দৌড় ২

লেখকঃ রাকিব হাসান

ছাদ থেকে ঝোলানো লাইটার আলোতে চোখ কড় কড় করতেসে, আলো থেকে আড়াল করতে উপুড় হয়ে শুইলাম, সারা শরীরে ব্যাথাটা আরো খামচে ধরলো। অসহ্য ব্যাথা.. রিমান্ডে নিয়ে এতো মারার কোনো দরকারই ছিলো না। আমি তো আগেই সব জবানবন্দি দিসিলাম, কেনো শুধু শুধু এতো মারলো??? এর থেকে বেশি আর কি বলবো?? যা সত্যি সেটাই তো বলছি…

সকালে কোর্টে হাজির করবে, আদালত নিশ্চয়ই আমাকে ফাঁসি দিবে.. আমি ও সেটাই চাই। আমাকে ফাঁসি দিক, তাহলে এই অভিশাপের জীবন থেকে মুক্তি পাই। আরো আগে আমার মরা উচিৎ ছিলো। তাহলে এতো ঝামেলা হতো না। আমি যে কেনো মরি না.. তবে এবার অবশই মরবো। নিজেই ফাঁসি চাবো। আমার উকিল নাই, আত্মপক্ষ সমর্থন নাই, নিজেই ফাঁসি চাচ্ছি.. এতো কিছুর পরেও আদালত আপত্তি করবে না নিশ্চই।

আমি হত্যা মামলার আসামি। দিদার মিয়াকে গরম তেল ঢেলে পুড়ায় মারার মামলা। জবানবন্দিতে সব লেখা আছে, তবু আদালত আমাকে আবার বলতে বললো .. এক কথা আর কতবার বলবো.. হুজুর.. আমিই দিদারের গায়ে ত্যাল ঢাইলা দিছি, অরে মারনের লাইগাই ত্যাল ঢালছি। ওর জন্য আমার চাচা আত্মহত্যা করসে, আমি সেইটার প্রতিশোধ নিসি। ও মরছে, এখন আমার মরতে আফসোস নাই। আপনি আমারে ফাঁসি দেন হুজুর.. আমারে ফাঁসি দেন… আমি নিজের দোষ স্বীকার যাচ্ছি হুজুর.. আমি বাইচা থাকতে চাই না, আমি বাইচা থাকলে এই অশান্তি শেষ হইবো না কুনো দিন। আপনি আমারে ফাঁসি দেন। আমি মরলে সব অশান্তি শেষ হইবো হুজুর..বাড়ি থেইকা একদিন পলায় আসছিলাম যেই দোষে, সেই দোষ অহনো আমার পিছ ছাড়ে নাই। আমি অন্যরকম এইটাই আমার দোষ, এই দোষে একদিন আমাকে জন্ম দেওয়ার অপরাধে আমার মা মরতে চাইসিলো। সেই কথা এখনো আমার কানে বাজে.. উঠানে দাড়ায় দেখসিলাম মা মাটিতে বসে কানতেসে, সেই ছবি এখনো চোখে ভাসে.. সেইদিন বাসা থেকে পালাইসিলাম। বাসা থেকে পালায় প্রথমে আসছিলাম জেলা শহরে, তারপর ট্রেনে করে ঘুরতে ঘুরতে ঢাকায় চইলা আসি। ভাবসিলাম ভিক্ষা কইরা খাবো, তবু বাড়ি যাবো না। কিন্তু এই শহরে ভিক্ষা করাও কঠিন, টোকাইরা নতুন কাউকে থাকতে দেয় না, তাদের আয় কইমা যায়, ফকিরদের ও নিজের জায়গা আসে। তারাও নতুন মানুষ সহ্য করে না। রাস্তায় ঘুমাইতে গেলেও বাধা, সেই জায়গাও নাকি অন্য কারো জায়গা.. এই শহরে এতো মানুষ, তবু এখানে আমার জায়গা হয়না।

প্রথম কয়েকদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ালাম তাড়া খাওয়া কুত্তার মতো। এইভাবেই ঘুরতে ঘুরতে একটা রিকশার গ্যারেজে জায়গা পাইলাম, সেইখানেরিকশা সারাইয়ের কাজ শিকলাম, থাকি খাই আর রিকশা মেরামত করি। টাকা পয়সা নাই। ওই গ্যারেজের ম্যানেজার ছিলো দিদার মিয়া। তার পরিবার থাকে গ্রামের বাড়িতে, সে গ্যারেজেরই একটা ঘরে থাকে। গ্যারেজের মহাজন ব্যাস্ত মানুষ, উনি শ্রমিক নেতা, তাই গ্যারেজে বেশি সময় দিতে পারে না, এইখানে দিদারই আসল মহাজন। গ্যারেজে আমরা তিনজন মিস্ত্রী থাকতাম রাত্রে, দিদার মিয়া প্রায় দিনই আমাকে ফাই ফরমাস খাটতে ডাকতো, এই পান টা আইনা দে, বিড়ি আইনা দে.. শইলটা দাবাইয়্যা দে.. আমি নতুন আসছি, তার উপর বাড়ি থেইকা পলায়, তাই ভালো না লাগলেও এইসব করতাম।

এরকম চলতে চলতে দিদার মিয়া আমাকে একটা রিকশা চালাইতে দিলো, আমাকে আর গ্যারেজে কাজ করা লাগে না, সারাদিন রিকশা চালাই, মহাজনকে সন্ধ্যায় দুইশ টাকা জমা দিয়া বাকি টাকা আমার। মিস্ত্রীর কাজ করার সময় আমি কোনো টাকা পাইতাম না, থাকা খাওয়ার চুক্তি ছিলো .. দিদার মিয়া আমাকে রিকশা এমনি এমনি চালাইতে দেয় নাই, এর মধ্যেও কিন্তু আসে, শইল দাবাইতে দাবাইতে কত কিসু দাবাইসি.. আর দিদার মিয়া আমার কত কিসু দাবাইসে সেইটা আমি জানি আর দিদার মিয়া জানে। শুরুতে আমার ভালো লাগতো না। কিন্ত এই শহরে আসার প্রথম কয়দিনের ঘটনা আমাকে বুঝায় দিসে, এইখানে নতুন কারো জায়গা নাই, একা থাকার সুযোগ নাই.. ফকির রাও এইখানে একসাথে থাকে, ফুটপাতের জায়গা টাও নতুন কারো জন্য খালি নাই।।। তাই দিদার মিয়াকে বাধা দেই নাই। দিদার মিয়া আমাকে গ্যারেজজ থেইকা বাইর কইরা দিলে যামু কই?? খামু কি??

এই রিকশা চালাইতে চালাইতে একদিন দুইটা ছেলেকে নিয়ে সারাদিন ঘুরছিলাম, সেইদিন ছিলো ভালোবাসা দিবস, সেইদিন ওই ছেলে দুইটার গল্প শুনে চোখে পানি চলে আসছিলো।।।

দিদার মিয়ার সাথে আমার যত রসেরই সম্পর্ক থাক, আমরা থাকতাম আলাদা। আমি মিস্ত্রী দের সাথে বড় ঘরটাতে শুইতাম, আর দিদার মিয়া ম্যানেজারের ঘরে। যেইদিন রাতে দিদার মিয়ার শখ হইতো সেইদিন সে আমাকে শইল দাবাইতে ডাকতো। আবার আমার যেইদিন ইচ্ছা হইতো, সেইদিন আমি ই যাইতাম।।

এইভাবেই দিন যাচ্ছে, এলাকার লোকজনের সাথে অল্প স্বল্প পরিচয় হইসে, আমার যে মেয়েদের মতো স্বভাব সেইটা পুরাপুরি যায় নাই, তবে কিসুটা কমসে। আমাকে নিয়া আড়ালে আজেবাজে কথা বলে এটা আমি বুঝি, কিন্তু ধরি না, সবার মুখ বন্ধ করতে পারবো না আমি।

বস্তির যে দোকানে রাতে ভাত খাই সেইখানে এক চাচার সাথে পরিচয় হইসে, বুড়া একটা গারমেন্সে গার্ডের চাকরি করে। রাতে যখন খাই, তখন বুড়ার সাথে গল্প গুজব করি। বুড়া খোঁচায় খোঁচায় আমার বাড়ির কথা জিজ্ঞাস করে। আমি বলতে চাই না, তবু বুড়া জিজ্ঞাসা করে.. আমি খুবই বিরক্ত হই।

পরে একদিন বুড়া বললো, কেনো সে আমাকে এতো প্রশ্ন করে।। বুড়ার তিন ছেলে ছিলো, তার বড় ছেলে ছিলো আমার মত, মানে একটু অন্য রকম। ছোটতে নাকি সমস্যা অতোটা ছিলো না, যত বড় হয়, ততই সমস্যা বাড়তে থাকে, এলাকার লোকজন তাকে বিরক্ত করতো, চাচাদের কে কথা শুনাইতো। শেষে সহ্য করতে না পাইরা, ওই ছেলে একদিন একটা হিজরা দলের সাথে চলে যায়। চাচা চাচী কারো ইচ্ছা ছিলো না তাদের সন্তানকে সমাজ ছাড়া করার, কিন্তু সমাজ তাকে থাকতে দিতে চায়নি।। সেই ছেলে কয়েকবার তাদের বাসায় আসছিলো, সে বলছিলো, ” আমি হিজরা না আব্বা, আমি সত্যি ছেলে মানুষ, হিজরা কারা সেইটা আপনারা জানেন না, আপনারা কেউ জানেন না। তবে হিজরা না হইতেও হিজরা রা আমাকে যেভাবে আপন করে নিসে, আপনার সমাজ কোনোদিন আমাকে সেই ভাল ব্যাবহার টা দেয় নাই… আপনার সমাজ অন্ধ আব্বা, আপনারা সবাই অন্ধ… ”

চাচা এই কথা বলে হু হু করে কানছে আমার সামনে বসে.. আমি কি বলবো বুঝতেসিলাম না, আমি শুধু একাই এরকম পরিস্থিতির শিকার না.. আমার আব্বা কি কোনো একদিন এইভাবে… .জিজ্ঞাস করলাম, আপনার ছেলে এখন আসে না?? চাচা বললো, গ্রামের বাড়িতে থাকার সময় সে হঠাৎ হঠাৎ আসতো। উনারা ঢাকায় আসার পর থেকে আর কোন যোগাযোগ নাই। চাচি নাকি মরার দিন পর্যন্ত ওই ছেলেকে দেখার জন্য কানছে.. এখন চাচার অন্য দুই ছেলে বিয়া করে আলাদা থাকে, তারা স্বাভাবিক মানুষ তাদেরকে সমাজ আলাদা করেনি.. বুড়া মিয়া এখন একা থাকে, বুড়ি কয়েক মাস আগে মরে গেসে।

বুড়ার সাথে আমার পরিচয় এইভাবেই। তখনো আমি বুঝি নাই যে আমার জন্যই বুড়াকে মরতে হবে। যদি বুঝতাম তাইলে বুড়ার সাথে কথাই বলতাম না।।।
একদিন বিকালে রিকশা চালাইতে ইচ্ছা করতেসে না, আমি রিকশা নিয়া গ্যারেজে গেলাম। রিকশা স্ট্যান করায় ঘরে যাচ্ছি, দিদার মিয়ার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হইলো, সে আমাকে নিয়ে কারো সাথে গল্প করতেসে। আমি ওই ঘরের অন্যদিকের জানালায় গিয়া কান পাতলাম… কে আসছে বুঝতে পারলাম, দিদার মিয়ার গ্রামের দোস্ত, রানা। সে ঢাকায় কিসের একটা চাকরি করে। দিদারের কাছে মাঝে মাঝে আসে.. দিদার তাকে হাসতে হাসতে আমার কথা বলতেসে.. আমি আগে কেমন করে হাঁটতাম, কেমন করে হাসতাম, কেমন করে তাকাইতাম… কেমন করে দিদার আমাকে প্রথমবার ***** তারপর আমি এখন নিজে থেকেই যাই.. আমি কিভাবে কি করি.. মাগী লাগাইতে গেলেও টাকা লাগে.. আর আমি তো নিজে থেকে সুখ দিতে আসি.. তারপর ছেলেদের পিছন দিয়ে করতে বেশি মজা না মেয়েদের সামনে বেশি মজা.. এগুলা নিয়ে আলোচনা করতেসে দুই দোস্ত.. দিদার মিয়া রানাকে রাত্রে থাকতে বললো, আজকে রানা প্রথম বার কোনো ছেলের স্বাদ নিবে..

আমি অপমানে মরে যাচ্ছিলাম… হ্যা আমি নিজে থেকে দিদারের সাথে শুইতে যাই, কিন্তু শুরু টা কে করসে??? ইচ্ছা হলো দিদারকে যেয়ে থাপ্পড় দিয়ে আসি, পরে মনে হইলো, দিদার যদি থাকতে না দিতো, কাজ না দিতো তাহলে?? কী করতাম আমি??

আমি গ্যারেজ থেকে চলে আসলাম নিজের জিনিসপত্র নিয়ে। সেই যে একদিন বাড়ি থেকে বাইর হইসি, তারপর আজকে আবার বাইর হইলাম আস্তানা ছাইড়া। গিয়া উঠলাম ওই চাচার বাসায়। চাচা তার গারমেন্সে একটা চাকরি নিয়া দিলো আমার।। আমি চাচার বাড়িতে থাকা শুরু করলাম। তখনো বুজি নাই, আমি চাচার আজরাইল হয়ে উনার বাসায় উঠলাম..
দিদার মিয়া আমার খোঁজ পায়ে গেললো অল্প কয়দিনের মধ্যেই। একই এলাকা.. খোঁজ পাওয়া খুবই সোজা। দিদার একদিন আমারে বললো গ্যারেজে ফিরতে। আমি না কইরা দিলাম, দিদার তখন শাশায় গেলো। সে আমারে দেইখা নিবে। আমি চাচারে সব খুইলা বললাম.. চাচা বললো, তুমি যাইতে চাইলে আমি আটকাবো না। থাকতে চাইলে ফিরায় ও দিবো না।।।
আমি ভাবসিলাম দিদার বড়জোর আমাকে মারবে, অথবা গ্রামের জঙ্গলে সেই যে শিক্ষা পাইসিলাম, সেই রকম কিসু করবে। কিন্তু দিদার করলো সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা কাজ… একদিন মর্ণিং শিফটের ডিউটি কইরা সন্ধায় ঘরে ফিরসি.. দেখি বস্তির সামনে লোকজনের ভিড়.. সেইখানে দিদার মিয়া, চাচা, ওই গ্যারেজের মহাজন, আরো কয়েকজন মান্যগণ্য লোক আর বস্তির লোকজন.. বস্তির লোকজন তামাশা দেখতে খুব পছন্দ করে, তামাশা দেখতে সব ভাইঙ্গা পড়ছে উঠানে.. শালিশ তখন প্রায় শ্যাষ.. আমাকে দেইখা দিদার আবার নতুন কইরা শুরু করলো…

এই মাইগগা পোলা, কুন গ্রাম থেইকা মাইজ্ঞামী কইরা লাত্থি খাইয়া আসছে, আমি দয়া কইরা আমার গ্যারেজে থাকতে দিসিলাম.. টুকটাক কাজ কাম শিখাইসিলাম.. কিন্তু হারামজাদার খাসলত বদলায় নাই। আমার গ্যারেজে মাইজ্ঞামী শুরু করসিলো। আমারে খারাপ ইশারা দিতো, গায়ে গতরে হাতাইতো.. হারামজাদার পু** মারা খাওয়ার বড় শখ.. আমারে ইশারায় সেইটাই বুঝাইতো.. আমি এইজন্য গ্যারেজ থেইকা ছাড়াইয়া দিসি, হারামজাদায় আইসা উঠসে এই বুড়ার ঘরে, বুড়ার বউ মরছে দুই বছর, বুড়া এখন বউয়ের অভাব এই মাগীরে দিয়া মিটাইতাছে.. অয় তো একটা হিজরা.. অরে হিজরাদের সাথে দিয়া দেওন দরকার।। অরে নিয়া এই বুড়া নষ্টামি করে.. বুড়ারে সবাই কন, এইসব নষ্টামি ছাড়তে হইবো। এই মাগীরে বিদায় করতে হইবো…

আমি চিৎকার দিয়া বললাম.. দিদার মিয়া, তোমার গ্যারেজে আমি কার লগে কি করসি প্রমান দাও.. তুমি রাইত বিরাতে শইল দাবানের লাইগা আমারে তোমার ঘরে ডাকতা এইটা সবাই জানে..

দিদার মিয়া খেপে উঠে আমাকে মারতে আসলো। আর সবাই হুড়মুড় কইরা আমারে মারতে শুরু করলো। গ্যারেজের মহাজন আইসা থামাইলো সবাইরে… তারপর তারা চাচাকে বললো আমাকে আর ঘরে রাখা যাবে না। আমাকে বললো এই এলাকা ছাইড়া চইলা যাইতে.. আমি মহাজনের পা ধইরা বললাম.. আমি এইখান থেইকা চইলা যাবো, কিন্তু চাচারে আপনেরা দোষ দিবেন না, উনি ফেরেশতার মতো মানুষ, দিদার মিয়া যা বলছে সব বানাইয়া বলছে.. আমার কথা কেউ শুনলো না.. মহাজন পা ঝাড়া দিয়া আমার হাত সরায় চইলা গেলো।। ভীর হালকা হওয়ার পর আমি চাচার সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম, চাচা আমারে মাফ কইরা দিয়েন.. আপনি কুনো দোষ না কইরাও আমার জইন্য আজ অপমান হইলেন .. আমি চইলা যাবো চাচা. আপনি ভালো থাকবেন চাচা.. আমারে মাফ কইরা দিয়েন..
চাচা বিড়বিড় কইরা বললো, এইটা তোর দোষ না রে বাপ, এইডা আমার বড় পোলার অভিশাপ,অরে আমি সমাজের ভয়ে খ্যাদাইয়া দিসিলাম.. নিজের পোলার থেইকা সমাজরে বড় ভাবসিলাম, সেই দোষের সাজা এইডা.. আজকে তুই যেমন লাত্থি ঝাটা খাইয়া বেড়াচ্ছিস, আমার পোলাও নিশ্চয়ই এইরকমই সাজা ভোগ করসে.. আমার দোষে আমার পোলা কষ্ট পাইসে.. আমার পোলার কষ্ট আমার উপরে অভিশাপ হইয়া আসছে.. তুই কান্দিস না বাপ.. তোর কষ্ট আমি বুঝি.. তুই কোথাও যাবি না, তুই এইখানেই থাকবি..

চাচা উইঠা ঘরে গেলো, আমি বস্তির মাঠে আইসা বসলাম.. আমি কি এমন পাপ করসি যে জন্য এইরকম হচ্ছে?? আজকের এই দিন আমি আমার গ্রামে দেখসি, আমি ই সব খানে ঝামেলা লাগাই.. যেইখানে যাই সেইখানেই সর্বনাশ কইরা দেই.. আমি কেনো জন্মাইলাম..??
সন্ধার পর ঘরে আসলাম, চাচারে এক নজর দেইখা চইলা যাবো.. এইবার সত্যি সত্যি ই মরতে যাবো.. কিন্তু ঘরে আইসা দেখি দরজা ভিতর থেইকা বন্ধ.. চাচারে ডাকতেসি.. কিন্তু কেউ জবাব দেয় না.. আমার কেমন ভয় লাগলো..
বস্তির লোকজনরে নিয়া দরজা ভাঙলাম.. ভিতরে ঢুইকা দেখি.. চাচা গলায় ফাঁস দিসে.. আমি মাথা ঘুরায় ওইখানেই পইড়া গেলাম…

যখন হুশ আসলো ততক্ষনে চাচার দুই ছেলে খবর পায়ে আসছে, ঘরের সামনে খাটিয়ায় চাচারে রাখসে.. আমি উঠে দাড়াইতেই চাচার এক ছেলে আমারে মারতে আসলো.. তোর জন্যই আব্বা মরছে.. এই বইলা মারতে মারতে আমারে বস্তি থেইকা বাইর কইরা দিলো..

বস্তির পাশের মাঠে সারা রাত শুইয়া থাকলাম.. এখন আর মরতে ইচ্ছা করতেসে না.. এখন প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা করতেসে.. সারারাত অপেক্ষা করলাম ভোর হওয়ার জন্য.. ভোরবেলা ঘরে গেলাম.. চাচার ছেলেরা চইলা গেছে রাত্রেই.. চাচার জিনিসপত্র নিয়ে ঘর বাড়িওয়ালীরে বুঝাইয়া দিয়া গেসে, আমার কাপড় চোপড় পইরা আসে মাটিতে.. ঘরে গিয়া কিছুক্ষণ বইসা থাকলাম, বাড়িওয়ালী রে বললাম আজকের দিনটা সময় দিতে.. গোসল কইরা আইসা মেঝেতে শুইয়া একটা ঘুম দিলাম.. ঘুম ভাঙলো সন্ধায়..
মাথাটা একদম পরিস্কার লাগতেসে, কি প্রতিশোধ নিতে হবে আমি জানি..

দিদার মিয়ার খোঁজে গ্যারেজে গেলাম। শুনলাম সে চা’র দোকানে গেছে.. চা’র দোকানে আইসা দেখি সে চুলার পাশে বেঞ্চে বইসা আসে, চুলায় তেল ফুটতাসে, তার মধ্যে বড়া ভাজা হচ্ছে… প্রতিশোধ নেওয়ার এতো সহজ রাস্তা পাবো ভাবি ই নাই.. চুলার কাছে গিয়া আচমকা তেল ভর্তি কড়াই টা তুলে তেল ঢাইলা দিলাম দিদার মিয়ার গায়… …. … দিদার মিয়ার চিৎকার যখন কানে ঢুকলো তখন মনে হইলো এর থেকে শান্তির শব্দ আগে কখনো শুনি নাই..

লোকজন দিদাররে হাসপাতালে নিয়া গেলো, আমারে দড়ি দিয়া দোকানের সাথে বাইন্ধা রাখলো.. বাইন্ধা রাখার দরকার আছিলো না.. আমি কোথাও জাইতাম না।।। তারপর পুলিশ গিয়া আমারে ধরলো..

থানায় যখন খবর পাইলাম দিদার মরসে, আমি এটেম টু মার্ডার থেইকা সরাসরি মার্ডার কেসের আসামি হইসি.. তখন খুব শান্তি পাইসি হুজুর… ও মরছে, এখন আমার মরতে আফসোস নাই। আপনি আমারে ফাঁসি দেন হুজুর.. আপনি আমারে ফাঁসি দেন.. আমি জেলখানায় থাকলে এইখানেও কলংক হইবো হুজুর। আপনি আমারে যত তাড়াতাড়ি পারেন ফাঁসি দেন… ফাঁসি দেন…

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.