দ্বিধা

লেখকঃ আনন্দধারা

বিয়ের পিঁড়িতে কখনো বসবে এ কথা কিছুদিন আগ পর্যন্তও ভাবতো না শিমুল। কি হবে বিয়ে করে? কি লাভ? এই তো বেশ আছে। স্কুলের চাকরি দিয়ে তো ভালভাবেই বাবা- মা’কে নিয়ে সংসারটা চলে যাচ্ছে। সব সময় ভাবতো কিভাবে সম্ভব একটা অচেনা, অজানা মানুষের সাথে নিজের বাকি জীবনটা কাটানো? তাই রায়হান তাকে ছেড়ে যাবার পর থেকে এভাবেই গত পাঁচটি বছর পার করে আসছিল শিমুল।

কিন্তু তার বিয়ের প্রতি অনিচ্ছায় ভাটা পড়ে একটা ছবি দেখে। ছোট খালা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে গিয়েছিল। সুমন্ত’র ছবি। রিমলেস গ্লাস পড়া চৌকোনা মুখবয়ব। ফরসা গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মুখে হাসি নেই, কিন্তু চোখ জোড়ায় কেমন যেন একটা মায়া মায়া ভাব। দেখেই মনে হয় মনের ভেতর চাপা একটা কষ্ট লুকিয়ে আছে। ঠিক তার মতো। সচরাচর ছেলেদের ছবির দিকে একবার তাকিয়েই “না” বলে দেয় শিমুল। কিন্তু সুমন্তকে না বলতে কেমন যেন একটা বাধ সাধলো শিমুলের। কেন যেন মনে হলো এই মানুষটার সাথে একবার হলেও দেখা করা দরকার।

ছোটখালা যেন রাজ্য জয় করে ফেললেন। আইবুড়ো মেয়ে তা সে যত স্বাবলম্বীই হোক না কেন, বড় ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে বাবা-মায়ের যত যত্ন আত্তিই করুক না কেন, সমাজের চোখে সে বোঝাই। তাই সমাজের গুরু দায়িত্ব বিয়ে দিয়ে সে মেয়ের বোঝা মাথা থেকে নামানো।

শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় সেদিনই তাদের দেখা করার দিন নির্ধারণ করা হলো। শিমুল বরাবরই স্বাধীনচেতা। তাই সে নিজেই সুমন্তকে ফোন করে দেখা করার স্থান-কাল ঠিক করে নিল। বসুন্ধরা সিটির ফুড কোর্ট, বিকেল ৪ টা।

জুম্মার নামাজ পড়ে এসে খাওয়ার পর বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছিল সুমন্ত। তাতেই হলো কাল। ঘুম থেকে উঠে দেখে ঘড়িতে বাজে ৩ টা ৪৫। ঘুম থেকে উঠেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল দিল শিমুলকে,

– হ্যালো!
– হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে গেছেন? একটু অপেক্ষা করেন। আমি আসছি। আর বিশ মিনিটের মত লাগবে।
– ইয়ে, আসলে আমি আপনাকে সরি বলার জন্য ফোন করেছি। দুপুরে খাওয়ার পর একটু শুয়েছিলাম, ব্যাস। তাতেই ঘুমিয়ে পড়ি। এই মাত্র ঘুম থেকে উঠলাম। এখন রওনা দিলেও আসতে কমপক্ষে এক ঘন্টা লাগবে। আমি সত্যিই আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আপনার যদি ব্যস্ততা থাকে, তাহলে আজকের প্রোগ্রামটা আমরা বাদ দিতে পারি।
– আসলে আমি কাছাকাছি চলে এসেছি। আর তেমন কোন ব্যস্ততাও নেই। আপনি আসেন আস্তে ধীরে। আমি আছি। মার্কেটে সময় কাটানো তো মেয়েদের জন্য কোন ব্যাপারই না।
– অনেক ধন্যবাদ। আমি এক্ষুনি বের হচ্ছি।

মেয়েটার মাঝে কেমন যেন একটা স্নিগ্ধতা আছে। শ্যামলা চেহারার মাঝে বাঁশির মতো নাকটা চোখে পড়ার মতো। চোখের চাহনিতে কেমন একটা খা খা ভাব। কি একটা কষ্ট যেন মনের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে। চাকরি করে সংসার চালাতে হয় দেখে জোর করে একটা রুক্ষ ভাব ফুটিয়ে তোলার অপচেষ্টা যে করেছে, ছবি দেখেই সেটা বোঝা যায়।
বিয়ের সিদ্ধান্তটা হুট করেই নেয়া। এভাবে একা একা আর কতোদিন! তাই ত্রিশের কোঠা পেরোতেই একাকিত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চিরকুমার থাকার মহান ব্রত পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় সুমন্ত। অফিস কলিগ আসলাম ভাই তার খালাতো শ্যালিকার ছবি দেখানোর পর তাই এক বাক্যেই শিমুলের সাথে দেখা করতে রাজি হয়ে যায় সে।

সাধারণত শুক্রবার হলেও রাস্তা খুব একটা ফাঁকা থাকে না, কিন্তু সুমন্তর কপাল ভাল। সি এন জি নিয়ে একটানে আধ ঘন্টার মাঝে চলে এলো কাওরান বাজার। ফুড কোর্টে গিয়ে যখন পৌঁছাল মোবাইলের ঘড়িতে তখন ৫ টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। শিমুল পাঁচ তলায় ছিল। ফোন পেয়ে চলে এলো ক্যাপ্রিকর্নসে।

– সরি, আপনাকে অনেক্ষণ অপেক্ষা করলাম।
– ঠিক আছে, সমস্যা নেই। আমি ভেবেছিলাম আরো দেরি হবে আপনার।
– আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু রাস্তা ফাঁকা ছিল আজ কেন জানি। তারপর? কেমন আছেন?
– এইতো ভালো। আপনি?
– চলে যাচ্ছে এক রকম। তারপর! বলেন আপনার কথা, শুনি।
– আমার আর কি কথা! বাবা মা আর আমার ছোট্ট সংসার। বড় ভাই থাকলেও না থাকার মত। বাবা তার জমি বিক্রি করে জার্মানি পাঠান ভাইয়াকে। আর দশজন বাবা-মায়ের মত তাদেরও আশা ছিল ছেলে বিদেশে যেয়ে পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি পাবে, টাকা পাঠাবে। ভাইয়া পড়াশোনা শেষ করলো ঠিকই, চাকরিও পেলো ভাল। কিন্তু টাকা আর পাঠালো না। এক সময় যোগাযোগই বন্ধ করে দিল আমাদের সাথে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এক জার্মান মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই সেটেল্ড এখন। এই তো!

– দুঃখিত। আপনাকে কষ্ট দিলাম।
– আরে না না। আমরা তো এখানে আজ এসেছিই একে অপরকে জানার জন্য। আপনার কথা বলেন।
– বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে আমি। ছোটবেলা থেকেই একা বড় হয়েছি। বন্ধু বান্ধবও তেমন নেই এখন। ভার্সিটি লাইফের ফ্রেন্ডরা সবাই বিয়ে থা করে সেটেল্ড। বাসা থেকে অনেক আগেই বলছিল বিয়ের কথা, কিন্তু সাহস করে উঠতে পারিনি এতদিন।
– হা হা হা! তাই নাকি? বিয়েতে ভয়? কেন? মেয়েরা কি বাঘ না ভাল্লুক যে আপনার ঘাড় মটকে দেবে?
– হা হা! আসলে তার চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হয় আমার কাছে। ঘাড় মটকে দিলে তো বেচেই যেতাম, একবারেই শেষ। মেয়েদেরকে আমার কাছে মনে হয় সিন্দাবাদের ভুতের মত। একবার ঘাড়ে চড়লে আর নামানো যাবে না
– হা হা হা! তাহলে তো মহা মুশকিলের কথা! তা কেউ ঘাড়ে চেপেছিল নাকি?
– না না। সেই ভয়েই তো কারো ছায়া মারাতাম না। ফ্রেন্ডদের গার্লফ্রেন্ডদের দেখতাম কিভাবে ফ্রেন্ডদের মাথা চিবিয়ে খায়। আর এখন তো দেখছি তাদের বউদের। কেমনে যে ওরা পারে বউদের প্যানপ্যানানি সহ্য করতে!
– হা হা হা! সত্যি হাসালেন। অনেকদিন পর এভাবে হাসলাম প্রান খুলে। হো! হো হো!
– আপনার হাসিটা তো সুন্দর। হাসেন না কেন?
– হয়েছে। ফ্লার্ট করতে হবে না। তা নিজে কেন যেচে পড়ে সিন্দাবাদের ভুত ঘাড়ে তুলছেন এখন সেটা বলেন।
– আসলে ভেবে দেখলাম সিন্দাবাদের ভূত হলেও একাকি পথ চলার চেয়ে ভূতের সাথে পথ চলা ভালো। সঙ্গী হিসেবে তো কাউকে পাওয়া যাবে! আসলে একাকি জীবনে অতিষ্ট হয়ে পড়েছি। একদম সত্যি কথাটা বললাম।
– ধন্যবাদ, সত্যিটা বলার জন্য। এবার সত্যি করে আরেকটা কথা বলবেন?
– অবশ্যই। কেন নয়?
– এই ভুতটাকে কি পছন্দ হয়েছে?
– সত্যি তো অনেক বললাম। এবার মিথ্যা বলি?
– হা হা হা! আচ্ছা বলেন।
– হয় নাই।
হঠাত এই উত্তরটা পেয়ে লজ্জায় মাথা নিচে নামিয়ে নিল শিমুল। কি হচ্ছে এটা? এই প্রশ্নটা কি এখনই করার দরকার ছিল? আর উত্তরটাও এভাবে চলে আসবে ভাবেনি। মজা করতে করতে ভুলে করে ফেলেছে প্রশ্নটা। আর উত্তরটাও এলো চট জলদি।
– আমি কিন্তু ফান করছি না।
– আপনাকে কে বলল যে আমি ফান করছি? আপনি কিন্তু বললেন না এখনো এই সিন্দাবাদের ঘাড়ে উঠবেন কিনা।
– জানি না! (লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল শিমুল)

আজ শিমুল-সুমন্তের বিয়ের রিসেপশন। আক্‌দ হয়েছে শিমুলদের বাসায়, গতকাল রাতেই। শিমুল-সুমন্ত সুখী দম্পতির মত স্টেজে বসে সবার সাথে হাসি বিনিময় করে ছবি তুলে যাচ্ছে একের পর এক। হঠাত সামনের দিকে তাকিয়ে দুজনের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। শিমুল বলে ওঠে, “ভাইয়া!” আসে পাশে নেমে আসে পিনপতন নিরবতা। সুমন্ত হা করে তাকিয়ে থাকে শিমুলের দিকে। শিমুল আর তখন তার মাঝে নেই। ভুলে যায় আজ সে বিয়ের কনে। স্টেজ থেকে নেমে দৌড়ে ছুটে যায় শিহাবের দিকে। ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাইয়ের বুকে। কাঁদতে থাকে ঝর ঝর করে।

– শিমুল! ছাড় ওকে। ও আমাদের কেউ না।
(বাবার কথায় সম্বিত ফিরে পায় শিমুল। সরিয়ে নেয় নিজেকে ভাইয়ের বুক থেকে।)
– এতদিন কোথায় ছিল তার বোনের প্রতি দরদ? চলে যেতে বল ওকে।
– বাবা, আমি জানি আমার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। আমি শুধু শিমুলকে একবার দেখার জন্য এসেছি। কালই আবার চলে যাবো।
– না! তুই এখনি যাবি। এই মুহুর্তে চলে যাবি এখান থেকে। আমি চাই না তোর মত কুলাঙ্গার ছেলের উপস্থিতির কারনে আমার মেয়ের নতুন জীবনে কোন অমঙ্গল বয়ে আসুক। একটা ছেলে হয়ে তুই যা করিসনি, মেয়ে হয়ে শিমুল আমাদের জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করেছে। তাই আমি চাই না তোর কারনে ওর জীবনে কোন অমঙ্গল আসুক। বের হ এখান থেকে! (রীতিমত উত্তেজিত হয়ে যান আজমল সাহেব)
– ঠিক আছে বাবা, আমি চলে যাচ্ছি। ভালো থাকিস শিমুল। তোদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ধৃষ্টতাও আমার নেই। তাই আর কিছু বলবো না। জানিনা আমার মত পাপিষ্ঠের দোয়া আল্লাহ্‌ শুনবেন কিনা, তারপরো দোয়া করি। ভালো থাকিস।

শিহাব বের হয়ে যায় কমিউনিটি সেন্টার থেকে। রেশ কেটে দিয়ে যায় বিয়ের আনন্দঘন পরিবেশের। খাওয়া দাওয়া শেষে নব দম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সবাই এক এক করে বিদায় নেয়।

মন খারাপ করে বাসর ঘরে ঢোকে শিমুল। একমাত্র ভাইটার সাথে এতদিন পর দেখা হলো, তাও প্রান খুলে দুটো কথা বলতে পারলো না। ভাইয়ার যে দোষ নেই তা নয়, কিন্তু হাজার হলেও ভাই তো! রক্তের সম্পর্ক কিভাবে অস্বীকার করবে সে?

সুমন্ত সেই তখন থেকেই চুপ। এতবড় ঝটকা কিভাবে সামলাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কমিউনিটি সেন্টার থেকে রুমে আসা পর্যন্ত এই তিন ঘন্টা সময় যে কিভাবে পার হয়ে গেল সুমন্তর জানা নেই। চিন্তার সাগর থেকে ডুব দিয়ে উঠলো সে শিমুলের স্পর্শে,
– সুমন্ত, আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আজকের দিনটা এমন হবার কথা ছিল না। আমি করজোড়ে ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে।
– না না! এখানে তোমার দুঃখিত হবার কি আছে? বসো।
– কিছু খাবে?
– হুম?
– কিছু খাবে?
– পানি দাও এক গ্লাস।
পানি পান করার পরেও সুমন্তর আড়ষ্টতা কাটে না। আগের মতই মোহাবিষ্ট হয়ে বসে থাকে সে। শিমুল কিছুটা অবাক হয়। ব্যাপার কি? সুমন্ত এতো বেশি রিএক্ট করছে কেন? কোথায় এখন তারই উচিত শিমুলকে সান্ত্বনা দেয়া, তা না করে সে নিজেই মুখ ভার করে বসে আছে। ভাইয়ার উপস্থিতিতে তাদের বিয়ের আনন্দে ভাটা পড়েছে ঠিক, কিন্তু তাই বলে এরকম মুখ ভার করে থাকার মত কিছু কি হয়েছে? শিমুল জিজ্ঞেস না করে পারলো না,
– আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
– হুম।
– ভাইয়া আসার পর থেকে আমরা সবাই খুব আপসেট। ব্যাপারটা আমরা কেউই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছি না। কিন্তু এটা তো আমাদের পরিবারের ব্যাপার। তোমাকে এমন অস্বাভাবিক লাগছে কেন?
– কই নাতো!
– দেখো সুমন্ত, আমি তোমার স্ত্রী। এখন আমিই তোমার সবচেয়ে আপনজন। আমাদের মাঝে কোন গোপনীয়তা থাকলে আমরা কেউই একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারবো না। আমি তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি কিছু একটা হয়েছে। প্লিজ বলো। আমার কাছে যদি গোপন করো তাহলে কষ্ট পাবো।
– কই? কি গোপন করলাম?
– আচ্ছা ভাইয়া কি তোমার পূর্ব পরিচিত?
– হুম?
– বলছি ভাইয়াকে কি তুমি আগে থেকে চিনতে?
অতীতের অতল গহবরে তলিয়ে যায় সুমন্ত। ১৯৯৫, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ক্লাস সেভেন এর ছাত্র তখন সে। বাবার সরকারি চাকরির পোস্টিং ঢাকার বাইরে থাকায় হোস্টেলেই থাকতে বাধ্য হয় সে। বাবা-মাকে ছেড়ে কখনোই থাকা হয়নি। তাই প্রায়ই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো। বন্ধুরা প্রথমে সান্ত্বনা দিলেও পরে পিঠ পিছে হাসাহাসি করতো। বলতো, “সুমন্ত দেখতে যেমন মেয়েদের মতো, ভ্যা ভ্যা করে কাঁদেও মেয়েদের মত”। বলেই সেকি হাসি তাদের।

সেই থেকে সুমন্ত তাদের ঠাট্টার পাত্রে পরিণত হয়। উঠতে বসতে শুনতে হয় “হাফ লেডিস” বা “ছিঁচকাদুনে” এর মত শব্দ। ছোটবেলা থেকেই একা একা বড় হয়েছে বলে মা বাইরেও যেতে দিত না তেমন। তাই খেলাধুলাও শেখা হয়ে ওঠেনি। বন্ধুরা খেললে ও এক কোনে বসে থাকতো চুপ করে। তাই দেখে সবাই বলতো, “ও কি ক্রিকেট খেলবে? ও তো খেলবে কুতকুত!” কষ্টটা আরো বাড়িয়ে দিত তারা।

কিচ্ছু বলতে পারতো না কাউকে। বাবা-মায়ের সাথে দেখা হতো মাসে একবার। বাথরুমে যেয়ে দরজা লাগিয়ে মুখে কাপড় গুঁজে অঝোর ধারায় কাঁদতো সুমন্ত। এমন একটা বন্ধু ছিল না যে তাকে একটু হলেও বুঝবে।

একদিন বাথরুম থেকে কান্নাকাটি করে এসে বেসিনের সামনে মুখ ধুচ্ছিল, এমন সময় এক বড় ভাই পাশের বেসিনে হাত ধুতে ধুতে জিজ্ঞেস করলেন,
– কোন ক্লাসে পড়িস?
– ক্লাস সেভেনে।
– বাড়ি কই?
– জ্বি, খুলনা।
– চোখ লাল কেন? কান্নাকাটি করেছিস?
– কই নাতো!
– আবার মিথ্যা কথা! মারবো এক চড়!
কান্নার রেশ তখনো কাটেনি সুমন্তর। তাই ঝাড়ি খেয়ে চোখ থেকে ঝর ঝর করে পানি ঝরতে লাগলো।
– কিরে? মাগিদের মত কাঁদিস কেন অল্পতেই? আমি কি এমন বললাম তোকে? আজিব তো!
দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে যায় সুমন্ত। কি যে অসহনীয় এক একটা দিন কাটে তার! কাউকে বলতে পারে না।
আরেকদিন দেখা হয় সেই বড় ভাইয়ের সাথে, বাথরুমেই। সকাল বেলা দাঁত মাজছিলো। সুমন্তকে দেখে বলল,
– কেমন আছো?
– জ্বি ভালো।
– সেদিনের জন্য সরি। আসলে মেজাজ গরম ছিল তো তাই।
– না ভাইয়া, ঠিক আছে।
– তোমার মন খারাপ লাগলে আমার রুমে আসতে পারো। ৩১০ নাম্বারে থাকি আমি। আমার কাছে গল্পের বই আছে কিছু, পড়লে মন ভাল লাগবে।
– জ্বি আচ্ছা।
ভয়ে ভয়ে জলদি বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে সুমন্ত। ভাবে, তার রুমে একদিন যাওয়া যায়। গল্পের বই পড়ে ভালভাবে সময় কাটানো যাবে।
দুইদিন পরে রাতের পড়া শেষ করে ৩১০ নম্বর রুমে যায় সুমন্ত। উদ্দেশ্য ওই ভাইয়ার থেকে বই নেয়া। নক করতেই ভাইয়া দরজা খুলে দিলেন,
– আরে আসো আসো।
– ভাইয়া, আপনার থেকে বই নিতে এসেছি।
– হুম বুঝতে পারছি। কার বই নিতে চাও?
– হুমায়ুন আহমেদ আছে? অথবা শরৎচন্দ্র?
– হুম আছে। দেখো কোনটা নেবে।
এভাবে এক রকম সখ্যতা গড়ে ওঠে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়া ভাইয়াটার সাথে। প্রায়ই বিভিন্ন গল্পের বই নিয়ে পড়তো। মাঝে মাঝে পড়া বুঝতেও যেত ভাইয়ার কাছে। ভাইয়া সিনিয়র হওয়ায় একাই একটা রুম পেয়েছিলেন। বড় ছাত্রদের রাত জেগে পড়াশোনা করতে হয় দেখে তাদের জন্য এই ব্যবস্থা।
একদিন রাত এগারোটার দিকে সুমন্তর খুব কান্না পেলো বাবা-মা’র কথা ভেবে। ভাবলো ভাইয়ার কাছে ব্যাপারটা বললে ভাইয়া হয়তো মনটা ভালো করে দেবেন। যেই ভাবা, সেই কাজ। লাইট না জ্বালিয়ে আস্তে আস্তে দরজা খুলে বের হয়ে এলো সুমন্ত রুম থেকে। তারপর পা টিপে টিপে সোজা ৩১০ নম্বর রুম। কয়েকবার নক করার পর ভাইয়া দরজা খুললেন।
– কি ব্যাপার? এতো রাতে তুমি?
– ভাইয়া, আব্বু-আম্মুর কথা মনে পড়ে খুব কান্না পাচ্ছে। তাই আপনার কাছে আসলাম।
– আসো ভেতরে আসো। মন খারাপ হচ্ছে খুব বেশি?
– জ্বি ভাইয়া।
– আসো আমার পাশে এসে বসো।
(সুমন্ত সুবোধ বালকের মত পাশে গিয়ে বসে।)
– আমার কাঁধে মাথা রেখে কিছুক্ষণ কান্না করো। মনটা হালকা হবে।
ভাইয়ার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে সুমন্ত। কিছুক্ষণ পর ভাইয়া তার এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সুমন্তকে। সুমন্তর খুব ভাল লাগছিল। যাক এতদিনে এমন একজনকে পাওয়া গেল যে তার কষ্টটা বুঝতে পারলো। কিছুক্ষণ পর ভাইয়া সুমন্তর হাতটা ধরলো। সুমন্তও শক্ত করে আঁকরে ধরলো ভাইয়ার হাতটা, পরম নির্ভরতায়।
ভাইয়া তার হাতটা আস্তে আস্তে টেনে নিয়ে গেল তার বিশেষ অঙ্গের দিকে। শক্ত আর মোটা একটা কিছু হাতে পড়তেই দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিতে চাইলো সুমন্ত। কিন্তু ভাইয়া হাতটা সরাতে দিলেন না কিছুতেই। এরপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। সুমন্ত বুঝতে পারে সে নিজেই সাপের গর্তে পা দিয়েছে। কিন্তু তখন তার আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। ভাইয়া তার মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরেছে। জোর করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার হাফ প্যান্টটা খুলে দেয় ভাইয়া। টেনে নামিয়ে ফেলে নিজের ট্রাউজারটাও। হুমকি দিয়ে বলে, “এমনিতেই এত রাতে রুম থেকে একা বেরিয়েছিস। এখন যদি চিৎকার করিস, তাহলে হাউস টিউটর এসে তোকে দেখে ফেলবে এখানে। তারপর তোর বাপকে ডেকে তোকে টিসি দেবে স্কুল থেকে। তাই একদম চুপ করে থাকবি।”
ভয়ে চুপসে যায় সুমন্ত। ভাইয়া তাকে নিয়ে আদিম খেলায় মেতে ওঠে নরপশুর মত। দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকে সুমন্ত। রক্তে ভিজে যায় ৩১০ নম্বর রুমের সাদা বিছানার চাদর।
– কি হলো কথা বলছো না কেন? ভাইয়াকে কি তুমি চিনতে?
সুমন্ত বুঝতে পারে না কি বলবে শিমুলকে। সত্যটা বলে দেবে? বলে দিলে কিভাবে নেবে শিমুল বিষয়টাকে? বিশ্বস্ত দাম্পত্য জীবন গড়ার আশায় নিজের আত্নসম্মানের বলি দেয়াটা কি ঠিক হবে? বলাটা কি ঠিক হবে যে এক সময় ধর্ষিত হয়েছিল সুমন্ত? তাও শিমুলের ভাইয়ার দ্বারাই?

একটা দ্বিধা কাজ করে তার ভেতর।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১৩ই অক্টোবর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.