তুমি আমায় দিয়েছিলে বকুল ফুলের মালা

লেখক: এলাহি লিপু

ঘটনাটা ২০০৬ সালের। আমি তখন ক্লাস এইটে পরি। দুনিয়াটা তখন আমার যাবে।সবচে বিরক্তিকর। আমরা তখন বান্দরবন আসি, যেহেতু আমার বাবা সেখানে বদলি হন। নতুন স্কুল, পাহার, সাইকেল কোন কিছুই আমার ভালো লাগত না। এর মধ্যে ১ম সেমিস্টার শুরু হল আমাদের। আমি সাংঘাতিক খারাপ করলাম, করবোই না বা কেন। আমি তো পরতামই না। সেদিনই প্রথম কেও এসে বলল, তুমি কি পড়া লেখা করো না? আমি চোখে মুখে বিরক্ত এনে মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম না।

ঃ তাহলে তুমি খারাপ ছেলে।
ঃ সেটাই আমার অভ্যাস।

পরদিন ক্লাসে বিরক্তিকর কিছু অঙ্ক বাড়ির কাজ ছিল। আমি যথারীতি কিছুই আনলাম না। সে হুট করে এসে আমার বেঞ্চের ওপর খাতাটা ঝপ করে ফেলে রেখে বলল এগুলো করো। ও চলে গেলো কিন্তু আমার আর অঙ্ক করা হল না।ক্লাসে স্যার আসল। যাদের বাড়ির কাজ হয়নি তাদের দাড়াতে বলল। এবং এরপর তিনি শুরু করলেন তার রামধোলাই। অবশ্য তাতে আমার কখনো কিছু যায় আসে না। পরের দিন আমি আমার মতো আছি। যেহেতু খারাপ ছাত্রের সাথে কেও কখনো কথা বলে না। অঙ্ক স্যার আসলেন। যথারীতি দাড়াতে বললেন। আমি দাড়াতে নিলাম পাস থেকে সে আমার বেঞ্চে খাতাটা ফেলে দারিয়ে পরল। ও ছিল সামনের বেঞ্চে, স্যার ওকে দিয়েই মারা শুরু করলেন। আমার বিরক্তের চেয়ে কষ্টই বোধহয় বেশি লাগল সেদিন। ও, যার জন্য এ বিরক্ত কিংবা কষ্ট তার নামটাই তো বলা হয় নি। ও অং। কি হল জানি না, সেদিন মহাবিরক্ত নিয়ে বাড়ির কাজ করলাম। সেই হয়ত শুরু ছিল, এরপর থেকে বুঝি আর না বুঝি অন্তত পড়তে বসি। এই কয়দিনে আমার নাকি উন্নতি হচ্ছে বলে সবার ধারনা। ফাইনাল পরিক্ষায় বোধ হয় খারাপ ছাত্র ট্যাগটা কাটা পরল। নতুন ক্লাসে উঠেছি, কিন্তু অং এর পটর পটর বেড়ে গেলো। এমন ভাব যেন আমি ছারা আর কেও ক্লাসে নেই। নাইন টেন দেখতে দেখতে কিভাবে যে কেটে গেলো। এস এস সির রেজাল্টের ক্রেডিট পুরতাইন অং এর। সবাই খুব প্রসংশা করছিলো তবে আমার দুপুর রোদের মধ্যে পাহারে উঠে বসে থাকা, লুকিয়ে লুকিয়ে বিড়ি টানা কিছুই বদলাই নি। তখন আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে। হুট করে একদিন বাবা স্ট্রোক করলেন, তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম কিতু বাবা আর ফিরলেন না। আমি ছিলাম বাবার সবথেকে আদরের। কি হয়ে গেলো জানি না। মনে হচ্ছিলো আমার পৃথিবী পুরোটা উল্টে গেছে। কিভাবে জানি না! আমি আমাদের কলেজেরমাদক সেবী গেঙ্গের সাথে জড়িয়ে গেলাম। ড্রাগসের কারনে আমার স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছিলো তবে সেটা কেও ধরতে পারছিলো না। ছোট খাটো ঝামেলা, মারা মারিতে প্রায়েই থাকতাম। বাসায়ও কমপ্লেন পাঠানো হয়েছে কতবার। কিন্তু বড় ভাইদের শাসনের পর আমি সেই মাদকের নেশায়ই ডুবে থাকতাম। মাঝে মাঝে মনেই থাকত না আজ কয় তারিখ কিংবা আজ কি বার। ইন্টারে ফেল করি। কেনই বা করব না তখন তো আর বলার কেও ছিল না। যে আমি না পড়লে নিজে মার খাবে। অং তো অন্য কলেজে।
হুট করে একদিন অং এসে বাসায় হাজির। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো ও পাশে থাকলে আমি ভালো হয়ে যাবো। তাই ওর বিরক্তিকর জ্ঞান ঝাড়ার পরেও ওর পাশে চুপ করে বসে ছিলাম। ও প্রায়ই আসতো। তখন আমি জানতাম না ওকে আমাকে ঠিক করারম জন্য বাসা থেকে আসতে বলা হয়েছে। কে জানতো হয়ত আমি ভালো হয়েও গিয়েছিলাম।আমাকে এটা ওটা নোট করে পড়াত, গল্প করত। আমি পরের বছর হয়ত আবার পরিক্ষা দিলাম। অন্তত পাস করলাম। আমরা হাটতে যেতাম, ও ভালো গান গাইত, আমি রিকুয়েস্ট করে ওর গান শুনতাম আর ওর পায়ের ওপর মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে ঘাস ছিরতাম।

ও জগন্নাথে চান্স পেয়ে ঢাকা চলে গেলো। আমার একা একা কেন যেন কিছুই ভালো লাগত না। সে সময় পরিচয় হয় রুমার সাথে। সুন্দরী, তপস্বিনী বলা যায় তাকে। কলেজেই ওর সাথে পরিচয় হয়। ইদানিং ওর সাথে বেশিরভাগ সময় ফোনেই কথা হয়। ওর সদরে কোন কাজ থাকলে আমরা একসাথেই যাই। এই মেয়েটা কেন যেন একটু বেশিই পটর পটর করে। গতকাল ও কি মনে করে যেন বলেই ফেলল, তুই আমাকে ভালবাসবি?

ঃজানি না। আর জানারই বা কি ছিল, কেন যেন আমার মনে হয় জগতের সব মানুসের মতো আমার হৃদয়টা নয়। কাওকে অনেক ভালবাসতে ইচ্ছে করে কিন্তু আমি ভালবাসতে পারি না।

আজ সকালটা আমার মনে হচ্ছে রোঁদে চক চক করছে। এর অন্যতম কারন হতে পারে, একটু আগে ঢাকা থেকে মামা ফোন করেছিলেন মার কাছে। আমি যেহেতু পড়াশুনাও করছি না, ছোট কোন চাকরি অবুসসুই আমি হাত ছারা করব না। আর করবোই বা কেন, প্রতি দুপরে মা ভাত বেড়ে দিতে দিতে যেভাবে নিরস মুখে তাকিয়ে থাকেন। সে নিরস ভাবটা কেন যেন আর দেখতে ইচ্ছে করে না। কাল সকালেই ঢাকা যাচ্ছি।
মামা ইলেকট্রিকের দোকান দিয়েছেন। এবং আমি এই দোকানের একমাত্র কর্মচারী। হয়ত বলা হয়নি আমি কিছুটা ইলেকট্রিকের কিছুটা কাজ জানতাম আগে থেকেই। দু মাস কাটল। আমার কিছুই ভালো লাগে না। সেই কর্কশ ব্যাবহার, সেই সকাল, সেই রাত, রাতের সোডিয়াম বাতিগুলোর নিরলস চেয়ে থাকা, অসহ্যকর।

আমার তো ফটিকের মতো কোন কার্তিকে পুজর ছুটিও নেই। যে কার্তিকের অপেক্ষায় দিন কাটবে।
আরেকটা দিন গেলো, আমি ভাবতেও পারি নি আমার জিবনে কার্তিক এতো জলদি আসবে। কাল বিকেলে ফেরার পথে ছেলে বেলার বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেলো। কি সাংঘাতিক! এক্তুও বদলায়নি মনে হয় কিংবা পুরনো মুখ কখনো বদলায়ই না। ইলেকট্রিকের তার আমার ব্যাগে ছিল কিন্তু ১৬০ ভোল্টের ঝটকাটা পুরো শরীরে খেলাম।
কথা বলছি তো বলছি, সে শুনছে। অফ, এমন যদি সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যেতো। আসলে আমার কি হয়েছে আমি বলতে পারি না! একটা ছেলের সাথে একটা ছেলে কি করে সারাজিবন কাটিয়ে দিতে পারে। আমার আসলে মাথা ঠিক নেই। অনেকদিন পর প্রিয় বন্ধুকে দেখলে যা হয়।

এই শহরের মানুষ গুলো যেন একটু কেমন। আমি কেন যেন কিছুই আপন ভাবতে পারছি না। কাজটা ঠিক হল কিনা জানি না। মামার দোকান ছেড়ে দিয়েছি। কোথায় যাবো জানি না। তবে বাসায় অবসসুই না। আমার হাতে একটা কালো রঙের সস্থা ব্যাগ, মাথার উপর ঝি ঝি ধরা রোদ। আমি দারিয়ে আছি আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে। একটু আগে অং কে ফোন করেছি। তার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছি। অং মেসে থাকে, কয়েক মাসের জন্য হলেও আমার একটা বেবস্থা হয়ে যাবে হয়ত।

বিধাতার এই বিশ্ব ভ্রমান্দ অনেক বর। বেস কদিন ধরেই অং এর এখানে আছি। শিট! ওকে এখন আর অং ডাকা যায় না।ও ওর নাম চেঞ্জ করছে, অং না অর্ক।
সকালে ক্লাসে যাওয়া আর সন্ধ্যায় ফেরার সাথে সাথে আরও অনেক কিছুই চেঞ্জ হয়েছে। এই কয়দিনে আমাকে অন্তত এতটুকু শিখিয়েছে যে, বাঁচতে হলে কঠিন কিছু করতে হয়। আমাকে নিয়ে গিয়ে অনার্সে ভর্তি করিয়ে দিয়েসেছে। মেসে থাকলে এটা ওটা নিয়ে পড়তে বসায়। অবশ্য আমার চুরি করে বিড়ি খাওয়ার কথাটা এখনো বোধ হয় শুনে নি, শুনলে কি করত কে জানে।

বছর কিভাবে কেটে গেলো জানি না। এখন আমিও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইরে থাকি। সন্ধার পরেও থাকি। তার পরেও থাকি ওর সাথে। কিন্তু ও কার সাথে যেন ফোনে বেস্ত। সে বছরের মাঘটাও ঠিক এভাবে কাটল। আমাদের সেমিস্টার শুরু হল। পরিক্ষা শেষ করে আমরা সেদিন একসাথে লাঞ্চ করছিলাম, আমি ওকে খাবার তুলে দিচ্ছিলাম। ও আমাকে হুট করে বলল, আর মাত্র কয়েকটা মাস, আমার মাস্টার্স শেষ হয়ে যাবে, হয়ত আমি চাকরি তে ঢুকব। তোরও অনার্স শেষ। কি করবি তুই?
কি আবার! বাদ দে তো এসব কথা।

বাসায় তো কথা হয় ঠিকই। কিন্তু আমার ওর এসব কথা ভালো লাগে না। কেন যান ওর অভ্যাস হয়ে গেছে। ওকে ছারা থাকাতে হবে কল্পনা করতে ইচ্ছা করে না। ওর ছেলেমানুষি, ওর ধমক দেওয়া, ওর সব কিছুই কেন যেন ঠিক বুকে লাগে।
মাঝে মাঝে গভীর রাতে ও ঘুমালে ওকে আদর করে দেই। সেদিন রাতেও ও ঘুমাচ্ছিল। আমি ওর কপলে চুমু দিয়ে ফিরে আসছিলাম, ও খপ আমার হাত ধরে ফেলল। তারপরের কথাটা ছিল, তুই আমাকে খুব ভালবাসিস তাই না?

আমার মনে তখন একটার পর একটা কেমেস্ত্রির এক্সপ্লুসন হচ্ছিলো। সেই অঙ্ক খাতা বেঞ্চের উপর ফেলে রাখা, সেই ঘাসের উপর শুয়ে থাকা, সেই রোদের মধ্যে ওর হাত ধরে নিয়ে যাওয়া। তারপর যা হয়ে গেলো সেটা হয়ত বলতে চাচ্ছি না। তার পরদিন কেমন যেন মনে হচ্ছে ও আমাকে এরিয়ে চলছে, আমি আর না পেরে সন্ধায় ছাদে গিয়ে কেঁদে ফেললাম। তবে যদি আগে জানতাম ও পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরবে তাহলে হয়ত কাদতাম না। ও আমার ঘার দুহাতে জড়িয়ে রেখেছে,

ওর গাল আমার ভেজা গাল স্পর্শ করছে। আমরা একদম চুপ চাপ। হয়ত হাজারোটা তারা আমাদের দূর থেকে দেখে কোন এক মধুর লগ্ন রচনা করছিলো। আমাকে এমন করে জড়িয়ে রাখবে?
ঃউম, মাঘ, পৌষ আর হেমন্ততে?
বসন্ততে?
ঃ জানি না।
আমারও জানা হল না সে কথা। তবে সেবার বসন্ত পর্যন্ত আমরা খুব শুখে দিন কাটিয়েছি। ফেব্রুয়ারির শুরুতে সে বাড়িতে যায়, বিয়ে করে ফেলল ২৪ তারিখ। আমি যদিও কিছু জানতে চাই নি, সে নিজে থেকেই বলল বিয়ে না করলে নাকি চলত না। ও আসার আগেই আমি মেস ছেড়ে দিলাম। তবে আমি মটেই দুখি না। আমি একজন প্রেমিক। আমি কাওকে ভালবাসতাম হয়তবা এখনো ভালবাসি কিংবা এখনো ভালবাসিনা। আমি বাড়ি চলে আসলাম।
৪ বছর পর, আমি ঢাকাতে মামার বাড়িতে গিয়েছিলাম কদিনের জন্য। সেদিন সন্ধায় আজিজ সুপার মার্কেটের নিচে কাওকে দেখলাম। অর্ক নাকি অং! সেই চওড়া কপাল, চওড়া বুক। কোলে আঁকড়ে ধরে রেখেছে একটা ফুট ফুটে মেয়ে কে। বয়স ৩ কিংবা আড়াই হবে। মেয়েটি সুন্দর করে বাবার কোলে বসে আইস্ক্রিম খাচ্ছে। দেখে অং এর আইস্ক্রিম খাওয়ার কথা মনে পরে গেলো।
আরে! এদদিন পর? করছ কি এখন, এগিয়ে এসে বলল ও।
এইতো কি আর!
বাসায় জোর করে নিয়ে গেলো। রূপবতী বউ, সুন্দর করে গোছানো বাসা। ছিম ছাম দেয়ালে কত দিনের পুরনো পরিচিত সব ছবি।
আমরা ছাদে বসে আছি। সেদিনের মতো চুপ চাপ। সে আমার ঠোঁটে চুম্বনে অধির হল। আমিও দুহাতে ওর গলার পেছনে নিয়ে ওকে বুকের সবটুকু শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। এক মুহূর্তের জন্নেও চোখ থেকে পানি পড়তে দেই নি। আর কখনো দেবও না। খুব কষ্ট হচ্ছিলো চেহারায় সেই নির্লিপ্ততা ধরে রাখতে। আর পারছিলাম না তাই ছাদের খোলা দরজা দিয়ে সোজা নিচের রাস্তায় নেমে এলাম। হয়ত বেখেয়ালেই রাস্তাগুলোর মাঝে হারিয়ে গেলাম।

সেটাই ছিল হয়ত একটি শেষ দেখা কিংবা একটি গল্পের শেষ।
৬ বছর হয়ে গেলো আমি বান্দরবনেই একটি স্কুলের অঙ্কের টিচার। বিয়ে কেন যেন আর করাই হল না। মা ও নেই এখন আর সে কথা মনে করিয়ে দেবার। মামাও মারা গেছেন। মামির কিডনির সমস্যা। কাল তরি ফোন করেছিল, মামার বড় মেয়ে। মামিকে একবার দেখে আসতে। কিন্তু কেন যেন আমার এই স্কুল ছেরে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। প্রতিদিন অপেক্ষা করি হয়ত নতুন কেও নিজের অজান্তেই বন্ধুর বেঞ্চে অঙ্ক খাতা ঠেলে দিয়ে শাস্তির জন্য দাড়িয়ে যাবে।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৬ই অক্টোবর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.