চিরন্তন প্রেম আর আমাদের স্বপ্ন

লেখকঃ স্বপ্ন ডানা

ঘড়িতে সকাল সাতটা। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে বর্ণিল। রাতজেগে ভার্সিটির অ্যাসাইনমেনট কমপ্লিট করেছে সে। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলে বেজে উঠল অর্ণবের কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত –
কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে?
তোমারে দেখিতে দেয়না!
মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয়না!
মোহমেঘে তোমারে,
অন্ধ করে রাখে, তোমারে দেখিতে দেয়না!
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাইনা?
শুধু বর্ষণ ফোন করলেই এই রিংটোন বাজে। ঘুমচোখে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে-
-শুভ সকাল। আমার জানটুসটা এখনও ঘুমায়?
-ঘুমালে ফোন রিসিভ করলাম কেমনে?
-ওহ! তাইতো। ক্লাস কয়টা থেকে?
-নয়টা থেকে। কাল রাতকরে ঘুমাইছি।
-ঠিক আছে সোনা, তুমি আরও একঘণ্টা ঘুমাও। অফিসে যাওয়ার আগে ঠিক আটটায় তোমায় জাগিয়ে যাব।
-ওকে জান, লাভ ইউ।
ফোনটা রেখে আবার ঘুমাতে লাগল বর্ণিল। বর্ষণের বাসা থেকে অফিস ৪০ কিলোমিটার দূরে। নিজের APACE বাইকে রোজ সে আসাযাওয়া করে। নয়টায় অফিস, তাই আটটার মধ্যেই বেড়িয়ে পড়তে হয়। ফ্রেস হয়ে নাস্তা করে রেডি হতে হতে আটটা বেজে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিল বর্ণিলকে।
-জান, উঠে পড়। আটটা বাজে।
-তুমি আদর না দিলে আমি উঠবোনা।
-ওরে দুষ্টু, সাতসকালেই দুষ্টুমি হচ্ছে?
-আদর দিবি কিনা বল।
-দিচ্ছি দিচ্ছি। উমমমমমাহহহহহ। আমারটা ?
-হুম, উমমমমমাহহহহ । তুমি কি বের হচ্ছ?
-হ্যাঁ।
-পৌঁছে অবশ্যই জানাবা, জানইত কত টেনশন করি তোমায় নিয়ে।
-ওকে বেবি, জানাব। রাখি।
ফ্রেস হয়ে রুমে আসার সময় বর্ণিল দেখল, হলের বাগানে কামিনী ফুল ফুটছে। ফুলটা বর্ষণের খুব পছন্দের। কামিনী ফুল পেয়ে বর্ষণযে কতটা খুশি হত, তা ভাবতে ভাবতে আনমনে হাসতে লাগল বর্ণিল। বন্ধু হৃদের ডাকে তার ঘোর কাটল।
-কিরে, একা একা হাসছিস যে!
– দেখনা বাগানে কি সুন্দর কামিনী ফুল ফুটছে!
-ওহ! এই কাহিনী? তুই নিশ্চয়ই ক্যাটরিনা কাইফকে কল্পনায় এই ফুল দিচ্ছিলি? হৃদের কথায় হোহো করে হেসে উঠল বর্ণিল। হুম, বর্ষণতো তার কাছে ক্যাটরিনা কাইফ-ই।
-ক্লাসে যাবিনা?
-এইতো রেডি হয়ে বের হব।
হৃদকে বিদায় দিয়ে রুমে এল বর্ণিল। রেডি হয়ে ক্যান্টিন থেকে নাস্তা সেরে ক্যাম্পাসে পা রাখতেই বর্ষণের ফোন।
-জান, অফিসে পৌঁছে গেছি। তুমি কই?
-মাত্রই ক্যাম্পাসে ঢুকলাম।
-নাস্তা করছ?
-করছিরে বাবা।
-ওকে সোনা, ক্লাসে যাও।
-হুম কাজ কর, বাই।
-ওকে জানপাখি।
একটা পর্যন্ত ক্লাস চলল বর্ণিলের। ক্লাসশেষে ফোন দিল বর্ষণকে।
-আমার বুড়াপিচ্চিটা এখন কই, আমি জানি।
-তাইনাকি? বলতো।
-তুমি এখন গাফফারের খিচুড়ির দোকানে।
– আরে, কি করে বুঝলা?
-এতটুকুন না বুঝলে আর কি ভালবাসলাম তোমায়?
-আমাকে এত ভালোবাসো কেন? কখনো হারিয়ে যাবেনাতো? মরে যাব তাহলে।
-ইস! শখ কত। আমি এত সহজে তোর জীবন থেকে হারাব? তোকে ছাড়া আমিও যে বাঁচবনা।
-লাঞ্চ করছ?
-না, করব।
-ভুনা খিচুড়ি আর গরুর মাংস তোমার সবথেকে পছন্দের ডিস। তোমাকে রেখে একা খেতে খুব কষ্ট হচ্ছে, জান।
-এরই নাম ভালবাসা। কাউকে ভালবাসলে তার পছন্দের কিছু যখন সামনে আসবে, তুমি তাকে মিস করবাই। সকালে কামিনী ফুল দেখে যেমন আমি তোমায় খুব মিস করছিলাম।
-কি বললা, কামিনী ফুল? ওয়াও! কাল আসার সময় আনবানা?
-আনবোরে পাগলু।
-এই, কাল রাতে ঘুমাতে পারনি, হলে ফিরে খেয়ে একটা জম্পেস ঘুম দাওতো। শেষে আবার শরীর খারাপ করুক!
-জো হুকুম জাহাপনা।
হলে ফিরে লাঞ্চ করে শুয়ে পড়ল বর্ণিল। আনমনে ভাবতে লাগল কতটা পাল্টে গেছে তার জীবন। যে বর্ষণকে কিছুদিন আগেও চিনতোনা, আজ তাকে ছাড়া তার একবেলাও চলেনা। ফেসবুকে ওদের পরিচয়। অনেকদিন ধরে ফ্রেন্ডলিস্টে থাকলেও ওদের মধ্যে তখনো কথা হয়নি। বর্ণিল তখন ভর্তিকোচিং করছে। অনলাইনে পেয়ে একদিন বর্ষণকে নক করল সে। প্রাথমিক আলাপচারিতা হল। বর্ণিলের মোবাইলে আননোন নম্বর থেকে একটা ফোন আসল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে- বর্ষণ বলছি। সেইথেকে রোজই ওদের কথা হত। নিজেদের সব কথাই ওরা শেয়ার করত। একদিন ভুলে মোবাইলটা বাসায় ফেলে যায় বর্ষণ। বর্ণিল ফোন দিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু কেউ ধরছেনা। বর্ণিলের নম্বর মুখস্ত না থাকায় বর্ষণও কিছু জানাতে পারছেনা। সারাটাদিন অস্থিরতায় কাটল দুজনের। অফিস থেকে ফিরেই ফোনটা হাতে নেয় বর্ষণ। দেখে বর্ণিলের মোবাইল থেকে মোট ১১৯ বার ফোন এসেছিল। বর্ণিলকে সাথে সাথেই ফোন দিল। রিংটোন শুনে বর্ণিল বুঝতে পারে ফোনটা বর্ষণের। রিসিভ করল। কেউ কোন কথা বলছে না। হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল বর্ণিল। ঘটনার মারাত্মকতা অনুধাবন করে বর্ষণও কাঁদতে লাগল।
-আই লাভ ইউ
-আই অলসো লাভ ইউ
দুজনের চিন্তাধারা একরকম। ওরা বিশ্বাস করে ভালবাসা হয় মানুষের সাথে মানুষের। এভাবেই ওদের সম্পর্কের শুরু। মান-অভিমান, খুনসুটি, দুষ্টুমির আবর্তে চলতে থাকে সবকিছু। ওদের প্রথম দেখা হয় বর্ণিল রুয়েটে ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে। ১৯ নভেম্বর, ২০১২। বর্ষণের কথামতো চৌড়হাঁস মোড়ে নামল বর্ণিল। নেমেই বাইকে বসা বর্ষণকে দেখতে পেল সে। চোখে দুষ্টু হাসি নিয়ে দুজন দুজনকে দেখছে। মুখে কোন কথা নেই, চোখেচোখে কথা হচ্ছে দুজনার। লজ্জায় লাল দুজনের মুখ। হাতে সময় নেই। ২০ মিনিট পর লাস্ট বাস ছেড়ে যাবে। কাল একটা পরীক্ষা থাকায় বাসটা ধরতেই হবে বর্ণিলকে। বাইকে চড়ে টার্মিনালে পৌঁছে টিকিট কেটে বাসে ব্যাগ রেখে নেমে আসল বর্ণিল। বর্ষণ ওর সামনে দাঁড়ানো। বর্ণিলের হাত ধরে বলল, ‘চল, ঐ বকুলতলায় দাঁড়াই’। দাঁড়িয়ে দুজন দুজনকে দেখছে। হঠাৎ বর্ণিলকে কিস করে বসল বর্ষণ। ঘটনার জন্য অপ্রস্তুত থাকলেও সমানভাবে সাড়া দিল বর্ণিল। ওদিকে বাস ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাস্তবতার তাগিদে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাসে গিয়ে বসল বর্ণিল। জানালা দিয়ে দেখতে লাগল বর্ষণকে। বাস চলতে শুরু করল। যতক্ষণ সম্ভব, দুজন দুজনকে দেখতে লাগল। কিছুদূর যেতেই বর্ষণের ফোন এল। ফোন রিসিভ করে বর্ণিল বুঝতে পারল বর্ষণ কাঁদছে। তার দুচোখ বেয়েও জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
বর্ণিল এখন বুয়েটে প্রথমবর্ষে অধ্যয়নরত। ছোটবেলা থেকেই সে এখানে পরার স্বপ্ন লালন করে এসেছে। স্বপ্ন সত্যি হবার দিন দুজনে চিৎকার করে কেঁদেছিল। সে কান্নায় ছিল বিশ্বজয়ের আনন্দ। কাল বর্ষণের কাছে যাবে বর্ণিল। পরশু শুক্রবার। সেদিন থেকে পরদিন ব্যাক করবে সে।
পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে বর্ণিল। বর্ষণের ফোন পেয়ে তার ঘুম ভাঙে ঠিক ছয়টায়।
-জান, অফিস শেষ। বের হচ্ছি।
-পৌঁছে জানাবা। একটু নিউমার্কেটে যাব।
-ওকে যাও, বাই।
নিউমার্কেট থেকে বর্ষণের জন্য ঘড়ি আর সানগ্লাস কিনে হলে ফিরছিল বর্ণিল। পলাশীর মোড়ে আসতেই বর্ষণের ফোন।
-জান, পৌঁছে গেছি।
-ওকে, ফ্রেস হয়ে রেস্ট নাও। কাল একটা ক্লাসটেস্ট আছে। এখন পড়ব। একদম ডিস্টার্ব করবানা।
-ওহ! আমি বুঝি তোমায় খুব ডিস্টার্ব করি? যাও আর ফোন-ই দেব না।
ফোন কেটে দিল বর্ষণ। বর্ণিল জানে, একটু পরেই বর্ষণ ফোন দেবে। তাকেতো সে চিনে! পড়া শেষ করে ডিনার সেরে রুমে ঢুকবে, তখনি বর্ষণের ফোন এল।
-আপনাকে ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত।
-এতক্ষণে ডিস্টার্ব করার কথা মনে পড়ল? কখন থেকে ওয়েট করে আছি!
-তাইনাকি? খাইছিস?
-মাত্রই খেয়ে আসলাম। তুমি?
-একটু আগে খাইছি। কাল কখন রওয়ানা দিবা?
-এগারটায় ক্লাস শেষ। একটার বাস ধরব।
-শোন, ঘুমাব এখন। খুব টায়ার্ড লাগছে।
-কি? আমাকে আদর না দিয়ে ঘুমাতে পারবা?
-উহহহ, ঢং! পাগল আমার! নে উমমমমমাহহহহহ।
-উমমমমমাহহহহ।
-ওকে বেবি, শুভরাত্রি।
-শুভরাত্রি।
রাতেই সব গোছগাছ করে রাখবে বর্ণিল। বর্ষণের গিফট করা নীল শার্টটায় তাকে দারুণ মানায়। জিন্স, শার্ট আর পাঞ্জাবি লন্ড্রি থেকে নিয়ে এল সে। গিফট বক্সে ঘড়ি, সানগ্লাস আগেভাগেই র্যাআপিং করে এনেছে। সব ব্যাগে ভরল। ওহহহহহ! বর্ষণের জন্য স্পেশাল গিফট হিসাবে কেনা চিত্রাঙ্গদা, মেমরিজ ইন মার্চ মুভির ডিভিডিগুলো ভরা হয়নি। ব্যাস! আর কিছু বাদ নেই। কাল আটটা থেকে ক্লাস। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। ঠিক ছয়টায় উঠল। ফোন দিল বর্ষণকে।
-শুভ সকাল। আমার বুড়াপিচ্চিটা উঠছে?
-উঠবো এখন। তুমি একবারে বের হবা?
-ক্লাস শেষ করে হল থেকে ব্যাগটা নিয়েই বের হব। শোন, আজতো আমি নয়টায় ক্লাসে থাকব, পৌঁছে ম্যাসেজ দিয়ে জানাবা।
-ওকে জান।
নীল শার্ট আর জিন্স পড়ে বের হল বর্ণিল। ক্যাম্পাসে যেতেই রিফাতের সাথে দেখা।
-দোস্ত তোকেতো সেইরাম লাগছে। শার্টটা যেন তোর জন্যই বানানো হইছে!
-হাহাহা। ঠিক বলছিস। ক্লাসে যাবিনা?
-চল।
নয়টা বাজার একটু আগেই স্যার প্রথম ক্লাস নিয়ে বের হলেন। বর্ষণকে ফোন দিল বর্ণিল।
-পৌঁছাইস?
-হুম। ম্যাসেজ লিখতেছি আর তুমি ফোন দিলা।
-ওহ! আমি ক্লাসে।
-ওকে বাই, জিএম স্যার সালাম দিছেন।
-ওকে জান।
ক্লাস শেষ। হল থেকে ব্যাগ নিয়ে রিকশায় উঠল বর্ণিল। বর্ষণের ফোন এল।
-বের হইছ?
-মাত্রই বের হলাম।
-তাড়াতাড়ি আস জান, আর যে তড় সইছে না।
-আমার মনটাও যে আনচান করছে।
-এই রাখি। বস ফোন দিছে।
-ওকে বেবি।
রিকশা থামল শাহবাগে এসে। তাজা দেখে কামিনী ফুল নিল বর্ণিল। একটা ট্যাক্সিতে করে গাবতলি পৌঁছাল। লালন এক্সপ্রেসে ডি-১ টিকিটটা পেয়ে গেল। বাসে উঠে ফোন দিল বর্ষণকে।
-জান, আমি আসছি তোমার কাছে।
-বাসে উঠছ?
-মাত্র উঠলাম, ছয়টার মধ্যে পৌঁছে যাব।
-ওকে, তোমার কাছেতো বাসার একটা চাবি আছেই। আমি সাতটার মধ্যে চলে আসব।
সময় যেন ফুরাচ্ছেনা। দুইশ কিলোমিটার রাস্তার কিলোমিটার পোস্টগুলো দেখে যাচ্ছে বর্ণিল। পথ আর শেষ হয়না। পাঁচ ঘণ্টা পাঁচ বছরের মত মনে হচ্ছে। বর্ষণও অস্থির। ফোন দিচ্ছে একটু পরপরই।
ঠিক ছয়টা পনেরতে বাসায় পৌঁছাল বর্ণিল। বর্ষণও বেরিয়ে গেছে। হাতে সময় নেই। বর্ষণ আসার আগেই ফুল দিয়ে ঘর সাজাতে হবে তাকে। সব ঠিকঠাকভাবে সাজানো হল। সাতটা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে বর্ষণ আসল। দরজা খুলতেই বর্ণিলকে ‘জান’ বলে জড়িয়ে ধরল। কামিনী ফুলের গন্ধে পুরো ঘর মৌ মৌ করছে। পাগলটার পাগলামি দেখে জল এসে গেল বর্ষণের চোখে।
-এত ভালবাস কেন আমায়?
-তুমি যে আমার বুড়াপিচ্চি।
বর্ষণকে আদর করে এনামেই ডাকে বর্ণিল। বর্ষণযে তার জন্য ঈশ্বরদীর লিচু আর কুমারখালীর রমেশের দই এনেছে, এতক্ষণে তার চোখে পড়ল।
-এগুলা আমার জন্য?
-না, আমারতো আরও দশটা প্রেমিক আছে, ওদের জন্য।
-আমি এবছরে এখনো লিচু খাইনি। আমার সব থেকে পছন্দের ফল!
-জানি, এজন্যইতো তোমার জন্য আনলাম।
একটা লিচু ছিলে বর্ণিলের মুখে দিতে গেল বর্ষণ। বর্ণিল উল্টে তা বর্ষণের মুখে পুরে দিল।
-এবার ওটা আমার মুখে দাও।
-হাহাহা! তুমি না!
ঠোঁটদুটো বর্ণিলের দিকে এগিয়ে কিস করতে করতে লিচুটা ওর মুখে ঠেলে দিল বর্ষণ।
-চল ফ্রেশ হয়ে একটু ঘুরে আসি। গড়াই পাড়ে যাব।
-হুম চল।
আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। নদীর পাড়ে বর্ষণের কোলে শুয়ে চাঁদ দেখছে বর্ণিল। বর্ষণ গান ধরল-
খুব কাছাকাছি তুমি আমি আছি
নিশ্বাসে খুঁজে পাই বিশ্বাসের ছোঁয়া
তোমার আমার প্রেম বিশুদ্ধ সরোবরে অবগাহনের ধোঁয়া
-যদি সারাজীবন তোমার কোলে এভাবে শুয়ে থাকতে পারতাম!
-কখনো আমায় ছেড়ে যাবেনাতো?
-সবই আল্লাহ্‌র ইচ্ছা। তিনি চাইলেতো এখনই আমাকে ………………
কথা শেষ না হতেই বর্ণিলের মুখ চেপে ধরল বর্ষণ।
-আর কখনো যদি এমন কথা বল, নিজেকে শেষ করে ফেলব আমি। তুমি না থাকলে আমি কার জন্য বাঁচব?
কথা বলতে বলতে দুচোখ বেয়ে জল গড়াতে লাগল বর্ষণের।
-এই কাঁদবেনা, এটা আমি সইতে পারিনা। কান ধরলাম, আর কখনো এমন বলবনা।
-চল উঠি।
-হুম চল।
দই-চিড়া বর্ণিলের খুব পছন্দের। বাসায় ফিরে চিড়া ভিজিয়ে দই মাখাল বর্ষণ। বর্ণিলকে খাইয়ে দিল নিজ হাতে। বর্ণিলও বর্ষণকে খাইয়ে দিল। খাওয়া শেষে গামছা দিয়ে বর্ষণের চোখ বেঁধে দিল বর্ণিল। ব্যাগ থেকে ঘড়ি, সানগ্লাস বের করে পড়িয়ে গামছা খুলে দিল। বর্ষণের খুব পছন্দ হল জিনিসদুটো। ওদুটো নাকে-মুখে ঘষতে লাগল সে। ওদিকে চিত্রাঙ্গদা অন করল বর্ণিল। এক চমক না কাটতেই আরেক চমকে আচ্ছাদিত হল বর্ষণ। বর্ণিলকে শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরল।
-আমার মনের চাহিদাগুলো কিভাবে বুঝ?
-আমি যে তোমার প্রানপাখি!
বর্ষণের কোলে শুয়ে চিত্রাঙ্গদা দেখছিল বর্ণিল। কিছুক্ষণ পর-
-খুব ঘুম পাইছে।
-চল শুয়ে পড়ি, কাল মুভি দেখবনে।
একটাই বালিশ বিছানায়। বর্ষণ শুয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিল। বর্ণিল এসে তার বুকে মাথা রাখল। ‘এটাই আমার বালিশ’- এই বলে বর্ষণের বুকে নাক ঘষতে লাগল সে। বুকের লোমগুলো নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল। বুকের গন্ধ নিয়ে যাচ্ছে সে প্রাণভরে। হঠাৎ মাথাটা তুলে বর্ষণের ঠোঁটে ঠোঁট রাখল বর্ণিল। পাগলের মত কিস করতে লাগল দুজনে। চুম্বনপর্ব শেষে মাথাটা আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনল। ঘুমিয়ে পড়ল দুজনে। সকালে ঘুম ভাঙার পর-
-এই উঠ, আমরা লংড্রাইভে যাব।
-সত্যি?
-হুম। পঙ্খীরাজে চড়ে আজ হারাব দুজনে।
বাইকে ঝড় তুলে এগুচ্ছে বর্ষণ। দুচোখ বন্ধ করে ওকে পেছন থেকে জাপটে ধরে আছে বর্ণিল। বাইক থামল লালনের মাজারে এসে। বর্ণিল গান ধরল-
মিলন হবে কত দিনে?
আমার মনের মানুষেরও সনে………………………
বর্ষণ ওকে একটা একতারা কিনে দিল। সেখান থেকে মীর মোশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা ঘুরে গাফফারের খিচুড়ির দোকানে আসল ওরা। লাঞ্চের মেন্যু খিচুড়ি আর গরুর মাংস। লাঞ্চ শেষে বাসায় ফিরে ওরা চিত্রাঙ্গদার বাকি অংশ দেখল। বিকেলে আবার বের হল। লাভলি টাওয়ারে গেল শপিং করতে। বর্ণিলকে একটা হেডফোন আর একজোড়া জুতা কিনে দিল বর্ষণ। সন্ধ্যা হয়ে এল।
-চল, গড়াই পাড়ে যাই।
-আমিও ওখানে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম।
দুজনে গড়াই পাড়ে গেল। বর্ষণের কাঁধে মাথা রেখে গোমড়ামুখ করে আছে বর্ণিল।
-কি হল? মুখ বাংলার পাঁচের মত করে রাখছ ক্যান?
-কাল চলে যাব, আবার কবে দেখা হবে, কে জানে?
-পাগল! আমাদের দেহের মাঝে দূরত্ব থাকলেও মনের মাঝে কোন দূরত্ব নেই।
বর্ণিলের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে গান ধরল বর্ষণ-
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে,
দেখতে আমি পাইনি তোমায়,
দেখতে আমি পাইনি।
রাতে কলিজা আর পরোটা দিয়ে ডিনার সেরে ওরা বাসায় ফিরল। বর্ষণকে জাপটে ধরে বিছানায় ফেলল বর্ণিল। দুজনে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল। এবার বর্ণিলের বুকে ঘুমাল বর্ষণ। বর্ষণের ঘুম ভাঙল সকাল সাতটায়। বর্ণিলকে দ্রুত ডেকে তুলল।
-আমাকে তাড়ানোর জন্য এত ব্যস্ত যে!
-অবুঝ হয়োনা সোনা। তোমাকে যে অনেক বড় প্রকৌশলী হতে হবে! এত অবুঝ হলে চলবে? রেডি হও। তোমাকে বাসে তুলে দিয়ে আমি অফিসে যাব।
দুজনে রেডি হয়ে নিল। বর্ষণকে জাপটে ধরে কাঁদতে লাগল বর্ণিল। বর্ষণও পারল না চোখের জল আটকাতে।
-এভাবে আর কতদিন? আমার যে খুব কষ্ট হয় তোমায় ছেড়ে থাকতে।
-এইতো সোনা, তুমি বিএসসি শেষ করার পর আমরা বাইরে চলে যাব। সেখানে আমরা আমাদের মত করে বাঁচতে পারব।
-সত্যি বলছ? আমি কিন্তু সারাদিন তোমায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকব। আমাদের এই স্বপ্ন সত্যি হবেতো?
-হবে জান, বর্ণিল স্বপ্নে বিভোর হয়ে ভালবাসার বর্ষণে ভিজব দুজন।
-আবার কবে হবে দেখা?
-জানিনা। তবে সে দেখার আশায় বুক বেঁধে করে যাব মধুর অপেক্ষা।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৯ই আগস্ট, ২০১৩।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.