টি-স্টল

লেখকঃ একলা পথিক

১.
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দক্ষিণে শতবর্ষী যেই বুড়ো বটগাছটা দাড়িয়ে সেই বটগাছের তলায় একচালা টিনের নড়বড়ে ছোট্ট ঘরটাই রহমত মামা’র টি-স্টল। টি-স্টল’টা দেখতে গাঁয়েগতরে মুমূর্ষু হলে কি হবে। অত্র এলাকার মধ্যে আহামরি ডাকসাইটে বটে। একযুগেরও বেশি পুরাতন নামজাদা এ টি-স্টলে কাঁকডাকা ভোঁর হতে নাকডাকা গভীর রাতঅব্দি ছেলে-ছুড়ি বুড়ো-বুড়ি’দের জমায়েত লেগেই থাকে। লোকমুখে নাম শুনেছে অথচ এই টি-স্টলের চায়ের কাঁপে ঠোঁট ভেজাতে আসে নি এমন লোকের জুড়ি মেলা ভার। আসলে রহমত মামা’র হাতের চা’য়ে জাদু আছে বলা যায়।

ক্লাস,স্টাডি আর টিউশনির ফাঁকে যে অবসরটুকু থাকে তার পুরোটা এই টি-স্টলেই ব্যয় করে জাহিদ। তাই টি-স্টলের অধিকর্তা রহমত মামা’র সাথেও তার সখ্যতা বেশ গাঢ়। টি-স্টলে আগত নানান প্রকৃতির মানুষের বিচিত্র আচরণ ও কর্মকাণ্ড দেখে ভেতোরে ভেতোরে এক ধরণের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করে সে।
মাঝেমাঝে সেই অনুভূতিগুলো নিয়ে একান্তে গবেষণা করে মস্তিষ্কে কীসব রহস্যের জট পাকায়। আবার কখনো হয়তো অকারণে কিছু একটা নিয়ে ভীষণ ভাববে। ভেবে ভাবনার জলে জাল ফেলে জলের অতল হতে নীলকান্তমনি খুঁজে আনার প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে তটস্থ রাখতেই ভালোবাসে।

প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা সাদামাটা প্রকৃতির জাহিদ এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। টি-স্টলের উল্টোদিকের সুবিশাল আবাসিক ছাত্র হলের ১০ফিট বাই ৮ফিটের ছোট্ট কামরায় একাই থাকে। বন্ধুবান্ধব তেমন নেই বললেই চলে। অপ্রয়োজনে কারো সাথে মেলামেশা কথাবলা একদমই স্বভাব বিরুদ্ধ জাহিদের।
স্বল্পভাষীতা তার জন্মগত বৈশিষ্টও বলা চলে। ভয়ংকর রকমের প্রয়োজন ও ভদ্রতার খাতিরেই দুয়েকজন সহপাঠীর সাথে গা বাঁচানো সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। জাহিদের বদভ্যাস বলতে সময় অসময়ে রহমত মামা’র টি-স্টলে হানা দিয়ে কয়েক কাঁপ চায়ের সুধা পান করা এই যা।

২.
দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁইছুঁই। বটের ছায়ায় টি-স্টলের সামনের চৌপায়ার বেঞ্চিতে বসে পত্রিকাতে নিমগ্ন জাহিদ। হঠাৎ সাইসাই করে কোঁথা হতে লালসাদা কালার কম্বিনেশনের এক মোটরসাইকেল ছুটে এসে থামলো তার ঠিক কয়েক গজ সামনে। হুট করেই জোরসে বাইকের ব্রেক কষায় দমকা বাতাসে একগাদা ধুলো এসে পড়লো জাহিদের গায়ে।

রাগভরা চোখে তাকাতেই দেখতে পেলো একজোড়া কপোতকপোতী বাইকে বসা। পেছন থেকে মেয়েটা শক্তকরে ছেলেটাকে বুকের সাথে জাপটে ধরে আছে। চোখের দেখাতেই ওদেরকে জাহিদের কাছে হালআমলের কয়েকটা সস্তা প্রেমিক যুগল থেকে আলাদা কিছুই মনে হল না। জাহিদের কাছে কেন জানি মনে হয় আজকালকার ছেলেমেয়েদের মাঝে প্রেম ভালোবাসা বলে কিচ্ছু নেই। যা আছে তা কেবলমাত্র প্রেম নামক লোকদেখানো আধুনিক সংস্কৃতি।

ছেলেটা বেশ আধুনিক ও সুদর্শন। ঠোঁটে ধোঁয়া ওঠা সিগারেট,লম্বা কোঁকড়া চুল,কানে দুল,হাঁতে গুন্ডাদের মত ব্রেসলেট প্যাঁচানো,পায়ে দামী কালারফুল জুতা আর জিম করা দানবাকৃতির বডির সাথে বুকফাঁড়া গেঞ্জিতে চেহারায় পুরোদস্তুর নায়কোচিত ভাব।
মেয়েটাও একেবারে কম যায় না। আহামরি সুন্দরী তবে স্মার্টনেসে কিছুটা অশালীনতা প্রকাশ্য। টাইট ফিটিংসের ক্লিভেজ বের করা একটা টি-শার্টের সাথে স্কিন টাইট জিন্স প্যান্ট আর হাই হিলে চেহারাতে পশ্চিমা আভিজাত্য স্পষ্ট। ছেলেটা বাইক থেকে নেমেই হাঁক ছেঁড়ে দুইকাঁপ চা’য়ের অর্ডার দিলো।

৩.
সৃষ্টিকর্তা কিছুকিছু মানুষকে হয়তো বাড়তি কিছু গুণ দিয়েই পৃথিবীতে পাঠান। জাহিদ মনে হয় সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। চোখের দেখাতেই কারো অন্তরের অন্তঃস্থলের আবহাওয়া অনুধাবন করতে পারার বিশেষ ক্ষমতা আছে তার। কেননা ওদেরকে চাক্ষুষ করেই জাহিদ অনুভব করলো ছেলেটি হাই ফ্যাশেনেবল ও হালকা চঞ্চল চরিত্রের হলেও ভেতরটা অত্যন্ত প্রেমময় ও আবেগি।
নিমিষেই যে কাউকে আকর্ষণ করার মায়াবী জাদু আছে ছেলেটার মধ্যে। মুখাবয়বে একটা বুনো প্রশান্তি লুকিয়ে আছে যা সহজে কেউ ধরতে পারে না। ছেলেটির বিশেষ এ দিকটা জাহিদের বেশ নজর কাড়লো। ছেলেটিকে ঘিরে অন্যরকমের এক মুগ্ধতার রেশ তৈরি হল তার অভ্যন্তরে। কিন্তু মেয়েটিকে তার কাছে বিশেষ সুবিধার বলে মনে হল না। কেমন যেন গড়মিল আলগা চরিত্রের শৃঙ্খলবিহীন মেয়েদের মতই লাগলো।

একবার চায়ের কাঁপে চুমুক দিচ্ছে। পরক্ষণেই কি যেন একটা মজার কথা তুলেই উচ্চশব্দে হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ের উপর ঢলে পড়ছে। কখনো দুষ্টুমিষ্টি খুনসুটিতে মাতছে। আবার কখনো নির্লজ্জের মত জনারণ্যে একি কাঁপেই দুজনে ঠোঁট ভেজাচ্ছে। প্রকাশ্যে দুজনের প্রেমের রসায়ন হয়তো সাবলীল। কিন্তু ভেতোরে কোথাও একটা ঝামেলা অবশ্যই আছে বলেই মনে হয় জাহিদের।

হঠাৎ একটা বিষয় জাহিদের স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হলো। খেয়াল করলো প্রেমিক যুগলের নিবিড় প্রেমালাপের মধ্যেই মেয়েটার মুঠোফোনে তৃতীয় কেউ একজন একের পর এক ফোনকল করেই চলেছে। আর প্রতিবারই মেয়েটি কোন না কোন একটা মিথ্যা অজুহাত দাড় করিয়ে খানিকটা দূরে সরে গিয়ে বেশ রসিয়ে রসিয়ে ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির সাথে কথা বলছে।

বারবার মেয়েটির এমন আচরণে ছেলেটিকে বেশ রাগান্বিত ও বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। জাহিদ অবাক হলো গভীর বিষণ্ণতায় ছেলেটির মন ভারাক্রান্ত হলেও তা যেন মেয়েটিকে বিন্দুমাত্রও আন্দোলিত করছে না। ভীষণ চাপাকষ্ট যে ছেলেটার সমস্ত শরীর জুড়ে খেলা করছে সেটা কিন্তু ঠিকই জাহিদের চোখে বিঁধলো।
তবে পুরো বিষয়টা জাহিদের কাছে কেমন যেন অন্যরকম ভাবে ভালো লাগলো। দুজনের মধ্যকার ভাবের মঞ্চায়নটা জাহিদের কাছে কখনো কিছুটা আবছা কুয়াশাচ্ছন্ন আবার কিছুটা রৌদ্রজ্জ্বল পরিস্কার দৃশ্যের মতন ঠেকতে লাগলো।

সেদিনই জাহিদ রহমত মামার কাছ থেকে জানলো প্রেমিক যুগলও তারই ভার্সিটির স্টুডেন্ট। আর এই জুটি নাকি প্রায়ই এমন অপরাহ্ণে টি-স্টলে আসে ছোটখাট ডেইট মারতে। সেই থেকে জাহিদও পালা করে ক্লাস কাজের ব্যস্ততার ফাঁক বের করে টি-স্টলে চলে আসে। আর দূর থেকে নীরব দর্শক হয়ে ডানাছাড়া দুই কপোতকপোতীর প্রেম নামক রহস্যময় ছলাকলা উপভোগ করে।
জাহিদ বেশ জোরালোভাবেই উপলব্ধি করতে লাগলো সুন্দরী মেয়েটি নয়। দিনকে দিন সে ঐ উষ্কখুষ্ক চুলের হাঙ্কিপাঙ্কি চরিত্রের ছেলেটার প্রতিই অস্পৃশ্য টান অনুভব করছে। যুবকটির অদৃশ্য এক আকর্ষণ রোজরোজ চুম্বকের মত তাকে টি-স্টলের দিকে টেনে নিয়ে আসে। তার বুনো আভিজাত্য জাহিদের হৃদমাঝারে এক অদ্ভুত ঝড় তোলে যার আওয়াজ সে ব্যতিত আর কেউই শুনতে পায় না।

কিন্তু কি সেই আকর্ষণ আর কেনই বা অপরিচিত যুবকের প্রতি এতোটা মায়া ও পিছুটান? তা জাহিদ নিজেও বুঝে না। হয়তো ছেলেটার প্রতি মেয়েটার করুণ অবহেলা,ভালোবাসার মিথ্যা নাটক! নয়তো মেয়েটির প্রতি ছেলেটার বুকভরা একপেশে নিষ্ফল ভালোবাসা আর হাহাকারই তার কারণ।
কিন্তু ছেলেটির প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ তার জন্য কেবলমাত্র ঐ দূর থেকে দর্শন করা পর্যন্তই সার,সে বিষয়ে জাহিদ যথেষ্ট জ্ঞাত। কেননা জাহিদ বরাবরই বাস্তববাদী। সত্যকে মেনে নিতে ভালোবাসে,বিশ্বাস করে। অযথা আবেগের চুলকানি তার ভেতোরে বিন্দুমাত্রও নেই।

জাহিদ মনস্তাত্ত্বিকভাবেই অবগত,ছেলেটির কাছে গিয়ে পরিচিত হওয়া কিংবা কথা বলা তো দূরের কথা। তার মত গাও গেরাম থেকে আসা অনাধুনিক আটপৌরে একটা ছেলের পক্ষে শহুরে ভারী স্মার্ট কোন যুবার কাছে গিয়ে মনের সুপ্ত বাসনার কথা ব্যক্ত করার দুঃসাহস করাও অসম্ভব।
তাও আবার ছেলেটা কিনা তার মত ব্যতিক্রমী যৌন সত্তার কেউই না। তাই প্রত্যহ অদূর থেকেই তাকে উপভোগ করে চোখ ও মনের তৃষ্ণা মেটানোর রহস্যময় নেশার ঘোরে নিজেকে আবদ্ধ রাখতেই ভালোবাসে।

৪.
আজ জাহিদ বেশ ভালোভাবেই খেয়াল করছে প্রেমিক জুটির মধ্যে কেমন যেন মেঘ থমেথমে অবস্থা। কেননা রোজকার মত আজ বাইক থেকে নেমেই ছেলেটা হাঁকডাক ছেঁড়ে চায়ের অর্ডার পর্যন্ত করেনি। মেয়েটাও ভীষণ গুরুগম্ভীর মুডে। কোন একটা কারণে ওদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে সেটা বুঝতে জাহিদের মোটেও দেরি হল না।
আকস্মিকভাবেই দুজনের ভেতোরে বেশ জোরেশোরেই বাকবিতণ্ডা তর্কযুদ্ধ বেঁধে গেলো। এই প্রথমবারের মত জাহিদ চকোলেট বয় টাইপের ছেলেটিকে অত্যন্ত ক্ষিপ্র মেজাজী এবং অগ্নিমূর্তি রুপে আবিষ্কার করলো। মেয়েটিও ছাড়ার পাত্রী নয়। পাল্টা আক্রমণ করেই চলেছে। দুজনের আলাপচারিতা শুনে জাহিদ কিছুটা আঁচ করতে পারলো দুজনের সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় কোন পক্ষের অবৈধ অনুপ্রবেশই ছিল কথাকাটির পেছনের মূল কারণ।
কিন্তু ঘটনা যে এতোটা গুরুতর পর্যায়ে মোড় নিবে সেটা জাহিদের কল্পনাতেও ছিল না। কেননা তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে মেয়েটা আচমকাই যুবকটির গালে সজোরে কষে এক চড় বসিয়ে দিলো। টি-স্টল প্রাঙ্গণের জনাকীর্ণ মজলিশে প্রকাশ্যে এমন ঘটনা উপস্থিত সবাইকে একেবারে চমকে দিলো। প্রচণ্ড অপমান রাগ ও অভিমানে যুবকটাও সশব্দে পাল্টা আরেকটা চপেটাঘাত মেরে দিলো মেয়েটির মেকাপে রাঙানো টকটকে লাল গালে।

ভয়ানক ক্ষোভে জর্জরিত ছেলেটা এক মুহূর্তও দেরি না করে মলিন মুখে উত্তেজিত ভঙ্গীতে দিগ্বিদিক হয়ে বাইক টেনে দূরের অজানায় মিলিয়ে গেলো। আর মেয়েটা বসে ফুঁপিয়েফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। চোখের সামনে মঞ্চায়িত কয়েকমুহূর্তের ঘটনায় জাহিদ একেবারে বিস্ময়ে বিমুঢ়। ঠিক যেন মঞ্চস্থ হবার আগেই নাটকের সমাপ্তি ঘটলো। কিছুক্ষণ পর মেয়েটাও একটা রিকশা ডেকে টি-স্টল থেকে বিদায় নিলো।

বেশ কিছুদিন হতে চললো জাহিদ ঘুরেফিরে দিনের মধ্যে কয়েকবার করে টি-স্টলে এসে ঢুঁ মারে। কিন্তু অভিমানী প্রেমিকপ্রেমিকা জুটির কোন হদিস পায় না। ক্যাম্পাস চত্বরের সর্বত্র নজর রাখে কিন্তু কোথাও প্রেমিক যুগলকে একসাথে বা আলাদাভাবেও একনজর দেখতে পায়না। তারা যেন একেবারেই লাপাত্তা।
জাহিদ নিজে হয়তো কখনো কারো সাথে প্রেম করেনি। তবে আজকালকার নামসর্বস্ব প্রেমভালোবাসা দেখে তার মনে একটু রসিকতা ভর করে। ওদের কাহিনী মনে পড়লেই মুচকি হেসে ভাবে, এরা কি এমন জমিদারী প্রেম করে যে কেউই কারো সামান্য একটু অভিমান পর্যন্ত ভাঙাতে পারে না,এতদিন ধরে অভিমান চললে প্রেম করবে কখন?

ছেলেটা হয়তো জাহিদের আপন বা পরিচিত কেউই নয়। তবুও তার প্রতি জাহিদের অজ্ঞাত টান তাকে এক অজানা দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত করলো। কিন্তু অচেনা যুবকের নিরুদ্দেশে তার ভেতোরে কেন এতো উৎকণ্ঠা সেটা ভেবে জাহিদ সর্বদাই দ্বিধান্বিত। এটা কি ভালোবাসা নাকি শুধুই ভালোলাগা সে নিজেও সন্দিহান। তবে জাহিদ তার বর্ণহীন নিরানন্দ জীবনে সামান্য দ্বিধাদন্দের এই দোলাচলের মাঝেই লুকায়িত সুপ্ত মাদকতা অনুভব করতে ভালোবাসতো।
অবশেষে জাহিদ টি-স্টলের রহমত মামার দ্বারস্থ হল অপরিচিত সেই প্রেমিক যুগলের কোন খবরাখবর তিনি জানেন কিনা তা জানার জন্য। কিন্তু রহমত মামা জাহিদকে এমন মর্মান্তিক কোন খবর দিতে পারেন তা কস্মিনকালেও জাহিদের ভাবনাতে ছিল না। খবরটা শোনামাত্রই যেন গুলিবিদ্ধ পাখির মতন জাহিদের হৃদয়াহত হলো ।

সেদিন যুবকটি টি-স্টল থেকে মেয়েটির সাথে অভিমান করে হন্তদন্ত হয়ে চলে যায়। যাবার সময় পথে বেপরোয়াভাবে বাইক চালাতে গিয়ে একটা পাবলিক বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে ভয়াবহ দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়। সেই থেকে আজোবধি ছেলেটি একটি হাসপাতালে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এমনকি ডাক্তারদের ভাষ্যমতে যুবকটির জীবন এখনোও মারাত্মক আশঙ্কাজনক।
দুঃসংবাদটি জাহিদকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করলো। অনর্গল বলে যাওয়া রহমত মামার কথাগুলো জাহিদের মর্মে গিয়ে বাজতে লাগলো। প্রাণোচ্ছল একটি জীবন তথাকথিত প্রেমের নগণ্য মানঅভিমানে এভাবে নিঃশেষের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে সেটা বিশ্বাস করতেও কষ্টে তার বুক ফেটে আসছিলো।

৫.
রজনীগন্ধার ডাটায় প্যাঁচানো একটা ফুলের তোড়া হাঁতে নিয়ে হাসপাতালে যুবকটির কেবিনের সামনে দাড়িয়ে জাহিদ। অদূরেই কাঁচঘেরা জানালাটার সামনে দাড়িয়ে দেখলো ছেলেটাকে মুখে নেবুলাইজার দিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ মুখোমণ্ডলী ব্যান্ডেজে আবৃত।
পায়ের দিকে চোখ পড়তেই ভয়ে আঁতকে উঠলো জাহিদ। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো ডান পা’টা হাঁটুর নিচ থেকে পুরোপুরি কাঁটা আর বাম পায়ে রডের মতন কয়েকটা কি যেন ঢুকিয়ে একটা স্ট্যান্ডের সাথে টানটান করে বেঁধে রাখা হয়েছে। যেন প্রাণসর্বস্ব একটা জীবন্ত লাশের নিথর দেহখানা অবশিষ্ট মাত্র।

তরতাজা সেই যুবকের আজকের এই করুণহাল দেখে জাহিদ মানসিকভাবে ভীষণ মুষড়ে পড়লো। আবেগাক্রান্ত চোখদুটো জলে ছলছল করে উঠলো। হঠাৎ জাহিদের চোখ আটকালো ছেলেটির শয্যা পাঁশেই মলিন মুখে নিশ্চুপ বসে থাকা একজন বয়স্ক ভদ্র মহিলার দিকে। তিনি নিশ্চয়ই ছেলেটির মা হবেন।
হঠাৎ জাহিদের ভাবনায় এলো আরোগ্য লাভের কামনায় ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর ছলে কেবিনে প্রবেশ করা যুক্তিযুক্ত। এতে অন্তত যুবকটিকে প্রথমবারের মত একটু নিবিড়ভাবে দেখতে পাওয়া যাবে। ভেবেই পা বাঁড়াতে গিয়েই আবার কেন যেন থেমে গেলো জাহিদ।

ভাবতে লাগলো কি পরিচয়, কি অধিকার নিয়ে দাঁড়াবে সে? সেতো ছেলেটার নামটা পর্যন্তও জানেনা। তাহলে ভেতোরে গিয়ে কীভাবে উপস্থাপন করবে নিজেকে? বরঞ্চ সবকিছু শুনে তিনি যদি ছেলেটির প্রতি জাহিদের করুণা ভেবে উল্টো তাকেই আরো ভুল বোঝে,তবে? তখন নিজেকে আরো বেশি অপরাধী বলে মনে হবে। এমন বিস্তর সব প্রশ্ন আর চিন্তাগুলো জাহিদকে চারদিক থেকে আঁকড়ে ধরতে লাগলো।
শেষমেশ মনস্থির করে নিজেকে বোঝালো ছেলেটার কাছে এতোদিন যেমন অজানা অচেনা ছিলো সারাটাজীবন না হয় তেমন অজ্ঞাত কেউ হয়েই থাকুক, সেটাই ভালো। মিথ্যে মায়া বাঁড়াতে গিয়ে কারো দুঃখের কারণ হয়ে নিজেকে অপরাধী করার দরকার কি?

অতঃপর ফুলের তোড়ার সাথে ছোট্ট চিরকুটে “তোমার দ্রুত আরোগ্য লাভের কামনায় অজ্ঞাত কোন এক শুভাকাঙ্খি” কথাগুলি লিখে হাসপাতালের এক ওয়ার্ডবয়ের হাঁতে ধরিয়ে দিলো। ওয়ার্ডবয়কে ফুলগুলো ছেলেটির শয্যাপাশে রেখে আসতে বলেই হাসপাতাল ছাড়লো জাহিদ।

৬.
ছেলেটি মারা যাবার পর থেকে জাহিদ এখন আর আগের মত টি-স্টলে আসে না। যদিও ছেলেটি ইহলোক ত্যাগ করায় তার প্রভাব জাহিদের ভেতোরে তেমন একটা পড়েনি। কিন্তু তবুও টি-স্টলে আসতে এখন আর আগের মত কোন পিছুটান অনুভব করেনা। ইচ্ছে হয় না। নিরামিষ জীবনে যাও একটু মসলার স্বাদ পেতো নিয়তির করাল গ্রাস তার কাছ থেকে সেইটুকুও কেঁড়ে নিলো। হয়তো সেইজন্যই আসতে অনীহা জন্মেছে।

আজকাল হুটহাট টি-স্টলে একটু আধটু যাও আসে তা ঐ রহমত মামার হাতের চা’য়ের লোভে। বহুদিন পর সেদিন পড়ন্ত বিকেলে জাহিদ টি-স্টলে বসে কাঁপ-ঠোঁটে মাখামাখি করছিলো। এমন সময় বিশাল সাইজের ঝাঁ চকচকে ব্র্যান্ডনিউ এক মোটরবাইক বিকট আওয়াজ তুলে জাহিদের সামনে এসে থামলো। বিরক্তভরা গম্ভীরমুখে চোখ তুলে তাকাতেই জাহিদ দেখতে পেলো ঠোঁটে ধোঁয়া ওঠা জ্বলন্ত সিগারেট ধরে অতীব সুদর্শন এক যুবক বাইকে বসে আছে।

পেছন থেকে যুবকের কোমর বরাবর দুহাত দিয়ে শক্তকরে চেপে তাকে বুকের সাথে জাপটে ধরে রেখেছে সুন্দরী এক রমণী। মেয়েটি আর কেউই নয়। এটা সেই মেয়েটাই। যে মেয়েটির সাথেই শেষবারের মত তীব্র রাগ-অভিমান করে এই টি-স্টল থেকেই চলে যাবার পথে ছেলেটির এক্সিডেন্ট হয় এবং পরে জীবনাবসান ঘটে। অথচ সেদিনও ঐ ছেলেটিই কিনা এই মেয়েটিকে কতই না ভালোবাসতো। মাত্রই কিছুদিনের ব্যবধানে আজ আবারো সেই পড়ন্ত বিকেল সেই একই টি-স্টল, পার্থক্য শুধু মেয়েটির বাহুতে আজ নতুন কোন সুদর্শন বন্দি।

জাহিদ মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ একধ্যানে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। সুদর্শন নতুন নবাগত যুবকের সাথেও মেয়েটির ঠিক পূর্বেকার ঐ ছেলেটির মতই লোকদেখানো প্রেম-ভালোবাসার সাবলীল অভিনয় ও মাখামাখি। জাহিদ কিঞ্চিৎ হেসে মনেমনে ভাবতে লাগলো আসলেই মানুষের জীবন কতই না বিচিত্র আর অদ্ভুত।
কেউকেউ কখনোই তাঁর প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য পায়না, কেউ পেয়েও ধরে রাখতে পারে না। আবার কেউকেউ হাজারটা পায়। আর জাহিদের মতন মানুষদের অনুভূতিগুলো হয়তো আজীবন ভেতোরে ভেতোরেই গুমরে মরে। পরিচয় সংকটে ভোগে। কিংবা কোনদিন প্রকাশই পায়না।

*সমাপ্ত*
[টি-স্টল একটা কাল্পনিক গল্প মাত্র]

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.