প্রেম ও ভালোবাসা

লেখকঃ হোসেন মাহমুদ

এক

পনের-ষোলতে সিদ্ধান্ত নির্বাচনে কিছুটা সাবধানী হতে হয়, ঠিক যেন গরম চায়ে প্রথম চুমুকের মত।

দুই

চিরসবুজের বাংলাদেশ প্রমাণ করতে বুড়ো কড়ই মাঠের এক কোনায় ঠায় দাঁড়িয়ে, ঠিক যেন আমার গ্রামের স্কুল মাঠের মত। পেট মোটা বিল্ডিং এর শহরে মরচে পড়া টিন মাথায় স্কুল ঘর গুলো আজও দাঁড়িয়ে, বোধহয় সরকারের গর্ভে জন্মেছিল বলে। সকাল-বিকাল সাইকেলের প্যাডেলে পা মেরে এই পথটা মাড়াতে গেলে কাঁসার ঘণ্টার আওয়াজ কানে জ্বালা ধরায়। আওয়াজটা রাস্তা অব্ধি সীমাবদ্ধ থাকলে মোটেও মাথা ঘামাতাম না। হাজারীবাগ ট্যানারির পাশ দিয়ে হেঁটে আসতে গেলে যেমন বিনে পয়সায় চামড়ার গন্ধ শরীরের সাথে লেপটে বাসায় চলে আসে, তেমনি স্কুলটাকে সাইকেলের পিছনে ফেলতে গেলে ঘণ্টার আওয়াজ কান চেপে চলে আসে, আমি যেখানে অফিস-বয়ের কাজ করি সেইখানটায়। সারাটা দিন সেই ঘণ্টা বিরতিহীন বাসের মত আমার পিছনে ছুটে। বড় সাহেবের অফিস কক্ষে, হল রুম, কিচেন কিংবা কলতলায় যেখানি যাই না কেন ঘণ্টার প্রতিধ্বনি আমার পিছু ছাড়ে না। মাঝে-মাঝে এই ঘণ্টা, সুতো-কাটা ঘুড়ি হয়ে আমাকে নিয়ে চলে আমার গ্রামের ফেলে আসা শৈশবে।

যে গ্রামটার সাথে আমার নাড়ির সুতো সংযুক্ত, সেটি মফস্বল নাম নিয়ে তখনই জবুথবু দাঁড়িয়ে ছিল; আর এখন তা শহর হয়ে দু’পেয়ে কুকুরের মতো ড্রেনে পড়ে আছে। মেঠো পথ ধরে এক ক্রোশ হাঁটলেই বটতলা। ফি-দিন বটগাছটা মৌচাকের মত লোকালয় দিয়ে পেট মোটা করেই চলছে। ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় বাসা থেকে আড্ডা দেয়ার সদ্য ছাড়পত্র পাওয়া আমারা বন্ধুরা এই বটতলাতেই আড্ডা দিতাম। নাকের নিচে গজানো বাদামী কেশ কালচে হয়ে উঠার আগেই আমার বন্ধুরা চোখের জ্যামিতিক কম্পাস দিয়ে স্কুল ফেরত বেগম রোকেয়াদের শরীর কাটাকুটি করত। আমি তখন ঠোঁটের কোনে শুকনো হাসি টেনে বখাটেপনায় নিজের অবস্থান বন্ধুদের বুঝাতাম। কিন্তু চোখে থাকত যুদ্ধ-ফেরত সন্তানের অপেক্ষারত মায়ের দৃষ্টি। এই বুঝি জং-ধরা দু’চাকার ফনেক্সটা আমাদের সামনে এসে বেল বাজাবে! খাকী-প্যান্টে কোমর জড়ানো একটা পা মাটিতে ফেলে কেউ একজন জিজ্ঞাস করবে; “স্কুল শেষে এখনো বাড়ী যাওনি বুঝি?” আমরা তখন টান করা সিনা নত করে, মাথা নুইয়ে ল্যাম্পপোস্ট হয়ে সাইকেল আরোহীকে সালাম দেই, গলা খাদে নামিয়ে বলি, “বাড়ীই যাচ্ছিলাম, বটতলা অব্ধি এসে দেখি অমলটা পিছনে পড়ে গেছে। তাই ভাবলাম একটু জিরিয়ে যাই” আমাদের কথা শোনে সাইকেল আরোহী মুচকি হেসে প্যাডেলে চাপ মারে। তার হাসি আমাদের জানান দিত, কাঁচা শব্দের বুননে যে মিথ্যা বাক্য গুলো তাকে উৎসর্গ করেছিলাম;তার সবকটাই মিথ্যার জাল থেকে বেকসুর খালাস হয়ে তার চোখে সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে। রাস্তার পাশে ঝোপের আড়ালে দাড়িয়ে গরম পানি বিসর্জনরত অমল, আমাদের কথা শোনে তেল ফুরিয়ে আসা মোটরের মত থেমে থেমে পানি ছাড়ে আর তার বন্ধুদের মিথ্যা বলার গুণে বিমোহিত হয়।

কোন এক অফিস ছুটিতে এই বটতলায় এসে বেতফলের মত খামোখা ঘণ্টা দুই বসে কামাল, অমল, পার্থ, সতিশদের অপেক্ষায় ছিলাম। মান্না দে ওপার যাওয়ার সময় আমার বন্ধুদের “কফি হাউজ” গানের ফ্রেমে বন্ধী করে দিয়ে গেছেন বিধায়; সেইদিন বন্ধুদের চেহারা আর দেখা হয়নি। বাড়ী ফেরার পথে কে যেন ভাঙা গলায় পিছু ডাকে। কাশ্মীরি শালে ঢাকা শরীর আর মোটা লেন্সের ফাঁকে দু’টো বৃদ্ধ চোখ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে আমার কাছে কুশলাদি জানতে চায়, “তেমন একটা দেখি না যে। কই থাকো এখন?” আমি অপ্রয়োজনে বাক্য অপব্যয়ে সচেতন হই। তাকে বোঝালাম যে শহরে রাজনীতির চাকা ঘোরে, পেট্রোল বোমা আর বালুর ট্র্যাকে করে, সেই শহরে বসবাস। বৃদ্ধ আমার কথায় সন্তুষ্ট হয়েছে বলে মনে হয় না। ডান হাতের লাঠি বাম হাতে নিয়ে খানদানি কাশি ছাপানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আবার প্রশ্ন ছুড়ে, “মতিন তো প্রেসক্লাবে ট্রেনিং এ গেছে। চেন নাকি?” আমি প্রেসক্লাব চিনি, মতিনকেও চিনি। কিন্তু মতিনকে কথার ঝুড়ি থেকে উপচে ফেলার অপচেষ্টায় তাৎক্ষণিক উত্তর দেই, “প্রেসক্লাব ফার্মগেট থেকে বেশী দূরে না”। বৃদ্ধর চোখের দৃষ্টি কিছুটা শীতল হয়, কাঁপা-কাঁপা হাতে শক্ত করে লাঠি চেপে নেতানো কণ্ঠে বলে, “মতিন তোমার কথা খুব বলে। একদিন বাড়ী এসো তবে” “দেখি, আসবোনি একদিন সময় করে” আমার উত্তরে বৃদ্ধ আশ্বস্ত হলেও কম্পিত হাত কাঁপা বন্ধ হয়নি। ডান হাতটা আমার ঘাড়ে রেখে বাড়ী আসার নিশ্চয়তা চায় সে। যেন তার বাড়ীতে আমার পায়ের ধুলো না পড়লে দেশের উশৃঙ্খল রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে না আদৌ! বুড়োর হাত থেকে মুক্তি পেয়ে চিন্তা করতে লাগলাম, অনেকে বলে মানুষের মমতার বেড়ী ছেঁদ করে বেরিয়ে আসা ওত সহজ নয়। কই! আমিতো ঠিকই পেরেছি। এই বৃদ্ধর মমতার ছায়ায় অনেক দিন আমার পিঠ বেঁচেছে বেতের আঘাত থেকে। প্রায় রাতে কই মাছের ঝোলে কিংবা কাঁচা আমে কাচকি মাছের চচ্চড়ি দিয়ে বৃদ্ধর পাশে বসে পেট পুরিয়ে বাড়ী ফিরেছি। আজ তার মমতার চাউনি উপেক্ষা করে কি সুন্দর অবলীল-অবহেলায় পিঠ দেখিয়ে বাড়ী ফিরছি। বৃদ্ধ যে মতিনের নামে কবিতা পড়ে গেল, তাকে আমি শুধু কথার সুতো থেকে নয়, জীবনের প্রতিটি স্তর থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলাম একটা সময়। কিন্তু আমার জীবন থেকে মতিনের নাম মুছে ফেলা আজও সম্ভব হল না। যার কারণে আমার বিদ্যার দৌড় ম্যাট্রিকের গণ্ডির মধ্যে বন্দী, যার কারণে এত কম বয়সে গ্রাম ছেড়েছি, তাকে এত সহজে ভুলা যায়?

তিন

আরেক অফিস ছুটির বন্ধে, যেবার দেশে রানা-প্লাজার মত ভবন বিধ্বস্ত হয়ে হাজার মানুষ মারা পড়েনি- আমি বৃদ্ধ দর্শনে যাই। যাত্রাপথে কেজি দুই আম আর বাড়ীর ছানা-পোনার কথা চিন্তা করে বোম্বে স্যুইট’স এর ক্র্যাকাস নিয়ে রওনা হই। দুই টান মারা সিগারেট রিক্সওয়ালাকে দিয়ে জোরে চালাতে বলি। সিগারেট পেয়ে তার মুখে গাঁজাখোরী বোল ফুটে, তার পোয়াতি বউ ফি-বছর বাচ্চা বিয়ানোর মেশিন হিসাবে গাভীন হয়, তারপরও সে বাংলা বাজারের জরিনা সুন্দরীকে নিয়ে চৌমুহানি ব্রিজের নিচে নীল প্ল্যাস্টিকের উপরে সাড়ে চার মিনিটের সংসার পাতায়। তার খেজুরে আলাপের মাঝখানে ব্যাঘাত ঘটিয়ে সেই পরিচিত বাড়ীর সামনে নোঙর ফেলতে বলি। বাড়ীর বউ-ঝিদের পর্দা রক্ষার্থে শুকনো সুপারি-পাতা দিয়ে তিন দিক ঘেরা পাঁচিল। কার যেন গাবানো জাল রোদ পোহাচ্ছে। মাচার উপরে সীমাবদ্ধ থাকতে নারাজ চাল কুমড়ো গাছ, ভূমি-দস্যুদের মত পুরো টিনের চাল নিজের দখলে নিয়ে বসে আছে। বেড়ার ফাঁকে একজোড়া মেয়েলী চোখ আমাকে অজগরের মত আস্ত গিলে খাচ্ছে। কার এই চোখ-দ্বয়?

আমি দরজায় কড়া নাড়ি। উস্খু-খুসকো ছেড়ে দেয়া চুলে এক কিশোরী দরজা খুলে সরে দাড়ায়। খাঁটি সরিষার তেলওয়ালা ভদ্রলোক ছেলে-মেয়েদের লন্ডন-প্যারিস-নিউইয়র্কে তেল পাঠানোর আগেই টিভি মিউট হয়ে যায়। ঘরের ভিতর থেকে বৃদ্ধের বেদম কাশির শব্দ আর বড় করে ধম নিয়ে হাঁক ডাক শোনা যায়, “কে, কেরে এই অসময়ে?” নুনে-হলুদ মাখা বার হাত শাড়ীর ছেঁড়ে দেয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এক গৃহবধূ সামনে এসে দাঁড়ায়। সালাম দিয়ে বললাম, “আমি…” “ও মিতু ইনারে বসতে দে” অ্যাইরে-ব্রাইশরে, পরিচয় দূরে থাক, পুরো বাক্য বানানোর সময়টা পর্যন্ত দিল না। কে এই মহিলা আর মিতুই বা কে?

খানিক বাদে শ্যাম-বর্ণা এক বালিকা আমায় পথ দেখিয়ে বসার ঘরে নিয়ে আসে। আমি ঘরের চার দিকে তাকাই। লম্বা চুলে যুবক রবীন্দ্রনাথ সাদাকালো ছবি হয়ে আজও দক্ষিণের বেড়ায় দাঁড়িয়ে। কাঁচের শেলফ ভর্তি নিউজ-প্রিন্টের কাগজে শরৎ, নজরুল, জীবনানন্দরা অনাদরের ধুলো গায়ে চড়িয়ে বেজায় বিরক্ত। পড়ার টেবিলটা বোধহয় বদলেছে। আগের কাঁঠাল গাছের পোক্ত তক্তার টেবিলটায় আমার কলমের অকথ্য কাটাকুটিতে ট্র্যাফিক জ্যাম লেগেছিল। আমার পছন্দের উত্তর-দিকের চেয়ারটা আজও সেখানেই আছে। এই চেয়ার নিয়ে জগলুর সাথে প্রতিরাতে আমার বেঁধে যেত। “ঐ চেয়ারটার মধ্যে কোন মৌচাক-ভাঙা মধু লেপটে আছে?- তুই শুধু ঐ চেয়ারটাতেই বসতে চাস” জগলুকে আমি সেইদিন বলতে পারিনি, এই চেয়ারে বসে মতিন স্যারকে জড়িয়ে ধরতে পারি, তাকে নিয়ে দার্জিলিং কিংবা শিলিগুড়িতে ঘুরে আসতে পারি। বোধহয় মতিন স্যারও আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ভাষা পড়তে পারত। টেবিলের পাশে পাতা সেই রাজকীয় পালংকটা এখনো বর্তমান। এই মশারি খাটানোর স্ট্যান্ডে মতিন স্যারের জামা-কাপড় ঝুলানো থাকত। সবার আগে পড়তে এসে স্যারের জামাকাপড়ে শরীরী ঘ্রাণ নিতে গিয়ে একদিন ধরা পড়েছিলাম স্যারের হাতে। ভেবেছিলাম সেইদিন পিঠের ছাল তুলে ডুগডুগি বাজাবেন, কিন্তু স্যার কিচ্ছু বললেন না। কিচ্ছু না বলাতে সেইদিন কিশোরের সাহস জ্বালানী তেলের দামে বৃদ্ধি পায়। তারপরের দিন অংকের খাতায় স্যারের নামের সাথে আমার নাম জুড়ে দিলাম পেলাস মেরে। তবুও স্যার মুখে তালা দিয়ে বসে ছিলেন। তবে মাইকেল মধুসূদনের “মেঘনাদ বধ” কাব্য’র মাঝ পাতাতে যে লেখে ছিলাম “স্যার আপনাকে ভালোবাসি” সেইটা নিশ্চয় স্যার দেখেছিল। তাই তো রেওয়ামিলে অমিল করায়, বেত ছেড়ে সেইদিন হাত দিয়েই চড়িয়েছিলেন। আমিও নাছোড়বান্দা, স্যারের উপর রাগ করে তার নামের সাথে সাবিনা ম্যাডামের নাম যোগ করে, লাভ চিহ্নের আলপনা একে দিয়েছিলাম স্কুল টয়লেটের দরজায়। ভেবেছিলাম আমার এই ক্যান্ডে স্যার সিধা হয়ে দ্বিধায় পড়বেন। কিন্তু আফসোস, তার কয়েকদিন পর স্যার এমন বোমটাই না ফাটালেন, যার জন্য আমার গড়া প্রেমের তাজমহলটা চিতায় তুলে অনিশ্চয়তার ঠ্যালা-গাড়ি ছেপে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হই।

কাঁচা-হলুদ রঙা মশারীর ভীতর থেকে বুড়ো কেশে উঠে। তেল চিটচিটে বালিশ থেকে মুখ তুলে বলে, “ ও মতিনের বউ, ছানা-পোনারা গেছে কই?” “কিছু লাগবে?” পর্দার ফাঁক থেকে সেই গৃহবধূর কণ্ঠস্বর। “মেহমানরে পানি-টানি কিছু দাও। এনারে চিন নাকি?” গৃহবধূ এক বাক্যে রগ কাটে, “বোধহয় চিনি”। তার কথা শুনে আমি ঢোক গিলে চিন্তায় আঁচড়ে পড়ি। তারমানে সেই কিশোরের অযাচিত ভালোবাসার কাহিনী স্যার তার স্ত্রীকে বলে দিয়েছে!!!

এমন সময় চার-পাঁচ বছরের হাফপ্যান্ট পড়া এক বালক সারা গায়ে কাঁদা মেখে ঘরে ঢুকে। “ও মনা এনারে সেলাম কর” কাশতে-কাশতে বুড়ো নাতির উদ্দেশ্যে বলে। সাথে করা আনা আম আর ক্র্যাকাস ধরিয়ে দেই মনার হাতে। স্যারের ছেলে মনা দেখতে অবিকল বাবার মত হয়েছে। সেই হাসি, সেই নাক, সেই চোখ, যারা একটা সময় আমার দর্শনের প্রধান উপজীব্য ছিল। মিতু আলমারি খুলে শরীফ মেলামাইনের ফুল আঁকা মণিহারের গ্লাস বাহির করে। ওপাশ থেকে মিতুর মা বলে, “যা গরম পড়েছে, উনার আবার লাগছে ঠাণ্ডা” মতিন স্যারের ঠাণ্ডা? ব্যাঙের আবার সর্দি-কাশি হয় নাকি? আচ্ছা এই ক’বছরে স্যার কি খুব বুড়িয়ে গেছে? আজতো স্কুল বন্ধ। তবুও কি স্যার বাড়ীতে নেই? আমার মনের কথা বুড়ো বুঝতে পেরে বলে, “ও মিতু তোর বাপ পোলা পড়াইয়া এখনো আসে নাই?”

“মতিন তো প্রেসক্লাবে ট্রেনিং এ গেছিল, চেন নাকি?” “প্রেসক্লাব ফার্মগেট থেকে বেশী দুরে না” আমি বুড়োর ছেঁড়া কথা জোড়া লাগাই। ঘুরে ফিরে একই প্রসঙ্গ আসে, কথারা হামাগুড়ি দেয়, বিশ্রাম নেয়, অবসর চায়। এরই ফাঁকে গ্লাস ভর্তি লেবু ঘ্রাণ নিয়ে মিতু দাঁড়ায়। গ্লাস বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে নামে, তৃষ্ণার জল তারপাশেই ধোঁয়াশা জমায়। এইরকমই ভালোবাসায় তৃষ্ণার্ত এক কিশোর এই বাড়ীর চৌকাঠে মাথা ঠেকিয়েছে বারংবার। কুকুরের মত তার স্যারের পায়ে পায়ে ঘুরেছে। মানছি, হয়তো কিশোরের সেই ভালোবাসা বালি দিয়ে গড়া খেলাঘর ছিল। কিন্তু স্যারকে নিয়ে যে ভালোবাসার নিজস্ব আকাশ সে বানিয়েছিল, তার শতভাগ দোষ কি শুধু সেই কিশোরের? স্যারেরে কি কোন প্রশ্রয় ছিল না তাতে? প্রতিদিন জামার পকেট থেকে কোকোলা চকলেট জ্যামস কে বের করে দিত? ফাইনাল এ্যকাউন্ট মিলালে একটি শক্ত হাত কিশোরের পিঠ চাপড়ে কে বাহ বাহ দিত? কিশোর অসুস্থ হলে বাড়ি বয়ে আপেল হাতে কে দেখতে যেত? কিশোরের অবাধ্য দৃষ্টি যখন স্যারের উপরে এসিডের মত নিক্ষিপ্ত হত, কই? স্যারতো কোন দিনও তাকে বাঁধা দিত না?

শরবতের গ্লাস হাতে আমার দিকে তিন জোড়া চোখ শিকারির মত তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলি, “আজ উঠি তবে” হাঁপানি ব্যারামে আক্রান্ত বৃদ্ধ জোরাজোরি করে নিজেই সিদ্ধান্ত দেয়, না খেয়ে ফেরা হবে না। এক পর্যায়ে সাব্যস্ত হয়, দুপুরে খেয়েই যেতে হবে। বুড়ো আর নাতি মিলে গাবানো জাল নিয়ে মুরগী শিকারে নামে। বাড়ীর এপাশ-ওপাশ তাড়া করেও কোন মুরগী নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে জালের ফাঁদে আসলো না। অবশেষে সেই জাল নিয়েই বুড়ো পুকুরে নামলেন। আমি দাওয়ায় বসে দাদা-নাতির মাছ-মুরগী শিকারের যুদ্ধ দেখি আর জীবনের এই পর্যায়ে এসে জীবনখাতার ফাইনাল এ্যকাউন্ট মিলাই।

সেইদিন যদি মতিন স্যার অন্যদিনের মত আমার পাশে এসে দাঁড়াত, মাথায় হাত রেখে বোঝাত, তবে হয়তো ঝরে পড়া স্কুল ছাত্রের খাতায় কখনো নাম লেখাতাম না। স্যার জানতো কি না জানি না, সেই সময়টা স্যার ছিল আমার পৃথিবী। আমার এক মুঠো স্বপ্নের নায়ক। কথা নেই, বার্তা নেই হুট করে স্কুলে এসে বোম ফাটিয়ে দিলেন, “আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে! এই কথা শোনার পর ঐ বয়সে বাড়ী পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়াটাই কিশোরের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল।

আমার চিন্তার সুতো কাটে মিতুর চিৎকারে। অবশেষে মিতু একটা কুচে মুরগী ধরতে সক্ষম হয়েছে। খাঁ-খাঁ রোদে পুড়ছে উঠানে শুকাতে দেয়া ডালা ভর্তি লাল মরিচ। মিতু মুরগী নিয়ে দৌড়ে আসতে গিয়ে শুকনো মরিচে পা ফেলে মচমচ শব্দ তোলে। মরিচে মিতুর ছোট্ট পা দুটো জ্বলছে কিনা জানি না, তবে আমার সারা শরীর ভীষণ জ্বলছে, তা বেশ টের পাচ্ছি। কি করলাম নিজের জীবনটাকে? অপাত্রে ভালোবাসা দান করে নিজের জীবনের সমস্ত সুখ জলাঞ্জলি দিয়েছি, পথে পথে কেঁদেছি, না খেয়ে থেকেছি আর এখন তিন হাজার মাস মাইনের অফিস-বয়ের কাজ করছি। যাকে ভালোবেসে আজ আমার বেগতিক অবস্থা, তার বাড়-বাড়ন্ত সংসার, লউ রে, মাখরে, অভাব তো কিচ্ছু নেই? সুন্দরী বউ, সাথে দুই দুইডা বাচ্চা-কাচ্চা। আহা রে… কি নিয়ে কাটালাম জীবনটা?

এতদিন স্যারের উপরে জমানো সমস্ত রাগ আজ আমার সম্মানে গলা কাটা মুরগীর লাল রক্তের সাথে প্রবাহিত করে দিলাম। আ-জন্ম হিসাব কষে আজ উত্তর মেলাতে পেরেছি। স্যারকে ভালোবেসে আমি নিজেই বনসাইকে বটে রূপান্তর করেছি। আমার ঐ কিশোর মনে স্যারের প্রতি ভালোবাসা, জ্বাল দেয়া খেজুর রসের মত গাঁড় করার পিছনে তার অবদান আছে তা অবান্তর নয়, তবে তার দিক থেকে সে হয়তো দোষীও নয়। স্যার হয়তো সত্যি আমাকে ভালবেসেছিল, বোধহয় এখনো বাসে। তবে সেই ভালোবাসার ধরন ছিল আলাদা। ছাত্র-শিক্ষক কিংবা ছোটভাই-বড়ভাই হিসাবেই হয়তো তিনি আমার মাথায় হাত রাখতেন, আমার পাগলামোতে খানিকটা প্রশ্রয় দিতেন। আর আমি সেই ভালোবাসাকে প্রেম বানিয়ে মনে মনে তাজমহল বানিয়েছি, নিজেই নিজের পায়ে কুঠার মেরে কেরিয়ারকে দশ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়েছি। একবারের জন্যও ভালোবাসাকে সংজ্ঞার ছাঁচে ফেলে চিন্তা করিনি, কোনটা প্রেমের ভালোবাসা আর কোনটা কথিত অর্থে ভালোবাসা। অবশ্য সেই কিশোর বয়সে কাঁচা মগজের নেয়া সিদ্ধান্তে ভ্রান্তি থাকতেই পারে। আসলে ষোল থেকে আঠার বয়সটাই এমন। সবকিছু রঙিন লাগে, নিজের মনের মত সব কিছু পেতে ইচ্ছা করে। নিজের স্বার্থের কাছে অন্যর চাহিদা গুলোকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। আর তখনকার সামান্য ভুল সিদ্ধান্তের গ্লানি সারাটা জীবন টানতে হয়। যেমন জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি টানছি।

চার

সব ভালোবাসা মানেই স্বর্গীয় প্রেম নয়। মধুমতি লবনের মত প্রেম ও ভালোবাসার তফাৎ সব প্রমিকদেরই বোঝা উচিৎ।

প্রথম প্রকাশঃ বাংলা গে গল্প। ১৮ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৫।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.