নষ্ট ছেলের রোদন কাহিনী

লেখকঃ নীল মেঘ

সন্ধ্যা ৬টা।
একটু আগে জানলাম আগামীকাল ভোর ৫টায় আমার মুক্তি।শুধু মুক্তি না,চিরমুক্তি।কদিন থেকেই বুঝতে পারছি চিরমুক্তির পথে আমি এগুচ্ছি।
ঐদিন জেলার সাহেব এসে বললেন,”আপনার কোন ইচ্ছা আছে?এই যেমন কাউকে দেখা কিংবা কিছু খাওয়া”।
আমার বলতে ইচ্ছা করছিল,হ্যাঁ আমার ইচ্ছা আছে।ফুচকার প্লেট হাতে সুরমা নদীর তীরে রাহাতদের সাথে আড্ডা দেয়া কিংবা খোলা আকাশের নিচে সবুজ চত্বরে প্রিয় লেখকের নতুন বইয়ের গন্ধ সোঁকা।
কিন্তু না এসব অর্থহীন কথা বলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করার কোন মানে হয়না তাই উনার কাছে শুধু জানতে চেয়েছিলাম,”আমার সময় কি খুব সন্নিকটে”?
আমার প্রশ্নটা শুনে উনি মোটেও অপ্রস্তুত হননি।হয়ত এরকম প্রশ্ন শুনে উনি অভ্যস্ত,আমার পূর্বসূরিরাও নিশ্চয়ই এরকম প্রশ্ন করত।উনি স্মিত হেঁসে ”কোন কিছু দরকার লাগলে গার্ডকে বলবেন” বলে চলে গেলেন।

কোর্টে আমার রায় শুনেই মা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেছিলেন।আমি দেখলাম মাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পরল।মা আর আমার মধ্যে মাত্র কয়েক গজ দূরত্ব,তারপরও আমি মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের শরীরটা একটু স্পর্শ করতে পারলাম না।সেদিন থেকেই নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম,আমি এখন সবার থেকে আলাদা,আমার চাওয়া-পাওয়াগুলো আর পূর্ণ হবার নয়।সেদিন থেকেই অপূর্ণতার সাথে আমার আপোষ করে চলার চেষ্টা।
অসুস্থ শরীর নিয়ে মা প্রায়ই রিমিকে নিয়ে আমাকে দেখতে আসতেন।রিমি আমার একমাত্র ছোটবোন।কত আদরের ছিল সে।ছিল কি বলছি,সেতো এখনও আমার সেই আদরের বোনই আছে।
একদিন রিমি একা এসেছিল।ওকে বলছিলাম,তোরা আর আসিসনা রিমি।তোদের দেখলে আমার কষ্ট হয়,মুক্ত পাখির মত উড়তে ইচ্ছে করে।আয়ুর সীমাবদ্ধতা ভেঙ্গে মুক্তভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে।
জানিনা পাগলিটা মাকে কি বলেছিল,তারপর থেকে আর কেউ আসেনা।একদিন শুধু তানিশা এসেছিল।
তানিশা হচ্ছে আমার একমাত্র মেয়েবন্ধু।
”কেন তুই এমন করলি শিমুল?” হয়ত এই প্রশ্নটাই করতে এসেছিল সে,আমাকে দেখার জন্য নয়।
আমি ওইদিন স্পষ্ট ওর চোখে আমার প্রতি ওর ঘৃণা দেখতে পেয়েছিলাম।সেই চোখ যেন বলছে তুই খুনি,তুই আমার ভালবাসার খুনি।

সারাদিন থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল।এমন দিনে ক্লাস করার মানেই হয়না।কাঁথামুরি দিয়ে শুয়ে আছি এমন সময় তানিশার আওয়াজ।
”শিমুল শিমুল শিমুল”
বুঝতে পারছি সে খুব উত্তেজিত এবং খুশি।কারণ যখনই সে অতিরিক্ত আনন্দে থাকে তখনই আমাকে এভাবে ডাকে।
-কিরে এই ঝড় বাদলার দিনে এলি কেমনে?
-শালা তুই জানিসনা আজ কি হইছে,তোকে সরাসরি না বলে থাকতে পারবনা।
-তোকে না কতদিন বলছি আমাকে শালা বলবিনা।মেয়েমানুষের মুখে শালা শুনতে বিশ্রী লাগে।
-ওই মেয়েমানুষ আর ছেলেমানুষ কি রে?বন্ধুত্বের মাঝে জেন্ডার টানিস ক্যান?
-আচ্ছা হইছে আর লেকচার ঝাড়তে হবেনা।এখন বল তোর সেই মহা-কাহিনী,শুনে ধন্য হই।
-ফাজলামি ছাড়,আজকে দিপু আমাকে প্রপোজ করেছে।
-কোন দিপু?তোর বোনের সেই দেবরটা যার জন্য তোর বুক ফাটে তো মুখ ফুটেনা সে?
-আবার ইয়ার্কি!
আমি সেদিন অন্য এক তানিশাকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমার জীবনে এরকম দিন কি কখনও আসবে?হয়ত এতদিনে এসেও যেত যদিনা আমার চাওয়াগুলো আর সকল ছেলেদের মত হত।
এরপর আরেকদিন তানিশা আমাদের বাসায় এল সাথে তার ওই দিপুকে নিয়ে।
ওইদিন মা রিমিকে নিয়ে বড় আপুর বাসায় গেছে সেজন্য আমি ক্লাসে যাইনি।মা আমাকে বাড়ি পাহারার ডিউটি দিয়ে গেছেন কারণ তখন দিনেরবেলা ছিঁচকে চোরের উৎপাত বেড়ে গেছিল।
তানিশাকে কিরকম জানি দেখাচ্ছিল।আগের মত না,একটু অন্যরকম।কিছুটা লাজুক,নার্ভাস সবমিলিয়ে কিরকম একটা উদভ্রান্ত ভাব তার যে ভাবের সাথে আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত।
সে আমাকে বলল,”কিরে বাসায় আর কেউ নেই,তুই একা?”
আমি বুঝলাম না সে এই কথা কেন বলছে।তাকেতো আমি রাতেই বলছি বাসায় কেউ আজ থাকবেনা বলে আমি ক্লাসে যাবনা।
আমি তার সেকথার উত্তর না দিয়ে বললাম,”তুই ঠিক আছিস তো?”
-হ্যাঁ আমি ঠিক আছি।আচ্ছা তুই কি তোর ঘরটা ১ঘন্টার জন্য আমাদের ধার দিবি।
আমার বুঝতে আর অসুবিধা হলনা তানিশার আসার হেতু কি।
আমি তাকে আড়ালে নিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে এটা ঠিক না কিন্তু সে উল্টো আমাকে বুঝাতে শুরু করল।
তার কথাবার্তার অর্থ ছিল দুদিন পর যাকে বিয়ে করব তার সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটানো দোষের কিছুনা।এতে পারস্পরিক বোঝাপড়াটা আরও ভাল হয়।
যখন কোন যুক্তি দিয়েই সে আমাকে বুঝাতে পারছিল না তখন সে আমাকে একটা প্রশ্ন করছিল।
”তুই কি জেলাস?”
তার সেই প্রশ্ন শুনে কিংকর্তব্যবিমুর এই আমার মুখ দিয়ে আর কোন কথাই আসেনি।
তানিশা আমার একমাত্র ভাল বন্ধু।সে যদি কোন ভুল করে সুখি হয় এবং সেটা যদি আদৌ তার জীবনে ভুল হয়ে না আসে তাহলে আমি কেন তাকে সেই ভুলের সুখ নিতে বাঁধা দেব?নিজেকে এটা বলেই সান্ত্বনা দিলাম।

অনেকক্ষণ হল ওরা আমার ঘরে।ঠিক কতসময় পর ওরা বের হয়েছে খেয়াল নেই।বেরোনোর পর দেখলাম দিপুর চোখেমুখে কিরকম একটা ক্রুর হাঁসি।তানিশার চোখে চোখ পরতেই চোখ নামিয়ে নিল।তারপর ওরা বিদায় নিয়ে চলে গেল।
তার দিনপাঁচেক পরের কথা।
একদিন দিপুর ফোন এল।যে করেই হোক এক্ষুনি তাদের বাসায় যেতে হবে।আমি ভাবলাম তানিশা হয়ত ওর বাসায় এবং সেখানে নিশ্চয় কোন ঝামেলা বেঁধেছে।আমি তড়িঘড়ি করে দিপুর বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
গিয়ে দেখি বাসায় দিপু একা।আমি বললাম,কি ব্যাপার হঠাৎ জরুরী তলব?
-একা একা বোরিং লাগছিল তাই তোমাকে এভাবে ডেকে আনলাম নইলেতো এত তাড়াতাড়ি আসতে না।
-তানিশাকে বললেই পারতেন।দুজনে সুন্দর সময় কাটাতেন।
-আরে মাঝেমাঝে শালাশালিদেরও সাথেও তো ডেট করা দরকার।
এভাবে হাসিঠাট্টায় কিছুসময় পার হবার পর দিপু বলল,চল রুমে গিয়ে রিলাক্স হয়ে আড্ডা দেই।
রুমে যাওয়ার পর দিপু ওয়াশরুমে গেল।ওয়াশরুম থেকে দিপু বের হবার পর আমি যা দেখলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
সম্পূর্ণ নগ্ন দিপু।তার মুখে সেদিনের মত সেই অস্বাভাবিক ভঙ্গির হাঁসি।
আমি চলে আসতে উদ্যত হলে দিপু আমাকে হাত ধরে আটকে রাখে।
-এটা ঠিক না দিপু ভাই।আপনি আমার বন্ধুর বাগদত্তা।
-তাতে কি হয়েছে!তাকেতো আমি বিয়ে করবই।
আমি অবাক হলাম যখন শুনলাম ঐদিন দিপু আমার ঘরে গিয়ে তানিশার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমার টেবিলে রাখা ডায়েরী পড়েছে এবং বিশেষ একটা পাতা ছিঁড়েও এনেছে যেখানে আমি স্পষ্টভাবে আমার সমকামী জীবনের কথা লিখেছি।
দিপু আমাকে ভয় দেখাল আমি যদি তার কথা না শুনি তাহলে সে আমার হাতের লেখা ওই পাতার লেখাটা সবাইকে দেখিয়ে দিবে।
আমি একসময় দিপুর প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হলাম।
আমার মন আর শরীর দুটা যেন আলাদা দুই সত্ত্বা হয়ে গেল।দিপুর উষ্ণ আদর যখন আমার মন প্রাণপণ প্রত্যাখ্যান করতে চাইছিল শরীর তখন মনের বিপরীতে গিয়ে সেটাকে সাদরে গ্রহণ করেছিল।শরীরের চাহিদার কাছে যেন আমার সকল নৈতিকতা ধূলিসাৎ হয়ে গেছিল সেদিন।
চরম পুলকিত সময়ের পরেই নিজের মধ্যে অপরাধবোধ জেগে উঠল।
ক্লান্তশ্রান্ত নগ্ন আমি হঠাৎ দিপুর ক্যামেরার মুহুর্মুহু ফ্লাশে সম্বিত ফিরে পেলাম।ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে।দিপুর কথার অবাধ্য না হয়ে যাতে চিরস্থায়ীভাবে তার হাতের পুতুল হয়ে থাকি সেজন্য এই ব্যবস্থা।

জেলের বাবুর্চিকে নিয়ে জেলার সাহেব এলেন।আমি রাতে কি খাব জানতে চাইলেন।আমি অনেক ভেবেও খুঁজে পেলাম না জীবনের শেষ রাতের খাবার আমি কি দিয়ে খাব।এমনিতে আমার প্রিয় খাবারের তালিকা অনেক লম্বা কিন্তু যখন আমাকে নাম বলতে বলা হল আমি কিছুই পেলাম না বলার মত।

আমার প্রাণপণ চেষ্টা সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কিন্তু সেটা পারছিনা আমি।
এই চারদেয়ালের ভেতর থেকে আমার জানতে ইচ্ছা করে কে কেমন আছে।
মায়ের কথা,রিমির কথা,বড়আপুর কথা।
নাজমা বুয়ার অসুস্থ ছেলেটা সুস্থ হয়েছে কিনা?
আমার বারান্দায় বাসা পেতে বাস করা সেই চড়ুই দম্পতির কথা।ওদের কিচিরমিচিরে বিরক্ত হয়ে কতদিন ভাবছি ওদের তাড়িয়ে দেব কিন্তু বড় মায়া হত তাড়াতে গেলে।
জানিনা ওরা আছে কিনা!যদি থাকে তাইলে ওদের কেউ তাড়িয়ে দিওনা।
মা আমাকে ক্ষমা কর!
বাবাহীন আমরা তিন ভাইবোনকে অনেক কষ্টে বড় করে এইসময়ে এসে যখন তোমার সেই স্বপ্নের সুখ দেখার কথা তখন আমি তোমাকে এমন দুঃখ দিলাম যেটা হয়ত কোনদিন লাঘব হবেনা।
খুব ইচ্ছা ছিল চাকরি পাবার পর কোনদিন কোথাও ঘুরতে যেতে না-দেখা আমার এই লক্ষ্মী মা টাকে নিয়ে সাগর দেখতে যাব।সাগর দেখার পর তোমার মুখখানি কিরকম হয় সেটা আর দেখা হলনা মা।
দেখারতো আরও কত কিছু ছিল।রিমির বিয়ে দেখব।একসময় রিমির ফুটফুটে একটা বাবু হবে,রিমি গাল-ফুলিয়ে অভিযোগ করবে ”ভাইয়া তুমি আমার বাবুর চেয়ে বড় আপার বাবুটাকে বেশি আদর কর”।
কত স্বপ্ন ছিল বড় আপার মত টাকার অভাবে সাদামাটা করে রিমির বিয়ে দেবনা।ধুমধাম করে আমাদের পাশের বাসার নায়লার মত করে ওকে বিয়ে দেব।আমার পরীর মত বোনটাকে এত সুন্দর করে সাজিয়ে নিতাম যাতে সবাই বলত,”আরে এটাতো একটা লালপরী,রিমি কোথায়?”

রাত ৯টা।
আমাকে খাবার দেয়া হয়েছে।অন্যান্যদিনের মত অতিসাধারণ খাবার না,মেজবানি খাবার।এই খাবার হজমের দরকার পরবেনা তার আগেই আমি পৃথিবী থেকে চলে যাব।
আরে আমি যে আজকের এই দিন পর্যন্ত বেঁচে আছি সেটাওতো ভাগ্যের গুণে যদি ওইদিন কোনকিছু চিন্তা না করে দুর্ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলতাম তাহলে কি আজ এভাবে সব বলে যেতে পারতাম!

আগেরদিন রাতে দিপু বলে রাখছিল সন্ধ্যা ৭টায় হোটেল সিতারাতে থাকতে।গিয়ে দেখি দিপু রিসিপশানে বসে আছে।আমাকে নিয়ে সোজা ২০৫নাম্বার রুমে চলে গেল।
দিপু যে এতটা নীচে নামবে আমি কল্পনাও করিনি।আমাকে একটা লোকের হাতে দিয়ে সে ওই লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলে এল।হতভাগ্য এই দেহটাকে আবার বলী দিতে হল।
সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছিলাম এভাবে আর চলতে দেয়া যায়না।হাতে কীটনাশকের একটা শিশি নিয়ে সেদিন বাসায় ফিরলাম।
নোটপ্যাড রেডি,টেবিলে বিষের বোতল।খাবার আগে মনে উদয় হল আমি কেন এভাবে কাপুরুষের মত চুপিচুপি মরব।এক শিমুল মারা গেলে আরও লক্ষ শিমুল আছে দিপুদের প্রতারণার শিকার হবার জন্য।তারচেয়ে দুনিয়া থেকে যদি একটা দিপুকে উঠিয়ে দিয়ে মারা যেতে পারি তাইলে অন্তত কেউ না কেউ আমার এই আত্মত্যাগে বাঁচবে।অন্তত আমার বেস্ট ফ্রেন্ডটাতো একটা মুখোশধারীর হাতে পরবেনা।
সিদ্ধান্ত বদলালাম,দিপুর সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকলাম।
দিপুর ব্যবসার রমরমা একটি আইটেম হয়ে গেলাম আমি।এখন ওই হোটেল ম্যানেজারও আমায় চিনে।আমায় দেখলে সে রুম নাম্বার বলে দেয় সাথে তার অশ্লীল টিপ্পনীতো আছেই।
কত রকমের ভদ্রলোক যে আমার কাছে এসেছিল।মধ্যবয়স্ক থেকে শুরু করে পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যাক্তি,এদের মধ্যে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ছিল।মানুষ সম্পর্কে আমার ধারণাই পাল্টে গেছিল।রাস্তাঘাটে লোক দেখলেই মনে হত এই লোকটা ভদ্রবেশী কোন নিষিদ্ধ বালকের শয্যালোভী হোটেলগামী কেউ,লোকদেখানো সামাজিক ভদ্রলোক।
বাসায় গিয়েই প্রতিদিন দেখি বেডসাইডের ড্রয়ারে রাখা ১০ইঞ্ছি ছুরিটা জায়গামত আছে কিনা।
অবশেষে একদিন সুযোগ পেয়ে গেলাম।বাসায় কেউ নাই।আহ্লাদী সুরে দিপুকে আসতে বললাম।
দিপু ৩০মিনিটের ভেতর আসছে বলে ফোন রেখে দিল।
রক্তের একটা হিমস্রোত শরীরে বয়ে গেল।সেই অনুভূতিটার কথা কোনদিনই লিখে বুঝানো যাবেনা।
দুরুদুরু বুকে কাজ শুরু করলাম।
আগে থেকে দিপুর পছন্দের দুই বোতল পানীয় এনে রেখেছি।১পাতা মাইলাম ৭.৫মিলিগ্রাম আর ১পাতা সেডিল ৫মিলিগ্রাম একসাথে ভেঙ্গে গুড়ো করে দুই বোতল পানীয়ের এক বোতলের মুখ খুলে ওই পানীয় দিয়ে একটা কাপে গুড়ো করা ট্যাবলেটগুলো ভাল করে মিশিয়ে সিরিঞ্জে ভরে মুখ না খোলা ওই বোতলে মিশিয়ে দিলাম।প্ল্যাস্টিকের বোতল থাকায় সহজেই সিরিঞ্জের সূচ ঢুকে গেল বোতলে এবং সূচ বের করার পর সূচ ঢোকানোর কোন চিহ্নই রইল না।
আমি জানি এটাতে ৯৯% কাজ করবে।এমনিতেই স্লিপিং পিল তারউপর ওই পানীয়তে ছিল ১০% এলকোহল।
দিপু আসার পর আমার নার্ভাসনেস আরও বেড়ে গেল।কোন এক জার্নালে পড়ছিলাম নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে বের করলে নাকি নার্ভ শক্ত থাকে।তাই করলাম কিন্তু কাজ হল বলে মনে হলনা।
দিপুকে বললাম,কফি খাবে না ঠাণ্ডা খাবে।
জানতাম দিপু কফির কথা বলবেনা কারণ গরম থেকে এসে সে কখনও গরম কিছু খায়না।তবুও যাতে অকারণ সন্দেহ না করে সেজন্য বলা।দিপুও যথারীতি ঠাণ্ডার কথাই বলল।
নিজের জন্য কফি বানিয়ে দিপুকে পানীয়টা দিলাম।
মনেমনে বললাম,তোর প্রিয় পানীয় খেয়ে তোর মৃত্যু হচ্ছে এটাও কি কম ভাগ্যের!
নাক দিয়ে গ্রহণ করে মুখ দিয়ে বর্জন করা শ্বাসপ্রশ্বাসের চেয়ে কফি অনেক কাজে আসল।কিরকম ফুরফুরে লাগছে।
দিপু অর্ধেক খেয়েই আমাকে তার কাছে টেনে নিল।
হায় ঈশ্বর!
সব বুঝি ভেস্তে গেল!
বললাম পুরোটা খাও।
সে সেদিকে কান না দিয়ে আমার শরীর নিয়ে মেতে উঠল।
১০মিনিট পর বুঝলাম কাজ হচ্ছে।দিপুর কথাবার্তা কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে।১৫মিনিটের ভেতর দিপুর শরীর পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে গেল।আমি আমার এতদিনের যত্নে রাখা ছুরির সদ্ব্যবহার করলাম।
খুন করা তো মোটেও কঠিন না।
আহঃ
কি শান্তি!
এতদিনের জমে থাকা অশান্তি ৩০মিনিটের মধ্যেই খালাস।
বাসার ঝামেলা এড়াতে পুলিশ আসার অপেক্ষা না করে নিজেই থানায় গিয়ে সব খুলে বললাম।সেসময় থানায় একজন সাংবাদিক ছিলেন উনাকে বললাম,নিউজটার শিরোনাম দিবেন ”লহূ হাতে লোহিত শিমুল”।আমি নিজেই জানিনা তখন আমি এত ঠাণ্ডা মাথায় কিভাবে কথা বলছিলাম।
জানিনা শেষপর্যন্ত কি শিরোনাম হয়েছিল।

সেই মানা করার পর গতকাল রিমি মাকে নিয়ে আসছিল।
মা শুধু চেয়ে রইলেন,তেমন কথাও বললেন না।পাছে কথার মধ্যে যদি কান্না চলে আসে তাইলে যে আমি কষ্ট পাব।
মা!মা!মা!
তোমায় বড় ভালবাসি মা।কোনদিন বলা হলনা সে কথাটা।
রিমিটা বড্ড বোকা।ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলল।
রিমির কান্নার বাণ আমার বুক ভেদ করে মার বুক ভেদ করল।চোখের জলে তিনটা মানুষের একসাথে শেষ কথা হল।
আল্লাহ!এত কষ্ট কেন তোমার এই পৃথিবীতে?

আজকে আবার আমার ওজন নেয়া হল।ওজনের অনুপাতে ফাঁসির দড়ি তৈরি হবে।
গোসল করার পর কারাগারের ইমাম আমাকে নামাজ পড়িয়ে তউবা করালেন।
নামাজ পড়তে গিয়ে অনেকদিন পর বাবার কথা মনে পড়ল।ছোটবেলায় যখন বাবার সাথে জুম্মার দিন মসজিদে যেতাম তখন কি দুষ্টামিটাই না করতাম।বাবা সেজদায় গেলে বাবার পিঠে চড়তাম।আসার সময় বাবা বলতেন এই শেষ পরের জুম্মায় তোকে আর নেবনা কিন্তু পরের জুম্মা এলে ঠিকই আমি বাবার কনিষ্ঠ আঙ্গুল ধরে গুটিগুটি পায়ে জুম্মাঘরের দিকে যেতাম।
আমি আসছি বাবা!মাকে ফেলে তোমার কাছে আসছি।

জেলার সাহেবকে অনুরোধ করছিলাম শেষমুহূর্ত পর্যন্ত যেন এই খাতাটা আমার সাথে থাকে।উনি উনার কথা রেখেছেন আশা করছি আমার মৃত্যুর পরও উনার কথা রাখবেন।আমার এই নোটটা সংবাদপত্রের অফিসে পৌঁছে দিবেন।

তানিশা হয়ত ধরেই নিয়েছিল আমি তাকে ভালবাসি আর এজন্য দিপুকে খুন করেছি।
আমার মাঝেমাঝে মনেহয় আমার আর দিপুর অবস্থান তার মনের দাঁড়িপাল্লার বাটখারার দুইদিকে।ভালবাসার দিকে দিকে দিপু আর ঘৃণার দিকে আমি।
আমার এই লেখাটা যখন সে দেখবে তখন খুব অবাক হবে।হয়ত বাটখারার দিক পরিবর্তন হয়ে আমি ঘৃণা থেকে ভালবাসায় আর দিপু ভালবাসা থেকে ঘৃণায় চলে আসবে কিংবা কে জানে হয়ত পরিবর্তন হবে না।ভালবাসার মানুষকে হয়ত কখনও ঘৃণার পাল্লায় ফেলা যায়না।

আমার লিখতে কষ্ট হচ্ছে।আমি হেঁটে হেঁটে লিখছি আর এগুচ্ছি বিদায়ী মঞ্চের দিকে।
চলে আসছি বিদায়ের মঞ্চের কাছাকাছি।একদিকে রাখা লাল টুপি দেখা যাচ্ছে যেটা আমাকে ক্ষণিক বাদেই পরিয়ে দেয়া হবে যাতে ভয়ঙ্কর মৃত্যু দেখে আমি ঘাবড়ে না যাই।
আমি মরতে যাচ্ছি।
সবার চোখে একজন খুনির বেশে আমার ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে যাচ্ছি কিন্তু নিজের কাছে শত্রু কতল করে বীরের বেশে আমি ফাঁসিকাষ্টে ঝুলতে যাচ্ছি।
কেউ একজন আসছেন আমার হাত পেছন দিকে নিয়ে হাতকড়া পরাতে।
মা তুমি কোথায়?
আমার ভয় করছে মা।সত্যি ভয় করছে…

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ৮ই অক্টোবর, ২০১৪।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.