পথিক

লেখকঃ শুভ্র ভাই


সুবিশাল ঘরখানা বেশ পরিপাটি করে সাজানো। ডাবল সাইজের বিছানায় সাদা চাদর বিছানো। চাদর খানা ঘন্টাখানেক আগেও টানটান ছিলো। এখন দুমড়েমুচড়ে আছে। চাদরের এক কোনায় তুহিনের নগ্ন দেহ অবশ শুয়ে আছে। চোখে তার জল। দু:খের নয়, শারিরীক কষ্টের। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক আরব শেখ। আরবদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক খুলে নিলে খুবই সাধারণ চেহারা দেখতে হয় তাদের। আরবটির বয়স বেশী নয়। আঠাশ ত্রিশের মধ্যে হবে। সুদর্শন, রোমান্টিক বলা যায়। কিন্তু বিছানায় পুরো জানোয়ার হয়ে ওঠে। তুহিনের মনে হতে থাকে তাকে কোন নির্দয় বাঘের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। বাঘটি তাকে ছিড়ে খুড়ে শেষ করে দেবে। শিষ দিতে দিতে আরবটি পরিপাটি করে নিজেকে গুছিয়ে নিলো। তারপর বেরিয়ে গেলো। ড্রেসিংটেবিলের ওদিক থেকে মিষ্টি জেসমিনের সুগন্ধ আসছে। বডি স্প্রের গন্ধ। তুহিন উঠে বসে। সারা শরীরে ব্যাথা। মরুভুমির শহর দুবাইয়ে এখন ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা। কিন্তু শীতাতপ রুমের মেঝে জলে ভেজানো পাথরের মত ঠান্ডা। তুহিন মেঝেতে পা রেখে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলো। থাই গ্লাসের ওপাশে নিশ্চুপ বিকেল বসে আছে খেঁজুর গাছের মাথায়। তুহিন সিদ্ধান্ত নিলো যে করেই হোক পালাতে হবে এই জাহান্নাম থেকে। বাড়ির কথা মনে পড়ছে তার। দেশে কি এখন রাত? মা কি করছে? ঘুমিয়েছে? মিমি কি করছে? তার কথা ভাবছে কি বসে বসে?

শাওয়ার ছেড়ে দিলো। বৃষ্টির মত ঝিরঝিরে পানি এসে আছড়ে পড়লো তুহিনের মুখে। এক বৃষ্টিদিনে দেখা হয়েছিলো মিমির সাথে। নাইকানিবাড়ির রাস্তাটা বৃষ্টি হলেই কাদাকাদা হয়ে যায়। অংক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে ফিরছিলো। অংক ইংরেজিটা তার কিছুতে মাথায় ঢোকে না। মেট্রিক পাশ করার পরে আর্টসে আর অংক থাকেনা। কিছুটা হলে তো বাঁচা যাবে তখন। আর দু মাস পরেই মেট্রিক পরীক্ষা। স্যার স্পেশাল কোচিং করাচ্ছে সেজন্য। ছাতা নিতে মনে নেই। বড় একটা মানকচুর পাতা ছিড়ে মাথার উপর ধরে তুহিন পা টিপে টিপে হাটছে যাতে পপাত ধরণীতল না হয়। বড় কদমগাছটার কাছাকাছি আসতে একটা মেয়েলি গলার ডাক পেলো। এই যে শুনছেন! তুহিন ডানে বায়ে তাকায়। না আশেপাশে কেউ নেই। তাকেই ডাকছে। একটা মেয়ে বয়স বারো চৌদ্দ হবে সাথে ছয় সাত বছরের একটা ছেলে। মেয়েটাকে চেনেনা তুহিন। গ্রামের সব মেয়ে তুহিনেরা চেনা। বিয়ে করার জন্যে বন্ধুরা তারা চুপিসারে মেয়ে দেখে বেড়ায়। ভাগাভাগি করে নেয় এ আমার ও আমার। এই যেমন রাশেদ বলে বেড়ায় যে উত্তর পাড়ার শিকদারের ছোট মেয়ে তার কিন্তু আজ পর্যন্ত তার সাথে কথা বলে উঠতে পারলো না। আবার তার বন্ধু রাব্বী শিউলিকে ভালোবাসে। কিন্তু শিউলি তাকে একটুও পাত্তা দেয় না।
– আমাকে বলছ?
– আর কেউ আছে যে বলবো? দেন তো কয়েকটা কদম ফুল পেড়ে।
– গাছ তো অনেক বড়। না উঠে পাড়া যাবেনা।
– সেজন্য তো আপনারে কইলাম। না হলে নিজেই পাইড়ে নিতাম। গাছে উঠতে পারেন?
আসলেই তুহিন সেভাবে গাছ বাইতে পারেনা। কিন্তু সুন্দরী মেয়েটার আহবান উপেক্ষা করতে পারলো না। বেশ ডাগরডাগর চোখ। এর সাথে প্রেম করতে পারলে মন্দ হয় না। কথা বাড়ানোর জন্যে দুটো ফুল পেড়ে দেয়াই যায়।

কোনমতে ভেজা গাছ হাচড়ে পাছড়ে উঠলো মোটা ডালটাতে। ফুলগুলো সব আরো উচুতে পাতার আড়ালে হাসছে। নিচ থেকে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো মেয়েটা।
– এই টুকু গাছে উঠতে আপনার যে দশা তাতে না আপনার বিচি দুটো গাছের ডালে আটকে থেকে যায়!
তুহিনের কান লাল হয়ে উঠলো। কোন মেয়ে তাকে এটা বলতে পারে ভাবে নাই।

মিমির সংগে তুহিনের অল্পতে ভাব হয়ে গেলো। তারপর প্রেম। তাদের পাড়ার সাইফুলের শ্যালিকা সে। বেয়াই বিয়াইন সম্পর্কে একে অন্যকে ডাকতে ডাকতে হাসি ঠাট্টা ইয়ার্কি মারতে মারতে কখন যে ভালোবেসে ফেললো তারা টেরই পেলো না। কচি বয়সের প্রেম মানেই বস্তা বস্তা আবেগ আর রাশিরাশি পাগলামি।


টাঙাইল সদরে ঈদ উপলক্ষ্যে কেনাকাটা করতে গেছিলো তুহিন। ফেরার পথে বদরুলের সংগে দেখা। পাশের গ্রামে বাড়ি। কয়েক বছর আগে মিডল ইস্টে গেছিলো। ভালো যে আছে তা তার পোষাক আশাকে ভালোই বোঝা যাচ্ছে। জোর করে সে তুহিনকে সুরভী রেস্তোরাঁর দোতলায় নিয়ে বসায়। জম্পেশ খাওয়ালো। তুহিন মনে মনে ভয় পাচ্ছিলো তাকে না আবার বিল ধরিয়ে দেয়। তাহলে হোটেলের থালাবাসন মাজা ছাড়া গত্যন্তর থাকবেনা। বিল বদরুলই দিলো। বদরুলকে সবাই বদু ভাই বলে এলাকায়। তুহিন বললো, বদু ভাই আমি যাই তাহলে এবার।
– আরে যাবি কিরে। আমার সাথে চল। ও বাসে সিএনজিতে ঠেলা ঝাঁকি খেতে খেতে যাওয়ার চেয়ে আমার সাথে চল। বাইকে করে তোকে ইশ্বরীগঞ্জ বাজারে নামিয়ে দেবো।
বাইকে যেতে যেতে বদু ভাই বললো,
তুই কি পড়ালেখার পাশাপাশি কিছু করিস?
– কিছু মানে?
– আয় রোজগার?
– নাহ।
– কি বলিস! এখনো বাপের ঘাড়ে বসে কতদিন খাবি। কিছু মিছু কর। না পারলে বিদেশ যা। বিদেশে খালি টাকা আর টাকা।
– কিন্তু আমি কাউকে চিনিনা। আমাদের বিদেশ যাওয়ার অত টাকা নাই।
– আরে ধুর। ভাই আছেনা। তুই যাবি কিনা বল। কাগজ পাতি দে। পাসপোর্ট করিয়ে আনি।

তুহিনের মাথায় বিদেশের পোকা ঢুকে গেলো। অনেক টাকা হবে। চোখ বুঝলে দেখতে পায় তাদের বাড়িতে দোতলা বিল্ডিং হয়েছে। গ্রিল দেয়া বারান্দায় চেয়ারে বসে আছে মা। পায়ের কাছে টুলে বলে পান বানিয়ে দিচ্ছে ঘোমটা দেয়া নতুন বউ মিমি। বাপ মা রাজি হচ্ছিলো না কিছুতে এতটুকু ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে। তুহিন জিদ করে। কোথায় সে আর ছোট আছে। এই বয়সে তার দাদা বিয়ে করে ফেলে। গ্রামে তার বয়সী অনেকেই বিয়ে করেছে। বাচ্চাও হয়েছে কারো কারো। মিমির সাথে দেখা হলো। মিমি বলে, বিদেশ গিয়ে আমাকে ভুলে যাবা নাতো!
মিমিকে কি সে ভুলতে পারে। মিমির জন্যে সে সব করতে পারে। বদু ভাইয়ের মত বিদেশ থেকে ফিরে সেও বাইক কিনে বাইকের পিছে মিমিকে বসিয়ে সে টাঙাইল সদরে যাবে সিনেমা দেখতে।

একদিন নাইকানিবাড়ির রাশেদের সংগে দেখা। ছেলেটা সহজ সরল। সবার সাথে কথা কইতে পারেনা। তবে একবার শুরু করলে থামানো মুশকিল হয়ে যায়। এর বোধ হয় কোন মাইয়ার সংগে লাইন টাইন নাই। সবসময় দেখা যায় পোলাপাইনগো লগে ঘুরতেছে। আড্ডা দিতেছে। রাশেদ তাকে দেখে তার স্বভাবসুলভ টোনে জিজ্ঞেস করলো,
– ও তুহিন, তুমি নাকি বিদেশ যাতিছো?
– হ ভাই। যাওয়ার চিষ্টা করতিছি।
– কবে যাবা। কুনদেশে?
– তা এওনো জানিনে। পাসপোর্টের জন্যি কাগজপাতি দিছি। প্রথমে নাকি ভারতে কাজের ভাইভা দিতি হবে। তারা বাছাই করলি তারপর মিডল ইস্টে যাওয়া যাবে।
– সে আবার কিরাম কথা। বুঝে শুনে যাইয়ো।
– চাচা কোন দেশে আছে রাশু ভাই?
– আব্বা তো সৌদি থাকে।

মাসখানেক বাদে তুহিনের হাতে পাসপোর্ট ধরিয়ে দেয় বদু ভাই। তুহিনের এখনো ভোটার লিস্টে নাম ওঠেনি। সেই কারণে কাগজপত্তর ঠিক করতে নাকি অনেক টাকা খরচ হইছে। তুহিনের বাপকে উত্তর বিলের সাত কানি জমি বেঁচতে হলো। আল্লাহ দিলে পোলা বিদেশ গেলে এরকম জমি কত হবে তার কি ইয়ত্তা আছে।

বিদেশ যাওয়ার দিন কিছুতে আসছিলো না। তুহিন অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলো। তারপর একদিন হঠাৎ এসে গেলো সেইদিন। তুহিনের মনে হলো, ইশ কোন কারণে যাওয়াটা যদি পন্ড হয়ে যেতো। কিন্তু সব চাওয়া পূর্ণতা পায় না। তুহিন জানতোনা যে সে গলাকাটা পাসপোর্ট হাতে ভারতে চলে গেলো।

কত জাত বেজাতের মানুষ চারপাশে। তবে রক্ষে বদু ভাই ভারত পর্যন্ত এলো। এ শহরের নাম নাকি হায়দরাবাদ। বদু ভাই আরো কিছু ছেলেকে সাথে করে আনছে বাংলাদেশ থেকে কাজ দেবে বলে। বদু ভাই লোকটা খুব ভালো।


একদিন পরে ভাইভার দিন। তুহিন মনে মনে ভয় পাচ্ছিলো। আরব দেশের লোক যদি তাকে আরবিতে প্রশ্ন করে তাহলে তো সে কিছু উত্তর দিতে পারবেনা। মনে মনে সে আল্লাহকে ডাকতে লাগলো। বদু ভাই অভয় দিলো। আরে ধুর ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। ওরা তোদের কাজ করাতে নেবে। মেয়ে জামাই বানাতে না। দেখবে ফিট টিট আছিস কিনা। এই আর কি।

ভাইভার দিন একটা কাঁচের ঘরে তুহিনের মত আট দশ জনাকে শুধুমাত্র সাদা রঙের হাফপ্যান্ট পরিয়ে বসিয়ে রাখা হলো। তাদের নাকি ফিজিক্যাল ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে এভাবে। কাঁচের ওপাশে কারা আছে তুহিন জানেনা। গার্ডের ড্রেস পরা একটা লোক শক্তমুখে দেয়ালে লাগানো একটা টিভি পর্দার দিকে চেয়ে আছে। তবে পর্দাটা টিভির চেয়ে কম্পিউটারের মত দেখতে। কি সব ছক কাটা। লোকটা হঠাৎ এগিয়ে এসে সব থেকে সুন্দর ছেলেটার দিকে এগিয়ে এলো। ইংরেজিতে বললো স্ট্যান্ড আপ। ছেলেটা ভয়ে ভয়ে দাঁড়ালো। ছেলেটার সাথে তুহিনের আলাপ হয়েছে। খুব কম কথা বলে। ভীতু ভীতু চাহনি। বাড়ি খুলনা জেলায়। খুলনা জেলায় তো সুন্দরবন। ইশ তুহিনের কিছু দেখা হলো না। টাঙাইলের বাইরে সে কোথাও যায়নি আগে। বিদেশ থেকে পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে ফিরলে সে মিমিকে সাথে নিয়ে হানিমুনে যাবে সুন্দরবনে। নাকি কক্সবাজারে? কোনটা ভালো হবে! বদু ভাইকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। কিংবা রাশু ভাইকে। সে গুগল করে পাড়ার সবাইকে এটা ওটা খুঁজে দেয়।

গার্ডটা ফর্সা ছেলেটার হাত ধরে হ্যান্ডশেক করে বললো, “কংগ্রাচুলেশনস। ইউ হ্যাভ বিন সিলেক্টেড।” তারপর হাতের মার্কার কলম দিয়ে বাম দুধের উপরে ইংরেজিতে এক লিখে পাশের ঘরে নিয়ে গেলো। তুহিনকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। তৃতীয়বার তাকে সিলেক্ট করলো। তার বুকেও ইংরেজিতে তিন লিখে দিলো। লেখার সময়ে তার গায়ের মধ্যে সুড়সুড় করছিলো। পাশের রুমে নিয়ে বসালো তাকে। বিকেলে বদু ভাইয়ের সাথে দেখা। তার পিঠ চাপড়ে দিলো। কিরে তুহিন, বিদেশ গিয়ে আমাকে ভুলে যাবিনাতো। দুদিন বাদেই তোদের ফ্লাইট। তারপর সোজা দুবাই। সে হাত দিয়ে প্লেন ওড়ার ভঙ্গি করলো।

তুহিন শাওয়ার বন্ধ করে দিলো। পানির ঝিরিঝির শব্দ থামতে একরাশ নৈশব্দ তাকে ঘিরে ধরলো। বাইরের ঘরে খাবারের ট্রে রাখার শব্দ হলো। নিশ্চয়ই তুকুটেলা এসেছে খাবার দিতে। কি এক অদ্ভুত নিয়ম এখানে। যেদিন তুহিনের আরব মনিব আসে সেদিন তুহিনকে খাবার দেয়া হয় না। মনিব চলে গেলে খাবারের ট্রে হাতে আসে তুকুটেলা। বদরুলকে তুহিন ভুলতে পারেনি। যদি কোনদিন দেশে ফিরে যেতে পারে তাহলে টুটি চেপে ধরবে তার। তার গোব্দা দেহটা নিথর হওয়ার আগপর্যন্ত কিছুতেই ছাড়বেনা।

সেই বিকেলের পরে আর নরপিশাচ টার দেখা পায়নি তুহিন। একটা ইন্ডিয়ান তাদেরকে হিন্দিতে কেই মেই করে সারাক্ষণ বকেছিলো। কি বলতো তার কিছু না বুঝলে তুহিন বুঝতো যে লোকটা বিরক্ত। কিছু লোক এমন থাকে। সারাক্ষণ বিরক্তি নাকের ডগায় নিয়ে ঘোরে। দুইদিন বাদে তুহিনকে খুলনার সেই ছেলে আর আরো তিনটে ছেলের সাথে প্লেনে তুলে দেয়া হলো। প্লেনে অনেক কিছু খেতে দিয়েছিলো। ওয়েটার গুলার হাতে মদের বোতলও দেখেছে একবার। খুলনার ছেলেটা বললো, এদেরকে নাকি ওয়েটার বলেনা, এয়ার হোস্ট্রেস বলে। দুবাই এয়ারপোর্ট এ নামার পরে তারা আলাদা হয়ে গেলো। কে কোথায় যাচ্ছে তাও জানেনা। নিয়োগকারী ব্যক্তি আলাদা। কাজও আলাদা। তুহিনকে নাকি হোটেলের রিসেপশানে কাজ দেয়া হবে। বেতনের কথা শুনে তো বিস্ময়ে থ। এই কাজ করে লাখ টাকা কামানো সম্ভব। সে ভাবতেই পারেনি। তার উপর থাকা খাওয়া ফ্রি। সপ্তাহে একদিন ছুটি।

মাইক্রোবাস তাকে বড় একটা বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো। বাইরে পিঠপোড়া গরম। তার সারা গা চিড়বিড় করে উঠলো। এখানেই প্রথম তুকুতেলার সাথে দেখা। ছয়ফুটি কৃষ্ণাঙ্গ লোকটাকে দেখে তুহিন কিছুটা অবাক হয়েছে। শক্তিসামর্থ্য লোকটা বেশ কষ্ট করে উচ্চারণ করলো, বাংলাদেশ?

তুহিন মাথা নেড়ে হ্যা বললো । আফ্রিকান লোকটি হাতনেড়ে তাকে অনুসরণ করতে বললো। তুকুতেলা লোকটা গম্ভীর। কিছু বলেনা। বললেও লাভ কি হতো। আরবি টারবি বললে তুহিন বুঝতোই বা কি। বিকেলের দিকে তুকুতেলা আবার এলো। তাকে গোছল করতে নিয়ে গেলো একটা ঘরে। গোছলখানা এত বড় হতে পারে তুহিনের জানা ছিলো না। একটা শ্যাম্পুর বোতল নিয়ে তুহিন মাথায় মাথায় দিতে গেলে তুকুতেলা শব্দ করে হেসে উঠলো। তুকুতেলা ইশারায় দেখিয়ে দিলো এটা মাথায় নয় গায়ে মাখতে হয়। তুহিন অবাক হলো। লিকুইড সোপের সংগে তার পরিচয় ছিলোনা। বডি ওয়াশকে সে শ্যাম্পু ভেবেছিলো। জিনিসটা ভালো ছিলো। গায়ে মাখলে ভুরভুর করে গোলাপ ফুলের সেন্ট বের হয় যেন চামড়া থেকে। গোছল শেষে একসেট ড্রেস দিলো তুকুতেলা। আবার হাফপ্যান্ট। আরবদেশে কি তাকে হাফপ্যান্ট পরে কাটাতে হবে। একদিক থেকে অবশ্য মন্দ না। আরব দেশে যে গরম। ড্রেস পরার পরে তাকে ঠিক স্কুল পড়ুয়া বালকদের মত কিউট লাগছে। বেশ সুন্দর একটা বডি স্প্রে ছড়িয়ে দিলো তুকুতেলা। তারপর এক গ্লাস জ্যুস খেতে দিলো। জ্যুস খাওয়া শেষ হতেই একজন আরবীয় পোশাক পরা লোক ঘরে ঢুকলো।


লোকটাকে দেখে তটস্থ হলো তুকুতেলা। মাটির দিকে চেয়ে রইলো। লোকটা আরবিতে কিসব বললো। তুকুতেলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। লোকটা তুহিনের কাঁধে হাত দিয়ে ঘরে রাখা খাটের দিকে এগিয়ে গেলো। তুহিন বুঝে নিলো এই তার মালিক। এর অধীনে কাজ করতে হবে। তুহিন কিছু বুঝে ওঠার আগে আরবটা তাকে জড়িয়ে ধরলো। তাকে চুমু খেতে লাগলো ঠোঁটে। এসব কি! তুহিন বাঁধা দিতে গেলো। একি তার হাত দুর্বল লাগছে কেন। হাতে বল পাচ্ছেনা। তবে জ্যুসে কি কিছু ছিলো! তারপর তুহিনের সংগে সেই বিছানায় যা যা হতে লাগলো তা তুহিনের কল্পনাতেও কোনদিন ছিলোনা। তুহিনের যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সারা ঘর ফাঁকা। কেউ নেই। যে পোশাকটা সে পরে ছিলো তা মেঝেয় লুটাচ্ছে। সম্পূর্ণ দিগম্বর সে। বিছানার সাদা চাদরে রক্ত। রক্ত তার দুই উরুতে শুকিয়ে আছে। হঠাৎ তুহিন বুঝতে পারলো তার সারা শরীরে অমানসিক ব্যাথা করছে। কোথাও যেন কেটে ফেটে গেছে। মাথাটা তার আস্তে আস্তে কাজ করতে শুরু করেছে।

তুহিনকে কেউ কিছু বলে দেয়নি তবুও সে বুঝতে পারলো তার সাথে কি হয়েছে। মুক্ত এক পথিক পথ হারিয়ে মরুদেশে এসে বন্দী দাসের জীবন পেয়েছে। দাস নাকি রক্ষিতা! কোন শব্দটা উপযুক্ত! তুহিন ধরতে পারেনা। সপ্তাহে এক কি দুদিন আরব লোকটা আসে। বাকিটা সময় তার শুয়ে বসে কাটে। এখন তুহিন অভ্যস্ত হয়ে এসেছে। সে জানে বাঁধা দিলে ব্যাথা বাড়ে। তাই চেষ্টা করে আরবটাকে দ্রুত প্রশমিত করা যায় এমন কিছু করতে। ঘরের কম্পিউটারে একগাদা ছেলেদের ব্লুফিল্ম আছে। আরব ব্যাটাটা সে সব দেখে সেভাবে করার চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে তার এক বন্ধু আসে। দুজন হলে তুহিনের কষ্ট হয়ে যায়। একদিন সেই বন্ধুটির সাথে খুলনার সেই ছেলেটি এলো। আল্লাহ। আফিফের ভাগ্যেও তুহিনের মত অবস্থা। প্রথম সেশানের পরে আফিফ তুহিনকে বললো ওয়াশরুমে যাবে। সে আফিফকে ওয়াশরুমে নিয়ে যেতে তাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। এই জীবন আফিফ মানতে পারছেনা। সেও পালাতে চায়। কোথায় পালাবে। কার কাছে যাবে এই মরুর দেশে!

সকালের দিকে চলে যায় আফিফ তার মনিবের সাথে। সারা রাত্রির অত্যাচারে অত্যন্ত ক্লান্ত তুহিন। ওয়াশরুমে গিয়ে গোছল করার ইচ্ছেও হচ্ছেনা। অন্যদিন আরবটি চলে যাওয়ার পরে সে সারা গা ভালো করে ধুয়ে আরবটির স্পর্ষ মুছে ফেলতে চায়। তার দুচোখ ভেঙে কান্না এলো। মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ছে। কি করছে মা। তার জন্যে পাগল হয়ে কি আলুথালু বেশে নাইকানিবাড়ির রাস্তায় ঘুরছে আর একে ওকে তুহিনের কথা জিজ্ঞেস করছে। কাঁধের উপর দুফোঁটা গরম পানির স্পর্ষ পেতে তুহিন মাথা ঘুরিয়ে তুকুতেলাকে দেখতে পেলো। কখন এসেছে খেয়াল করেনি। তুকুতেলার চোখে জল। তুকুতেলা লোকটি খারাপ নয়। তুকুতেলার ভাষা তুহিন বোঝেনা। তবে এটা বুঝেছে যে সে আরবি বলেনা। অন্য কোন ভাষা বলে। মাঝে মাঝে তুকুতেলা তার ভাষায় তুহিনকে গল্প বলে যায়। কি বলে তুহিন বোঝেনা। তুকুতেলা গল্প বলতে বলতে কখনো হাসে কখনো বেদনাময় অভিব্যক্তি দেয়। তুহিনও তাকে মাঝে মাঝে গল্প শোনায়। দেশ বাড়ির গল্প, মায়ের কথা, মিমির কথা। অর্থ না বুঝলেও মন দিয়ে বুঝে নেয়। তুহিন লক্ষ্য করে দেখেছে তুকুতেলা স্বাধীন হলেও কিছুতেই এই বাড়ির বাইরে যেতে চায় না। কি তার জীবনের গল্প। বাইরের দুনিয়ার প্রতি কেন এত ভয় এই বিশালদেহীর। তুহিন তাকে ইশারায় কত বার পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। সে শুধু ডানে বায়ে মাথা ঝাঁকায়।

আরবীয় মনিব রতিসুখ মিটিয়ে যাওয়ার পরে তুকুতেলা জলদি তুহিনকে গোছল করে একসেট পোশাক পরিয়ে গেটের দিকে ঠেলতে লাগলো। প্রথমে তুহিন কিছু বুঝতে না পারলেও কিছুসময় পরে সে বুঝতে পারলো যে তুকুতেলা তাকে পালিয়ে যেতে দিচ্ছে। সে পালিয়ে গেলে তুকুতেলার কি হবে। এসব ভাবনার উত্তর মেলায় আগেই তুহিন নিজেকে আবিষ্কার করলো সে প্রচন্ড বেগে দৌড়াচ্ছে। সন্ধ্যার আলো জ্বলতে শুরু করেছে চারপাশে। বুকখানা হাপড়ের মত উঠানামা করছে। পানি খেতে পারলে ভালো হতো। পানি কই পাবে।

তুহিন জানে তাকে কোথায় যেতে হবে। বাংলাদেশ দূতাবাস। কোথায় সেটা! রাশু ভাই থাকলে তাকে গুগল করে বের করে দিতে বললে তখনই বের করে দিতো। ভালো করে ইংরেজিটা না শেখার কষ্ট সে অনুভব করতে লাগলো। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে জিজ্ঞেস করতে লাগলো বাংলাদেশ এমব্যাসি কোথায়? প্রশ্ন জিজ্ঞেস যাকে করে সেও যে ইংরেজি বোঝে এমন না। দুবাই শহর যেন সারা রাত জেগে থাকে। অনেক হাটলো সে। এক পর্যায়ে সে পৌছে গেলো আব্দুল্লা হুসেইন আল মালিক ভিলা, ১২৩/৩ স্ট্রিট, আবু হাইল রোড, আল উহেইদা, দেইরাতে। বাংলাদেশ দূতাবাসে। তখন রাতের আধার কেঁটে আলো ফুটে গেছে চারিধারে। সকালের তীব্রতা জানান দিচ্ছে নতুন দিনের সূর্য। ক্ষুধার্ত পেটে তাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখলো দারোয়ান অফিস খোলা পর্যন্ত। অনেক হাতে পায়ে ধরার পরে সে সাক্ষাৎ পেলো কনস্যুলেট জেনারেলের। লোকটা সৌম্যদর্শন। মন দিয়ে তুহিনের কথা শুনলো। তুহিনের কাছে পাসপোর্ট চাইলো। পাসপোর্ট কিভাবে দেবে সে। দুবাই এয়ারপোর্ট এর বাইরে আসতেই তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয় ড্রাইভার।


রাষ্ট্রদূত তুহিনকে বলে তার খুব বেশি করার কিছু থাকবেনা। একেতো তুহিনের বাংলাদেশী পাসপোর্ট নেই। তার উপর জাতীয় পরিচয় পত্রের ডাটাবেজেও নাম নেই। কিভাবে প্রুফ হবে যে সে বাংলাদেশি। আমি তো বাংলায় কথা বলছি। দুর্বল গলায় বলে তুহিন। রাষ্ট্রদূতের ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা দেখা দিলো। ভারতেও অনেকে বাংলায় কথা বলে। কনস্যুলেট জেনারেলের রুম থেকে বেরোতে হয় তাকে। তাও সে বসে থাকে। একটা পাউরুটি দিয়েছিলো এরা তাকে। গোগ্রাসে গিলে খেলো সে। অফিসারের হাতে পায়ে ধরলো অনেক। বড় স্যারের দেখা আর মিললো না। সিকিউরিটি তাকে যখন বের করে দিলো তখন আবারো বিকেল ঘনিয়ে এসেছে। পেটে ভেতর ক্ষুধার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। কোথায় যাবে সে। দুচোখে অন্ধকার দেখছে। একবার মনে হলো তুকুতেলার কাছে ফিরে যাবে সে। কিভাবে যাবে। সব দালান যেন দেখতে একই রকম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সে উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটছে। হালকা আধারে দাঁড়ানো এক লোক শিস দিলো। তুহিন তাকাতে লোকটা তাকে কিছু একটা ইশারা করলো। মাথা ঠিকমতো কাজ না করলেও লোকটার ইশারা বুঝতে পারলো। যে জীবন থেকে সে পালাতে চাইলো সেই জীবন কেন তাকে এত বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। তুহিন হাত দিয়ে ইশারা করলো, ফুড ফার্স্ট। ক্ষুধার কাছে পরাজিত হলো তুহিন। লোকটা ফিচেল হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো।

মরুর আকাশ তখন হাজারো তারা নিয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। খেঁজুর গাছের শাখা দুলিয়ে আসা লু হাওয়ায় ভর করে সে জিগাইলো, পথিক তুমি কি পথ বাছিয়া লইলে! তুহিনের তখন উত্তর দেওয়ার অবকাশ নেই। তার মুখের ভিতর তখন অন্য কিছু।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.