাড়ালে। সেখানে কোনকিছু বলার অাগেই অামার মাথা ধরে ঝপ করে সে তার দিকে এগিয়ে নিল ঠোঁট।তারপর কামড় বসালো। অামি চোখ বড় বড় করে অাছি। এক দীর্ঘ চুম্বনের পর সে দৌড়ে চলে গেলো। চোখের অাড়ালে যাওয়ার অাগে অামার দিকে তাকিয়ে একটা চোখটিপ দিল। অামি মনে মনে বললাম
-ইমপ্রেসিভ।
.
বিয়ের কাজে সহায়তা করছি পুরোদমে। এর মাঝে চলছে টুকটাক রোমান্স। বিয়ের অাগের রাত্রে সে অামাকে নিয়ে যায় সেই পুকুরঘাটে। সে বলে, “এখান থেকেই অামাদের প্রেমের পথচলা, চাই এখানেই অামাদের প্রেমের পরিপূর্নতা পাক।”
এই বলে সে অামার কাছে অাসলো। তার চোখের দিকে তাকালাম। মাদকতার অাবেশে তার চোখ বন্ধ করে ফেলছে। সে এগিয়ে অানছে তার ঠোঁট। কাছাকাছি অাসতেই অামি তাকে একটা ধাক্কা দিলাম। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে অাছে। অামি বললাম
.
-মনে অাছে, একদিন তুই মৃন্ময়ীর সাথে বাজি ধরেছিলি। অামার অাবেগকে পদদলিত করেছিলি। অাজ অামার সময়। তুই কি ভাবছিস অামি তোকে সত্যিই ভালোবাসি! ফাক অফ দৌস টাইপ লাভ। তুই চ্যালেঞ্জ করেছিলি, তার বদলে অামি রিভেঞ্জ নিলাম। ব্যাস অার কিছু না।
ঘটনার অাকষ্মিকতায় মৌ হতভম্ব হয়ে গেছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। দেখছি তার চোখ দিয়ে গলগল করে জল পড়ছে। অার অামি পেয়েছি সুখ। এক বুনোসুখ। সে বললো
-যা বলছো তা কি সত্য..?
-শতভাগ। শুধু এতটুকু বোধানোর জন্য প্রেমটা করেছি যে দ্যাখ প্রথম প্রেমের দহসকাল কেমন কাটে। প্রত্যেকটা বিরহের মুহুর্ত কাটে অবর্ননীয় নীল কষ্টে। ভালো থাকিস। অার কিছু বলার নেই।
-অভিক শোন….
.
অামি শোনি নি। রাতটা কোনরকম পার করেছি। তারপর চলে এসেছি অাপন নীড়ের ঠিকানায়। অনেকদিন পর মনটা হালকা লাগছে। একটু বোঝা কমেছে বুক থেকে। অাবার ফিরে গেলাম অাগের অামিতে। কালস্রোতে হারিয়ে গেলো মৌ, মৃন্ময়ী ও চিন্ময় দা।
.
১০.
কেটে গেলো অারো ২ টি বছর। নাগরিক ব্যাস্ততায় তাদের কথা অার স্মরন করা হয় না। মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে করে, কেমন অাছে মৃন্ময়ী, কেমন অাছে চিন্ময় দা।
.
অামি তখন পড়তাম ইন্টার ২য় বর্ষে। টেস্ট পরীক্ষা শেষ।এখন শুধু বাসায় বসে রিভিশন। সেদিন কেন যেন খুব বোরিং লাগছিলো। একটু শান্তির খোঁজে চলেছিলাম অামার শহরের প্রানকেন্দ্রে। ময়মনসিংহে। সেখানকার সবচেয়ে বড় পার্ক সার্কিড হাউজে বসে অাছি। সামনে মৃত ব্রহ্মপুত্র। কয়েকটা গাংচিল উড়ছিলো। হঠাৎ করে একটা কন্ঠ শোনে চমকে উঠলাম। কে যেন বলল
-বসতে পারি?
তার দিকে চোখ গেলো। সত্যিই অপ্রত্যাশিত জায়গায় অপ্রত্যাশিত মানুষ।
মৃন্ময়ী।
.
-বসো বসো।
অনেকক্ষন কেউ কথা বলতে পারলাম না। শেষে নীরবতা ভেঙে বললাম
-ভালো অাছো?
-জানি না। তুমি?
-ভালো থাকতে যাই না অার। নিলয়ের কি খবর…
-তার সাথে অামার ব্রেকাপ হয়ে গেছে।
মৌলিক বিষ্ময় নিয়ে জিগ্যেস করলাম
-কবে?
-সেবারেই।
-অার চিন্ময় দা কেমন অাছে?
মৃন্ময়ী কোন কথা বলে না।
-কি হল, বল না চিন্ময় দা কেমন অাছে…?
মৃন্ময়ীর মুখের দিকে তাকালাম। তার চোখ জলাসিক্ত। বললো
-মারা গেছে সেবারেই। ২০১১ সালে।
কেন যেন মাথাটা একটা চক্কর দিলো। খবরটা বুকে খুব অাঘাত করলো। অার তারপর যা শোনলাম তাতে হয়তোবা নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবো না। অার সারাজীবন অামার স্মৃতিতে অমলিন থাকবে। মৃন্ময়ী বলেছে
.
-“অামার দাদা ছিলো হিমোফিলিয়া তে অাক্রান্ত। এটা একটা জেনেটিক রোগ। এ রোগীদের রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না, যার ফলে কাঁটা স্থান হতে অনবরত রক্ত পড়ে যায়। অার ব্যাক্তিজীবনে অামার দাদা ছিলো স্পষ্টভাষী। বাবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাকে সবদিক ভাবতে হয়। অামার দাদা একদিন অাঁতলামি করে জানিয়ে দেয় সে সমকামী। তারপর বাবা তাকে নিয়ে অনেক মনরোগ বিশেষজ্ঞ দেখিয়েছে। কিন্তু কোন লাভ হয় নি। এদিকে এখানে বেড়াতে এসে দাদা তোমায় পছন্দ করে। তা অামি প্রথমদিনই বুঝতে পারি। কিন্তু তার কাছে যেন না থাকো সে কারনে অামি অামাকে দিয়ে ব্যাস্ত রাখতাম তোমায়। দাদার ডায়রী পড়ে সব জেনেছি। তোমাদের নদীর তীরে জোছনা, তোমাদের হোন্ডায় চড়া সব। এখানে বাবা দাদাকে পাঠিয়েছিলো একটু বিশ্রামের জন্য, একটু রিল্যাক্সের জন্য কিন্তু সে বিধি বাম। দাদা সেদিন অামাদের ঘাটে দেখে খুব কষ্ট পেয়েছে। ভেবেছে বিয়েটা সারা হোক সব তোমাকে বলবে সে। কিন্তু বিয়ে শেষ হওয়ার অাগেই তুমি চলে গেছো। সেদিন দাদা ঘর থেকে বের হয় নি। অবস্থা বেগতিক দেখে বাবাকে খবর দেই। বাবা এসে পরদিনই তাকে নিয়ে যায়।
দিনদিন তার পাগলামি বেড়ে যায়। সারাদিন রাত তোমার নাম জপে, এভাবে কাউকে পাগল হতে দেখিনি। মা বুদ্ধি দিলো বাবাকে যে দাদার বিয়ে দেয়া হোক। দাদা কঠিনমুখে না করে। অার বলে যে, “অামি চাইনা অারেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট হোক”
.
বাবা তার সিদ্ধান্তে অটল। একটা গরীব ঘরের সুন্দর মেয়েকে পছন্দ করে বাবা। যখন শোনে তার বিয়ে ঠিক তখন সে কিছু বলে না। রাত্রে খেয়ে ঘুমোতে যায়। রাত্র ১:৩০ এর দিকে অামি বাথরুমে যাওয়ার জন্য বের হই। দাদার রুম পেরিয়ে শেষমাথায় বাথরুম। দাদার রুমের নিচদিয়ে দেখি যে রক্ত ভেসে অাসছে। চিৎকার দিলাম অামি। বাবা মা দৌড়ে এলো। দরজা ভেঙে দেখি যে দাদা হাতের রগ কাটা। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেয়া হলো। কিন্তু রক্তক্ষরণ বেশি হওয়ায় পথের মাঝেই…..
কিছুক্ষন পর মৃন্ময়ী অাবার বলতে শুরু করলো
জানো দাদা যখন হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলো তখনও সে বলছে
-I Love U Ovik.
.
ঘটনার অাকষ্মিকতায় অামি প্রায় থ। সে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে তারপর বললো
মৌ এর সাথে এখনো অামার সম্পর্ক অাছে। তুমি যা করছো তা খুব খারাপ করছো। মৌ এর সাথে অামার বাজিটা কেন হয়েছিলো জানো..?
কারন মৌ ভাবতো তুমি তাকে ভালোবাসো। অার সে কারনে তুমি অার কাউকে ভালোবাসি বলবে না। অার সে তোমাকে অনেক অাগে থেকেই ভালোবাসতো।
সব শোনার পর অামার চোখ দিয়ে গলগল করে পানি পড়ছে। শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলাম সামনের দিকে।
কিছুক্ষন পর অাবার মৃন্ময়ী বললো
একটা কথা বলবো?
-বলো?
-অামায় ভালোবাসবে….
.
অামি কিছু বলি নি। চুপ করে উঠে হাটতে থাকলাম। জানি পিছনে মৃন্ময়ী বসে কাঁদছে…
কানে বাজছে “চিন্ময়ের ইতিকথা”
I LOVE YOU OVIK
.
*

.
বাসায় গেলাম।চিৎকার করে কাঁদছি বাথরুমের কল ছেড়ে। সত্যিই একটা ভালোবাসা পেয়ে হারিয়েছি অারেকটার দিকে তাকাইনি, যার কাছে ভালোবাসাটাই ছিল মুখ্য।
রওনা দিলাম মামার বাড়ি।পৌছুলাম। পড়ন্ত এক শীতের বিকেলে সূর্য প্রায় অস্তমিত। দুটো বছর মামার বাড়ি যাই না। এবার গেলাম। পুকুরের কাছে যেতেই দেখি উদাসী দৃষ্টীতে মৌ বসে অাছে যেন বুকে অাছে এক অপার্থিব ব্যাথা। কাছে গিয়ে বসলাম। চুপচাপ বসে অাছি। মৌ এর হাতটা ধরে বললাম
.
-সরি…
অামার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। সে বললো
-মৃন্ময়ী তোকে সব বলে দিয়েছে…
অামি তার হাতটা কপালে ধরে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠি। হেঁচকি তুলে বলি
অামায় মাফ করে দে দোস্ত।
-অামি সেদিনেই তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তবে জানিস কি, তুই ভালোবাসা বুঝতে পারিস না রে। এটাই তোর অক্ষমতা। কে জানে, হয়তো ভালোবাসা পেয়ে হারাবি।
অামি জলসিক্ত চোখে অাবার তাকে বললাম
-অারেকটা সুযোগ দিবি…
-না, তা হয়না রে, তা হয়না…
অামরা বন্ধু অাছি বন্ধুই ভালো….
এরপর দুজনেই চুপ করে অাছি। হঠাৎ সে বললো
-অাচ্ছা খেঁজুরের রস খেয়েছিস?
-না।
-যা কাল খাওয়াবনে….
.
এই কথা বলে সে অামার কাঁধে মাথা রাখলো। পুরো বাড়িতে অার কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। শুধু দিনশেষে রয়ে গেলাম অামরা। সূর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে তার শেষ কিরন…..
ডায়রীটা শেষ হয়ে গেলো। এতদিন পরেও চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো কয়েকফোঁটা গরল। ৭বছর হয়ে গেছে এখনো তাকে ভুলতে পারি না। দিনশেষে যখন একা থাকি তখন “চিন্ময়ের ইতিকথা” টা মনে পড়ে
.
অাই লাভ ইউ অভিক
অাই লাভ ইউ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.